Showing posts with label মুসলিম বিশ্ব. Show all posts
Showing posts with label মুসলিম বিশ্ব. Show all posts

Friday, August 17, 2012

বার্মা-আরাকানের নির্যাতিত মুসলমানঃ আমাদের দায়


কাশ্মীর, ফিলিস্তিন, বসনিয়া, চেচনিয়া ও মরো মুসলমানদের ন্যায় আরাকানের রোহিঙ্গা মুসলমানরাও মজলুম মুসলমান। ধর্মনিরপেক্ষতা ও প্রগতির বুলি আওড়ানো হিন্দু-ইহুদী, খ্রিস্টান ও বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কর্তৃক এসব মসুলমানরা শুধমুাত্র ধর্মীয় কারণেই যুগ যুগ ধরে নির্যাতনে নিঃশেষ হতে চলেছে। স্বতন্ত্র মুসলিম জাতিসত্ত্বার কারণেই এরা আজ নির্যাতিত, নিপীড়িত, উদ্বাস্তু এবং নিজদেশে পরবাসী হিসেবে জুলুমের শিকার হচ্ছে। আমরা যারা ইসলামে বিশ্বাসী অথবা যারা বিশ্বাসে মসুলিম হয়েও কর্মে মুসলিম বিদ্বেষী তাদেরও দায় রয়েছে এসব নির্যাতিত মুসলমানদের সহযোগিতা করা। কেননা এসব দেশের ঈমানদার মসুলমানদের সাথে নামকাওয়াস্তে মসুলমান বা তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ইসলাম বিদ্বেষী মসুলমানরাও বিধর্মীদের নির্যাতন থেকে রেহাই পাচ্ছে না। তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ ও প্রগতিশীল মুসলমান(!) হওয়া সত্ত্বেও ইয়াসির আরাফাতকে জীবন দিতে হয়েছে স্লো পয়ঃজনিংয়ের দ্বারা, সাদ্দাম হোসেন ও ময়ুাম্মার গাদ্দাফিকে ও লাঞ্ছনার মৃত্যুবরণ করতে হয়েছে এবং বামপন্থী কমিউনিস্টি বাশার-আল আসাদকেও মৃত্যু গহ্বরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে প্রগতিশীল নামক বিধর্মী ক্রুসেডাররা। উপরোক্ত নির্যাতিত মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে দর্ভুাগ্যবান হলো বার্মার মুসলমানরা। কেননা অন্যদের নাগরিকত্বের পরিচয় আছে কিন্তু রোহিঙ্গা মুসলমানরা হাজার বছর ধরে আরাকানে বাস করে ও সেদেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকতৃ নয়। তারা এখন বিশ্বের দেশে দেশে এবং নিজদেশে নাগরিকত্বহীন, নাগরিক অধিকারবিহীন উদ্বাস্তুর জীবনযাপন করতে বাধ্য হচ্ছে।

ভৌগোলিক দিক থেকে আরাকানের অবস্থান ৯২০ থেকে ৯৪.৯০ পর্বূ দ্রাঘিমাংশে এবং ২১.৯০ উত্তর অক্ষাংশের মধ্যে। আরাকানের প্রকৃত আয়তন ১৬,৫০০ বর্গমাইল, কিন্তু ১৯৭৪ সালে বার্মার সরকারি মানচিত্রে ও নথিপত্রে ১২,৬৪২ বর্গমাইল উল্লেখ করা হয়েছে। (সূত্র- বাংলা বিশ্বকোষ, ১ম খ-, পৃ- ২২৩)। ১৯৭৪ সালে বর্মী সরকার আরাকান নাম পরিবর্তন করে রাখাইন রাজ্য নামকরণ করে। ১৯৩১ সালে ব্রিটিশ সরকার পরিচালিত আদমশুমারি রিপোর্ট অনুযায়ী বার্মার মোট জনসংখ্যা ১,৪৬,৫৩,৯৭৭ জন; তন্মধ্যে মুসলিম ৫,৮৪,৮৩৯ জন। আরাকানের মসুলমানদের সংখ্যা এখানে উল্লেখিত হয়নি। বিশিষ্ট ঐতিহাসিক ড. আবদলু করিম তাঁর ‘রোহিঙ্গাদের হাজার বছরের ইতিহাস’ নামক প্রবন্ধে লিখেছেন, “আরাকানের লোকসংখ্যা আনমুানিক ৪০ লক্ষ। তন্মধ্যে বৌদ্ধ ২০ লাখ, মসুলমান ১০ লাখ, জড়বাদী ৮ লাখ, হিন্দু ও খ্রিস্টান ২ লাখ। বৌদ্ধরা আরাকানে মগ নামে পরিচিত এবং মুসলমানরা রোহিঙ্গা নামে পরিচিত।” ২২-০৬-১২ তারিখে জাতিসংঘ প্রকাশিত তথ্যানুযায়ী আরাকানে বর্তমানে রোহিঙ্গাদের সংখ্যা আট লাখ। মসুলমানদেরকে হত্যা ও বহিষ্কার করে এবং বার্মার বৌদ্ধদেরকে পুনর্বাসন করে বার্মা সরকার আরাকানের মুসলমানদের অবস্থান প্রান্তিক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছে।


আরাকানের সংক্ষিপ্ত রাজনৈতিক ইতিহাস-

খ্রিস্টপর্বূ ২৬৬৬ সাল থেকে ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত আরাকান মোটামুটি স্বাধীন রাষ্ট্র ছিল বলে ঐতিহাসিকগণ উল্লেখ করেছেন।১ বেশিরভাগ সময়ে আরাকান উত্তর ও দক্ষিণে ২টি রাজ্যে বিভক্ত ছিল। খ্রিস্টপর্বূ ২২০০ থেকে ২০০০ খ্রিস্টপর্বূ  শতাব্দীতে উত্তর বিহারের মগধ থেকে আগত অনেক হিন্দু-বৌদ্ধ ও জৈন বঙ্গে, আরাকানে ও বার্মায় ধর্মপ্রচার ও উপনিবেশ স্থাপন করতে আসে। তখন থেকে আরাকান ও বার্মার শাসকগণ নিজেদেরকে মগধ রাজবংশীয় হিসেবে পরিচিত করার জন্য মহৎচন্দ্র, সুলতচন্দ্র, নরপতিগী, চন্দ্রসুধর্মা, শ্রীসুধর্মা খেতাব গ্রহণ করতো এবং রাজধানীর নাম ভারতীয় নামে বৈসালী, ধন্যাবতী, চম্পাবতী রেখেছিল।২ অপর ঐতিহাসিক তথ্য হলো- সম্রাট অশোকের মগধ বিজয়কালীন মগধ থেকে বিতাড়িত হয়ে যারা আরাকানে আশ্রয় গ্রহণ করেন তারাই আরাকানের মলূ মগ  জনগোষ্ঠী। খ্রিস্টীয় ২য় শতাব্দী থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত চন্দ্র-সর্যূ ও কোলসিংহ চন্দ্রবংশ আরাকান শাসন করেছে।

দশম শতাব্দীতে সান উপজাতি কিছুদিনের জন্য আরাকান দখল করেছিল। দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে বার্মার প্যাগান বংশ (1044- 1287) উত্তর আরাকানকে সাময়িকভাবে সামন্তরাজ্যে পরিণত করেছিল। (G.E Harvey, History of Barma, P.138)

বার্মার আক্রমণে টিকতে না পেরে ১৪০৬ খ্রিস্টাব্দে আরাকানরাজ নরমিখলা সদলবলে গৌড়ের সলুতান গিয়াসউদ্দীন আজম শাহের দরবারে আশ্রয় লাভ করেন। ১৪০৬ সাল থেকে ১৪৩০ সাল পর্যন্ত আরাকান বার্মার অধীনে ছিল। ১৪৩০ সালে গৌড়ের সুলতান জালালদ্দুীন মহুাম্মদ শাহ (যদু) দুই পর্যায়ে ৫০ হাজার সেনা সহায়তা দিয়ে তাঁকে আরাকানের সিংহাসনে পনুঃপ্রতিষ্ঠিত করেন। ১৪৩০ সাল থেকে ১৫৩০ সাল পর্যন্ত ১০০ বছর আরাকান গৌড়ের করদরাজ্য ছিল। (সত্রূ- আরাকান, রাজসভা, ড. মহুম্মদ এনামলু হক/আবদলু করিম সাহিত্য বিশারদ, তৎসূত্র-J.A.S.B vol-13, Part-1, 1844, P-46)

১৫৫৪ সালে দিল্লীর সম্রাট শের শাহের জ্ঞাতি শামসদ্দুীন মোহাম্মদ শাহ গাজী সমগ্র চট্টগ্রাম ও উত্তর আরাকান জয় করেন। ১৫৮০ সালে সমগ্র চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে যায় এবং মোগল বিজয় পর্যন্ত (২৭-০১-১৬৬৬ইং) চট্টগ্রাম আরাকানের অধীনে ছিল। ১৭৮৫ সালে বার্মার রাজা বোধপায়া আরাকান দখল করে অবর্ণনীয় জলুমু শুরু করেন। তাঁর অত্যাচারে আরাকানের মগ ও রাখাইনরা পালিয়ে বাংলাদেশে এসে স্থায়ীভাবে থেকে যায়। কক্সবাজার ও বাকেরগঞ্জের রাখাইন সম্প্রদায় এবং বান্দবানের মারমা (মগ) সম্প্রদায় উক্ত সময়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়।

১৪০৬ সাল থেকে ১৪৩০-এর মধ্যে আরাকানের অনেক মগ  বা রাখাইন বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় এবং ১৬৬৬ সাল থেকে ১৭৮৫ সালের মধ্যে আরাকানের করদরাজ্য ‘চকোমা’ (বর্তমান মিজোরাম) থেকে বর্তমান চাকমা জনগোষ্ঠী বাংলাদেশে এসে বসতি স্থাপন করে। মোগল প্রশাসকদের বদান্যতায় চাকমারা দলে দলে পার্বত্য চট্টগ্রামে এসে বসতি স্থাপন করে। ১৭৮৫ সাল থেকে ১৮২৫ সাল পর্যন্ত আরাকানে বার্মার শাসন, ১৮২৬ সাল থেকে ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন, ১৯৪২ সাল থেকে ১৯৪৫ সাল পর্যন্ত জাপানি শাসন এবং পনুরায় ১৯৪৫ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত ব্রিটিশ শাসন এবং ১৯৪৮ সাল থেকে অদ্যাবধি পর্যন্ত বর্মী শাসনের কাল।

আরাকানের জাতিগত (নৃতাত্ত্বিক) ইতিহাস

আরাকানের প্রাচীন জনগোষ্ঠী The southern মঙ্গোল বা দক্ষিণী মোঙ্গল শ্রেণীর। তিব্বতের মালভূমিতে এদের উদ্ভব ও বিকাশ। আরাকানের মধ্যবর্তী জনগোষ্ঠী হলো- বিহারের মগধ এলাকার বৌদ্ধ, হিন্দু ও জৈন আগন্তুকগণ। এদের কেউ কেউ মঙ্গোলয়েড এবং কেউ কেউ আলপাইন শাখার মানষু। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতক থেকে আরাকানে ব্যবসা- বাণিজ্য উপলক্ষে বিপলুসংখ্যক আরবী, ইরানী, তর্কুী, ভারতীয় ও বাংলাদেশী বসতি স্থাপন করেছে। এদের বেশিরভাগ ককেসয়েড মানবধারার আলপাইন শাখার মানুষ। বর্তমানে আরাকানের জনগোষ্ঠী প্রধানত ২ ভাগে বিভক্ত। প্রথমোক্তরা হলো রাখাইন বা মগ দ্বিতীয়াক্তরা হলো রোহিঙ্গা বা মসুলমান। আরবীয়, ইরানী, ভারতীয় ও বাংলাদেশী মানুষের সাথে স্থানীয় মগদের মিশ্রণে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর উদ্ভব হয়েছে। রাখাইনদের ভাষা চীন-তিব্বতি ভাষা পরিবারের অন্তর্ভুক্ত, রোহিঙ্গাদের ভাষা আরবী- ফার্সী, উর্দু ও বাংলা ভাষার মিশ্রণে গঠিত হয়েছে। অধিকাংশ রাখাইনের ধর্ম হলো থেরবাদী বৌদ্ধধর্ম। এই ধর্ম হীনযানী বৌদ্ধ ধর্মের একটি শাখা। হীনযানী বৌদ্ধ ধর্মের গ্রন্থসমূহ পালিভাষায় লিখিত। ইসলামধর্ম যেরূপ আরাকানে বহিরাগত ঠিক তদ্রুপ বৌদ্ধ, হিন্দু ও খ্রিস্টানধর্ম বহিরাগত।

আরাকান ও বার্মায় মসুলমানদের আগমনের ধারা-

বার্মা ও আরাকানে মসুলমানদের প্রথম আগমন ঝড়ের কবলে পড়ে আরব মুসলমানদের বাণিজ্যতরী আরাকান উপকূলে ডুবে যাওয়ার মাধ্যমে শুরু হয়। মূলতঃ ইসলামের আবির্ভাবকালে আরব ব্যবসায়ীগণ লোহিত সাগর থেকে চীনা উপকলূ পর্যন্ত বিস্তৃত বাণিজ্য পথের নিয়ন্ত্রণ করতো। ইসলামের আবির্ভাবের পরে আরবীয় ও ইরানী মসুলিম ব্যবসায়ীরা তাদের যাত্রাপথে অসংখ্য মসুলমান ব্যবসায়ী কলোনি স্থাপন করে। ৮ম শতাব্দী থেকে সপ্তদশ শতাব্দী পর্যন্ত বার্মা ও আরাকানে মসুলমানদের বেশ কয়েকটি বাণিজ্য কলোনি স্থাপিত হয়। এ বিষয়ক কয়েকটি ঐতিহাসিক তথ্য নিম্নরূপ-
 (১) মসুলমান নাবিকগণ নবম শতাব্দীতে বার্মায় অবতরণ করে। তাদের নিকট বার্মা নামে যে এলাকাটা পরিচিত ছিল তা ছিল নিম্ন বার্মার উপকলূীয় অঞ্চল ও আরাকান। (সূত্র-G.E. Harvay,History of Burma,P. 10)

(২) চীনা পরিব্রাজকগণ ৮৬০ খ্রিস্টব্দের দিকে বার্মা ও ইউনান সীমান্তে পারস্য দেশীয়দের কলোনি দেখতে পেয়েছিলেন। ... এ তথ্য সত্রূগুলোতে যে পেগু (নিম্নবার্মার রাজধানী) নাবিকদের উল্লেখ রয়েছে তারা ছিল আরব এবং পারস্য দেশীয়। এরা পেগু শহরে বসতি স্থাপন করেছিল অথবা তারা ছিল এদের বংশধর। মুসলমান বাণিজ্য কলোনিগুলো নবম শতাব্দীনাগাদ পেগুতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল এবং আরবদের বাণিজ্যতরী প্রায়ই এখানে ভিড়ত। (সূত্র- সিদ্দিক খান, Muslim Inter-cource in Burma. P.417)

(৩) রাশিয়ান ব্যবসায়ী আথানাসিয়াস নিচি যিনি ১৪৭০ সালে এশিয়া ভ্রমণ করেন। তিনি পেগু বন্দরটিকে “ভারতীয় দরবেশদের একটি উপনিবেশ” বলে বর্ণনা করেছেন। [সূত্র- কোর্টিনে লক সম্পাদিত The first Englishman in India (London,Jorge Rutlage 1903) P. 121]

(৪) ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারত ভ্রমণরত পর্তুগীজ পরিব্রাজত দূয়ার্তে বারবারোসা উল্লেখ করেছেন- “পেগুতে অনেক মসুলমান বাস করে। মরুীয় (মুসলমান) বাণিজ্য জাহাজগুলো পেগু থেকে চিনি, রন্ত্যক দ্রব্যাদি ও পদ্মরাগমনি রপ্তানি করে এবং কার্পাস, রেশম, আফিম, তামা, রূপা, ঔষধী ভেষজদ্রব্য ইত্যাদি আমদানি করে। পেগুর অধীনস্থ মার্তাবান এমন একটি শহর যেখানে মসুলমানরা বাস করে। (সূত্র- J.S. Farnival,Europians in Burma: The Early Porfuguse থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন ইসরাইলী গবেষক ও কূটনীতিক মোসে ইগার)।

(৫) সপ্তদশ শতাব্দীতে শ্যামরাজ্য শাসিত মারগুই ছিল মসুলমানদের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য কেন্দ্র। ১৬৭৮ খ্রিস্টাব্দে মারগুই এ অবস্থানেরও জনৈক ব্রিটিশ বণিক বলেন, “মুসলমানরা অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করতো। গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক পদগুলোই মসুলমানদের দখলে ছিল। মারগুই-এর গভর্নর, টেনাসসেরিম প্রদেশের ভাইসরয় এবং টেনাসসেরিম থেকে অযোধ্যা পর্যন্ত বিস্তৃত স্থলপথের উপর অবস্থিত প্রধান শহরগুলোর গভর্নরেরা ছিল ভারতীয় এবং পারস্য দেশীয় মসুলমান। ....সপ্তদশ শতাব্দীর শেষেরদিকে ব্রিটিশ এবং ফরাসীরা এতদাঞ্চলে প্রভাবশালী হলে অধিকাংশ মসুলমানকে পদচ্যুত করা হয় এবং অনেককে হত্যা করা হয়। [সূত্র-Moris Colis, Siamse white(London Favaur & Favour-1936)P-36-39]।

