Showing posts with label বাংলাদেশ. Show all posts
Showing posts with label বাংলাদেশ. Show all posts

Wednesday, June 13, 2012

আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের স্বরূপ


একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার শর্তাদি হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড- ও সীমান্ত, সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসীদের স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতা, উক্ত ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সরকার বা শাসক, উক্ত দেশের থাকবে স্বাধীন বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষানীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি। উক্ত শর্তাদি বাস্তবে পূরণ হলেই একটি দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মর্যাদালাভ করে। পক্ষান্তরে একটি দেশের যদি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থাকে কিন্তু সীমান্ত হয় অরক্ষিত, সরকার যদি হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার, প্রতিরক্ষানীতি হয় পরনির্ভরশীল, পররাষ্ট্রনীতি হয় নতজানু এবং অর্থনীতি হয় ভঙ্গুর ও শোষণের শিকার তবে উক্ত দেশকে কখনও স্বাধীন-সার্বভৌম বলা যায় না।


একটি দেশের জনগণকে তখনই স্বাধীন বলা যায়, যখন উক্ত দেশের সরকার হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম, নাগরিকদের যদি থাকে ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, বৈধ পথে সম্পদ অর্জন ও ব্যয়ের স্বাধীনতা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দমাফিক সরকার গঠন ও পরিবর্তনের অধিকার, মেধা ও যোগ্যতা অনুসারে চাকরি পাওয়ার ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার এবং ধর্মীয়, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ ও চর্চা করার অধিকার। দেশের নাগরিকগণ যদি উক্ত অধিকারসমূহের একটি থেকেও বঞ্চিত হয় তবে সে নাগরিক তার দেশে পরিপূর্ণ স্বাধীন তা বলা যাবে না।


উপরোক্ত মৌলিক শর্তাদির আলোকে আমরা যদি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে পর্যালোচনা করি তবে আমরা দেখতে পাই-
১. ভূখণ্ড ও সীমান্ত : ১৯৪৭ সালের ভূখণ্ড ও সীমান্ত নিয়েই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠিত হয়। ১৯৭১-পরবর্তী শাসক আমাদের বেরুবাড়ি ভারতকে প্রদান করেছে; কিন্তু বিনিময়ে প্রাপ্য আমাদের ছিটমহল ও করিডোরে আমরা এখনও সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পারিনি। প্রতিবেশী ভারতের দাবির কারণে আমাদের সমুদ্রসীমা এখনও চিহ্নিত হয়নি। তদুপরি আমাদের সরকার প্রতিবেশী ভারতের মদদপুষ্ট শান্তিবাহিনীর নিকট দেশের এক-দশমাংশ ভূমি তুলে দেওয়ার আয়োজন করেছে। একতরফা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে ভারতের একক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বাঘ থেকে বিড়ালের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের ৫৪টি নদী পানির অভাবে মরা খালে পরিণত হতে চলেছে। এই হলো আমাদের ভূখণ্ড ও সীমান্তের হাল-হকিকত।


২. স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতা : বর্তমান সরকার সচেতনভাবে দেশের জনগণের স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতাকে ধ্বংস ও অবনমিত করার কর্মসূচি পালন করছে। স্বাধীন থাকার জন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র বজায় রাখা অপরিহার্য। আমাদের সরকার আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিপরীত সংস্কৃতি লালন-পালন করছে যাতে জনগণের স্বাতন্ত্রবোধ বিলুপ্ত হয়।


৩. স্বাধীন সরকার ও শাসক : দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী গঠিত সরকারই স্বাধীন সরকার হওয়ার পূর্বশর্ত। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চাপিয়ে দেয়া সরকারকে স্বাধীন সরকার বলা হয় না; বরং তাঁবেদার সরকার বলা হয়। বর্তমান সরকারটি তথাকথিত ১/১১-এর ফসল। আর ১/১১ সংগঠিত করেছিল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, ইসরাইল, ইউরোপ ও ভারত। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেয়া সরকার স্বাধীন সরকার নয়- সরকার প্রধানও স্বাধীন শাসক নয়। তাই সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নই এ সরকারের প্রধান কাজ।


৪. স্বাধীন বিচার বিভাগ : স্বাধীন বিচার বিভাগের পূর্বশর্ত হলো সৎ, যোগ্য, নীতিবান ও নিরপেক্ষ আইনমন্ত্রী ও বিচারক। বাংলাদেশের বর্তমান আইনমন্ত্রী নৈরাজ্যবাদী গণআদালতের সমন্বয়কারী ছিলেন, আইন প্রতিমন্ত্রী যখন এপিপি ছিলেন তখন হাইকোর্ট সুয়োমোটো রুল জারি করে তাঁকে এপিপি পদ থেকে অসততার দায়ে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। আর এই সরকার বিচার বিভাগে দলীয় ক্যাডার, খুনের আসামি ও প্রধান বিচারপতির এজলাসে লাথি মারার দায়ে দোষী ব্যক্তিকে পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ করে বিচার বিভাগকে পক্ষপাতদুষ্ট ও চরম বিতর্কিত করেছে। ফলে বর্তমানে বিচার বিভাগ নৈরাজ্য সৃষ্টিতে ও অবিচার করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে।


৫. প্রতিরক্ষানীতি : আমাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে বিগত সাড়ে তিন বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, গোপালগঞ্জীকরণ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন, বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত করে বিশ্বমানের এ বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ব্যাপারে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের উপর নির্ভরশীলতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।


৬. পররাষ্ট্রনীতি : আধুনিক সরকারে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর পর যে গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে সেটি হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমান সরকার পররাষ্ট্র বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছে, বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পদায়ন করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। একদেশ নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। বিপদের দিনে বন্ধুহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে যা হয় বাংলাদেশের বেলায়ও তাই হবে।


৭. অর্থনীতি : সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার টার্গেটকৃত দেশের অর্থনীতি ধ্বংসকে প্রধান কর্তব্যকর্ম হিসেবে নির্ধারণ করে। দেশ ও জনগণ যদি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী থাকে তবে তারা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবেলায় দৃঢ় অবস্থান নেয়। অপরদিকে ভুখা-নাঙ্গা জনগণ সামান্য খুঁদ-কুড়ার লোভে সাম্রাজ্যবাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। এ জন্যই অতীতে আমরা দেখেছি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশী ষড়যন্ত্রের মাত্র ১৯ বছরে সমৃদ্ধ বাংলাকে দুর্ভিক্ষের বাংলায় পরিণত করে এক-তৃতীয়াংশ জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, ১৯৭১ সাল-পরবর্তী তিন বছরে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে লাখ লাখ লোককে মেরে ফেলা হয় এবং বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয়। একই লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ১/১১-এর পর থেকে অদ্যাবধি এদেশের ব্যক্তি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্থনীতি ধ্বংসের অব্যাহত প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়েছে। অর্থনীতির প্রধান প্রধান সেক্টরসমূহ ধ্বংস করে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন নিয়ম-কানুন তৈরি করে, ড্যাব, পরিবেশের অজুহাতে এবং নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে এদেশের সমৃদ্ধ আবাসন খাতকে ধ্বংস করে বর্তমানে ভারতের সাহারা গ্রুপের নিকট আবাসন খাতকে তুলে দেয়া হচ্ছে। শেয়ারবাজার, ইউনি-পে-টু ইউ, স্পীক এশিয়ার মাধ্যমে এদেশের জনগণকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। কৃত্রিম গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করে শিল্প-কারখানাকে ধ্বংস করে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে, সম্ভাবনাময় গার্মেন্টস খাতে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে ধ্বংস করা হচ্ছে, ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যমূলক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে জনশক্তি রফতানি খাতকে সংকুচিত করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বন্ধ করা হচ্ছে, মৎস্য, পোলট্রিশিল্পসহ সকল ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পকে ধ্বংস করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। এই হলো আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।


উপরোক্ত অবস্থার আলোকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বর্তমানে আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মান দ্রুত নিম্নমুখী হচ্ছে এবং আমরা পরাধীনতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছি।