বিজেতা হিসেবে মুসলমানদের বার্মায় ও আরাকানে আগমন-

(১) দিগ্বিজয়ী সম্রাট চেঙ্গিস খানের পৌত্র চীন সম্রাট কবুলাই খানের আমলে তাঁর ইউনান প্রদেশের শাসনকর্তার ছেলে সেনাপতি নাসির উদ্দীন ১২০০০ অশ্বারোহী ও তীরন্দাজ সৈন্য নিয়ে বার্মা অধিকার করেন। এ বাহিনীতে বিপলুসংখ্যক মুসলমান ও তাতার ছিল। তখন বার্মার রাজবংশকে প্যাগান রাজবংশ বলা হতো। (সত্রূ- Yule রচিত The book of Sir Marko Polo. P-11, 99)।

(২) ১৪৩০ সালে গৌড়ের সলুতান জালালুদ্দীন মহুাম্মদ শাহ (যদু) দইু পর্যায়ে ৫০,০০০ সেনা সাহায্য দিয়ে গৌড়ে আশ্রিত আরাকানরাজ নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহকে আরাকানের রাজা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। বার্মার আক্রমণ প্রতিহত করতে এ পঞ্চাশ হাজার পাঠান ও তুর্কী সৈন্য আরাকানে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করে। এরাই বর্তমানে রোহিঙ্গা জাতি গঠনের মূল নিয়ামক।

(৩) ১৫৫৪ খ্রিস্টাব্দে দিল্লীর সম্রাট শেরশাহ- এর জ্ঞাতি শামসদ্দুীন মোহাম্মদ শাহ গাজী সমগ্র চট্টগ্রাম ও উত্তর আরাকান জয় করেন।

বার্মায় ও আরাকানে প্রধান প্রধান মসুলিম বসতিসমূহ-

ব্যবসায়ী হিসেবে, ভাড়াটিয়া সৈন্য হিসেবে, যদ্ধুবন্দী হিসেবে, বিজেতা হিসেবে বার্মা ও আরাকান সরকারের কর্মচারী-কর্মকর্তা হিসেবে মুসলমানরা বার্মা ও আরাকান সরকারের অনমুতি সাপেক্ষে উক্ত দুই দেশে বসতি স্থাপন করেন। মুসলিম ব্যবসায়ীরাই বার্মা ও আরাকানকে ব্যবসা সফল দেশ হিসেবে গড়ে তোলেন মসুলমান রাজনীতিক ও সেনাবাহিনীর লোকেরাই শক্তিশালী এবং আধুনিক দেশ হিসেবে গড়ে তলুতে প্রধান ভূমিকা পালন করেন। উভয় সরকারের অশ্বারোহী বাহিনী, নৌবাহিনী ও আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার মুসলমানরাই প্রতিষ্ঠা করেছিল। এ প্রসঙ্গে কয়েকটি ঐতিহাসিক তথ্য নিম্নরূপ-

(১) বার্মা রাজা আনরঠার মৃত্যুর পর তাঁর পুত্র সলু (Sawlu) (১০৭৭-১০৮৪) বার্মার রাজা হন। সলুর গৃহশিক্ষক ছিলেন একজন মসুলমান। উক্ত গহৃশিক্ষকের পত্রু রহমান খান এবং সলু দুধভাই ছিলেন। ক্ষমতালাভের পর সলু তাঁর দধুভাইকে উসসা (USSA) নগরীর শাসনকর্তা নিযক্তু করেন। সলরু পর তাঁর সৎভাই সানজিথা বার্মার রাজা হন। তাঁর আমলে বার্মার কয়েকটি এলাকায় মুসলিম উপনিবেশ গড়ে উঠে। (G.E. Harvay,History of Burma,P. 24/27/31)।

(২) গৌড়ের সলুতান জালালুদ্দীন মোহাম্মদ শাহ (যদ)ু ১৪৩০ সালে ৫০ হাজার সেনা সাহায্য দিয়ে আরাকানকে বার্মার দখল থেকে মক্তু করেন এবং বিতাড়িত আরাকানে রাজা নরমিখলাকে আরাকানের সিংহাসনে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। নরমিখলা ওরফে সোলায়মান শাহ্ ম্রোহং নামক স্থানে নতনু রাজধানী স্থাপন করেন। উক্ত রাজধানীর নিরাপত্তার জন্য নরমিখলা রাজধানীর চারপাশে মসুলিম বসতি স্থাপন করেন। উক্ত মুসলিম জনপদসমূহ হলোÑ রওয়াম নেদানপাড়া,  মোয়াল্লেমপাড়া, সাম্নুরিক, কুয়িপাড়া, কামারপাড়া প্রভৃতি। নিরাপত্তার জন্য নরমিখলা আরাকান-বার্মা সীমান্তেও মসুলিম বসতি স্থাপন করেন। (সত্রূ- আরাকানে মুসলমান : ইতিহাস ও ঐতিহ্য; সামিউল আহমদ খান, রোহিঙ্গা মসুলমান, পৃ.-২৭৬) একই সূত্রে বলা হয়েছে, এসব এলাকায় এখনো ৭টি মসজিদের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। যেগুলো বর্মীরাজ ও তাদের লেলিয়ে দেয়া মগদের দ্বারা লুণ্ঠিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।

(৩) আরাকানের ৫টি নদী লেম্রা, মিঙ্গান, কালাডন, মায়ু ও নাফ নদীর উভয় তীরে গড়ে উঠেছিল মসুলিম জনপদ। প্রধানতঃ চট্টগ্রামের মসুলমান বংশোদ্ভতু রোহিঙ্গা সম্প্রদায় অধ্যুষিত ছিল এ সকল জনপদ ও শত শত গ্রাম। এখনো মংডু, বুচিডং, রাসিডং প্রভৃতি মহকুমার অধিকাংশ গ্রাম বিশেষ করে নাফ, লেম্রা ও মিঙ্গান নদীর তীরঘেঁষে যতো জনপদ লক্ষ্য করা যায় সেসব জনপদে অর্ধেকেরও বেশিসংখ্যক বাসিন্দা রোহিঙ্গা মুসলমান। আগে এসব এলাকায় শতকরা ৮০ থেকে ৯০ ভাগ, কোথাও কোথাও শতকরা ৯৮ ভাগ ছিল মসুলমান। কালাডান ও মায়ু নদীর তীরবর্তী চন্দনা, মিউরকলু, কাইনি পেরাং, কাইম পেরাং, সোলিং পেরাং, টংফরু, ডবে আফকচান, কেরী, কাজীপাড়া, কেওদা, রোহিঙ্গাপাড়া, রমজপুাড়া, আমবাড়ী, বাহারপাড়া, লখনৌপাড়া, টংটং মিরং, ফলুওয়ারী পালওয়ানপাড়া, মেয়কটং, মচ্ছারী আংপেরাং, রাজারবিল, রৌশন পেরাং, জোপেরাং, ছমিলা, রোহিঙ্গাডং, আলীখং মিন জং, ছুয়েক্রংডং, মরুছং, খোয়াংছং, লোয়াডং প্রভৃতি এলাকাগুলোতে রোহিঙ্গা মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল। (সূত্র- আরাকানের মুসলমান : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সম্পাদনা- ড. মুহিব উল্লাহ সিদ্দিকী, প্রবন্ধকার- সামিউল আহমদ খান, প্রবন্ধ-‘রোহিঙ্গা মসুলমান’, পৃ.-২৮১)

এছাড়াও আরাকানের প্রধান প্রধান শহর ও বন্দরসমূহে বিপলুসংখ্যক মসুলিম বসতি দশম শতাব্দী থেকেই প্রতিষ্ঠিত হয়। উপকূলীয় এলাকায় কয়েকটি মুসলিম উপনিবেশ ছিল। এ সংক্রান্ত তথ্য হলো-

(১) বর্মী নারীগণ বিদেশিদের প্রতি ভদ্র ও সহানুভূতিশীল ছিল। বার্মায় বসবাসে লিপ্ত প্রায় অধিকাংশ ব্যবসায়ী বর্মী স্ত্রী গ্রহণ করতো। (সূত্র- Hamilton. Hall-Early English Inter-cource in Burma,P.984)

(২) Hamilton আরো লিখেন, “আরবীয় ফারসী এবং ভারতীয় মসুলমানদের বংশধররাই বার্মার মসুলিম জাতি। বর্মী ভাষায় ইহাদের ‘পথি’ বলা হয়। দ্রুত বংশবৃিদ্ধ এবং নতনু নতনু মুসলিম বণিকের আগমনের ফলে বার্মায় মুসলমানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পায়। বার্মায় মসুলমান জাতির কিয়দংশ বার্মায় আগত প্রথম মুসলমান বণিকদের উত্তর-পুরুষ এবং অবশিষ্টাংশ মসুলিম বণিক ও বর্মী রমণীর বিবাহজাত সন্তান। বার্মায় ধর্মপ্রচারের দ্বারা ইসলাম বিস্ততৃ হয়নি। এই কৃতিত্ব ঐ আমলে বিভিন্ন দেশ হতে আগত মসুলিম নাবিক ও ব্যবসায়ীদের প্রাপ্য। (সূত্র- ঐ)।

বার্মা ও আরাকানে মসুলমানদের প্রভাব ও অবদান-

আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রচলন, বহির্বাণিজ্য, নৌবাহিনী গঠন, অশ্বারোহী বাহিনী গঠন, যুদ্ধে আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার, আধুনিক মুদ্রাব্যবস্থাসহ সকল ক্ষেত্রে মসুলমানরাই বার্মা ও আরাকানকে প্রাচীন যুগ থেকে আধুনিক যুগে পদার্পণে প্রধান ভূমিকা পালন করে। এজন্য হাজার বছর ধরে মুসলমানদের সাথে আরাকানী ও বর্মীদের সৌহার্দ্যপর্ণূ সম্পর্ক ও ঘনিষ্ঠ আত্মীয়তার বন্ধন অব্যাহত ছিল। সপ্তদশ শতাব্দী থেকে বার্মায় ইউরোপীয়দের আগমন এবং পরবর্তীতে ইউরোপে বাষ্পীয় ইঞ্জিন আবিষ্কারের পর থেকে ইউরোপীয়রা মসুলমানদেরকে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করে। এ পর্যায়ে ব্রিটিশ ষড়যন্ত্র  ও Devide Rule পরিস্থিতির শিকার হয়ে মসুলমানরা অত্যাচার ও নিগ্রহের শিকারে পরিণত হয়। এতদসংক্রান্ত কয়েকটি ঐতিহাসিক তথ্য নিম্নরূপ-

(১) আরাকান রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ। তাদের মুদ্রায় ৭৯২ মথি (১৪৩০ খ্রি:) থেকে ১০০০ মথি (১৬৩৮ খ্রি:) পর্যন্ত মোট ১৫ জন রাজার বৌদ্ধ নামের সঙ্গে মসুলমান নাম পাওয়া যায়। (সূত্র- M. Robinson & L.A. Shaw: The coins of Banknote of Burma,Manchaster,1980.P.44-45)।

(২) ১৪৩০ সালের পূর্বে আরাকানের কোনো আধুনিক মুদ্রা ছিল না। আধুনিক মুদ্রা তৈরি করার জন্য আরাকানে কোনো কারিগর ছিল না। তাই আরাকানের রাজা বাংলা থেকে অভিজ্ঞ কারিগর নিয়োগ করে। মদ্রুায় আরবি ও বাংলা ভাষা এবং অক্ষরের উপস্থিতি প্রমাণ করে বাংলা থেকেই মুদ্রার কারিগররা আরাকানের টাকশালে নিযক্তু হয়। টাকশালের কর্মকর্তা- কর্মচারী ছাড়াও বিভিন্ন রকমের মুসলমান কর্মচারী, চিকিৎসক (হাকিম বা তবিব), কাজী, অশ্বারোহী ও পদাতিক সৈন্য, বণিক, ব্যবসায়ী ও কর্মজীবীগণ বাংলা থেকে আরাকান গমন করে। ড. আবদলু করিম, রোসাঙ্গে বাংলা সাহিত্য)।

(৩) ১৫০১ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৫১৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ভারত ভ্রমণরত পর্তুগীজ পরিব্রাজক দয়ূার্তে বারবারোসা উল্লেখ করেছেন, “অনেক মসুলমান পেগুতে (বার্মার তৎকালীন রাজধানী) বাস করে। মরুীয় দ্রব্যাদি ও পদ্মরাগমনি রপ্তানি করে এবং কার্পাস, রেশম, আফিম, তামা, রূপা, ঔষুিধ, ভেষজদ্রব্য ইত্যাদি আমদানি করে। পেগুর অধীন ‘মার্তাবান’ শহরে ও অনেক মসুলমান বাস করতো। [সূত্রÑ ঞযব উবষঃর ঝঁষঃধহধঃব (বোম্বাই, ভারতীয় বিদ্যাভবন, ১৯৬০) পৃ.-৬৫১, তৎসূত্র- J.S. Furnival, Eurupians in Barma, The early Portugese)।

(৪) পঞ্চদশ ও ষষ্ঠদশ শতাব্দীতে টেনাসসেরিম ও মারগুই বন্দর ইউরোপীয় নাবিকদের নিকট সপুরিচিত ছিল। তারা বর্ণনা করেছেন যে, এগুলো মসুলিমপ্রধান শহর যার সাথে মালাক্কা, বাংলা ও মক্কার বাণিজ্যিক সম্পর্ক ছিল। (সূত্র-D.C. Dcot “O” conor Mandalaya and Other cities of past in Barma(London, Hanchinchos, 1407, P.-405)।

(৫) ব্রিটিশ দূত মাইকেল সাইমন্স যিনি ১৭৯৫-৯৬ সালে এবং ১৮০২ সালে বার্মার রাজার সাথে আলোচনা করতে আসেন। তিনি তাঁর স্মৃতিগাথায় উল্লেখ করেন যে, “প্রচুরসংখ্যক বিদেশি যাদের মধ্যে মসুলমানদের সংখ্যা ছিল অত্যধিক এবং যারা বার্মায় স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেছিল তাদের সাথে লেনদেনের ব্যাপারে ক্রমবর্ধমান প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়। ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ এবং বিদেশীদের সাথে সংযোগ রক্ষা সম্পর্কিত পদগুলোতে এসব সম্প্রদায়ের বাছাইকতৃ লোকদের নিয়োগ করতে সরকার বাধ্য হয়। (সূত্র- M. Siddik Khan,Muslim Intercource with Barma,Islamic culture,P.-261.) তথ্যসূত্র Michel Simons, Second Embassy to Ava-P.198।


সেনাবাহিনীতে মসুলমান-

১। বার্মার উপকূলীয় শহরগুলোতে অনুপ্রবেশের সমান্তরালে মুসলমানেরা রাজ্যের অভ্যন্তরেও বসতি গেঁড়ে বসে। বর্মী রাজাদের এবং স্থানীয় জমিদারদের অধীনে ভাড়াটে সৈন্য অথবা যদ্ধুবন্দী হিসেবে বার্মায় এদের আগমন ঘটে। একাদশ শতাব্দীতেই রাজা অনহরথের সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত ভারতীয় সেনা ইউনিট এবং দেহরক্ষীগণ গর্বের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। স্পষ্টতই তাদের সবাই ছিল মসুলমান। (এইচ, আর স্পীয়ারম্যান, British Barma Gazzete,Vol-1, রেঙ্গুন, ১৮৮০ পৃ.-২৬২)।

২। ১৫৪১ খ্রিস্টাব্দে তাবিন সোয়েডি (১৫৩১- ১৫৫০) মার্তবান বন্দর অধিকার করেন। শহরের অনেক মসুলমান বাসিন্দা তাঁর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। ১৫৬৪ খ্রি:।

৩। ১৭৫৬ খ্রি: রাজা আলংপায়া (১৭৫২-১৭৬০) আরাকানের নৌবন্দর সিরিয়াম (পার্সী-সির-ই-আম অর্থাৎ সমুদ্রের কিনারা) অধিকার করেন। তাঁর বন্দীদের মধ্যে অনেক মুসলমান ছিল। ইউরোপীয়দের অধীনস্থ সেনাবাহিনীতে চাকরি করার জন্য তাদেরকে বাধ্য করা হয়। (G.E Harvey History of Barma,P.-241)।

(৪) বর্মী রাজা মিনডং (১৮৫৩-১৮৮৭)-এর শাসনামলে সেনাবাহিনীতে হাজার হাজার মসুলমান অন্তর্ভুক্ত ছিল এবং তারা বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োজিত ছিল। মসুলমান পদাতিক ও গোলন্দাজ বাহিনীর সৈন্যরা মিনহলা যুদ্ধে (১৮৮৫) ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে শৌর্যের পরিচয় দেয়। এর পরপরই বৌদ্ধ সান্দালয়ের পতন ঘটে। (উবাউ এর Mendalay Centenary: History of Burmese Muslims থেকে উদ্বৃতি দিয়েছেন ইসরাইলী গবেষক মোসে ইগার, ভাষান্তর মোসতাক আহমদ...... রাজতন্ত্রের আমলে বার্মায় মসুলমানদের অবস্থা)।

আরাকান ও বার্মা সরকারে মসুলমান-

কবি কাজী দৌলত ও আলাওল রচিত কাব্যসমহূ পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ১৪৩০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৬৮৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ২৫৪ বছর আরাকানের বৌদ্ধ রাজাদের দরবারে প্রধানত চট্টগ্রামের মসুলমান সভাসদদের প্রভাব ছিল। আরাকানের রাজারা চট্টগ্রামের মসুলমানদের মধ্য হতে প্রধানমন্ত্রী, সমরসচিব, উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী ও নিম্ন শ্রেণীর কর্মচারী নিযক্তু করতেন। সিলেটবাসী এক ব্যক্তিও আরাকান রাজার সমরসচিব বা প্রধান সেনাপতি নিযক্তু হয়েছিলেন। এ সময় আরাকানের সমর বিভাগ পরিচালনার দায়িত্ব ন্যস্ত ছিল লস্কর উজির খ্যাত মন্ত্রীর হাতে। আরাকানের সমর বিভাগে অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করেন লস্কর উজির। শাসন বিভাগের প্রধান পদেও মসুলমান কর্মচারী নিযক্তু করা হতো। বিচার বিভাগ পরিচালনা করতেন মসুলমান কাজী। এরূপ কয়েকজনের পদবী ও সময়কাল নিম্নে উল্লেখ করা হলো-