পূর্বেই বলা হয়েছে, সার্বভৌম দেশ ও স্বাধীন সরকারই কেবলমাত্র জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। পক্ষান্তরে আধা স্বাধীন, আধা সার্বভৌম অথবা তাঁবেদার দেশ ও সরকার সাম্রাজ্যবাদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে জনগণের স্বাধীনতা হরণ করে। এরূপ সরকার সাম্রাজ্যবাদীদের চোখ দিয়ে জনগণকে দেখে। এমতাবস্থায় তাঁবেদার সরকারের দৃষ্টিতে গোলামী মানসিকতার নাগরিকগণ হয় সরকারের বন্ধু এবং স্বাধীনচেতা নাগরিকগণ হয় সরকারের শত্রু। এরূপ সরকার প্রভুরাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য স্বাধীনতাকামী জনগণের অধিকার হরণে সদাসর্বদা তৎপর থাকে এবং একপর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদের মদদে নিজ দেশের জনগণের উপর হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন চাপিয়ে দেয় এবং দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।


বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের নাগরিক স্বাধীনতার স্বরূপ
১. ব্যক্তি স্বাধীনতা : আমি একজন ব্যক্তি। আমি আমার যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু আমার সে পথ বন্ধ। কেননা আমি সরকারি দল করি না, সরকারি দলের ক্যাডারদেরকে চাঁদা দিতেও রাজি নই। সুতরাং ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া আমার কপালে জুটবে না, কোনোভাবে ভর্তি হতে সক্ষম হলেও চাঁদা ব্যতীত হলে সিট পাবো না, চাঁদা না দিলে জানমালের নিরাপত্তা থাকবে না। এভাবে সরকারি, দল দলীয়কৃত প্রশাসন ও বিচার বিভাগ আমার নাগরিক স্বাধীনতাকে টুঁটি চেপে ধরছে।


২. বাক্ স্বাধীনতা : আমি আমার মনের কথাটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে জানাতে চাই। কিন্তু উক্ত কথাটা যদি সরকারি লোকদের পছন্দ না হয় তবে আমাকে শারীরিক-মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে, মিথ্যা মামলা, হামলা, রিমান্ডের শিকার হতে হবে। সুতরাং আমাকে হয় বোকার মতো থাকতে হবে অথবা জুলুমের শিকার হতে হবে।


৩. বৈধ পথে সম্পদ অর্জন : আমি একজন দোকানদার বা ঠিকাদার। আমি সরকারি দলকে চাঁদা দেয়া ব্যতীত ব্যবসা করতে পারি না, টেন্ডারবাক্সে টেন্ডার জমা দিতে পারি না। কেননা ঠিকাদারীর কাজ পেতে হলে আমাকে সরকারি দলের ক্যাডার হতে হবে অন্যথায় ক্যাডারদের হাতে প্রাণ হারাতে হবে। সুতরাং বৈধ পথে সম্পদ অর্জনেও আমি স্বাধীন নই।


৪. চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার : আমি কঠিন রোগগ্রস্থ। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নাই। সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে ঘুষ দিতে হবে, সিট পেতেও ঘুষ লাগবে, চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার নেই হাসপাতালে। তারা হয় অনুপস্থিত অথবা বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি এর প্রতিবাদ করলে স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের নেতাকর্মীদের দ্বারা হেনস্থা হতে পারি, অনভিজ্ঞ স্বাচিপ চিকিৎসকদের অবহেলা ও অপচিকিৎসায় মারা যেতে পারি। সুতরাং আমার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নেই।


৫. ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার : আমার বসতবাড়ি একব্যক্তি জোরপূর্বক দখল করে নিলো। আমি থানায় মামলা করতে গেলাম। দখলকারী যদি বিত্তশালী হয় অথবা সরকারি দলের লোক হয় তবে পুলিশ আমার মামলা গ্রহণ করবে না, মামলা নিলেও সঠিকভাবে চার্জশিট দেবে না, চার্জশিট দিলেও প্রতিপক্ষের ভয়ে সাক্ষীরা আদালতে গেল না, সাক্ষী যদিও যায় তবে দেখা গেল বিচারক ঘুষ খেয়ে আমার বিরুদ্ধে রায় দিলো অথবা আমার জীবদ্দশায় রায় দিলো না। এমতাবস্থায় আমার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোথায়?


৬. পছন্দসই সরকার গঠনের অধিকার : আমি চাই আমার পছন্দের দল সরকার গঠন করুক। আমার দলকে আমি ভোটে বিজয়ী করতে চাই। আমি সরকারি দলের নজরে পড়লাম। ভোটের আগেই আমাকে মিথ্যা মামলায় জেলে নিয়ে গেল অথবা ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিলো। এমতাবস্থায় আমার পছন্দসই সরকার গঠনের অধিকার থাকলো না।


৭. ধর্মচর্চা করার অধিকার : আমি একজন মুসলমান। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে চাই। আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামাজ আদায় করলে সরকারি দল মৌলবাদী বলে আমার উপর হামলা করলো। আমি সরকারি চাকরিজীবী, নামাজ-রোজা করার অপরাধে বরখাস্ত হওয়া, ওএসডি হওয়া এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি একজন সাধারণ নাগরিক। নামাজের সময় হওয়ায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে প্রবেশ করতে চাই। কিন্তু সহজে তা সম্ভব নয়। এদেশের মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডা পাহারায় কোনো পুলিশ না থাকলেও বায়তুল মোকাররম মসজিদ গেটে সারি সারি পুলিশ, রায়টকার, জলকামান সদা তৎপর। দুরু দুরু মনে মসজিদের গেটে ঢুকতে চাইলে দেখা গেল পুলিশ যন্ত্র দিয়ে, হাত দিয়ে আমার জামার নিচে লাদেন খুঁজছে। সুতরাং ছেড়ে দে মা-কেঁদে বাঁচি।


৮. জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার : বর্তমান বাংলাদেশে জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন। বেডরুমের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের কাজ নয়- এ কথাটি প্রধানমন্ত্রী নিজেই জাতিতে জানিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন ২০-২৫টি খুন, সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫-২০ জনের মৃত্যু এবং একাধিক গুমের ঘটনা ঘটছে। সুতরাং এখানে প্রত্যেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তদুপরি খালে, নদীতে, পাটক্ষেতে, ম্যানহোলে, পানির ট্যাংকে, ডোবায় প্রতিদিন বেওয়ারিশ লাশ পড়ে থাকে। যা ইতিপূর্বের কোনো সরকারের আমলে এত ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি। একইভাবে পাড়াগাঁ থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত কোথাও আপনার মালের-সম্পদের নিরাপত্তা নেই। সরকারি দলের ক্যাডার, একশ্রেণীর পুলিশ স্বতন্ত্রভাবে ও ক্ষেত্রবিশেষে যৌথভাবে নাগরিকদের মাল-সম্পদ আত্মসাতে লিপ্ত রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে নির্দলীয়  বিরোধী দলীয় জনগণের বাগানের গাছ, পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ফসল অহরহ লুটপাটের শিকার হচ্ছে। শহরাঞ্চলে চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের সম্পদ লুটে নেয়া হচ্ছে। আর ইজ্জত! তার অবস্থা আরও করুণ। সরকারি দলের ক্যাডার, সন্ত্রাসী, মাস্তান- এমনকি শিক্ষকরাও মা-বোনদের ইজ্জত আবরু লুণ্ঠন করছে, তথাকথিত ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি এ সরকারের আমলে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।


৯. পরিবেশের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার : সরকারের তাবেদারী মনোভাব এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে প্রতিবেশী দেশ নদীর পানি আটকে দিয়ে, আমাদের সমুদ্র এলাকায় বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে এদেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সরকারি রাস্তার গাছ, পাহাড়ের গাছ, উপকূলীয় বনভূমির গাছ কেটে অবাধে পরিবেশ ও সম্পদের ধ্বংস করছে। নদীর পাড়, নদীর পাড়ের পাবলিকের জমি ডেজার দিয়ে কেটে মাটি বিক্রি করছে। পাহাড় কেটে পাহাড়ের মাটিও বিক্রি করছে। ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, নদী ভাঙনে ফসলি জমি-বসতবাড়ি বিলীন হচ্ছে, উপকূলীয় জনগণের নিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সাধারণ জনগণের উপায় নেই এসবের প্রতিকার চাওয়ার- ন্যায় বিচার পাওয়ার।


এই হলো আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের বর্তমান বাস্তবতা। আমরা কি এরূপ অবস্থা অব্যাহতভাবে চলতে দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবো- নাকি জান দেবো, তবু স্বাধীনতা ও অধিকার বিসর্জন দেবো না। আমাদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ।