(১) লস্কর উজির আশরাফ খাঁ- তিনি আরাকানরাজ থিরি থধুম্মার (১৬২২-১৬৩৮) লস্কর উজির ছিলেন। তিনি চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী থানার অন্তর্গত চাবিয়া গ্রামের অধিবাসী ছিলেন।

(২) লস্কর উজির বড়ঠাকুর- তিনি আরাকানরাজ নরপতিগ্যির (১৬৩৮-১৬৪৫) সমরসচিব ছিলেন। বড়ঠাকুর আরাকানরাজ প্রদত্ত উপাধি। তাঁর পিতামহ গৌড় থেকে এসে চট্টগ্রাম জেলার পটিয়া থানার চক্রশালায় বসতি স্থাপন করেছিলেন।

(৩) প্রধানমন্ত্রী মাগর ঠাকুর- তিনি আরাকানরাজ নরপতিগ্যি (১৬৩৮-১৬৪৫) থদোমিন্তা (১৬৪৫-১৬৫২) এবং সান্দথঠুম্মা (১৬৫২-১৬৮৪) আরাকানের এই তিন রাজার আমলে প্রথমে মন্ত্রী ও পরে প্রধানমন্ত্রী নিযক্তু ছিলেন। তিনি লস্কর উজির বড়ঠাকুরের পুত্র ছিলেন।

(৪) প্রধানমন্ত্রী সৈয়দ মসুা- ১৬৫৮ খ্রি: মাগন ঠাকুরের মৃত্যু হলে সিলেটের বাসিন্দা সৈয়দ মুসা আরাকানরাজ সান্দথুঠম্মার (১৬৫২-১৬৮৪) প্রধানমন্ত্রী নিযক্তু হন। তিনি সিলেট বিজয়ী সৈয়দ নাসির উদ্দীন সিপাহসালারের বংশধর এবং হবিগঞ্জের তরফ পরগনার লস্করপুর গ্রামের অধিবাসী।

(৫) প্রধানমন্ত্রী নবরাজ মজলিশ- সৈয়দ মসুার পর তিনি আরাকানে রাজ্যের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন।

(৬) প্রধান সেনাপতি সৈয়দ মোহাম্মদ খান- তিনি আরাকানেরাজ সান্দথুঠম্মার প্রধান সেনাপতি ছিলেন। (৭) অর্থমন্ত্রী সোলায়মান- তিনি রাজা সান্দথঠুম্মার অর্থমন্ত্রী ছিলেন।

(৮) লস্কর উজির বোরহানউদ্দীন- তিনি আরাকানরাজ থদোমিন্তার এর সমরসচিব বা মন্ত্রী ছিলেন। তিনি প্রথম আরাকানের অশ্বারোহী বাহিনী গঠন করেন। চট্টগ্রামের বাঁশখালী থানার জলদি গ্রামে তাঁর বংশধররা বর্তমানে বসবাস করেন।

(৯) বিশিষ্ট মুসলিম ব্যবসায়ী উ-জী সওদাগরকে বার্মারাজ বোধপায়া (১৭৮২-১৮১৯) সোনার তাজ উপহার দেন। এটি পরে তিনি বিনা বাধায় রাজসভায় ঢকুতে পারতেন। চট্টগ্রাম, ঢাকা, কলকাতা, পেগু, মান্দালয়, আভা, ব্যাংকক প্রভৃতি স্থানে তিনি বাণিজ্য করতেন। সাফাপাড়ায় তাঁর নামে পুল এখনো বর্তমান।

(১০) ১৭০০ থেকে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে আরাকানের আরো তিনজন সেনাপতির নাম জানা যায়। তাঁরা হলেন,
(১) ক্বাইসের হ্রেলা (২) বলদিপাডার বুসিং (৩) বন্দরের আলীয়া বাইং। আলীয়া বাইং-এর পাকা মসজিদ এখনো বর্তমান।
(তথ্য সূত্র- আরাকানের মুসলমান : ইতিহাস ও ঐতিহ্য, সম্পাদনা- ড. মোহাম্মদ মুহিব উল্ল্যাহ ছিদ্দিকী, প্রবন্ধ- আবদলু হক চৌধুরী, আরাকান রাজসভায় মসুলমান সভাসদ, পৃ-১৮৮-২০৭)।

(১১) ব্রিটিশ নাগরিক হেনরি জবুসিনি ১৮৫৫ সালে বার্মা ভ্রমণ করেন। তিনি বর্ণনা করেছেন যে, পাগানের গভর্নর ছিলেন একজন মসুলমান যাকে পরে হত্যা করা হয়। (সূত্র- ক্যাপ্টেন হেনরী জলু, A narrative of the mission sent by the Govornor General of India to the court of Ava in1855, P.-228)।

(১২) ব্রিটিশ কর্তকৃ বার্মা অধিকারের কিছুকাল পূর্বে অর্থাৎ ১৭৯৫ থেকে ১৮২৫ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ব্রিটিশ এবং বর্মী রাজাদের মধ্যকার যাবতীয় রাষ্ট্রীয় কর্মকাণ্ডে মসুলমানরা বার্মার পক্ষে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। (সূত্র- পূর্বোক্ত মোসে ঈগর-এর প্রবন্ধ, পৃ.-১৭৬)।

(১৩) প্রথম এংলো-বার্মিজ যুদ্ধের পর সিংহাসনচ্যুত রাজা বার্গিদ তাঁর সিংহাসন পুনরুদ্ধারের জন্য সাহায্যের অনুরোধ জানিয়ে ব্রিটিশদের নিকট জনৈক মুসলমান দূতকে প্রেরণ করেন। রাজা বোধপায়ার আইন উপদেষ্টা যিনি ছিলেন উল্লেখিত দূতের পর্বূসূরি তিনি সেই একই মসুলমানকে এক গোপন মিশনে দিল্লীতে প্রেরণ করেছিলেন। (পূর্বোক্ত তথ্যপঞ্জী-৫২, পৃ-১৮৫)।

আরাকানের সংস্কৃতিতে মুসলমান প্রভাব-

আরাকানের লোকেরা নিজেদেরকে রক্ষইং বা রাক্ষস হিসেবে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতো। উক্ত রক্ষইং থেকে রাখাইন শব্দটি এসেছে। সভ্য মানুষের চাল-চলন, আচার-ব্যবহার তাদের মধ্যে  ছিল না। এতদসংক্রান্ত প্রামাণ্য তথ্য নিম্নরূপ-
(১) প্রাচীনকালে আরাকানীরা ছিল বন্যস্বভাবের। মাথার চলু কাটা বা হাত-পায়ের নখ কাটার ব্যাপারে তারা ছিল উদাসীন। রাজা নরমিখলার সিংহাসন পুনরুদ্ধারকালে আরাকানে আগত গৌড়ের মুসলমান সেনাদের সংস্পর্শে এসে আরাকানীরা চুল ও নখের যত্ন নিতে শিখে। মুসলিম-পূর্ব আমলে আরাকানীরা রান্না করা খাবার খাওয়া জানতো না। মসুলিম সেনারা আরাকানে খাদ্য রন্ধন প্রণালী প্রবর্তন করে এবং মশলা, তৈল, ঘির প্রচলন করে। মসুলমানদের সাধ্য নেই আরাকানীরা কোরমা, পোলাও, বিরিয়ানীর স্বাদ পায়। পোশাকের ব্যাপারেও তারা আদিম অবস্থানে ছিল। গৌড়ের রাজদরবারে ২৪ বছর নির্বাসন জীবনযাপনকারী রাজা নরমিখলা গৌড়ের অনুকরণে আরাকানের রাজদরবারে আমির-ওমরা, জেনানামহল, পর্দাপ্রথা, জল্লাদ ও ক্রীতদাসপ্রথা প্রচলন করেন। (পূর্বোক্ত- আবদুল হক চৌধরুী লিখিত প্রবন্ধ, পৃ-২০০)।

(২) বিদেশের সাথে যোগাযোগের ক্ষেত্রে বর্মী রাজারা ফারসী ভাষা ব্যবহার করতেন। ফারসী ভাষায় বুৎপত্তিসম্পন্ন মুসলমানদেরকে তারা রাজধানী, বড়শহর ও বন্দরগুলোতে দোভাষী হিসেবে নিয়োগ করেছিল। প্রতিবেশী দেশ সফরে বর্মী সরকার কর্তকৃ প্রেরিত প্রতিনিধি দলের সফরসঙ্গীরূপে দোভাষীরা সঙ্গে থাকতো।১ প্রথম ইঙ্গ-বার্মিজ যুদ্ধের সময় (১৮২৪-১৮২৬) ব্রিটিশ এবং বর্মীদের মধ্যে একইভাবে ফারসী ভাষায় চিঠি আদান-প্রদান করা হতো।২
তথ্যসূত্র- ১. মাইকেল সাইমন্স, journal of his second embassy to the court of Ava in  1802 সম্পাদনা ভি.জি.ই হল (লন্ডন, জর্জ এলন এন্ড আনউইন, ১৯৫৫) পৃ-৪০৩।
২. দেশাই, A Pagent of Burmese History, P.- 247।
৩. A Phayre, History of Burma, (London-1984) P.17
৪.সত্যেন্দ্রনাথ ঘোষাল, কাজী দৌলত বিরচিত ‘সতীময়না ও লোরচন্দ্রানী’ পৃ-৭।(চলবে)

লেখক : সম্পাদক, মাসিক ইতিহাস-অন্বেষা

Saturday, March 31, 2012

কূটনীতিক খালাফ আল আলী হত্যাকাণ্ড- এবং বাংলাদেশে ন্যায় বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনা...



৫ মার্চ সোমবার দিবাগত রাত ১.১৩ থেকে ১.১৫ মিনিটের  মধ্যে ঢাকাস্থ রাজকীয় সৌদি দূতাবাসের সিটিজেন্স্ এফেয়ার্স বিষয়ক কূটনীতিক খালাফ-আল-আলী নিজ বাস ভবনের ৫০ গজ অদূরে গুলিবিদ্ধ হন। প্রত্যক্ষদর্শী পর্তুগাল দূতাবাসের নিরাপত্তাকর্মী জুলফিকার আলী বলেন, তিনি রাত ১.১৫ মিনিটের সময় গুলির শব্দ শুনতে পান। শব্দ শুনে তিনি এবং অপর নিরাপত্তাকর্মী তালেব শব্দের দিকে এগিয়ে যান। তখন তারা দু’ব্যক্তিকে একটি সাদা প্রাইভেটকারযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে দেখেন। জুলফিকার আলী তাৎক্ষণাৎ থানায় খবর দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে আহত ও অচেতন কূটনীতিককে নিয়ে যায়। পুলিশের মতে, কূটনীতিককে সাথে সাথে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন তাঁর বুকের বামপাশে গুলিবিদ্ধ ছিল। ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ইউনাইটেড হাসপাতালের ডাক্তার খালাফ-আল-আলীকে মৃত ঘোষণা করেন।
উল্লেখ্য, খালাফ-আল-আলীর ফ্ল্যাটে নিরাপত্তাকর্মী তাপস রেমা জানান, আলী প্রতি রাতে জগিং করতে বের হতেন। প্রায় সময়ই তিনি সাইকেল নিয়ে বের হতেন। ঘটনার দিন তিনি ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে তার সাইকেলটি নষ্ট দেখতে পান। এজন্য তিনি নিচের নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদেরকে বকাঝকা করে হেঁটে বেরিয়ে যান। তাঁর সাথে শুধু একটি মাম পানির বোতল ছিল। ব্যায়ামের পোশাক পরে বের হওয়ায় তিনি সাথে সেলফোন নেননি।


খালাফ-আল-আলীর মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশ বলছে তাঁরা ঘটনার পরপরই হাসপাতালে নিয়ে যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে তারা রাত সাড়ে তিনটায় খালাফ-আল-আলীকে গ্রহণ করেন। পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য কিছু বাস্তব প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যথা-
১. পুলিশের বক্তব্য সত্য হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাত দেড়টা থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত কেন খালাফ-আল-আলীর দেহ থেকে গুলি বের করেনি। এই দীর্ঘ সময়ে তারা আহতকে কি কি চিকিৎসা দিয়েছিল। অপরদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সত্য হলে পুলিশ রাত সোয়া একটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত খালাফ-আল-আলীকে কোথায় রেখেছিল? তদন্তকারীরা কি এজন্য পুলিশ বা হাসপাতালকে জবাবদিহি করেছিল। এরূপ দায়িত্বজ্ঞানহীন অমানবিক কাজের জন্য পুলিশ বা কোনো ডাক্তারের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? ব্যবস্থা নেয়া না হলে কি বুঝতে হবে সরিষার মধ্যে ভূত ছিল- নাকি এদেশের সাধারণ নাগরিকদের মতো খালাফ-আল-আলী পুলিশ ও ডাক্তারদের অবহেলা ও অবজ্ঞার শিকার হয়েছিল?
২. খালাফ-আল-আলী ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে তাঁর সাইকেল নষ্ট হওয়ার কারণ জানতে কর্মচারীদেরকে বকাঝকা করেছিল। এতে বুঝা যায় তাঁর জানামতে তাঁর সাইকেলটি ভালো অবস্থায় ছিল কিন্তু কেউ না কেউ তাঁর সাইকেলটি অসাবধানতাবশত অথবা পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করে দিয়েছিল। এ বিষয়টি তদন্ত হয়েছে কিনা?
৩. তদন্তকারীরা তাপস রেমা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছে কি? যেমন তার জাতীয়তা, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, তার সাথে কোন কোন মহলের যোগাযোগ রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
৪. গুলিবিদ্ধের ঘটনা রাত সোয়া একটা হলেও সিআইডির ক্রাইম সিনের কর্মকর্তারা পরদিন দুপুরে ঘটনার আলামত সংগ্রহে ঘটনাস্থলে যায়। এই বিষয়ে সিআইডির ক্রাইস সিনের কর্মকর্তা জানান, পুলিশ আমাদেরকে ঘটনার কথা সাথে সাথে জানালে আমরা তাৎক্ষণাৎ আসতাম। কিন্তু আমাদেরকে আজকে জানিয়েছে বিধায় আমরা আজকে আলামত সংগ্রহে এসেছি। দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে আসায় অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গেছে। সিআইডি ঘটনাস্থলে রক্তের দাগ বা গুলির খোসা পায়নি। বিষয়টি সন্দেহজনক নাকি রহস্যজনক তদন্ত করে দেখা দরকার। কেননা দীর্ঘ ১১ ঘণ্টায় কেউ আলামত সরিয়ে ফেলেনি এর নিশ্চয়তা কোথায়?
৫. খালাফ হত্যার আগে গোয়েন্দা সংস্থা কূটনৈতিক জোন নিয়ে বিভিন্ন আশঙ্কা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- “একটি মহল সরকারকে বেকাদায় ফেলতে কূটনীতিক এলাকাকে টার্গেট করতে পারে।” ঘটনার তদন্তকারীরা উক্ত বিশেষ মহলকে তদন্তের অন্তর্ভুক্ত করেছে কিনা?
৬. কূটনীতিক এলাকার নিরাত্তাহীনতার কথা আগেই জানিয়েছিল ৪২টি দূতাবাস। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তবুও এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি কেন? পুলিশের মতে, গুলশান এলাকায় সন্ত্রাসী সংখ্যা ৯২ জন; তন্মধ্যে ১২ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। বাকি ৮০ জন সন্ত্রাসীর ব্যাপারে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন? উক্ত ৮০ জন কি সরকারি দলের প্রভাবশালী সন্ত্রাসী?