Saturday, May 19, 2012

আমাদের Aim in life আছে- Aim of Nation নাই



সম্ভবতঃ ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে আমার এক শিক্ষক ক্লাসে প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা বড় হলে কে কি হতে চাও? উপস্থিত অনেকেই, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। আমি বলেছিলাম, বিমানের পাইলট হবো। কিন্তু বাস্তবে বিমানের পাইলট হওয়া দূরের কথা- নিজের গাড়ি চালাতেই ভয় পাই। পরবর্তীতে বহু পরীক্ষায় ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ বা ‘Your Aim in Life’ রচনার উপর লিখেছি, পাসও করেছি। রচনা বইয়ের অনুকরণে কখনও ডাক্তার হয়ে দেশসেবা করার কথা, কখনও বিজ্ঞানী হয়ে নতুন নতুন আবিষ্কার করার কথা, উকিল হয়ে জনগণকে আইনী সহায়তা প্রদানের কথা লিখেছিলাম। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসে এর কোনো কিছু করার সুযোগ হয় নাই। এর কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অভাব, স্বশিক্ষিত ও আদর্শ নাগরিক হওয়ার শিক্ষানীতির অভাব, জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাবের জন্যই আমাদের কিশোর বয়সের সুন্দর-সুন্দর সপ্নগুলো নিজের অজান্তে বিলীন হয়ে গেছে। পারিপার্শ্বিক, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমরা যা হতে চাই, তা হতে পারি না, আমাদের মহৎ ও সৃষ্টিশীল চিন্তাসমূহ বাস্তব জীবনের দূষিত পরিবেশে এসে এইড্স রোগীর ন্যায় নিঃশেষ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, আমাদের যেসব সহপাঠী তাদের কাংখিত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে তাদের অনেকে বাস্তব জীবনে এসে শুধুমাত্র অধিক অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর স্বনামধন্য পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।


আমাদের Aim in life-এর এই দুরবস্থার কারণ সম্ভবত এই যে : ১. আমরা আবেগের বশবর্তী হয়ে Aim ঠিক করেছিলাম। অথবা রচনা বইয়ে লিখিত Aim-কে নিজের Aim হিসেবে উল্লেখ করে পরীক্ষা পাসের চেষ্টা করেছিলাম। ২. আমাদের Aim-কে আমাদের অভিভাবক সমাজ ও রাষ্ট্র জানার চেষ্টা করেনি এবং গুরুত্ব দেয়নি। ৩. লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যে সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল তা আমরা পাইনি। ৪. লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যে দৃঢ় মনোবল সৃষ্টির দরকার ছিল, মনোবল সৃষ্টির জন্য যেরূপ নৈতিক শিক্ষার দরকার ছিল আমরা তা অর্জন করার সুযোগ পাইনি।
৫. আমাদের পাঠ্যপুস্তকে আদর্শ মানব সৃষ্টির সিলেবাস অনুপস্থিত ছিল বরং খারাপ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা আমাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত ছিল। দু-একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোধগম্য হবে।
ক. আমরা অংক করেছি এক সের দুধের সাথে কি পরিমাণ পানি মিশ্রিত করলে কত টাকা লাভ হবে। সুতরাং বর্তমানে আমরা ভেজাল মিশানোয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নে পরিণত হয়েছি।
খ. আমরা টোনা-টুনির গল্পে পড়েছি, টোনা এবং টুনি কিভাবে বনের পশুদেরকে দাওয়াত দিয়ে নিজেরা পালিয়ে গিয়ে গাছের ডালে অবস্থান নিয়ে আনন্দ করছে এবং উক্ত গল্পে সরল বিশ্বাসে দাওয়াতে আগমনকারী পশুদেরকে বোকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই গল্পের মাধ্যমে প্রতারক টোনা-টুনিকে বুদ্ধিমান সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং প্রতারিত পশুকুলকে বোকা আখ্যায়িত করা হয়েছে। সম্ভবত এইরূপ গল্পের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের সমাজে প্রতারকগণ বাহবা পায় আর প্রতারিত জনগণ বোকা সাব্যস্ত হয়।
গ. একটি গল্পের শিরোনাম ছিল ‘বাঘ ও বক’। উক্ত গল্পের সারকথা হলো- বাঘের গলায় হাঁড় বিদ্ধ হয়েছিল। বক পুরস্কারের প্রতিশ্র“তিতে বাঘের গলা থেকে উক্ত হাঁড় বের করে বাঘকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। বিপদ থেকে উদ্ধারের পর বক প্রতিশ্র“ত পুরস্কার দাবি করায় বাঘ পুরস্কারের পরিবর্তে বককে মৃত্যুর হুমকি প্রদান করেছিল। পাঠকবৃন্দ একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন, আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিকের আচরণ উক্ত বাঘের ন্যায় আর জনগণ হচ্ছে উক্ত বকের ন্যায়।


সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা পদ্ধতি ও সিলেবাসের করুণ শিকারে পরিণত হচ্ছে সমগ্র জাতি। এই শিক্ষা ব্যবস্থাই কাউকে তৈরি করছে ভেজাল মিশ্রণকারী হিসেবে, কাউকে প্রতারক হিসেবে আর কাউকে অকৃতজ্ঞ হিংস্র জানোয়ার হিসেবে। হয়তো এজন্যই ব্যবসায়ী ঠকাচ্ছে দেশ ও জনগণকে, রাজনীতিকগণ জনগণকে, উকিল মক্কেলকে, ডাক্তার রোগীকে, শিক্ষক ছাত্রকে, হাকিম ন্যায়বিচার প্রার্থীকে, পুলিশ নির্যাতিতকে, আমলা নাগরিককে, আলেম ভক্তদেরকে, পীর মুরীদদেরকে। ফলে যে যত বেশি ঠক বিদ্যায় পারদর্শী সে এদেশে ততো বেশি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।


এদেশের ১৪ কোটি লোকের ১৪ কোটি Aim in life আছে। প্রকাশ্যে উক্ত Aim in life-এ দোষণীয় কোনো উপাদান নেই। উক্ত Aim in life-এর ফলে আমরা ডাক্তার, কবিরাজ, প্রফেসর, অফিসার, দেশ নেতা, দেশ নেত্রী হচ্ছি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী হচ্ছি, আলেম-উলামাসহ অনেক কিছু হচ্ছি কিন্তু আমাদের সবকিছুই পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থে- জাতীয় স্বার্থে নয়। কারণ আমাদের Aim in life শিখানো হয়েছে Aim of Nation নয়।


জাতীয় স্বার্থে নয় কেনো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা স্বাধীনতার এত বছর পরও জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করিনি, লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজন মনে করিনি। প্রত্যেকেই আমরা ব্যক্তিস্বার্থে/ দলীয় স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছি- জাতীয় স্বার্থ আমরা এখনও নির্ধারণ করিনি। পৃথিবীর সকল মহান এবং শক্তিশালী জাতি তাদের জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করেছে, জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, লক্ষ্যে পৌঁছার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। ফলে উক্ত জাতির সদস্যগণ তাদের সকল ব্যক্তিস্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে বিন্যস্ত করেছে। তাদের ব্যক্তিস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়ে জাতিকে সমৃদ্ধ করছে, জাতীয় স্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের উপরে প্রাধান্য পাচ্ছে। কয়েকটি দেশের উদাহরণই এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিবেচিত হবে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে আমেরিকা নিজেকে বিশ্বশক্তির কাতারে দাঁড় করানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে। লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হওয়ার পর সে তার প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নকে শক্তিহীন করতে সচেষ্ট হয় এবং বিভিন্নমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভাঙ্গার ব্যবস্থা করে সে বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় লক্ষ্য হলো- পৃথিবীর অপর কোনো শক্তি যাতে তার সমকক্ষ হতে না পারে তার ব্যবস্থা করা এবং নিজেকে আরও শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়াসমূহ ও সকল জাতীয় সংস্থাসমূহ, সরকারি ও বিরোধীদলসমূহ কাজ করে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় স্বার্থে তারা একই টেবিলে সমবেত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান ও জার্মানী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মিত্রশক্তির সাথে গোলামী চুক্তি করতে বাধ্য হয়েও তারা জাতীয় অগ্রগতির অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করে। চুক্তির কারণে সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার পথ রুদ্ধ হওয়ায় উভয় দেশ নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার ব্রত গ্রহণ করে। মাত্র কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় তারা প্রত্যেকে বিশ্ব অর্থনীতির নীতি নির্ধারকের ক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে তারা নিজেদেরকে সামরিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।