খালাফ-আল-আলী হত্যার সম্ভাব্য কারণ-
তদন্তকারীরা সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে- ছিনতাইকারী, নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ ও জনশক্তি রফতানিতে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সৌদি-বাংলাদেশ বিরোধ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা। বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়। 
(ক) ছিনতাইকারী : ব্যায়ামের ড্রেস পরা ও মাম পানির বোতল হাতে পায়চারীরত ব্যক্তির নিকট যে কিছু পাওয়া যাবে না এটা একজন বোকা ব্যক্তিও বুঝে। সুতরাং এরূপ একজন কপর্দকশূন্য ব্যক্তিকে কোন ছিনতাইকারী টার্গেট করতে পারে না।
(খ) নিজেদের মধ্যে বিরোধ : খালাফ-আল-আলীর ভাই ও সৌদি নাগরিকদের মতে, খালাফ-আল-আলীর কোনো শত্রু ছিল না। তিনি যদি সৌদি সরকারের নিকট বিতর্কিত ব্যক্তি হতেন তবে তাঁর অতীত ক্যারিয়ারে তার ছাপ থাকত এবং তাঁর চাকরি অব্যাহত থাকত না। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি চলতি মাসেই তিনি রাজকীয় সৌদি দূতাবাস জর্দানে যোগ দেয়ার কথা চূড়ান্ত হয়েছিল। এমতাবস্থায় কারো সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলে সে বিদায়ী ব্যক্তির ভালোয় ভালোয় প্রস্থানই কামনা করবে।
(গ) জনশক্তি রফতানিতে বাধা সৃষ্টি করা : হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে আমাদের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সৌদি আরব সফরে গিয়ে ফিরে এসে আশান্বিত ফলাফল জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খুব শীঘ্রই একটি সৌদি প্রতিনিধি দল জনশক্তি রপ্তানী বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ সফরে আসবেন। এ খবরে সরকার এবং দেশের জনগণ আশান্বিত হয়েছিল দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশীদের জন্য সৌদি শ্রমবাজারের দরজা উন্মুক্ত হবে। এরূপ প্রেক্ষাপটে কূটনীতিক খুন বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার ধ্বংসের একটি নীলনকশা হওয়াটা অমূলক নয়।


উল্লেখ্য, ১/১১-এর অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে রাজনৈতিক কারণে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরবর্তীতে ১/১১-এর ফসল বর্তমান সরকারের ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী কার্যকলাপ, আলেম-উলামাবিরোধী দমনাভিযানের কারণে সৌদি আরবের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন বাংলাদেশের জন্যে বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশী শ্রমিকদের শূন্যস্থান পূরণে আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। ৫ বছর পূর্বে মক্কার বৃহত্তম শ্রমিক কলোনীর প্রায় ৬ হাজার অধিবাসীর সবাই ছিল বাংলাদেশী, কিন্তু বর্তমানে উক্ত শ্রমিক কলোনীর অর্ধেক বাসিন্দাই হলো ভারতীয়। এতদসত্ত্বেও উক্ত কলোনী সংশ্লিষ্ট দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও বাংলাদেশীদের নিয়ন্ত্রণে। খালাফ-আল-আলী হত্যাকাণ্ডের পর উক্ত কলোনীর ভারতীয়রা তুচ্ছ কারণে বাংলাদেশীদের উপর হামলা করে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। আমি নিজে গত নভেম্বর মাস মক্কায় অবস্থানে করে বাংলাদেশীদের নিকট শুনেছি কিভাবে ভারতীয়রা নিজেদের অপকর্ম বাংলাদেশীদের ঘাড়ে চাপিয়ে বাংলাদেশীদেরকে সৌদি আরব ত্যাগে বাধ্য করছে। এমতাবস্থায় খালাফ আলী হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধ্বংসের ভারতীয় চক্রান্ত মনে করাটা অমূলক নয়। এতদসত্ত্বে বিষয়টির ব্যাপারে আরও বৃহত্তর পর্যালোচনা দাবি রাখে। ঘটনাটির আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আরও ব্যাপক হওয়াটা বিচিত্র নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক হত্যাপ্রচেষ্টা ও দোষারোপ
১. ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের করাচী শহরে ২ জন বন্দুকধারী একজন সৌদি কূটনীতিককে হত্যা করেছিল।
২. ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার দায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অভিযুক্ত করেছে। 
৩. চলতি বছর ভারত, থাইল্যান্ড ও জর্জিয়ায় কর্মরত ইসরাইলী কূটনীতিকদের উপর হামলার চেষ্টা চালানোর জন্য ইসরাইল ইরানকে অভিযুক্ত করেছে। অথচ ইসরাইল অনেক ইরানী বিজ্ঞানীকে ইতোমধ্যে হত্যা করেছে।
৪. মার্চ-২০১২তে ঢাকায় সৌদি কূটনীতিক খালাফ-আল-আলীকে হত্যা করা হয়।


উপরোক্ত ৪টি তথ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদেরকে আমেরিকা ও ইসরাইলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং তাদের দোসর ইইউ ও ভারতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে হবে। যায়নবাদী ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন উক্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে মুসলিম বিশ্বকে টুকরো করা, গ্রাস করা ও লুণ্ঠন করাকে নিজেদের প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে বিবাদ-বিসংবাদ, যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে তৎপর রয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু দ্বন্দ্ব-সংঘাত, শাসক-শাসিতের দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগিয়ে গৃহযুদ্ধ লাগানোর চেষ্টা করছে। যাতে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বে মুসলিম বিশ্ব শক্তিহীন হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। এ সংক্রান্ত কয়েকটি তথ্য নিম্নরূপ-
(১) মার্কিন সরকারের পরামর্শদাতা রিচার্ড পার্ল, ডগলাস ফেইথ, ডেভিড ওরমসহ কয়েকজন ১৯৯৬ সালে “A clean break : A New strategy for securing the Realms” শিরোনামে একটি প্ল্যান প্রস্তুত করেন, যাতে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইরানের সরকার পরিবর্তনের নীলনকশা উপস্থাপন করা হয়।
(২) মার্কিন সামরিক জার্নালে প্রকাশিত মার্কিন কর্নেল রাল্ফ পিটার অংকিত Broader Middle East  প্ল্যান-এ দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কিভাবে সৌদি আরবসহ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশকে টুকরো করে শক্তিহীন করে গ্রাস করবে। সাম্রাজ্যবাদীরা বাংলাদেশকেও আপাতত তিন টুকরো করার প্ল্যান গ্রহণ করেছে। এ প্লানের সারকথা হলো- (১) তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করে একটি খ্রিস্টান রাজ্য বানানো। (২) খুলনাসহ সাবেক ৬টি জেলা নিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র বঙ্গভূমি। (৩) ঢাকা কেন্দ্রীক অবশিষ্ট অংশ নিয়ে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক হত্যার উক্ত ৪টি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও হত্যাকারীদের সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারি।
১. করাচী হত্যাকাণ্ড : ২ জন আঁততায়ী এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানে দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে লাভবান হবে তাদের শত্রুরা। কেননা সৌদি আরব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত বন্ধু। সৌদি আরবে রয়েছে পাকিস্তানের বিশাল শ্রমবাজার। উক্ত শ্রমবাজার থেকে পাকিস্তান বঞ্চিত হলে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ধ্বংস হবে এবং সাম্রাজ্যবাদীরা পাকিস্তানের উপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারবে। পাকিস্তানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।
২. যুক্তরাষ্ট্রে হত্যা প্রচেষ্টা : রিচার্ড পার্লের উক্ত প্ল্যানে আমরা দেখতে পেয়েছি ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের টার্গেটকৃত দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানে হামলার প্রকাশ্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ও হুমকি দিচ্ছে। ইরানকে পরাজিত করতে হলে সৌদি আরবের সাহায্য অতীব প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সৌদি কূটনীতিক হত্যা চেষ্টায় ইরানের ঘাড়ে দোষ চাপালে ইরান-সৌদি বিরোধ আরও তীব্র হবে যা সাম্রাজ্যবাদীদের কাম্য।
৩. ইসরাইলী কূটনীতিক হত্যাপ্রচেষ্টা : যেসব দেশের সাথে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সেসব দেশেই ঘটনাগুলো সংঘটিত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আর ঘটনার পরই ইরানকে দোষারোপ করা হচ্ছে। যায়নবাদী ইসরাইলের অপকৌশল সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল। তাদের মতে, ইসরাইল ঘটনাস্থলের বন্ধুরাষ্ট্রের দ্বারা তদন্ত করে ইরানের বিরুদ্ধে দলিল প্রস্তুত করে ইরানে হামলার একটি যুৎসই অজুহাত খুঁজে পাবে এবং ইরানী বিজ্ঞানী হত্যার দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করবে।
৪. ঢাকার হত্যাকাণ্ড : খালাফ-আল-আলীর হত্যা হত্যাকাণ্ডকে আমি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করি। কেননা এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিতাড়ন করা গেলে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। অভাব, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক হানাহানি দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে এবং উক্ত গৃহযুদ্ধ বন্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শান্তিরক্ষী নিয়ে সদলবলে হাজির হবে। ভবিষ্যতে চীন-ভারত-মার্কিন যুদ্ধে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা সহজ হবে।


বাংলাদেশে ন্যায় বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনা
বাংলাদেশে এখন মৎস্য ন্যায় অবস্থা। এখানে এখন রাষ্ট্র-সরকার ও সরকারি দল একাকার। দেশের সকল সুযোগ-সুবিধা আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ কেবল মাত্র সরকারি দলের সেবায় নিয়োজিত। সরকার জনকল্যাণের পরিবর্তে প্রভুরাষ্ট্রের কল্যাণে সদা-সর্বদা সজাগ ও সতর্ক। কেননা প্রভুরাষ্ট্রসমূহ ১/১১-এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। সরকার প্রধানকে বিপদ থেকে বাঁচাতে সামরিক হেলিকপ্টার পাঠানোসহ সম্ভাব্য সকল সাহায্য প্রদানের প্রকাশ্য ঘোষণা দিচ্ছে। ফলে সরকার দেশ-জনগণের কল্যাণের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজ দল ও প্রভুরাষ্ট্রের কল্যাণ কামনাকে নিজের পরবর্তী মেয়াদের ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রধান অবলম্বন মনে করছে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের সকল বিভাগ এখন বিশৃঙ্খল ও বেসামাল হয়ে রাষ্ট্রকে অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত করেছে। নিজ দল,  সরকারের মন্ত্রী-এমপি অথবা প্রভুরাষ্ট্রের স্বার্থ পরিপন্থী কোনো তদন্ত কার্যক্রম এদেশে বাধাহীনভাবে চলতে পারে না, তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। কয়েকটি তদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে আলোচনা করলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে।
১. বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যাকাণ্ড: ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে ঢাকার পিলখানার বিডিআর হেডকোয়ার্টারে সংঘটিত এ ঘটনায় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৩ ব্যক্তি নিহত হন। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হয়। সমকালীন পত্র-পত্রিকায় এতদসংক্রান্ত যে সব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা ছিল নিম্নরূপ :
ক. বিডিআর বিদ্রোহের উস্কানিদাতা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথে বর্তমান সরকারের ৮ জন মন্ত্রী এমপি জড়িত ছিল। যাদের মধ্যে তিনজন প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়।
খ. মুখোশ পরিহিত বহিরাগতের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে যারা বিডিআরের সদস্য ছিল না। (The Daily Star, Dhaka, 5 March, 2009)
গ. ১২ জন ভারতীয় ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডো হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় এবং কাজ শেষে নিরাপদে ভারত প্রত্যাবর্তন করে। (দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা, ১৬ মার্চ, ২০০৯)। 
ঘ. ২ মার্চ ২০০৯ তারিখের হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছে, “বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করার জন্য ভারত আসামের জোড়াহাট বিমানঘাঁটিতে জঙ্গীবিমান মোতায়েন রেখেছিল এবং কলিকাতার নিকটস্থ কালাইকুন্তায় এক ব্রিগেড প্যারাসুট বাহিনী প্রস্তুত রেখেছিল।


উক্ত দেশবিরোধী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রথমটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক, দ্বিতীয়টি সেনাবাহিনী কর্তৃক, তৃতীয়টি সিআইডি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি। পত্রিকান্তরে আমরা জানতে পেরেছি, সরকার তদন্ত কমিটির ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল যাতে ঘটনার মদদদাতা, উস্কানিদাতা ও বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে তদন্ত করা না যায়। সেনা তদন্ত দলের সদস্যরা সরকারি শর্তাবলী মান্য করার ব্যাপারে ১০-০৫-২০০৯ তারিখে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এতদসত্ত্বেও সেনা তদন্তদলের তদন্ত রিপোর্ট, সিআইডির তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির ৩০৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের ৭টি পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে।
২. শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি : ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকার শেয়ার বাজার লুট করেছিল। তখনকার তথ্য যা পাওয়া গিয়েছিল তা হলো- সরকারের শীর্ষ ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও ৩ জন মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী উক্ত শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতা ছিল। ২০১১ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয় এবং ২ জন ইতোমধ্যে আত্মহত্যা করেছে। এ ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট ও আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত রিপোর্টে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করা হলেও তারা সরকারের নিজস্ব লোক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 
সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড : মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনী নিজেদের বাসায় খুন হলেও এ খুনের ঘটনার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগ অযাচিতভাবে এ ঘটনায় নাক গলিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার প্রধানের স্বার্থ অথবা সরকারের প্রভু রাষ্ট্রের স্বার্থ এখানে জড়িত আছে। এ ঘটনার ব্যাপারে ২ জন রাজনীতিকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য-
(ক) ২৭-২-২০১২ তারিখে লালমনিরহাটের বিশাল জনসভায় বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, “সাগর-রুনীর নিকট সরকারের দুর্নীতির গোপন তথ্য থাকায় উক্ত তথ্য আদায়ে সাগর-রুনীকে খুন করা হয়। হত্যার পর তাদের বাসা থেকে ল্যাপটপ ও মোবাইল ছাড়া আর কোনো বস্তু চুরি হয়নি। খুনীরা সরকারের ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় তাদেরকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।”
(খ) বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রেসক্লাবের সেমিনারে বলেছেন, সাগর-রুনী হত্যাকারীরা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তদন্তের কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
৪. ১২ ও ১৪ মার্চ ২০১২-এর জনসভা : ৪ দলীয় জোট ঘোষিত ১২ মার্চের জনসভাকে বানচাল করতে সরকার তার সকল প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বাহিনীসমূহকে ব্যবহার করেছে। সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অঘোষিতভাবে তিন দিন বন্ধ করা হয়েছিল। আবাসিক হোটেল, মোটেল, কমিউনিটি সেন্টার ও রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। সরকারের নিকট ন্যায় বিচার চেয়ে লাভ হয়নি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় হাইকোর্ট রিট করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
পক্ষান্তরে ১৪ মার্চের সরকারি জোটের জনসভা সফল করার জন্য সরকার প্রশাসন ও পুলিশকে প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছে। সরকারি কর্মচারীরা প্রকাশ্যে ব্যানার নিয়ে উক্ত জনসভায় যোগদান করেছে। এ প্রসঙ্গে ১৫ মার্চের দৈনিক নয়া দিগন্ত শিরোনাম করেছে-
“বিরোধী দলের জন্যে রায়টকার-জলকামান সরকারি দলের জন্য বিশুদ্ধ পানি আর মোবাইল টয়লেট।” এতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি দলের জনসভায় যোগ দিতে আসা কর্মীদের বাস-ট্রেনের ভাড়া দিতে হয়নি, পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনের তেল-গ্যাস ছিল ফ্রী। 


বর্তমান সরকারের এরূপ অপকর্ম-অবিচারের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। এরূপ অন্যায়-অবিচার ও জুলুমের দেশে সৌদি কূটনীতিক খালাফ-আল-আলী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যে আলোর মুখ দেখবে না, খুনীরা যে চিহ্নিত হবে না, শাস্তি পাবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কেননা খালাফ হত্যাকাণ্ডে সরকারি দল, সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অথবা সরকারের কোনো প্রভুদেশ জড়িত থাকলে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। আমার মনে হচ্ছে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের মতোই খালাফ-আল-আলীর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রথমে পুলিশ করবে, পুলিশ ব্যর্থ হবে এবং তা ডিবিতে হস্তান্তরিত হবে, কিছুদিন পর ডিবি ব্যর্থ হবে এবং তদন্তভার সিআইডির কাছে ন্যস্ত হবে অতঃপর হিমাগারে চলে যাবে।

বাংলাদেশের করণীয় : বাংলাদেশ সরকার যদি নিজ দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তবে তাকে অবশ্যই দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য নিয়ে দ্রুততম সময়ে বন্ধুপ্রতিম সৌদি কূটনীতিক হত্যারহস্যের সমাধান করতে হবে। হত্যাকারী চিহ্নিত করতে হবে। বিদেশি প্রভুদের নাম উচ্চারণ করতে ভয় পেলে প্রকৃত সত্যটি গোপনে সৌদি আরবকে জানিয়ে দিতে হবে। যাতে সৌদি আরব যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, সরকারের ভ্রান্তনীতির কবলে পতিত হয়ে দেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় যদি সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের রেমিটেন্সের উৎস বন্ধ হয়ে যায় তবে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশে আগত রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১১৬০ কোটি ডলার, তন্মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৩৬০ কোটি ডলার, মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি দেশগুলো থেকে এসেছে ৩৮৬ কোটি ডলার এবং বাকি বিশ্ব থেকে এসেছে মাত্র ৪১৪ কোটি ডলার। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে রাজকীয় সৌদি দূতাবাসের একজন কর্মচারী নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব সকল থাই শ্রমিককে থাইল্যান্ডে ফেরত পাঠিয়েছিল।


সৌদি আরবের করণীয় : যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সৌদি আরবকে নিম্নের কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আনতে অনুরোধ করব।
১. বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ সৌদি আরবকে নিজেদের পুণ্যভূমি মনে করে এবং সৌদি আরবের ভালো খবরে খুশি হয়, মন্দ খবরে দুঃখ পায়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামপ্রিয়- সৌদি আরবপ্রিয় জনগণ শক্তিহীন ও অসহায়। সুতরাং থাইল্যান্ডের ন্যায় আচরণ করলে এদেশবাসী অতিশয় দুঃখকষ্টে নিমজ্জিত হবে।
২. বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে দিয়েছে, তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইহুদী-নাছারা ও মুশরিকদেরকে নিজেদের বন্ধু ও আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। জনগণ নয়- ইসলামবিরোধী শক্তিই বর্তমান সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এমতাবস্থায় এই সরকারের সদিচ্ছার উপর ভরসা না করে সৌদি আরবকে নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা অথবা বন্ধুপ্রতীম গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলো- বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বা সরকারি দল এই অপকর্মের সাথে জড়িত নয়। কিন্তু তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন হওয়ায় প্রভুদেশের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার ব্যাপারে ক্ষমতাহীন ও ভীত।
৪. কূটনীতিক খালাফ-আল-আলী হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা না করে পাকিস্তানে সৌদি কূটনীতিক হত্যা, যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি কূটনীতিক হত্যাপ্রচেষ্টা ও দোষারোপ, ভারত-থাইল্যান্ড ও জর্জিয়ায় ইসরাইলী কূটনীতিক হত্যাপ্রচেষ্টা ও দোষারোপের আলোকে বিচার করলে বিশ্বরাজনীতির আলোকে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজ হবে। এর মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি বা শক্তিকে চিহ্নিত করে ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণ করা সহজ হবে।
৫. প্রাপ্ত তথ্যমতে খালাফ-আল-আলী চলতি মাসেই তাঁর নতুন কর্মস্থল জর্ডানের রাজধানী আম্মানে যোগ দেয়ার কথা ছিল। তাঁর জর্ডানে যোগ দেয়ার ব্যাপারে ইসরাইল বা অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ জড়িয়ে আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। 
৬. বাংলাদেশ এখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অভয়ারণ্য। তাঁবেদার সরকার রক্ষার নামে, দূতাবাস পাহারার অজুহাতে এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের বাহানায় একাধিক সাম্রাজ্যবাদী দেশের সৈন্য ও বিশেষ বাহিনী এদেশে অবস্থান করার কথা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থে যে কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে।
পরিশেষে মরহুম খালাফ-আল-আলীর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।