১৯৬২ সালে বর্তমান মালয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ইন্দোনেশিয়ার শাসন থেকে মুক্ত হয়। উপযুক্ত নেতৃত্বের বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মালয়েশিয়া বর্তমানে মধ্যম সারির অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের জাতীয় লক্ষ্য বা Aim of Nation নির্ধারণ করেছে। লক্ষ্যে পৌঁছার সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ২০২০ সাল। এর সুন্দর নাম দিয়েছে ভিশন টুয়েন্টি-টুয়েন্টি। তাদের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে তাদের সাফল্যের ব্যাপারে কোনো প্রকার সংশয়ের সম্ভাবনা দৃষ্টিগোচর হবে না।


১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়। ভারতের নেতা পণ্ডিত নেহেরু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তিধর ভারত গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র উপমহাদেশকে ভারতের শাসনাধীন করার ব্রত গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে ভারত নেহেরু ঘোষিত শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে, পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়েছে। হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, সিকিম, গোয়া-দমন-দিউসহ শতাধিক ছোট-বড় দেশীয় রাজ্য দখল করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে দুই টুকরা করেছে। নিজের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে নেহেরু-ডকট্রিনের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে প্রতিবেশী সকল দেশে অশান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে তাবেদার সরকার, তাবেদার দল, গোষ্ঠী সৃষ্টি করে লক্ষ্যপানে এগিয়ে চলেছে। প্রতিবেশীদের জন্য ভারতের এহেন নীতি যতই ক্ষতিকর হোক না কেনো, জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে ভারতীয়দের দৃষ্টিতে এই নীতি তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার কর্মসূচি মাত্র। এজন্যই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে ভারতের সকল প্রকার বিরোধী মতাদর্শের দলসমূহ একযোগে কাজ করে।


পক্ষান্তরে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কারো জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পর্যন্ত নেই। জাতির কর্ণধারগণ যদি এ ব্যাপারে সজাগ-সচেতন হতেন তবে অবশ্যই ভারতের মতো না হলেও মালয়েশিয়ার মতো সমন্বিত জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণে সক্ষম হতেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অভাবে এদেশের জনগণ হয়েছে মাঝিবিহীন নৌকার যাত্রীর ন্যায়, যেখানে দাঁড়িরা অর্থের বিনিময়ে দাঁড় টানে কিন্তু মাঝি না থাকায়, নৌকার গন্তব্য নির্ধারিত না হওয়ায় ডানদিকের দাঁড়িদের টানে আমরা ডানদিকে যাই আর বামদিকের দাঁড়িদের টানে বামদিকে যাই। অথবা কখনও সামনে যাই, কখনও যাই পিছনে। এমতাবস্থায় কখনও যদি সত্যিকারের হ্যারিকেন-টর্নেডো উক্ত নৌকায় আঘাত হানে তবে আমরা ১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়ের ন্যায় সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যাব। আমাদের মহান পূর্বপুরুষদের বিগত ২৫০ বছরের সমস্ত ত্যাগ ও অর্জন বিলুপ্ত হবে।


আমাদের করণীয়-
১. Aim of Nation নির্ধারণ- ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমন্বিত জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। সৎ এবং অসৎ এর মধ্যে ঐকমত্য হবে না। তাই সৎ ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসীন হতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রথমত দলীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী মনোনয়নে ক্রয়-বিক্রয় নীতি পরিহার করতে হবে। সরকার গঠনের পর মন্ত্রীত্ব বেচা-কেনার সংস্কৃতি, স্বজনপ্রীতি কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে।
২. শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন- শিক্ষা ব্যবস্থাকে, পাঠক্রমকে, পাঠ্যসূচিকে জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণের অনুকূলে বিন্যস্ত করতে হবে। সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টির সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় চেতনা বিরোধী প্রবন্ধকার/ সাহিত্যিকদের লেখা পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দিতে হবে। ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে। কর্মহীন ধর্ম নয়- কর্মের মাধ্যমে ধর্ম পালনের শিক্ষা প্রদান করতে হবে।
৩. জাতীয় সংস্কৃতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন- আমার বিশ্বাস, বর্তমান বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চেয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাতির মানস গঠন করতে পারে, দেশপ্রেমিক ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাতন্ত্র্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে জাতীয় সংস্কৃতির রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। উক্ত রূপরেখা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে উক্ত মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী পদে মনোনীত করতে হবে। সংস্কৃতির সাথে জড়িত সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে উপযুক্ত ব্যক্তি নিয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি সকল উপজেলায় উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘উপজেলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকর্তা’র পদ সৃষ্টি করতে হবে।
জাতীয় সংস্কৃতির রূপরেখার অনুপস্থিতিতে বর্তমানে বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে। আমাদের জাতীয় নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধের বিরোধী নাটক, সিনেমা, সাহিত্য প্রচারিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তিসমূহ জাতির মন-মানসকে কলুষিত-বিভ্রান্ত করে জাতিকে আদর্শহীন ও নিস্তেজ করছে, জাতির প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করছে।


পরিশেষে আমি আমাদের জাতির বর্তমান কর্ণধারগণের নিকট এই সতর্ক বার্তা পৌঁছাতে চাই যে, উন্নত তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে ২৮ কোটি চক্ষু আপনাদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছে। জনগণ দেখছে, আপনারা জাতীয় স্বার্থকে বাদ দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন। আপনারা জনগণের সমস্যার কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার জন্য জনগণের নিকট ভোটভিক্ষা চেয়েছেন, জনগণ আপনাদেরকে সংসদে যাওয়ার টিকেট দিয়েছে। আপনারা উক্ত টিকেট লাভ করে সংসদে না গিয়ে জনগণের গাড়ি ভাংচুর করছেন, জাতীয় স্বার্থে আপনারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেন না, অথচ আপনাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিলের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেন, জনগণের টাকায় বিলাসবহুল শুল্কমুক্ত পোরশে, বিএমডব্লিউ, ক্যাডিলাক, ল্যাক্সাস গাড়ি প্রাপ্তির ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেন। ব্যক্তিস্বার্থে রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা এক হতে পারেন- জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপনারা দুই দলের দুই মুক্তিযোদ্ধাও এক হতে পারেন না। জাতীয় স্বার্থেই আপনাদেরকে এমপি নির্বাচিত করা হয়েছিল। অচিরেই আপনারা আপনাদের এ সকল কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রতিফল ভোগ করবেন।


সম্পাদকীয়ঃ মে ২০১২(মাসিক ইতিহাস অন্বেষা)

Thursday, January 19, 2012

কাদিয়ানী প্রসঙ্গ


(লেখাটি ৪দলিয় জোটের আমলে কাদিয়ানীদের নিয়ে সমস্যা সৃষ্টির প্রেক্ষাপটে লিখিত হয়েছিল। পাঠকগণ এটা পড়ে কাদিয়ানীদের উন্নত!!! কোরআন ও সাহিত্য সম্পর্কে ভাল একটা ধারনা পাবেন।)

নন ইস্যুকে ইস্যু করা, মীমাংসিত বিসয়কে বিতর্কিত করা, ফরজ কাজ বাদ দিয়ে নফলের পেছনে সময় ব্যয় করা আমাদের জাতীয় অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। কাদিয়ানীদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে সপ্প্রতি সরকার এরূপ একটি অপ্রয়োজনীয় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। অথচ কাদিয়ানীদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করার কোন প্রয়োজন ছিলনা। কাদিয়ানীদের প্রকাশনা নিসিদ্ধ করে সরকার প্রকারান্তরে প্রতিপক্ষের দুটি উপকার করেছে। এক. নিসিদ্ধ জিনিসের প্রতি জনগনের আগ্রহ বৃদ্ধি করেছে। দুই. তথাকথিত পাশ্চাত্য প্রগতিশীলদের নেতিয়ে পড়া কণ্ঠকে উচ্চকিত করার সুযোগ করে দিয়েছে।

পৃথিবীতে হাজারো মত ও পথ রয়েছে। এখন ও শতাধিক ধর্মমতের অনুসারী জনগোষ্ঠী রয়েছে। এতদ সত্ত্বেও নির্যাতিত, নিষ্পেষিত মজলুম মুসলমানগণ স্বধর্ম ত্যাগ করে অপরাপর ধর্ম গ্রহনে উদ্বুদ্ধ হচ্ছেনা। কাদিয়ানী ধর্মমত ও উক্ত শতাধিক ধর্মমতের একটি বৈ নয়। উক্ত শতাধিক ধর্মমতের প্রকাশনা মুসলমানদের ধর্ম বিশ্বাসের ক্ষতি করতে পারেনি, কাদিয়ানী প্রকাশনাও মুসলমানদের ঈমান আমলের ক্ষতি করতে পারবে না।