২৮ মার্চ ২০১২  
সম্পাদকীয়ঃ মাসিক  ইতিহাস-অন্বেষা, এপ্রিল ২০১২
প্রবন্ধকার : সম্পাদক, ইতিহাস-অন্বেষা

Wednesday, January 25, 2012

মুসলিম বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন এবং করণীয়


মুসলিম খেলাফত যখন প্রকৃত ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে রাজতন্ত্রী-স্বৈরতন্ত্রীতে পরিণত হয় এবং মুসলিম শাসকশ্রেণী ও অভিজাত শ্রেণী কর্তব্যকর্ম ভুলে গিয়ে যখন ভোগ-বিলাস আর শান-শওকতের চোরাবালিতে আটকে পড়ে শক্তিহীন-লক্ষ্যহীন অবস্থায় উপনীত হয় তখনই ইউরোপীয় খ্রিস্টান বাহিনী ১০৯৫ সালে মুসলিম অধিকার থেকে জেরুজালেম উদ্ধারের বাহানায় বিভিন্ন মুসলিম শক্তি কেন্দ্রের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চরম দানবীয় আক্রোশে। খ্রিস্টান ঐতিহাসিক হিট্টির ভাষায়, “ক্রুসেড ছিল মুসলিম প্রাচ্যের বিরুদ্ধে খ্রিস্টান প্রতীচ্যের তীব্র প্রতিক্রিয়া ও ঘৃণার প্রকাশ।” ঐতিহাসিক গীবনের ভাষায়, “খ্রিস্টান ইউরোপের অর্বাচীন, বর্বর ও অশিক্ষিত লোকেরাই ক্রুসেডে যোগদান করে।’’

বস্তুত ইসলামের আবির্ভাব পৌত্তলিক ও ভোগবাদী গ্রীক ও রোমান সভ্যতার প্রতি ছিল এক প্রচণ্ড- হুমকি। তাওহীদবাদী ইসলামের আবির্ভাব ও তৎসংশ্লিষ্ট সভ্যতা ও সংস্কৃতির বাস্তব অবদান বহু ঈশ্বরবাদী গ্রীক-রোমান সভ্যতার ধারা ও প্রভাবকে ব্যাহত করেছে দেখে আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ে সমগ্র ইউরোপ। এই আতঙ্কের ফলশ্রুতিতে এবং নিজেদের মধ্যকার তীব্র দ্বন্দ্ব-সংঘাতকে ভিন্ন দিকে প্রবাহিত করে জাতিকে উজ্জীবিত করতে ১০৯৫ সালের নভেম্বরে পোপ দ্বিতীয় আরবান ফ্রান্সের ক্লারমাউন্টে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড বা ধর্মযুদ্ধের আহ্বান করেন। উক্ত ভাষণের মূল কথাগুলো ছিল নিম্নরূপ-
(১) “হে ফ্রাংক জাতির সন্তানেরা! এই মহান জাতি ঈশ্বর নির্বাচিত তাঁর এক প্রিয় জাতি।... জেরুজালেমের চৌহদ্দি থেকে এবং কনস্টান্টিনোপলের আশপাশ থেকে প্রাপ্ত নিদারুণ দুঃসংবাদ এই যে, সেখানে অভিশপ্ত এবং পুরোপুরি ঈশ্বরবিরোধী একজাতি খ্রিস্টানদের জনপদসমূহে হিংস্র আক্রমণ চালিয়ে আসছে আর লুণ্ঠন ও অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে জনশূন্য করে দিচ্ছে সেসব জনপদকে। খ্রিস্টান বন্দীদের একাংশকে তারা নিয়ে যাচ্ছে নিজ দেশে, অন্যদেরকে নির্মম অত্যাচারের মাধ্যমে হত্যা করছে। তারা তাদের অশূচি নোংরামী দিয়ে কলুষিত করে দিচ্ছে গীর্জাগুলোর পূজাবেদী। গ্রীক সাম্রাজ্য এখন তাদের দ্বারা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই গ্রীকদেরকে তারা বঞ্চিত করেছে এমন এক ভূখণ্ড- থেকে যার বিশালতা দুই মাসেও পাড়ি দেয়া সম্ভব নয়।
(২) আমাদের প্রভু ও পরিত্রাতা যীশুর পবিত্র কবরভূমি আজ ওই অশূচি জাতির অধিকারে- এই অপ্রিয় সত্য আপনাদেরকে জাগ্রত করুক। আপনাদের সহায়-সম্পত্তি যেন আপনাদেরকে পেছনে না টানে, পেছনে না টানে যেন আপনাদের পরিবার চিন্তা। যে জনপদে আপনারা বসবাস করছেন তা চারিদিক থেকে সমুদ্র আর পাহাড় বেষ্টিত। এত বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য খুবই সংকীর্ণ ও আপনাদের সবাইকে খাদ্যের যোগান দিতে অসমর্থ। এ জন্যই আপনারা নিজেদের মধ্যে যুদ্ধবিগ্রহে লিপ্ত হন এবং অনেকেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হন।
(৩) জেরুজালেম হচ্ছে আমাদের সকলের আনন্দের এক স্বর্গভূমি। পৃথিবীর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত সেই রাজকীয় নগরী আজ উদ্ধারের জন্য আপনাদের নিকট মিনতি জানাচ্ছে। সর্বপাপ মোচনের জন্য আপনারা সাগ্রহে তার পথে অগ্রসর হোন, আর স্বর্গরাজ্যে অক্ষয় বসবাসের গৌরব ও পুরস্কারের নিশ্চয়তা লাভ করুন।
(৪) জেরুজালেম পুনরুদ্ধারকল্পে অগ্রসরমান ক্রুসেডারদের বর্মে যতদিন থাকবে ক্রুসচিহ্ন, ততক্ষণ তাদের জন্য থাকবে ইহলোকে সকল আর্থিক সুযোগ এবং পরকালে স্বর্গলাভের নিশ্চয়তা। উদ্ধার কর জেরুজালেম!! God
wills it- ঈশ্বর ইহাই চান। (তথ্যসূত্র : ক্রুসেদের ইতিবৃত্ত, আশকার ইবনে শাইখ, পৃ. ৩১-৩২। তৎসূত্র : Alfred
Dugun, The Story of the Crusseds,Page-42).

উল্লেখ্য তৎকালীন ইউরোপে শক্তিশালী এমন কোনো শাসক ছিল না, যিনি মুসলমানদের বিরুদ্ধে হামলা করতে সক্ষম। কিন্তু তখন খ্রিস্টান বিশ্বের ঐক্যের প্রতীক ছিলেন তাদের ধর্মনেতা পোপ। উক্ত পোপই খ্রিস্টান বিশ্বকে একত্রিত করে মিথ্যা ভাষণে অজ্ঞ-মূর্খ ইউরোপীয়দেরকে ধর্মের নামে, সম্পদের নামে, স্বর্গের লোভ দেখিয়ে ধর্মযুদ্ধে লিপ্ত করেছিল।

বর্তমান সাম্রাজ্যবাদীরা কি ধর্মনিরপেক্ষ? নাকি ধর্মযোদ্ধা?
মূলতঃ ১০৯৫ খ্রিস্টাব্দের পোপ দ্বিতীয় আরবান ঘোষিত প্রথম ধর্মযুদ্ধের মেয়াদকাল ছিল ১০৯৫ থেকে ১২৯১ সাল পর্যন্ত প্রায় ২০০ বছর। উক্ত সময়ে প্রমে ২টি পর্যায়ে মুসলমানরা পরাজিত হলেও পরবর্তীতে ক্রুসেডাররা শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়। কিন্তু তারা তাদের পরাজয় থেকে শিক্ষা নিয়ে পরবর্তীতে বিজয়ীর বেশে আবির্ভূত হয়ে অদ্যাবধি মুসলিম নিধনে ব্যাপৃত রয়েছে। পক্ষান্তরে মুসলমানরা নিজেদের বিজয় থেকে শিক্ষা নেয়নি এবং সমকালীন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জনের বিষয়ে গাফেল ছিল দীর্ঘদিন। ইত্যবসরে প্রাচীন ক্রুসেডাররা সমকালীন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে বিশ্বব্যাপী মুসলিম দেশ দখল, মুসলমান হত্যা ও সম্পদ লুণ্ঠনে নিজেদেরকে নিয়োজিত রেখেছে। পূর্বে তারা মুসলমানদের দেশ দখল করেছিল পোপের ভাষণে অনুপ্রাণিত হয়ে, আর বর্তমানে তারা দেশ দখল করছে যায়নবাদী ইসরাইলের গোপন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে।

যায়নবাদী ইহুদীদের রচিত ষড়যন্ত্রের দলিল “Protocol of the Elders of the Zion ” বইতে ইহুদীদের যে লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে তা হলো- “ইহুদী ছাড়া অপর সকল ধর্মমতকে পৃথিবী থেকে নির্মূল করা হবে। ইহুদীরা যেহেতু (তাদের মতে) খোদার প্রিয় ও শ্রেষ্ঠ জাতি, সেহেতু পৃথিবী শাসন করার একমাত্র হকদার ইহুদীরা। সুতরাং পৃথিবীর সকল শাসনতান্ত্রিক ব্যবস্থা ও রাষ্ট্রসমূহকে ধ্বংস করে একজন মাত্র ইহুদী বাদশাহ সমগ্র দুনিয়ার শাসনকার্য পরিচালনা করবে। এ লক্ষ্যে তারা ইতোমধ্যে সুপার গভর্নমেন্ট হিসেবে জাতিসংঘ স্থাপন করেছে।’’

বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের পরিচয়
যায়নবাদী ইসরাইল, তার বরকন্দাজ আমেরিকা, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও ভারত। বিগত প্রায় এক হাজার বছর যাবত ইহুদীগণ কর্তৃক রচিত বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক মতবাদ ও গোপন ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে এ সকল সাম্রাজ্যবাদী দেশসহ পৃথিবীর অধিকাংশ দেশে ইহুদীদের তল্পীবাহকগণ রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করতে সক্ষম হয়। ফলে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের প্রত্যাশা মোতাবেক এ সকল দেশে সরকার গঠিত হয় না, এ সকল দেশ পরিচালিত হয় না। পূর্বে ক্রুসেড শুরু হয়েছিল পোপের আহ্বানে আর বর্তমানে ক্রুসেড পরিচালিত হয় যায়নবাদী ইহুদীদের চাহিদা মোতাবেক। বর্তমান রাশিয়া যতদিন পর্যন্ত ইহুদী কার্লমাক্স, লেনিন, ট্রটস্কি, ব্রেজনেভ-এর আদর্শে পরিচালিত হয়েছিল ততদিন রাশিয়াও সাম্রাজ্যবাদী ছিল। ইহুদীদের একমাত্র রাষ্ট্রটি একটি ধর্মীয় রাষ্ট্র। কিন্তু পৃথিবীর অন্য কোনো জাতি ধর্মরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে ইহুদীদের বরকন্দাজরা উক্ত রাষ্ট্রকে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে ঝড়ের বেগে ধেয়ে আসে।

পোপ বনাম বুশ-জন মেজরের ভাষণ
বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ কি রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত যুদ্ধ করছে নাকি ধর্মযুদ্ধ পরিচালনা করছে তার পরিচয় জানতে হলে আমাদেরকে পোপের মানস ও ভাষণের সাথে বুশ-মেজরের ভাষণ ও মানসকে মিলিয়ে দেখতে হবে। পোপের ভাষণ ইতিপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। এক্ষণে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রসমূহের কর্ণধারদের ভাষণের কয়েকটি অংশ পাঠকদের জ্ঞাতার্থে প্রদান করা হলো-
১. প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী আরব জাতীয়তাবাদীরা মুসলিম তুরস্কের বিরুদ্ধে মিত্রশক্তিকে সহায়তা করেছিল। ইসলাম ও মুসলমানদের দুশমন এ সকল নামধারী মুসলমানদেরকে তাদের খ্রিস্টান বন্ধুরা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে- মিত্রশক্তি যুদ্ধে জয়লাভ করলে আরব এলাকার মুসলমানদেরকে তুরস্কের অধীনতা থেকে স্বাধীনতা দেয়া হবে। কিন্তু যুদ্ধের পর দেখা গেল আরবদের সহায়তায় তুরস্ককে পরাজিত করে খ্রিস্টান দেশগুলো আরব অঞ্চলকে টুকরো টুকরো করে নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে এবং ইউরোপের ইহুদীদেরকে ফিলিস্তিনে এনে অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা করেছে।

মক্কার শরীফ হোসেনের সহায়তায় খ্রিস্টান মিত্রশক্তি ৯-১২-১৯১৮ তারিখে বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে। ১-১০-১৯১৮ সালে শরীফ পুত্র আমীর ফয়সাল ও ফরাসী জেনারেল গুরবানী বিজয়ীর বেশে সিরিয়ার দামেস্কে প্রবেশ করে। এ সময় ফরাসী জেনারেল গুরবানী বায়তুল মোকাদ্দাস উদ্ধারকারী সুলতান সালাহউদ্দীন আইয়ুবীর কবরে পদাঘাত করে বললেন, “রে সালাউদ্দীন! আমরা এসে পড়েছি। আমরা সিরিয়া জয় করেছি।” (সূত্র : ত্রৈমাসিক সাময়িকী, ই.ফা.বা, ২৪ বর্ষ ২য় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর-১৯৮৪)

২. ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিওরীর রচয়িতা ও শীর্ষ মার্কিন বুদ্ধিজীবী ও নীতি-নির্ধারক স্যামুয়েল হ্যান্টিংটন ১৯৯৩ সালের ‘ফরেন এফেয়ার্স’ পত্রিকার জুন সংখ্যায় লিখেন- “সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর পশ্চিমা জগতের এক নতুন শত্রুর প্রয়োজন ছিল। কারণ যুদ্ধ কখনো থেমে থাকবে না।... নতুন শত্রু ইসলামী বিশ্বও হতে পারে, চীনও হতে পারে।
৩. যুগোস্লাভিয়ার খ্রিস্টান সার্বরা যখন স্বাধীনতাকামী নিরস্ত্র অসহায় বসনীয় মুসলমানদেরকে কচুকাটা করছিল তখন বৃটেনের প্রধানমন্ত্রী জন মেজর তার পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দফতরের মন্ত্রী ডগলাস হগকে ২-৫-১৯৯৩ইং তারিখে একটি চিঠি লিখেছিলেন, চিঠির সারকথা ছিল-
(ক) ইউরোপের বুকে কোনো সম্ভাব্য ইসলামী রাষ্ট্র সহ্য করা হবে না। তাই বসনিয়া হারেজগোভিনা খণ্ড বিখণ্ড না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে দেশটি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সে দেশের মুসলমানদের কোনো রকম সাহায্য প্রদান না করার নীতি ব্রিটেন অনুসরণ করে যাবে।
(খ) ব্রিটেন জানে গ্রীস, রাশিয়া ও বুলগেরিয়া সার্বীয়দের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিচ্ছে। জার্মানি, অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া এমনকি ভ্যাটিকানও সে অঞ্চলে ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার ক্রোট বাহিনীকে অনুরূপ সাহায্য দিচ্ছে। এ সত্ত্বেও বৃটেনকে নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো ইসলামী দেশ কিংবা গ্রুপ বসনিয়ার মুসলমানদের সাহায্য প্রদানে সফল না হয়।
(গ) ভবিষ্যত ইউরোপের মূল্যমান পদ্ধতি হবে এবং অবশ্যই হতে হবে খ্রিস্টান সভ্যতাভিত্তিক। এ অভিমত প্রতিটি ইউরোপীয় দেশের ও উত্তর আমেরিকার। (সূত্র : ইতিহাস- অন্বেষা, ডিসেম্বর-২০০৭, পৃ-২৪-২৫)
(৪) মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়া নিয়ে মাহমুদ আব্বাস ও তৎকালীন ফিলিস্তিনী পররাষ্ট্রমন্ত্রী নাবিল শাব এর সাথে আলোচনাকালে প্রেসিডেন্ট বুশ বলেন, ‘‘I am driven with a mission from God, God would tell me George, Go & fight those terrorist in Afganistan, and I did, And then God would tell me George, go & end the tyranny in lraq, and I did. (Source : The Independent, Britain, 7.10.2005) মূলত বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ বাহ্যিকভাবে নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষ দাবি করলেও তাদের মুখোশের নিচে লুকায়িত রয়েছে হিংস্র সাম্প্রদায়িকতা ও পরধর্ম, পরজাতি বিদ্বেষ। উপরোক্ত উদাহরণ এবং ভারতের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সরকারের নীতি-কৌশলই এর সপক্ষে জ্বলন্ত প্রমাণ। পক্ষান্তরে মুসলমান নামধারী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও কম্যুনিস্টরা হলো নিজ ধর্ম, দেশ ও জাতির দুশমন এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহযোগী গোলাম।

বর্তমান সাম্রাজ্যবাদীদের মাস্টার প্লান- বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নিজেদের আধিপত্য চিরদিন ধরে রাখার জন্য প্রধানত ৪টি কৌশল অবলম্বন করে। এই চারটি কৌশলেও যদি কোনো রাষ্ট্রকে পদানত করা না যায় তবে তারা উক্ত দেশে সরাসরি সর্বাত্মক হামলা পরিচালনা করে দেশটি ধ্বংস করে এবং তাঁবেদার পুতুল সরকার কায়েম করে। তাদের অনুসৃত উক্ত ৪টি অপকৌশল হলো-
(১) মানসিক অনৈক্য সৃষ্টি : টার্গেটকৃত অঞ্চল ও দেশের জনগণের মধ্যে মানসিক অনৈক্য ও বিভক্তি সৃষ্টি করা হয়। এই বিভেদ সৃষ্টির প্রধান প্রধান উপাদানসমূহ হলো :
(ক) মতবাদভিত্তিক বিভক্তি : গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ, ভূখণ্ড-ভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদ, গোত্রীয় ও আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদসমূহ বিগত কয়েক শতকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহের বুদ্ধিজীবীরা আবিষ্কার করেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উক্ত মতবাদগুলোকে বিশ্বব্যাপী প্রচারপ্রসারে সহায়তা করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষকে অন্তর্কোন্দলে লিপ্ত করেছে।
(খ) ধর্মভিত্তিক বিভক্তি : প্রত্যেক দেশে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের বসবাস। সাধারণত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ধর্ম অনুযায়ী উক্ত দেশে সভ্যতা-সংস্কৃতি গড়ে ওঠে এবং রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রাধান্য পায়। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উক্ত দেশের সংখ্যালঘু ধর্মীয় গোষ্ঠীকে সংখ্যাগুরুদের বিরুদ্ধে উস্কানি দেয়। সংখ্যাগুরু ধর্মীয় গোষ্ঠীর মধ্যে বিভিন্ন ফেরকা সৃষ্টি করে, বিভিন্ন পীর-পুরোহিত সৃষ্টি করে সংখ্যাগুরুদেরকে মানসিকভাবে বিভক্ত করে দ্বন্দ্ব-সংঘাতে লিপ্ত করায় এবং জাতিকে শক্তিহীন ও বিপদগামী করে।
(গ) সাহিত্যিক মতভেদ : একটি জাতিকে স্থায়ীভাবে বিভক্তির জন্য সাহিত্যিক মতভেদ খুবই কার্যকরী। এক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদীরা সংশ্লিষ্ট দেশের অতীত ইতিহাস রচনা করে ভেজাল দিয়ে এবং মিথ্যা দিয়ে। তারা প্রতিটি দেশের কিছুসংখ্যক বুদ্ধিজীবীকে কিনে নেয়। উক্ত বুদ্ধিজীবীরা সাম্রাজ্যবাদীদের ফরমায়েশ মোতাবেক ইতিহাস লিখে। নাটক লিখে, সিনেমার ¯স্ক্রিপ্ট লিখে, উপন্যাস লিখে। উক্ত সাহিত্যকর্মের কোনোটিতে একপক্ষের উপর অন্যপক্ষ আক্রমণাত্মক সংলাপ প্রয়োগ করে, ইতিহাসে যা ছিল না তা ঢুকিয়ে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে প্রকট করে তোলা হয়। দুটি উদাহরণ দিলেই ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে।
(১) ইয়েমেনের ইহুদী আবদুল্লাহ বিন সাবাহ ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে দীর্ঘ কয়েক বছর কুরআন হাদীসের উপর ব্যাপক জ্ঞান অর্জন করে নিজেকে ধর্মীয় বোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে। তখন হযরত ওসমান (রা:) মদীনার খলিফা ছিলেন। আবদুল্লাহ তখন হযরত আলী (রা:) এর একনিষ্ঠ ভক্ত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করে। সরলপ্রাণ মুসলমানদেরকে সে এই মর্মে ওসমান (রা:) এর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে তোলে যে, খেলাফতের সত্যিকারের হকদার হলো হযরত আলী (রা:), প্রথম তিন খলিফা হলো জবরদখলকারী। সুতরাং বর্তমান খলিফাকে অপসারণ করে হযরত আলী (রা:)কে খলিফা বানানো মুসলমানদের জন্য জরুরি। এই প্রচারণায় তার অনেক অনুসারী তৈরি হয়। সে ওসমান (রা:)-এর চিঠিকে বিকৃত করার মাধ্যমে তার অনুসারীদেরকে খেপিয়ে তোলে এবং হযরত ওসমান (রা:) সাবাহর অনুসারীদের হাতে নিহত হন। এরপর মুসলিম জনমত দুইভাগে বিভক্ত হয়। একভাগ হযরত আলী (রা:) এর দলে, অন্যভাগ ওসমান (রা:)-এর হত্যার বদলা নেয়ার শপথে আমীর মুয়াবিয়ার দলে। এভাবেই মুসলমানদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতি ভয়াবহ সংঘাত শুরু হয় এবং মুসলমানরা শিয়া-সুন্নি দুই দলে বিভক্ত হয়ে অনেক রক্তপাত ঘটায়- যা এখনও বিদ্যমান।

(২) দীর্ঘ হাজার বছর ভারত উপমহাদেশ শাসন করেছিল তুর্কী, আফগান ও মোঘল বংশোদ্ভুত শাসন কর্তারা। তাঁরা ভারতে বহিরাগত হলেও তাঁরা নিজেদের জ্ঞান- যোগ্যতা ও সর্বস্ব দিয়ে বহুধা বিভক্ত ভারতকে ঐক্যবদ্ধ করেন। তাদের আমলে সরকারি চাকরি, বাণিজ্যসহ সকল ক্ষেত্রে ভারতের সকল ধর্ম-বর্ণ-গোত্রের লোক স্বাধীনভাবে নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দেশ গঠনে ভূমিকা রেখে ভারতকে বিশ্বের সবচেয়ে শান্তিপূর্ণ ও সমৃদ্ধশালী আবাসভূমিতে পরিণত করেছিল। উক্ত সময়ের কোনো সাম্প্রদায়িক হানাহানির কথা জনগণের অজানা ছিল। তখন হানাহানি হতো রাজায়-রাজায়। নিরস্ত্র জনগণ নির্বিবাদে জীবনযাপন করত। ধর্মের নামে বা ধর্মের কারণে কেউ জুলুমের শিকার হতো না। কিন্তু ১৭৫৭ সালে মীরজাফর ও জগৎশেঠ গংদের সহায়তায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলা দখল করার পর তারা এদেশের জনগণকে একের বিরুদ্ধে অন্যকে সংঘর্ষে লিপ্ত হওয়ার ব্যবস্থা করে। এক পক্ষকে চাকরি-ব্যবসা-জমিদারী দিয়ে অন্য পক্ষের চাকরি-ব্যবসা-জমিদারী কেড়ে নিয়ে তারা স্থায়ী বিভেদের বীজ বপন করে। দেশি-বিদেশি ভাড়াটিয়া বুদ্ধিজীবীদের দিয়ে মিথ্যা ইতিহাস ও সাহিত্য রচনা করে ভারতবর্ষের জনমানসকে চিরদিনের জন্য বিষাক্ত করে যায়, যার ফলে অদ্যাবধি এ উপমহাদেশ হানাহানির দেশে পরিণত হয়।

সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব  The great game plan
সাগর মহাসাগর ও বিশ্বে স্বীয় আধিপত্য বজায় রাখতে বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কয়েকটি মতবাদ অনুসরণ করে। উক্ত মতবাদসমূহের রচয়িতা হলেন, নিকোলাস স্পাইফ্স্ম্যান, হার্বাট স্পেন্সার, হেনরি পাইরেনি ও স্যামুয়েল হান্টিংটন। উক্ত মতবাদের সারকথা হলো-
(ক) ইউরোয়েশিয়ান হার্টল্যান্ডে (উত্তরে রাশিয়া, দক্ষিণে ইরান, পূর্বে চীন, পশ্চিমে পূর্ব ইউরোপ ও উত্তর আফ্রিকা এলাকাকে ইউরোয়েশিয়ান হার্টল্যান্ড বলা হয়) অবস্থিত রাষ্ট্রসমূহের ঐক্য সমুদ্রে আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তিসমূহের জন্য ব্যাপক হুমকি। এ জন্য এ এলাকার দেশগুলিকে ছিন্নভিন্ন করা, ভেঙে দেয়া, টুকরা করা বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের স্থায়ী নীতি।
(খ) ইউরোয়েশিয়ার হার্টল্যান্ডে অবস্থিত দেশগুলোতে প্রায়ই ঐক্যের প্রবণতা দেখা দেয়। এই প্রবণতাকে প্রতিহত না করলে বিশ্ব আধিপত্য বজায় রাখা যাবে না। এ জন্যই প্রথম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেন জোট মধ্যপ্রাচ্য, মধ্যএশিয়া, পূর্ব ইউরোপ, ভারত ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় অনেকগুলো নতুন রাষ্ট্রের সৃষ্টিতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছে।
(গ) পূর্ব ইউরোপকে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করা, ভারত ও মধ্যপ্রাচ্যকে রাশিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন রাখা বৃটেনের দীর্ঘস্থায়ী নীতি। দার্শনিক ম্যাকাইন্ডার বৃটেনকে এই মর্মে সতর্ক করেন যে, অদূর বা সুদূর ভবিষ্যতে রাশিয়া-চীন- ইরান এবং ভারত যদি একটি একক অবস্থানে উপনীত হয় তবে সাগরের কর্তৃত্ব যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেন ও জাপানের নিকট থেকে উক্ত শক্তি চতুষ্টয়ের নিকট চলে যাবে।
(ঘ) স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর স্যামুয়েল হান্টিংটন সভ্যতার সংঘাত নামক যে তত্ত্ব হাজির করেছেন তা মূলত ইউরোয়েশিয়ান হার্টল্যান্ড ভিত্তিক সাম্রাজ্যবাদীদের দীর্ঘ দিনের ভাবনার ফসল। তিনি মূল ধারণাকে সভ্যতার সংঘাতের আবরণ পরিয়েছেন মাত্র। হান্টিংটন তত্ত্বের মূল কথা হলো- ইউরোয়েশিয়ান হার্টল্যান্ডে নয়টি ভিন্ন ভিন্ন সভ্যতা অবস্থান করেছে। এদের পরস্পরের মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি করে এদের নিয়ন্ত্রণ ও গ্রাস করার জন্য ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ন্যাশন এস্টেট স্থাপন করলে পশ্চিমা আধিপত্য অক্ষুন্ন থাকবে। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী মার্কিন কর্নেল রাল্ফ পিটার ২০০৬ সালের ‘U-S Armed Forces Journal’- এর জুন সংখ্যায় একটি মানচিত্র প্রকাশ করেন। উক্ত মানচিত্রের শিরোনাম ছিল ‘বিস্তৃত মধ্যপ্রাচ্য প্লান’। উক্ত প্লানে যেসব দেশকে টুকরা করার এবং বড় করার লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে তা হলো-

১। সৌদি আরব
সৌদি আরবের বর্তমান ভূখণ্ড-কে পাঁচ ভাগে ভাগ করা হবে। এর কিছু অংশ জর্দানের সাথে যোগ করে  Greater Jordan, কিছু অংশ ইয়েমেনকে দেয়া হবে, কিছু অংশ কুয়েতকে দিয়ে অবশিষ্ট অংশে দুইটি দেশ গঠন করা হবে। একটি হলো মক্কা ও মদীনা নিয়ে। Islamic Sacred State অপরটির নাম হলো Soudi Homeland Independent Territory.
২। ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের প্রদেশ ও ইরাকের শিয়া অঞ্চল নিয়ে Arab Shia State, ইরাকের মধ্য পশ্চিমাঞ্চলে গঠিত হবে Sunni Iraq, ইরান-ইরাক-তুরস্ক ও সিরিয়ার কুর্দী অঞ্চল নিয়ে গঠন করা হবে  Free Kurdistan. ইরানের উত্তরাঞ্চলের কিছু অংশ তুর্কমেনিস্থানকে দেয়া হবে।
৩। সিরিয়ার পশ্চিমাঞ্চল ও তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চল যোগ করে গঠন করা হবে Greater Lebanan. তবে লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের বিরাট এলাকা ও সিরিয়ার বেকা উপত্যাকার মালিক হবে ইসরায়েল। ফিলিস্তিন-মিশরের সীমানা তুলে দিয়ে ফিলিস্তিনীদেরকে মিশরের দিকে ঠেলে দেয়া হবে।
৪। পাকিস্তান থেকে উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশ বিচ্ছিন্ন করে আফগানিস্তানের সামিল করা হবে। আজাদ কাশ্মীরকে আফগানিস্তানের সামিল করা হবে। আফগানিস্তানের পশ্চিমাঞ্চলের শিয়া অধ্যুষিত এলাকা ইরানের সাথে সামিল করা হবে। পাকিস্তান থেকে সিন্ধু প্রদেশকে বিচ্ছিন্ন করে ভারতের সামিল করা হবে এবং বালুচিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করে Free Baluchistan নামক দেশ প্রতিষ্ঠা করা হবে। মার্কিন কর্নেলের আঁকা উপরোক্ত মানচিত্র যে কোনো কথার কথা নয়, তা যে কোনো চক্ষুষ্মান ব্যক্তিই অনুধাবন করতে পারবেন। কেননা ইতোমধ্যে পাকিস্তানকে প্লান অনুযায়ী অস্তিত্বহীনতার সংঘর্ষে নিমজ্জিত করেছে। পাকিস্তানের তালেবানদেরকে (টি.টি.পি) সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ সরকারের সাথে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত করিয়েছে, বালুচ লিবারেশন আর্মীকে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষণ ও স্বীকৃতি দিয়ে বিচ্ছিন্নতার দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে। সিন্ধুতে জিয়ে সিন্ধ আন্দোলনকে পরিচর্যা করা হচ্ছে।

ইরাক ইতোমধ্যে অঘোষিতভাবে তিন ভাগে বিভক্ত হয়েছে, সকল দেশের কুর্দীদেরকে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষণ দিচ্ছে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র, সিরিয়ায় গৃহযুদ্ধ শুরু করানো হয়েছে, ইয়েমেনও গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়েছে, ইরানে গৃহযুদ্ধ লাগানোর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ায় সরাসরি হামলার প্রস্তুতি পর্ব চলছে। ইরানকে দমন করা সম্ভব হলে পারস্য উপসাগর ও এর পার্শ্ববর্তী সকল দেশে সাম্রাজ্যবাদী দখল পরিপূর্ণতা লাভ করবে। তখন ইরানবিরোধী আরব দেশগুলোর সুখনিদ্রা টুটে যাবে এবং জি.সি.সি দেশগুলোতে ও মধ্যপ্রাচ্যের বাকি দেশগুলোতে রাল্ফ পিটার অংকিত মানচিত্র বাস্তবায়ন করা হবে। সৌদি আরবসহ অন্যান্য আরব দেশগুলো তখন বুঝতে পারবে ইহুদী-নাছারাদের সাথে বন্ধুত্বের পরিনাম কী। ভবিষ্যত ঐতিহাসিকরা লিখবে, ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রীক ক্ষমতা লিপ্সার বলি হয়েছে অজস্র সম্পদ ও সম্ভাবনার আরব দেশসমূহ। ইহুদী-নাছারাদের সাথে বন্ধুত্বের মাশুল দিতে গিয়ে আরবরাও শেষ হয়েছে পৃথিবীর অন্য দেশের মুসলমানদের আশা-ভরসার স্থলকেও সাগরের গভীরে তলিয়ে দিয়েছে।