বর্তমান পৃথিবীর ৪৮টি দেশ কাদিয়ানিদেরকে সরকারিভাবে অমুসলিম ঘোষণা করেছে। কিন্তু তাদের ধর্মকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়নি, তাদের প্রকাশনা বাজেয়াপ্ত করা বা নিষিদ্ধ করার প্রয়োজন হয়নি। কাদিয়ানী মতবাদ অনুযায়ী তাদের ধর্ম স্বতন্ত্র, তাদের নবি আলাদা, তাদের উপসনালয়, পাঠশালা, সামাজিক রিতি-রেওয়াজ মুসলমানদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। এমতাবস্থায় অন্যান্য স্বতন্ত্র ধর্মসমূহের মত কাদিয়ানী ধর্মমত ইসলামী আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষতি করতে সক্ষম নয়। কাদিয়ানীদের সাথে মুসলমানদের মৌলিক বিরোধ এই যে, তারা অমুসলমান হয়েও নিজেদেরকে মুসলমান পরিচয় দিয়ে মুসলমানদের ধর্ম ও সমাজে বিশৃঙ্খলা ও বিভাজন সৃষ্টি করতে চায়। এমতাবস্থায় কাদিয়ানী ফেতনার অকল্যাণ থেকে রক্ষা পেতে পৃথিবীর অন্যান্য মুসলিম দেশের ন্যায় কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করাই যথেষ্ট, তাদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করা জরুরী নয়। কেননা তাদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ না করলে জনগন তাদের স্বাতন্ত্র্য সম্পর্কে, তাদের ভণ্ডামি সম্পর্কে অবগত হতে সক্ষম হবে। সুবিশাল ও মহান ইসলামী সাহিত্যের তুলনায় কাদিয়ানীদের প্রকাশনা নিতান্তই আবরজনা বলে গণ্য হবে। তাদের সাহিত্যের বিষয়বস্তু ও মান সম্পর্কে পাথকদের ধারনা লাভের জন্য কাদিয়ানী প্রকাশনার (ওহীর) কয়েকটি নমুনা প্রদত্ত হল।
১. ‘যে ব্যক্তি তোমার অনুসরণ করিবে না, তোমার নিকট বায়াআত করিবে না এবং তোমার বিরোধিতা কারী হইবে সে আল্লাহ্‌ ও রাসুলের (গোলাম আহমদ) বিরুদ্ধচারনকারী জাহান্নামী।’
(তাবলীগে রিসালাত ৯ খঃ পৃঃ ২৭
২. ‘যে ব্যাক্তি আমার (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) বিরোধী, সে খ্রিষ্টান , ইয়াহুদি, মুশরিক এবং জাহান্নামী।’
(নুজুলুল মাসিহ পৃঃ ৪, তাজকিরাহ পৃঃ ২২৭, খাযাইন ১৮ খ. পৃঃ ৩৮২)
৩. ‘সকল মুসলিম আমাকে গ্রহন করিয়াছে এবং আমার দাওয়াতের সত্যতা স্বীকার করিয়াছে। কিন্তু বেশ্যার সন্তানেরা আমাকে গ্রহন করে নাই।’
৪. ‘যে ব্যাক্তি আমাদের বিজয়ের প্রবক্তা হইবে না, তাহার সম্পর্কে পরিস্কার বুঝিতে হইতে যে, তাহার ব্যাভিচার জাত সন্তান হওয়ার আকাংখা আছে।’
(আনোয়ারুল ইসলাম পৃঃ ৩০ খাযাইন ৯ খ. ৩১)
৫. ‘যে সকল মুসলমান হযরত মসীহ মওউদের (গোলাম আহমদ কাদিয়ানী) প্রতি আস্থা জ্ঞাপন করে নাই- এমনকি যারা হযরত মসীহে মওউদের নাম পর্যন্ত শুনে নাই তাহারাও কাফের, ইসলামের বাইরে।’
(আইনায়ে ছাদাকত পৃঃ ৩৫)

সম্ভবতঃ উপরে উল্লিখিত ওহীর! ভয়ে ভীত হয়ে এদেশের কিছু সংখ্যক মুসলিম নামধারী প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবী কাদিয়ানীদের পক্ষে জেহাদে অবতীর্ণ হয়ে লাশ ফেলার হুমকি দিচ্ছেন। সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির হুমকি দিচ্ছেন। সর্বোচ্চ আদালতের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টির হুমকি দিচ্ছেন। সন্ত্রাসীর ভাষায় কথা বলছেন। কাদিয়ানী ধর্ম মতের বিরোধিতা করে তথাকথিত জারজ হওয়া , বেশ্যার সন্তান হওয়া, মুসরিক, কাফের ও জাহান্নামী হওয়ার চেয়ে উম্মতে মুহাম্মদির বিরোধিতা করে মুরতাদ হওয়াকে শ্রেয় মনে করছেন। এমতাবস্থায় উক্ত প্রগতিশীলদের প্রতি আক্রোশ ভাব পোষণ না করে তাদের হুমকিকে মজলুমের আর্তচিৎকার মনে করা যুক্তিযুক্ত হবে।

পাশ্চাত্য প্রগতিশীল বুদ্ধিজীবীগণ সাধারণত ডারউইনের বিবর্তনবাদে বিশ্বাস করেন। ফলে উক্ত বুদ্ধিজীবীগন বিবর্তনবাদী কাদিয়ানী ধর্মের পক্ষে ধর্মযুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছেন। কাদিয়ানী ধর্মমতের কালানুক্রমিক বিবর্তন সমুহ নিম্নুোক্ত উদাহরনের মাধ্যমে সুস্পষ্ট হবে।
·      **   ১৮৮০ থেকে ৮৮ সাল পর্যন্ত গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ছিলেন একজন মুসলিম ধর্ম প্রচারক ও ইসলাম বিদ্বেষীদের বিরুদ্ধে একজন তুখোড় তার্কিক।
·      * *  ১৯৮৯ সন তিনি জনগনের নিকট থেকে বায়াআত গ্রহন শুরু করেন ও নিজেকে উম্মতের আওলিয়া দরবেশের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে দাবি করেন। (সিরাতুল মাহদি ১ম খঃ পৃঃ ১৪, ৩১, ও ৮৯)
·      * *  ১৮৯১ খ্রিঃ থেকে তিনি নিজেকে ইমাম মাহদি বলে দাবি করেন। (হাকিকাতুল ওয়াহয়ী পৃঃ ১৪৯, সিরাতুল মাহদি পৃঃ ৩১, ৮৯)
·     *  *  ১৯০০ খ্রিঃ থেকে তার মুরিদগন তাকে নবী হিসেবে আখ্যায়িত করে। জনরোষ থেকে রক্ষা পেতে তিনি এসময় নিজেকে আংশিক নবী, ছায়া নবী, ও বুরুজি নবী হিসাবে প্রচার করেন। (কালিমাতুল ফাসল পৃঃ ১৬৭, মুনকিরিনে খিলাফত কা আনজাম পৃঃ ১৯)
·        ** ১৯০১ খ্রিঃ তিনি নিজেকে নবী ও রাসুল বলে ঘোষণা করেন এবং পূর্বেকার ঝিল্লি-বুরুজি দাবি রহিত করেন। (সিরাতুল মাহদি পৃঃ ৩১, হাকিকাতুল ওয়াহয়ি ৩৯১, খাজাইন ২২ খ। ৪০৬-৭)
·      **   ১৯০৪ সালে তিনি নিজেকে হিন্দু অবতার শ্রীকৃষ্ণ বলে দাবি করেন। (লেকচার- শিয়ালকোট, ২নভে, ১৯০৪ পৃঃ ৩৪)

লক্ষ্য উদ্দেশের ক্ষেত্রেও কাদিয়ানী ধর্মমতের সাথে ইসলামী আকিদা বিশ্বাসের কোন মিল নেই। ইসলামে প্রত্যেক মুসলমানের মূল লক্ষ্য হল আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। দ্বীনদার পরহেজগার মুসলিমের ধর্ম ও জীবন পরিচালিত হয় এভাবে ‘নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার কোরবানি, আমার সমগ্র জীবন ও মৃত্যু একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য।’ পক্ষান্তরে গোলাম আহমদ কাদিয়ানী ও তার অনুসারীগণ সকল সময় সাম্রাজ্যবাদের স্বঘোষিত এজেন্ট বা দালাল। সাম্রাজ্যবাদের সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষেই তাদের জীবন ও কর্ম পরিচালিত হয়। উদাহরন স্বরপ কাদিয়ানীদের প্রকাশনার কিছু অংশ উল্লেখ করা হল।
১. “ অতএব আমার ধর্ম- যাহা আমি বরাবর প্রকাশ করি, এই যে , ইসলামের দুইটি অংশ রহিয়াছে । প্রথমত; আল্লাহ তায়ালার আনুগত্য স্বীকার করা। দ্বিতীয়ত সেই রাষ্ট্রর প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা, যাহা শান্তি স্থাপন করিয়াছে। অত্যাচারীদের হাত হইতে উদ্ধার করিয়া নিজের আশ্রয়ে আমাদিগকে গ্রহণ করিয়াছে। আর তাহা হইতাছে ব্রিটিশ সরকার ।’’(শাহাদাতুল কোরআন ষষ্ট মুদ্রণ- ৩য় পৃষ্ঠা)
২. তিন্তি বিষয় আমাকে ইংরেজ সরকারের হিতাকাংখায় প্রথম পর্যায়ে পৌঁছাইয়াছে। প্রথমত; মুরহুম পিতার প্রভাব, দ্বিতীয়তঃ বর্তমান সরকারের বিশেষ অনুগ্রহ, তৃতীয়ত খোদার এলহাম।(তিবয়াকুল কুলুব ৩০৯-১০ পৃঃ )
৩. ‘এবং আমি দৃঢ় বিশ্বাস করি যে, আমার মুরিদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পাইবে জেহাদের বিধান সমর্থনকারীর সংখ্যা তত হ্রাস পাইবে। কারন আমাকে মসীহ এবং মাহদি হিসাবে মানিয়া লওয়াই জেহাদের বিধানকে অস্বীকার করা।’ (শাহাদাতুল কোরআন ১৭ পৃঃ )
৪. ‘আমি নিজের কাজ না মক্কায় উত্তম রূপে আঞ্জান্ম দিতে পারি না মদিনায়, না তুরস্কে, না সিরিয়ায়,না ইরানে, না কাবুলে, কিন্তু এই সরকারের অধীনে যাহার সৌভাগ্যের জন্য দোয়া করিতেছি।’ (তাবলীগে রিসালাত ৬ষ্ঠ খ. পৃঃ ৬৯)
৫. ‘আমরা আশা করি ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সম্প্রসারণের সাথে সাথে আমাদের ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্র ক্রমশঃ
বিস্তার লাভ করিবে এবং অমুসলমানদের মুসলমান বানানোর সাথে সাথে আমরা মুসলমানদিগকে পুনরায় মুসলমান বানাইব।’ (আল ফজল, ১১ই ফেব্রুয়ারি, ১৯১০ইং)

কাদিয়ানীদের উক্তরূপ সিক্ষার আলোকে আমরা ধরে নিতে পারি যে, তারা উম্মতে মুহাম্মদিকে কাদিয়ানী মুসলমান বা সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টে রূপান্তরে সক্রিয় রয়েছে। ইতিমধ্যে কিছু সফলতাও তারা লাভ করেছে। কিন্তু তাদের সাফল্যে আমাদের বিচলিত হওয়ার কোন কারন নেই। কেননা প্রত্যেক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি স্বীয় শাসন শোষণ সম্প্রসারণে বিভিন্ন চটকদার নামে ও ব্যানারে প্রতিনিয়ত এজেন্ট রিক্রুট করছে। এসব এজেন্টগণ বংশানুক্রমিক ভাবে দালালিতে লিপ্ত থাকবে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের পতনে তারা রুশ-মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের দালালি করছে। উক্ত তিন সাম্রাজ্যবাদের পতন হলে নবউত্থিত নতুন সাম্রাজ্যবাদের ছায়াতলে আশ্রয় নেবে।

কাদিয়ানিরা অমুসলিম এ বিষয়ে মুসলিম বিশ্ব একমত। বিশ্বের ১৪৪টি দেশের ইসলামী সংগঠন ‘রাবেতায়ে-আলমে-আল-ইসলামি’’ ১৯/০৪/১৯৭৪ ইং তারিখে ‘মক্কা ঘোষণায়’’ কাদিয়ানীদের ‘কাফের’ সাব্যস্ত করেছে। ও,আই,সি ১৯৮৮ সালের ‘বাগদাদ ঘোষণায়’ কাদিয়ানীদেরকে অমুসলিম ঘোষণা করেছে।

উপসংহারে আমি বলব, বর্তমান জোট সরকার কাদিয়ানীদের প্রকাশনা নিষিদ্ধ করে বিজ্ঞতার পরিচয় দেননি। সরকার যদি কাদিয়ানী ফেতনা থেকে জনগণকে রক্ষায় আন্তরিক হন তবে পৃথিবীর অপরাপর ৪৮ টি দেশ রাবেতা ও ও,আই,সির ন্যায় কাদিয়ানীদের অমুসলিম ও স্বতন্ত্র ধর্মের অনুসারী হিসাবে ঘোষণা করাই যথেষ্ট বলে বিবেচিত হবে। কেননা প্রকাশনা নিষিদ্ধ করলে  নিষিদ্ধ জিনিসের প্রতি জনগনের আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে তদুপুরি বিভিন্ন ব্যানারে সক্রিয় সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টগণ ঐক্যবদ্ধ হওয়ার সুযোগ পাবে।

সম্পাদকঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা
(প্রথম প্রকাশ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা, ফেব্রুয়ারি ২০০৫ সংখ্যা)

Saturday, January 14, 2012

জাতীয় অর্জনসমূহের বিসর্জন আমাদের পতন নিশ্চিত করবে(প্রথম প্রকাশ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা, জুন ২০১১ সংখ্যা)


দীর্ঘদিন তিলে তিলে গড়া মূর্তিটিকে পুজো করে অবশেষে দীর্ঘ শ্রমের ও আকাংখার ধনকে পুকুর-খালনদী-সাগরে বিসর্জন দেয়া হিন্দু সংস্কৃতির ও ধর্মের প্রধানতম রীতি। অপরদিকে নিজেদের আকাংখা ও শ্রমের অর্জনকে সম্মান ও সংরক্ষণ করার রীতি ও মানসিকতা মুসলিম সংস্কৃতির রীতি। মুসলিম সম্প্রদায়ের যে সকল সদস্য তাদের নিজেদের ও নিজেদের পূর্বপুরুষদের শ্রম, ঘাম ও রক্তের বদলে অর্জিত অর্জনসমূহ যখন সম্মান ও সংরক্ষণের পরিবর্তে বিসর্জনের রীতি গ্রহণ করে নিজ দেশ-জাতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে ও মুসলিম বিদ্বেষী বিজাতীয়দের চরণতলে নিজেদের অস্তিত্বকে বিসর্জন দেয় তখন শুধুমাত্র আরবী নামের জন্য তাদেরকে মুসলিম বলা যাবে কি? আরব দেশসমূহের ইহুদী-খ্রিস্টান-কাফের-মুশরেকদের নামও আরবী ভাষায় রাখা হয়। কিন্তু তাদের ধর্ম-বিশ্বাস-সংস্কৃতি ও কর্ম ইসলামসম্মত নয় বিধায় তাদেরকে মুসলিম বলা হয় না। এমতাবস্থায় মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে মুসলিম নামধারী যেসব ব্যক্তি নিজ জাতি ও ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, নিজ জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও অর্জনকে মুসলিম বিদ্বেষীদের নিকট বিসর্জন দেয় তাদের ধর্মীয় পরিচয় বাস্তবে কি হওয়া উচিত তা নির্ণয় করা সময়ের দাবি। এ দাবি অনুযায়ী সত্ত্বর বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে মুসলিম বিশ্ব সংকট থেকে উদ্ধার পাবে না। ধর্মীয় সংজ্ঞানুযায়ী যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তারা কাফের। যারা আল্লাহকে স্বীকার করে কিন্তু আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করে অথবা আল্লাহর সাথে অপর কাউকে শরীক করে বা আল্লাহকেও পূজা করে, মূর্তি, দেবদেবী, পীর-পুরোহিতের নিকটও সাহায্য চায় তারা মুশরিক। অপরদিকে যারা মসজিদ/মাহফিলে গিয়ে ইসলামের পক্ষে কথা বলে আবার মন্দির-গীর্জায় গিয়ে দেবদেবীর স্তূতি গায় অথবা দিনের আলোয় মুসলমানদের পক্ষে কথা বলে আর রাতের আঁধারে কাফের/মুশরিক ও ইসলামবিরোধীদের সাথে মুসলিমবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং বিজাতীয় সংস্কৃতি অনুসরণ করে তারা মুনাফিক।

আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি। তিনি যুদ্ধ করেছেন মুশরিক, মুনাফিক ও স্বধর্মত্যাগী মুরতাদদের বিরুদ্ধে। তাঁর যামানায় আরবে স্রষ্টায় অবিশ্বাসী লোক ছিল না কিন্তু তারা স্রষ্টার ক্ষমতাকে বিভিন্ন দেবদেবীর মধ্যে আরোপ করে দিয়ে উক্ত দেবদেবীদের পূজা করত বিধায় রাসুল (সা.)-এর সাথে তাদের বিরোধ ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পাঠকবৃন্দ যদি তখনকার নামসমূহ বিশ্লেষণ করেন তবে বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন।
রাসুল (সা.)-এর পিতার নাম ছিল আবদুল্লাহ (আল্লাহর জাত নামের সাথে সম্পর্কিত)। তাঁর দাদার নাম ছিল আবদুল মুত্তালিব (আল্লাহর সিফাতী নামের সাথে সম্পর্কিত) নাম শুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাদের কর্ম ও বিশ্বাস ছিল দেবদেবীদের পক্ষে। এ জন্য তাঁরা মুসলিম ছিলেন না। এভাবে মুশরিক সর্দার আবু সুফিয়ান, খালিদ, উমর যাঁরা পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের ইসলাম-পূর্ব নামসমূহ একই ছিল। মুশরিক থেকে মুসলিম হওয়ার পর তাঁদের নামের কোনো পরিবর্তন করতে হয়নি। শুধুমাত্র বিশ্বাস ও কর্ম পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এমতাবস্থায় বর্তমান বিশ্বের যে সকল মুসলিম নামধারী ও পরিচয়ধারী ব্যক্তি তাদের বিশ্বাস ও কর্মে ইসলামবিরোধী তারা মুসলমান হয় বা থাকে কিভাবে? যারা “আল্লাহর উপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যটিকে নিজেদের দেশের সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করার পক্ষে কথা বলে এবং উচ্ছেদের জন্য মুশরিক ঠাকুর-পুরোহিতকে দায়িত্ব দেয় তারা কোন ধর্মাবলম্বী? আল্লাহর উপর আস্থা নাই ঘোষণা দেওয়ার পর বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলা কি সুস্পষ্ট মুনাফেকী নয়? যে রাষ্ট্রনায়করা আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসকে উচ্ছেদ করার পক্ষে তাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকার যুক্তি কোথায়? তবে কি তাদের ইসলাম-আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ইসলাম থেকে ভিন্ন? তবে কি তারা নতুন কোনো ইসলাম, নতুন কোনো রাহমানির রাহীমের উপর আস্থাশীল? পাঠকবৃন্দই সিদ্ধান্ত নেবেন এরূপ বিশ্বাস ও কর্মের অনুসারী ব্যক্তি ও দলের ধর্মীয় পরিচয় কি হতে পারে?

এখন বিসর্জনের সংস্কৃতির আলোচনায় ফিরে আসি। একশ্রেণীর আরবী নামধারী ও মুসলিম পরিচয়ধারী ব্যক্তি ১৭৫৭ সালে শুধুমাত্র ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ইহুদী-খ্রিস্টান ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সাথে আঁতাত করে আমাদের ৭০০ বছরের অর্জনকে ইসলামবিরোধীদের পদতলে বিসর্জন দিয়েছিল। উক্ত শ্রেণীর অর্থ ও ক্ষমতালোভী মুসলমান নামধারীদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমাদের ১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালের ও ১৯৪৭-১৯৭১ সময়কালের মৌলিক অর্জনসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং ১৯৭১-২০১১ সন অবধি সকল মৌলিক অর্জন ব্রাহ্মণ্যবাদের পদতলে, ঠাকুর দেবতার বেদীমূলে বিসর্জিত হওয়ার প্রহর গুনছে। কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন আপনাদের মধ্যে কি দেশ জাতি বিরোধীরা সংখ্যাগিরষ্ঠ? প্রশ্নের উত্তর হবে না। তবে দেশ-জাতি-ধর্ম বিরোধী বিভীষণরা আমাদের জাতশত্রু বিজাতীয়দেরকে সাহায্য করায় আমরা আমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছি না এবং দেশী-বিদেশী চক্রান্তে আমরা উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচন করতে সক্ষম হচ্ছি না। সৎ-যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অবর্তমানে জাতি বহুধাবিভক্ত ও শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। ১৭৫৭-২০১১ অবধি আমাদের প্রধান প্রধান মৌলিক অর্জন ও বিসর্জনের ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
উক্ত অর্জন ও বিসর্জনের আলোচনার পূর্বে ভারতবর্ষ থেকে ৭০০ বছরের মুসলিম শাসন বিলুপ্তির কারণসমূহ আলোচনা করা জরুরি।

নিরক্ষর ও কিশোর সম্রাট আকবর তাঁর কুচক্রি পরামর্শদাতাদের পরামর্শে মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সহযোগী ও তাঁর অভিভাবক রৈরাম খানকে পদচ্যুত ও হত্যা করার ব্যবস্থা করে নিজে সৎ ও যোগ্য অভিভাবক হারান। এমতাবস্থায় ভারতের বর্ণহিন্দু কুচক্রীরা আকবরকে নিজেদের কন্যা ও বোন উপঢৌকন দিয়ে মোঘল রাজদরবারে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করে, আকবরকে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী কাজকর্মে লিপ্ত করায় এবং আকবর-পরবর্তী মোগল শাসকদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী ও আত্মঘাতি দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে মুসলিম শক্তিকে হীনবল করে। আকবর ও আকবরের পরবর্তী মোঘল শাসকদেরকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করে। শাসকদের দেখাদেখি সাধারণ মুসলমানরাও মুসলিম সংস্কৃতির পরিবর্তে হিন্দু সংস্কৃতিতে আসক্ত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব, মর্যাদা, শক্তি সামর্থ হারিয়ে পতন নিশ্চিত করে। ১৭৫৭ সময়কালে মুসলমানদের অবস্থা বুঝার জন্য দুটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো।
১. মুসলিম সম্প্রদায়ের নিম্নশ্রেণীর লোকজন হিন্দু রায়তদের আচার-অনুষ্ঠান এমনভাবে পালন করতো যে, তাদেরকে শুধু অনুষ্ঠানে নয়, বরং নামেও পৃথক করা দুষ্কর হতো। মুসলমানদের নামের মধ্যে এরূপ নামও ছিল যথা- গোপাল, নেপাল, গোবর্ধন ইত্যাদি। (আবদুল বারী, The Reform Movement in Bengal, History of The Freedom Movement : Vol. 1, 1960)
২. হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত বাংলার অসংখ্য মুসলমান তাদের প্রাক্তন ধর্মীয় পদ্ধতি ও দেবদেবীর প্রতি আকর্ষণ বজায় রাখে। তাদের কেউ কেউ সর্পদেবী মনসা, ব্যাঘ্র দেবতা দক্ষিণা রায়, বাসন্তী দেবী, শীতলার পূজাকে নবরূপ দান করে। কেউ কেউ শিবের পূজাও করতো। সঠিক ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতাই এর প্রধান কারণ। (ঐ vol-111 part-1)