(৩) সাম্রাজ্যবাদী রচিত ডকট্রিনসমূহ
সাম্রাজ্যবাদ দেশসমূহ নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে ও বিস্তৃত করতে যে সকল স্থায়ী নীতি রচনা করেছে তা Doctrine নামে পরিচিত। বর্তমানে আমরা যেসব Doctrine- এর কথা শুনি বা জানি সেগুলির উৎস কিন্তু প্রাচীন গ্রীস এর বিভিনড়ব নগর রাষ্ট্রসমূহ। এ সকল প্রাচীন ডকট্রিনের সাথে সামঞ্জস্য রেখে রচিত হয় বিভিন্ন ডকট্রিনসমূহ। নিজ সম্প্রদায়, বর্ণ বা দেশের সমৃদ্ধির জন্য অন্য সম্প্রদায় বা জাতিকে শোষণ করা, নির্যাতন করা, পদপিষ্ট করা এই নীতির মূল প্রতিপাদ্য। এই নীতিসমূহের কয়েকটি নিমেড়ব প্রদান করা হলো-
(ক) মনরো ডকট্রিন : মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনরোকে এ নীতির প্রবক্তা বলা হয়। এর মূল বিষয় হলোÑ যে এলাকাকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট বা প্রভাব বলয়ের জন্য প্রয়োজন মনে করবে সে এলাকায় অন্য কোনো বহিঃশক্তি অথবা স্বাধীনচেতা রাষ্ট্রের উপস্থিতি মেনে নেয়া হবে না এবং সেসব এলাকার কোনো সরকারকে মার্কিন স্বার্থের পরিপন্থী কোনো কাজ করতে দেয়া হবে না। প্রয়োজনে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে বা হস্তক্ষেপ করে সরকার পরিবর্তন করা হবে অথবা দেশটি ধ্বংস করা হবে। (উল্লেখ্য, তেল-গ্যাস প্রাপ্তির পর থেকে মধ্যপ্রাচ্য এলাকাকে যুক্তরাষ্ট্র নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এ জন্য এ এলাকায় শক্তিশালী ইরাককে ধ্বংস করা হয়েছে, পাকিস্তানকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছে এবং ইরানকে ধ্বংস করার জন্য বিভিন্নমুখী কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।)
(খ) এথেনীয় পদ্ধতি : প্রাচীন এথেন্স এর শাসকরা মনে করত সৃষ্টিকর্তা তাদেরকে তাদের অনুসৃত শাসন ব্যবস্থা সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব প্রদান করেছেন। এই মহান দায়িত্ব পালনার্থে তারা অপরাপর দেশগুলোকে নিজেদের শাসন কায়েমের জন্য দখল করে নিত। আলেজান্ডারের বিশ্বজয় এরূপ মানসিকতার ফসল।
(গ) স্পার্টান মডেল বা পোলোপোনেশিয়ান লীগ : ড. আইভান এলান্ড তাঁর বিখ্যাত “দি এম্পায়ার হেজ নো ক্ল : ইউ.এস ফরেন পলিসি এক্সপোস্ড” নামক গ্রন্থে লিখেছেন, প্রাচীন স্পার্টা অন্য দেশ দখল না করে সামরিক শক্তি দিয়ে উক্ত দেশের শাসকগোষ্ঠীকে মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ করে নিয়ন্ত্রণ করত। এসব দেশের বৈদেশিক নীতি ও মৌলিক আভ্যন্তরীণ নীতি স্পার্টার মর্জিমাফিক হতো। এই মৈত্রীকে বলা হতো পেলোপোনেশিয়ান লীগ।
(ঘ) চানক্য নীতি বা নেহেরু-ইন্দিরা ডকট্রিন : ডাকাত সর্দার শিবাজী ব্যতীত যে হিন্দুজাতির মধ্যে কোনো অনুসরণীয় বীর নাই সে জাতির সদস্য ছিল চানক্য বা কৌটিল্য তা আমার বিশ্বাস হয় না। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতার রানী হেলেনকে যেরূপ সীতা বানিয়ে হেলেনের অপহরণ ও উদ্ধারের যুদ্ধকে রাম-রাবনের যুদ্ধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে, ঠিক তদ্রুপ আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময় আগত আলেকজান্ডারের কোনো সভাসদকেই হয়তো ব্রাহ্মণ্যবাদীরা নিজেদের চানক্য বা কৌটিল্য হিসেবে আখ্যায়িত করে কাহিনী রচনা করেছে। ইতিহাস পর্যালোচনায় দেখা যায়, চানক্যের সময়কাল ও আলেকজান্ডারের ভারত অভিযানের সময়কাল প্রায় সমসাময়িক। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, উক্ত ধার করা চানক্যের ন্যায় নেহেরু-ইন্দিরা ডকট্রিনও পাশ্চাত্যের অনুকরণে রচিত। চানক্যের মতবাদ, মনরো ডকট্রিন, এথেনীয় পদ্ধতি ও স্পার্টান মডেলের সাথে নেহেরু-ইন্দিরা ডকট্রিন বা The India Doctrine-এর কোনো মৌলিক পার্থক্য নেই। এ ডকট্রিনের মূল নীতিসমূহ হলো-
১. সার্ক দেশসমূহ, আফগানিস্তানের কিছু অংশ এবং বার্মাকে অন্তর্ভুক্ত করে অখণ্ড- ভারত গঠন।
২. সামরিক তৎপরতা চালানোর মাধ্যমে রাষ্ট্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি করা।
৩. টার্গেটকৃত দেশগুলোর সাথে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তি করা।
৪. অন্যকে নিজের কাছে আশ্রয় ও নিরাপত্তা চাইতে বাধ্য করাই হচ্ছে মিত্রতা।
৫. ভিন্ন বর্ণ ও জাতির সর্বস্ব অপহরণ কোনো পাপ নয়।

Orientalism বা প্রাচ্যতত্ত্ব : অষ্টাদশ শতাব্দী থেকে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ অস্ত্রের শক্তিতে এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশ দখল করে নিজেদের স্বেচ্ছাচারী শাসন চাপিয়ে দেয়। শাসনের ব্যাপারে তাদের নীতি ছিল পোড়ামাটি নীতি ও লুণ্ঠন। সমগ্র ইউরোপের জনগণ যাতে এই নীতিতে আসক্ত হয়ে পড়ে সে লক্ষ্যে পাশ্চাত্যে বুদ্ধিজীবীরা অষ্টাদশ শতকের শেষ ভাগ থেকে প্রাচ্যতত্ত্ব নামক বিভিন্ন তত্ত্ব হাজির করে। এসব তত্ত্বের দ্বারা ইউরোপ-আমেরিকার জনগণের মানস গঠন করা হয় এবং উপনিবেশিক দেশগুলোতে সামরিক ও রাজনৈতিক আধিপত্য বিস্তৃত ও বজায় রাখার জন্য প্রাচ্যের মানুষের মন-আচরণ-দৃষ্টিভঙ্গী ও সাংস্কৃতিক স্বভাবকে নিজেদের ইচ্ছামতো রূপান্তরিত, বিকৃত ও পরিবর্তন করে প্রাচ্যের একশ্রেণীর লোকের মনোজগত ও বাইরের ইমেজ পাশ্চাত্যের রঙে রঙিন করা হয়। বিংশ শতাব্দী থেকে অদ্যাবধি পাশ্চাত্য নিরন্তর চেষ্টা করে যাচ্ছে যেন প্রাচ্যের প্রতিটি দেশে পাশ্চাত্যের দেশীয় সেবাদাসরা ক্ষমতাসীন হয়। এর অন্যথা হলে পাশ্চাত্য বিভিন্ন অজুহাতে উক্ত সরকারের পতন ঘটায় বা ঘটানোর চেষ্টা করে। প্রাচ্য তত্ত্ববিশারদ Edward W. Sayeed বলেন-
“পশ্চিমা জ্ঞানজগতে প্রাচ্যতত্ত্ব নামের ডিসকোর্সের পরিশোধিত বক্তব্য হলো- পৃথিবীতে পশ্চিমের মানুষ আছে, আর আছে প্রাচ্যবাসী। প্রমোক্তরা আধিপত্য করবে আর সেই আধিপত্যের শিকার হতে হবে অবশ্যই প্রাচ্যবাসীদেরকে। যার মূল কথা হলো- প্রাচ্যবাদী পাশ্চাত্যবাসীকে নিজেদের ভূমি দখল করতে দেবে, নিজেদের আভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহ কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে দেবে, তারা নিজেদের রক্ত ও সম্পদ তুলে দেবে কোনো না কোনো পশ্চিমা শক্তির হাতে। প্রাচ্যতত্ত্ব প্রাচ্যকে নিকৃষ্ট মনে করে এবং প্রাচ্যের মানুষদেরকে নিজস্ব শাসনে পরিচালিত হওয়ার অযোগ্য ঘোষণা করে। যেহেতু প্রাচ্য বিনষ্ট, অসভ্য, তাই প্রাচ্যজনকে কথা বলতে দেয়া যায় না। কারণ সে নিজেকেও ভাল করে চেনে না, তাকে যতটা চেনে পশ্চিমের লোকেরা। এ জন্যই প্রাচ্যের পক্ষে কথা বলে সাম্রাজ্যবাদী ইউরোপ ও আমেরিকা- প্রাচ্য পরিণত হয় নিকৃষ্ট-নির্বাক- নিষ্ক্রিয় উপনিবেশে।”

মুসলিম বিশ্বে সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত সম্পর্কিত কিছু সাম্প্রতিক তথ্য
সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের বর্ণবাদী বুদ্ধিজীবীদের রচিত Doctrine The great game plan, বিভিন্ন মতবাদসমূহ, Orientalism এবং Clash of Civilization তত্ত্বকে প্রাচ্যের উপর চাপিয়ে দেয় সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের সরকারসমূহ। স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ খিওরী রচনার পূর্বে এবং সিনিয়র বুশের উক্ত তত্ত্ব ফেরী করার পূর্বে মুসলিম বিশ্বে কোনো জঙ্গী ছিল না। ছিল শুধু ভিটেমাটি হারা ফিলিস্তিনী প্রতিরোধ যোদ্ধা ও জবরদখলের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা আন্দোলনরত কাশ্মিরী মুজাহিদ। উক্ত কল্পিত সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব বাস্তবায়ন করার লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ৯/১১ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে টুইন টাওয়ার বিধ্বস্ত করে মুসলিম দেশ দখলের অজুহাত সৃষ্টি করে। তারপর থেকে পৃথিবীর সকল মুসলিম দেশ জঙ্গীময় হয়ে যায়। শুরু হয় জঙ্গী ও সন্ত্রাসী দমনের নামে রক্তাক্ত আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞের নির্মম-নিষ্ঠুর-অমানবিক কার্যক্রম। তখন থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা নিজেরাই মুসলিম যুবকদেরকে জঙ্গী বানায় এবং উক্ত জঙ্গী দমনের অজুহাতে জঙ্গীর বাপ-দাদার ভিটেমাটি-সহায়-সম্পদ কেড়ে নেয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে।

১। আফগানিস্তান : রাশিয়ার দখল থেকে আফগানিস্তান মুক্ত করার লড়াইয়ে পশ্চিমা শক্তি আফগান মুজাহিদ বাহিনী গড়ে তোলে। রাশিয়া পরাজিত হওয়ার পর আফগানরা গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হলে পশ্চিমারাই তালেবানদের সংঘটিত করে আফগানিস্তানে ক্ষমতাসীন করে। সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তির পর মধ্য এশিয়ার বিপুল পরিমাণ খনিজ সম্পদ লুণ্ঠনের জন্য পশ্চিমারা আফগানিস্তানের উপর দিয়ে পাইপলাইন স্থাপনের জন্য তালেবান সরকারের সাথে একাধিক বৈঠক করে। পশ্চিমারা চেয়েছিল আফগান মোল্লাদেরকে নামমাত্র ভাড়া দিয়ে পাইপ লাইন স্থাপন করবে। কিন্তু মোল্লারা বলল- আমাদের দেশের উপর দিয়ে আমরা পাইপ লাইন বসাব, আপনারা আমাদেরকে ন্যায্য হিস্যা প্রদান করবেন। মোল্লাদের এরূপ জবাবে অসন্তুষ্ট হয়ে তালেবান সরকার উৎখাতে ৯/১১-কে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে আফগানিস্তানে দখলদারিত্ব কায়েম করা হয়। স্বার্থে আঘাত লাগায় মুজাহিদরা হয়ে যায় জঙ্গী, তালেবানরা হয়ে যায় সন্ত্রাসী।

২। স্যামুয়েল বাকের লিউ রকওয়েল ওয়েবে লিখেছেন-
(ক) ১৯৬৩ সালে সি.আই.এ সাদ্দাম হোসেনের বাথ পার্টিকে সামরিক অভ্যুত্থানে সাহায্য করে। অভ্যুত্থানের পর সি.আই.এ’র তালিকা অনুসারে জেনারেল করিম কাসেমসহ জাতীয়তাবাদীদেরকে হত্যা করা হয়।
(খ) মার্কিনীরা তাদের সাম্রাজ্য নির্মাণে তেলসমৃদ্ধ অঞ্চলকে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে রাখতে চায়। এর ধারাবাহিকতায় ইরানের মোসাদ্দেক সরকারের পতন ঘটিয়ে রেজা শাহকে ক্ষমতাসীন করা হয়।
(গ) ইরাক দখল ও নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করা হয় ১৯৯৬ সালে। বর্তমান মার্কিন সরকারের পরামর্শদাতা রিচার্ড পার্ল, ডগলাস ফেইথ, ডেভিড ওরম্সসহ কয়েকজন  A Clean Break : A New Strategy for Securing the Realms” শিরোনামে জুলাই ১৯৯৬ সালে একটি প্লান পেশ করেন, যাতে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইরানের সরকার পরিবর্তনের নীল-নকশা উপস্থাপন করা হয়।
(ঘ) উক্ত রিচার্ড পার্ল-এর গ্রুপ ২০০০ সালের সেপ্টেম্বরে “Rebuilding Americas De Defence Strategy Fores” নামক আর একটি নীল্ নক্শা প্রণয়ন করে, যা বাস্তবায়নের অজুহাত সৃষ্টির জন্য পার্ল হারবারের ন্যায় একটি সর্বনাশা অজুহাত প্রয়োজন বলে মন্তব্য করা হয়। টুইন টাওয়ার হামলা ছিল উক্ত অজুহাত, যা ইসরাইল কর্তৃক বাস্তবায়ন করা হয়।
(৩) পাকিস্তানের পরমাণু বিজ্ঞানী ড. কাদির খান দ্য নিউজ- বিবিসিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ২০১৫ সালের মধ্যে পাকিস্তান ভাঙার পরিকল্পনা করেছে। প্রেসিডেন্ট মোশাররফ পাকিস্তান ভাঙ্গার মার্কিন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন।
(৪) সাদ্দাম হোসেন ও বাগদাদের তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত এপ্রিল গ্লাসপাই-এর মধ্যে দীর্ঘ বৈঠকের ৮ দিন পর সাদ্দাম কুয়েত দখল করেন। বিশ্বের বেশির ভাগ সংবাদ মাধ্যমের মতে, ইরাকের কুয়েত আক্রমণের পিছনে মার্কিন ইন্ধন ছিল। (সূত্র : আলমগীর মহিউদ্দীন, নয়া দিগন্ত, ১৪-০৬-০৮ইং)
(৫) আমেরিকার উস্কানিতে ইরাক ১৯৮০ সালে ইরানে হামলা করে। এতে ১০ লাখ মুসলমান নিহত হয়। (দৈনিক সংগ্রাম, ২৭-০৬-০৮)
(৬) বিখ্যাত আন্তর্জাতিক মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সিমুর হার্শ ৭ জুলাই ২০০৮ সালের নিউইয়র্কের পত্রিকায় লিখেন- “ইরানকে অস্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র ৪০০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করেছে। ইরানের ধর্মীয় নেতৃত্বে ও রাষ্ট্রীয় নেতৃত্বের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি, আরবী ভাষী ইরানী ও বালুচদের সাথে পার্সী ভাষী ইরানীদের বিভেদ সৃষ্টি করে অস্থিতিশীল করা এ পরিকল্পনার অংশ।

মার্কিন কর্নেল রালফ পিটারের অংকিত Broader Middle East Plan ও উপরোক্ত তথ্যসমূহ থেকে দেখা যাচ্ছে, পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ নিজেদের অন্যায্য লুণ্ঠনবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য মুসলিম বিশ্বকে ধ্বংস ও দখল করতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। তাদের টার্গেটকৃত দেশের মধ্যে পাশ্চাত্যের পক্ষের ও বিপক্ষের উভয় শ্রেণীর মুসলিম দেশ অন্তর্ভুক্ত। তবে পার্থক্য এই যে, সাম্রাজ্যবাদীরা প্রথমে পাকিস্তানে, ইরানে, সিরিয়ায়, ইরাকে ও তুরস্কে তাদের আগ্রাসী হামলা পরিচালনা করবে এবং তৎপর পাশ্চাত্যের বন্ধুরাষ্ট্র বা বশংবদ মুসলিম রাষ্ট্রসমূহের জানকবজ করবে। মুসলিম বিশ্বের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানরা কি এসব তথ্য অবগত নয়? যদি অবগত না থাকে তাহলে এমন অযোগ্য বেখবর রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানদের পদত্যাগ করে যোগ্য ব্যক্তিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করা দরকার। আর যদি জানা থাকে তাহলে তাদের উচিত আর কোনো মুসলিম দেশ সাম্রাজ্যবাদী হামলার শিকারে পরিণত হওয়ার পূর্বে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তোলা। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে নিজেদের মতভেদ দূর করা ও নিজ নিজ জনগণকে সাম্রাজ্যবাদীদের আসন্ন হামলার ব্যাপারে সজাগ -সতর্ক -ঐক্যবদ্ধ ও সশস্ত্র করা। মনে রাখতে হবে। সাম্রাজ্যবাদীরা কখনও কোনো স্বাধীন দেশের বন্ধু নয়। সাম্রাজ্যবাদীর পুতুল সরকারগণ সাম্রাজ্যবাদীদের দৃষ্টিতে টয়লেট পেপারের চেয়ে বেশি মূল্যবান নয়। সিরিয়ার বিপদে যদি তুরস্ক সহযোগিতার পরিবর্তে সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষাবলম্বন করে, তবে তুরস্ককেও ধ্বংস হতে হবে। ইরানের বিপদে যদি সৌদি আরব, পাকিস্তান ও জিসিসি দেশসমূহ ইরানকে সাহায্যের পরিবর্তে সাম্রাজ্যবাদীদের পক্ষাবলম্বন করে তবে ইরানের পতনের সাথে তাদেরও পতন হবে। আমাদের পবিত্র ভূমি অভিশপ্ত ইহুদী নাছারাদের পদতলে পিষ্ট হবে। এমতাবস্থায় একবিংশ শতাব্দীর জাগ্রত মুসলিম তরুণেরা প্রথমে তাদের দুর্ভোগের কারণ শাসকদের খুঁজে বের করে বিচারের সম্মুখীন করবে এবং সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে নির্মম-কঠিন প্রতিরোধ গড়ে তুলে সাম্রাজ্যবাদীদের পতন নিশ্চিত করবে। সবাইকে স্মরণ রাখা উচিত, আধুনিক তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে মুসলিম তরুণ-যুবকগণ এখন অনেক বেশি সচেতন সজাগ ও স্বাধীনতা প্রিয়। অযোগ্য-অথর্ব তাঁবেদার সরকারকে তারা জীবন্ত কবর দেবে।

পতন-পরবর্তী মুসলমানদের উত্থানের কারণ
সৌদি আরব
ধ্বংসপ্রায় মুসলিম বিশ্বের উত্থানের রূপরেখা প্রণয়ন করেন প্রখ্যাত ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব শায়খ আবদুল ওয়াহাব নজদী। তাঁর শিক্ষায় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মুসলমানরা ঘুম থেকে জেগে উঠে এবং ১৭৪৫ খ্রিস্টাব্দে আরবের একটি ক্ষুদ্র রাজ্যের শাসক মুহাম্মদ ইবনে সউদ শায়খ আবদুল ওয়াহাবের শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। নির্ভেজাল ইসলাম চর্চা ও প্রতিষ্ঠাই ছিল ইবনে ওয়াহাব এর মূল লক্ষ্য। সউদ পরিবার এর পর থেকে সকল কুসংস্কার দূর করে ইসলাম প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে রাজত্ব বিস্তৃত করার কার্যক্রম পরিচালনা করেন। অনেক ঘাত-প্রতিঘাত, চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ বংশের মহান ব্যক্তি আবদুল আযীয ইবনে সউদ ১৯০১ সাল থেকে ১৯৩২ সালের মধ্যে বর্তমান ভূখণ্ডের মধ্যে সউদী আরব প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁকে আধুনিক সউদী রাজত্বের প্রতিষ্ঠাতা বলা হয়। এ বংশ সউদী আরবে ইসলামী শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করায় সৌদি আরব এখনও বিশ্বের সবচেয়ে শান্তি ও ন্যায়বিচার সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে টিকে আছে। ১৯৭৫ সালে আততায়ীর গুলিতে এ বংশের মহান শাসক বাদশাহ ফয়সাল নিহত হওয়ার পর থেকে সৌদি আরব ক্রমান্বয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বলয়ে প্রবেশ করে। ১৯৮৪ সালে এ দেশটি যুক্তরাষ্ট্র-ফ্রান্স ও ব্রাজিলের সাথে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ এবং সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য চুক্তি করে। আভ্যন্তরীণভাবে দেশটি এখনও ইসলামের নিয়ম-কানুন পালনে সচেষ্ট থাকলেও আন্তর্জাতিকভাবে এরা ইসলামের দুশমন ইসরাইল ও সাম্রাজ্যবাদীদের সহযোগীতে পরিণত হয়েছে। এর থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে এ দেশটি মুসলমানদের জন্য যথাযথ কর্তব্য পালনে ব্যর্থ হবে এবং নিজেদের জন্য সর্বনাশ ডেকে আনবে। এ রাজবংশের উত্থানের কারণ নির্ভেজাল ইসলাম প্রতিষ্ঠা আর পতনের কারণ হবে ইসলামের দুশমন ইহুদীনাছারাদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন।

পাকিস্তান
১৯৪৭ সালে পাকিস্তানের জন্ম লাভ বিংশ শতাব্দীর বিস্ময়, রাজনৈতিক ইতিহাসের বিস্ময়। দীর্ঘ ১৫০ বছরের ইঙ্গ-হিন্দু শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত মৃতপ্রায় মুসলমানরা ধর্মের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রবল শক্তিধর বৃটিশ কর্তৃপক্ষ ও বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ উগ্র সাম্প্রদায়িক হিন্দু শক্তির সাথে যুগপৎ মোকাবেলা করে অর্জন করে পাকিস্তান। মুষ্টিমেয় মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও বুদ্ধিজীবী ঘুমন্ত ও মৃতপ্রায় জাতিকে মুসলিম জাতীয়তার মন্ত্রে দীক্ষিত করে ঐক্যবদ্ধ করে মাত্র ৪১ বছরের মধ্যে হিন্দুস্থানের বুক চিরে নিজেদের জন্য নিজেদের সার্বভৌম ভূখণ্ড- লাভ করা সম্ভব হয়েছে শুধুমাত্র স্বীয় ধর্মকে অবলম্বন করায়। কিন্তু ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতার পর পর এ জাতির মহান নেতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ইন্তেকাল করায় পরবর্তী দুর্বল নেতৃত্ব জাতিকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রে মাত্র ২৪ বছরে দেশটি ভেঙে যায়। এতদসত্ত্বেও বর্তমান পাকিস্তান ও বাংলাদেশ শত ষড়যন্ত্র মোকাবেলা করে বিশ্বে নিজেদের আসন ধরে রেখেছে। উভয় দেশের বতর্মান দূরবস্থার প্রধান কারণ হলো ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ ও মূল্যবোধ থেকে দূরে সরে যাওয়া। আত্মজিজ্ঞাসা ও ভুল সংশোধন উভয় দেশের স্বাধীনতাকে সংরক্ষণ করবে।

ইরান
অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ইরান ক্রমান্বয়ে রাশিয়া ও বৃটেনের কলোনীতে পরিণত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ১৯৫১ সালে ড. মোসাদ্দেক সরকার ইরানের তেলশিল্প জাতীয়করণ করায় সাম্রাজ্যবাদীরা মোসাদ্দেক সরকারের উপর ক্ষিপ্ত হয়। সিআইএর অর্থে সামরিক অভ্যুত্থানে মোসাদ্দেক সরকারের পতন হয়, পলাতক শাহ দেশে ফিরে এসে রাজতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থা চালু করেন এবং ইরানে পাশ্চাত্যের বেলেল্লাপনা, মদ, জুয়া, নেশা, অশ্লীল পুস্তক, অশ্লীল সিনেমা, পতিতালয় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেন এবং ইসরাইলের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করেন। এতদিন শাহের দেশবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ইরানের গণতান্ত্রিক শক্তিগুলি সক্রিয় ছিল কিন্তু শাহ কর্তৃক ইসরাইলের সাথে সম্পর্ক স্থাপন ও ইসলামবিরোধী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় ইরানের শক্তিশালী ধর্মীয় নেতারা তুমুল আন্দোলন গড়ে তোলেন। জনগণ আলেমদের নেতৃত্বে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ১৯৭৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল রেজাশাহ পাহলবীকে দেশ ছাড়া করেন। তৎকালীন পৃথিবীর সকল বৃহৎ শক্তি, বৃহৎশক্তির দেশীয় এজেন্টগণ এবং রাজতান্ত্রিক মুসলিম দেশসমূহের সম্মিলিত বাধা উপেক্ষা করে ইরানের ইসলামী বিপ্লব বিজয়ী হয়েছে, টিকে রয়েছে এবং বর্তমানে বিশ্বমোড়লদেরকে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়ার শক্তি অর্জন করেছে। ইরানী জনগণ যতদিন ইসলাম থেকে দূরে থেকেছিল ততদিন তারা অন্যান্য জাতিগোষ্ঠীর গোলামী করেছে।

তুরস্ক
১২৯০ খ্রিস্টাব্দ হতে ১৯২৪ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত তুরস্কে উছমানিয়া খেলাফত/রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত ছিল। ইরাকসহ সমগ্র আরব উপদ্বীপ, মিসর, মরক্কো, গ্রীস, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়া, সার্বিয়া, বসনিয়া, মন্টেনেগ্রো, হার্জেগোভিনা, হাঙ্গেরী, রুমানিয়া, আর্মেনিয়া এই সাম্রাজ্যের অধীন ছিল। ১ম বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর এ সাম্রাজ্য ভেঙে যায় এবং বর্তমান তুরস্ক অবশিষ্ট থেকে যায়। আমার আলোচ্য বিষয় হলো তুর্কীদের উত্থান ও পতনের কারণসমূহ উল্লেখ করা। তা সংক্ষেপে নিম্নরূপ-
তুর্কীরা মধ্য এশিয়ার তাতার জাতির বংশধর ছিল। তারা ছিল যাযাবর ও প্রকৃতিপূজারী। নবম ও দশম শতাব্দীতে তুর্কীরা ইসলাম গ্রহণ করে। ১০৫৫ খ্রিস্টাব্দে সেলজুক তুর্কীরা বাগদাদ দখল করে এবং ১২৫৮ খ্রিস্টাব্দে হালাকু খান কর্তকৃ ক্ষমতাচ্যুত হয়। অপরদিকে ১২৯০ সালে ১ম ওছমান ওছমানিয়া তুর্কী সালতানাতের ভিত্তি স্থাপন করেন তুরস্কের ইশকি শহরকে কেন্দ্র করে। প্রত্যেক শাসক তুর্কী সাম্রাজ্যের আয়তন বৃদ্ধি করে ১৮২৮ পর্যন্ত অত্যন্ত প্রতাপের সাথে এশিয়া মাইনর, আরব ভূখণ্ড- ও ইউরোপের বর্ণিত দেশসমূহ শাসন করেন এবং এর পর থেকে ১৯১৩ সাল নাগাদ ইউরোপীয় অংশসমূহে পর্যায়ক্রমে তুর্কী শাসন লোপ পায় এবং ১ম মহাযুদ্ধে পরাজয়ের পর বর্তমান আকার ধারণ করে। তুর্কী সেনাপতি কামাল পাশা ১৯২২ সালের ২৯ অক্টোবর তুর্কী সুলতানকে ক্ষমতাচ্যুত করে তুরস্কে প্রজাতন্ত্র স্থাপন করেন। কামাল পাশা প্রথম প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। ১৯২৪ সালের মার্চ মাসে কামাল পাশা খিলাফত ব্যবস্থা বিলুপ্ত করেন। অসংখ্য আলেম হত্যা করেন। ধর্মচর্চা নিষিদ্ধ করেন। আরবীতে নাম রাখা, আরবী পড়া, আরবীতে আজান দেয়া নিষিদ্ধ করেন। তুরস্ককে তথাকথিত সেক্যুলার (অর্থাৎ ইসলামবিরোধী) দেশে পরিণত করেন। মূলত ৬৩২ বছর পর্যন্ত প্রবল প্রতাপান্বিত তুর্কী সালতানাত কামাল পাশা ও তার অনুসারীদের দ্বারা ১৯২২ সাল থেকে সামরিক শাসনের দেশ, ইসলাম বিরোধীদের দেশ, জরুরি অবস্থা জারির দেশ ও ভিক্ষুকের দেশে পরিণত হয়। ইসলামপন্থী রজব তাইয়ে এরদোগানের ক্ষমতা গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত তুরস্ককে বলা হলো ‘ইউরোপের রুগ্ন মানুষ’। কিন্তু মাত্র এক দশকের মধ্যে এরদোগান সরকার তুরস্ককে ইউরোপের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশে পরিণত করেন। দুর্নীতিবাজ সেক্যুলারগণ যে তুরস্ককে ইউরোপের ভিক্ষুকে পরিণত করেছিল সে তুরস্ক এখন ইউরোপের সবচেয়ে ধনী ও শক্তিশালী দেশে পরিণত হয়েছে। এই সেক্যুলাররা তুরস্কে ২৫টি মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ দিয়ে তুরস্ককে গোলামে পরিণত করেছিল।

কামাল পাশার আসল পরিচয় : আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ পৃথিবীর অনেক মুসলমান লেখক দীর্ঘদিন কামাল পাশাকে নিয়ে গর্ব করে সাহিত্য-কবিতা রচনা করেছেন। কিন্তু তার আসল রূপ যারা জানে তারা অবশ্যই ঘৃণায় তার প্রতি সহস্র অভিশাপ বর্ষণ করবেন।

মুখোশের অন্তরালে কামাল পাশা : কামাল পাশা ইহুদী কবলিত দূনমা (প্রত্যাবর্তনকারী) সম্প্রদায়ের সদস্য ছিল। দুনমাদের পরিচয় হলো- ১৬৬৬ খ্রিস্টাব্দে শারতে শিবী নামক স্নার্নাবাসী ইহুদী নিজেকে ‘মসীহ মউদ’ বা প্রতিশ্রুত মসিহ (ঈসা আ.) হিসেবে দাবি করে। বিপুল সংখ্যক ইহুদী তার উপর ঈমান আনে। শিবী সদলবলে সিরিয়া ও বায়তুল মুকাদ্দাস সফর করে ইস্তাম্বুলে উপস্থিত হলে তুর্কী খলিফা তাকে গ্রেফতার করেন। এমতাবস্থায় শিবী ও তার দল ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে মুক্তি লাভ করে ও তুরস্কে স্থায়ীভাবে অবস্থান করে। তার অনুসারীরা ইতিহাসে দূনমা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে। পরবর্তীতে এ সম্প্রদায়ের লোকেরা তুরস্কে Comittee of Union and Progressনামক দল গঠন করে। এ দলের সদস্যগণ অনেক তুর্কী যুবককে নিজ দলে অন্তর্ভুক্ত করে এবং সালতানাতের অনেক বড় পদ দখল করে। ১ম বিশ্বযুদ্ধের প্রাক্কালে দানিয়ুব প্রদেশের গভর্নর মাদহাত পাশা এবং ড. নাজেম, ফওজী পাশা, ছগুম আফেন্দী প্রমুখ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিতে পরিণত হন। এসব ব্যক্তি তুর্কী সেনাবাহিনীতে একটি গোপন ইউনিট গড়ে তোলে এবং ১ম বিশ্বযুদ্ধের সময় উক্ত ইউনিট কামাল পাশার নেতৃত্বে তুর্কী সুলতানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে ও তুর্কী খেলাফত ধ্বংস করে। কামাল পাশা ইহুদীদের গোপন আন্দোলন ফ্রী ম্যাসন এর সদস্য ছিল। ইহুদীদের নির্দেশে সে তুরস্ক থেকে ইসলামকে উচ্ছেদ করার কর্মসূচি গ্রহণ করে। (তথ্য সূত্র: জাতির উত্থান-পতন সূত্র, প্রবন্ধকার, পৃ. ৪২)

উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেল ইসলাম ধর্মের প্রকৃত অনুসরণ যাযাবরকে বাদশাহী প্রদান করে এবং ইসলাম থেকে দূরে সরে গেলে আমীর থেকে গোলামে পরিণত হয়ে সকল জাতির পদতলে পিষ্ট হতে হয়। ইসলামী জাতীয়তাবোধ পরাধীন থেকে স্বাধীন করে এবং ভৌগোলিক, গোত্রীয়, ভাষাভিত্তিক ও অন্যান্য জাতীয়তাবাদ এবং অন্যান্য ইজম মুসলমানদের পতন নিশ্চিত করে।

বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের পতনের কারণসমূহ-
১. নিজ নিজ মাতৃভাষায় ইসলামকে না জানা এবং ইসলাম থেকে দূরে সরে যাওয়া।
২. খেলাফত থেকে রাজতন্ত্রে এবং গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন। এ বিষয়ে আমার ব্যক্তিগত মতামত হলো- সত্যিকারের খেলাফত ব্যবস্থা সবচেয়ে উত্তম, যদি খেলাফত প্রতিষ্ঠা সম্ভব না হয় তবে ইসলামী মূল্যবোধের ধারক ও বাহক ন্যায়পরায়ণ রাজা বাদশাহর শাসন জনগণের জন্য উত্তম। গণতন্ত্র মুসলমানদের জন্য উত্তম হবে যদি প্রত্যেক ধর্মীয় জাতি পৃথক ভোটের মাধ্যমে নিজেদের নেতা নির্বাচিত করে এবং সৎ ও দূরদর্শী ব্যক্তি প্রধান নির্বাহী ও সংসদ সদস্য হয়। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায়, ইহুদী মস্তিষ্কপ্রসূত বর্তমান গণতন্ত্র, পৃথিবীর দেশে দেশে রাজনীতি ব্যবসায়ী দুর্বৃত্তদেরকে নেতা নির্বাচিত করে এবং দেশ জাতিকে ধ্বংস করে।
৩. যায়নবাদী ইহুদী চক্রান্ত সম্পর্কে অজ্ঞতা।
৪. ধর্ম ও রাজনীতির বিভাজন।
৫. ইসলামী নেতৃত্বের অযোগ্যতা।
৬. জ্ঞান-বিজ্ঞানে পশ্চাদপদতা।
৭. শিরক ও বিদআতে লিপ্ত হওয়া।
৮. ধর্ম ব্যবসা ও ফেরকাবাজি।
৯. ধর্মবিমুখ শাসক।
১০. তাতায়ী ফেতনা।
১১. ক্রুসেড।
১২. বিজাতীয় সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও
বিজাতীয় মতবাদ গ্রহণ।

মুসলিম বিশ্বের করণীয়
১. সাম্রাজ্যবাদের তাঁবেদার সরকার থেকে মুসলিম দেশগুলোকে রক্ষা করা।
২. মুসলিম বিশ্বে একক নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। প্রথম শর্ত পূরণ করা গেলে ২য় শর্ত পূরণ করা যাবে।
৩. সাম্রাজ্যবাদের সেনাঘাঁটি ও গোয়েন্দা ঘাঁটি থেকে নিজ নিজ দেশকে মুক্ত করা।
৪. সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দেশগুলোর সাথে মুসলিম বিশ্বের ঐক্যপ্রতিষ্ঠা।
৫. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দ্রুত আত্মনির্ভরশীল হওয়া।
৬. সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহের ইহুদীবিরোধী ব্যক্তি ও সংগঠনকে সহায়তা প্রদান।
৭. সরকার ও জনগণের মধ্যে দূরত্ব নিরসন।
৮. সার্বজনীন উচ্চশিক্ষা ও সামরিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা।
৯. শিক্ষা ব্যবস্থা ও সিলেবাসকে লক্ষ্য অনুযায়ী বিন্যস্ত করা।
১০. মুসলিম জাতীয়তাবোধ ও মূল্যবোধকে শক্তিশালী করা।
১১. শক্তিশালী ও.আই.সি বাহিনী গঠন, আঞ্চলিক ও ভাষাভিত্তিক লীগ বিলুপ্তকরণ।
১২. সর্বক্ষেত্রে সমকালীন শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করা।
১৩. যায়নবাদী ষড়যন্ত্র সম্পর্কে নিজ জাতিকে ও অন্যান্য জাতিকে অবহিত করা, সতর্ক করা ও প্রতিহত করা।

এস, এম, নজরুল ইসলাম।
সম্পাদক মাসিক ইতিহাস অন্বেষা।