আমার দৃঢ় বিশ্বাস তৎকালে মাতৃভাষায় কোরআনের অনুবাদ, হাদিসের অনুবাদ ও ইসলামী সাহিত্য না থাকায় ধর্মান্তরিতরা ইসলামের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো না বিধায় পূর্ব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হতো না
 মুসলমানের অন্তর যখন আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর কর্মপন্থাকে নিঃশর্ত অনুসরণ করে তখন সে হয় বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক মানসম্পন্ন সাহসী ব্যক্তি। অপরদিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমানের ব্যাপারে মুসলমানের অন্তর যদি দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে অথবা বেখবর থাকে তখন শুরু হয় মুসলমানদের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়। এমতাবস্থায় উক্ত মুসলমান আল্লাহকে বাদ দিয়ে পীর পূজা, কবর পূজা, দরগাহ পূজা, দেবদেবী পূজায় লিপ্ত হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।
আধুনিক ভারতের মুসলমানদের উত্থানের রূপকার হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২) স্বচক্ষে ভারতীয় মুসলমানদের ১৭৫৭ সময়কালের পতন প্রত্যক্ষ করেছেন। মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের পতনের যেসব কারণ তিনি চিহ্নিত করেছেন তা হলো-
১. আত্মকলহ ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত।
২. শরীয়তবিরোধী বিদআতের প্রসার।
৩. ভ্রান্ত সুফী মতবাদের প্রসার।
৪. হিন্দু দেবদেবীর পূজা অর্চনা।
৫. পীর পূজা, কবর পূজা, দরগায় মানত।
৬. তাবিজ, কবজ, মাদুলী ও কুলজীতে বিশ্বাস।
৭. হোলি উৎসব উদযাপন (সমকালীন মোঘল সম্রাটগণ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা এ অনুষ্ঠান পালন করতেন)।
৮. নারীর উত্তরাধিকারের শরীয়তী আইন লঙ্ঘন (পাঞ্জাব ও যুক্ত প্রদেশে)।
৯. মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার প্রথার প্রচলন (মালাবারে)।
১০. জ্যোতিষশাস্ত্র, ভবিষ্যদ্বাণী ও ভূতপ্রেতে বিশ্বাস।
১১. বিদআতী পীর, ফকির ও ধর্মনেতা।
[বি. দ্র. : বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, সরকারি দল ও মহাজোটের শরীক দলগুলি উপরোক্ত পতনের কারণসমূহের প্রায় সবগুলির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং সঠিক ইসলাম, সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারকদের দমনে তৎপর রয়েছে। তবে কি তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মুসলিম শাসনের বিলুপ্তি চায়? তারা কাদের স্বার্থে এসব করছে?]

মুসলমানদের পতনের উক্ত কারণসমূহ চিহ্নিত করে শাহ ওয়ালীউল্লাহ এক যুগধর্মী সংস্কার আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে তিনি তাঁর পিতা আবদুর রহীম কর্তৃক দিল্লীর মেহেন্দিয়ুকা মহল্লায় স্থাপিত মাদ্রাসাকে ব্যবহার করেন। ছাত্রদেরকে সঠিক ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে দেন। তাঁর মাদ্রাসার ছাত্ররাই পরবর্তী ১০০ বছর প্রত্যক্ষভাবে ভারতীয় মুসলমানদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে ও তার শিক্ষা জীবন্ত রয়েছে। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিষ্য ও সহযাত্রীবৃন্দ যথাক্রমে শাহ আবদুল আজিজ, শাহ ইসমাইল শহীদ, মাওলানা আবদুল হাই, সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, মাওলানা এনায়েত আলী, মাওলানা বেলায়েত আলী, মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী, হাজী শরীয়ত উল্লাহ, সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর ও স্যার সাইয়েদ আহমদ খান। উল্লেখ্য, ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ে স্যার সাইয়েদ আহমদ খান ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলেও তাঁর মানস গঠন হয়েছিল শাহ ওয়ালীউল্লাহর চিন্তাধারায় সিক্ত হওয়ার মাধ্যমে। এ সংক্রান্ত প্রামাণ্য তথ্য নিম্নরূপঃ
১. স্যার সৈয়দ আহমদ খান নকসবন্দীয়া-মুজাদ্দেদীয়া তরীকার বুজুর্গ শাহ গোলাম আলীর শিষ্য হন। গোলাম, আলী হযরত শেখ আহমদ সরহিন্দের তরীকার লোক ছিলেন। (এস এম ইকরাম, Modern
Muslim India and the Birth of Pakistan, P-20)
২. দিল্লীতে অবস্থানকালে স্যার সৈয়দ আহমদ খান ওহাবী আন্দোলন (সংস্কার আন্দোলনের বৃটিশ প্রদত্ত উদ্দেশ্যমূলক নাম) এর সপক্ষে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। (ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক, ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন পৃ. ৬৪)
১৮৫৭ সালের রক্তাক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রশ্নে শাহওয়ালী উল্লাহর অনুসারীরা ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বৃহত্তর অংশ ইঙ্গ-হিন্দু শাসন শোষণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে আর অপরপক্ষ স্যার সাইয়েদ আহমদ খানের নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের পক্ষে। পরবর্তীকালে একপক্ষের নাম হয় দেওবন্দপন্থী অপর পক্ষের নাম হয় আলীগড়পন্থী। ১৮৫৭ সালের যুদ্ধে ও তৎপরবর্তী দমন-পীড়নে দেওবন্দপন্থীরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের উপর স্যার সাইয়েদ আহমদ খান আলীগড় আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিরা হলো নবাব মুহসিন- উল-মূলক (১৮৩৭-১৯০৭), নবাব ভিখারউল মুলক (১৮৪১-১৯১৭), নবাব আবদুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩), সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) এবং মহামান্য আগা খান, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ অসংখ্য জাতীয় ও আঞ্চলিক নেতৃবৃন্দ। জিহাদের পক্ষের মুসলিম নেতৃবৃন্দ সমগ্র ভারতে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। পক্ষান্তরে সমঝোতাপন্থী আলীগড় আন্দোলনের উত্তরসূরিরা পরবর্তীতে ভারতের একটি ক্ষুদ্র অংশে মুসলিম শাসন কায়েম করতে সক্ষম হন ১৯৪৭ সালে। আমাদের পূর্বপুরুষদের শতাব্দীব্যাপী বিরামহীন শ্রমের ফসল পাকিস্তানকে আমরা বিসর্জন দিয়েছি ১৯৭১ সালে এবং বাংলাদেশকে বিসর্জন দেওয়ার কার্যাবলী এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালে আমাদের কোটি কোটি পূর্বপুরুষ ইঙ্গ-হিন্দু প্রতিপক্ষের হাতে আহত-নিহত, পঙ্গু-দ্বীপান্তর-দেশান্তরী হওয়ার বিনিময়ে আমাদের মৌলিক অর্জনসমূহ ছিল-
১. পৃথক মুসলিম জাতিসত্তার স্বীকৃতি।
২. সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে পরিশীলিত ও জাগ্রত একটি মুসলিম সমাজ।
৩. ভারতবর্ষের দুই প্রান্তে আমাদের জন্য আলাদা একটি নিজস্ব রাষ্ট্র।
৪. মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা।
৫. আধুনিক গণতন্ত্রে উজ্জীবিত একটি সচেতন জাতি। (উল্লেখ্য, এ বিষয়ে কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। এ সংক্রান্ত আমার বক্তব্য হলো- এ দেশের জনগণ যখনই সুষ্ঠু গণভোটের সুযোগ পেয়েছে তখনই তারা ভোটের মাধ্যমে সঠিক ও যৌক্তিক রায় প্রদান করেছে। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত একশ্রেণীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি গণরায়কে বানচাল করেছে। গণতন্ত্র হত্যা করেছে, দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু জনগণ বারবার নিজেদের গণতান্ত্রিক অভিব্যক্তির সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রেখেছে।)

দীর্ঘদিনের অর্জনসমূহ বিসর্জনের ধারাবাহিকতা :
১. পৃথক মুসলিম জাতিসত্তার স্বীকৃতির মাধ্যমেই আমরা পাকিস্তান অর্জন করেছিলাম। কিন্তু আমাদের জাতির একটি অংশ ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পরপরই ভাষার প্রশ্নে অসহিষ্ণু হয়ে মুসলিম জাতিসত্তার মূলে কুঠারাঘাত করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বেদীমূলে ধর্মীয় জাতীয়তাকে বিসর্জন দেয়। অথচ ধর্মীয় জাতীয়তাই আমাদের ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা অর্জনের প্রধান উপাদান ছিল। একথা শতভাগ নিশ্চিত যে, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও মানচিত্রই আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
২. ১৯৪৭ সালে আমাদের মধ্যে অনেক সৎ, যোগ্য, নির্লোভ ও দূরদর্শী নেতৃবৃন্দ ছিল এবং আমদের জনগোষ্ঠীও ছিল ঐক্যবদ্ধ, উদীয়মান ও বিকাশমান। আমাদের একশ্রেণীর ক্ষমতা ও অর্থের লোভ এবং বিদেশী চক্রান্তে আমরা আমাদের সৎ লোকদেরকে দৃশ্যপট থেকে বিদায় করেছি এবং অসৎ নেতৃত্বকে বরণ করে নিয়েছি। এতে করে সমগ্র জাতি খুব দ্রুত নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে এবং বহুধা বিভক্ত হয়েছে।
৩. ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান অর্জনকে অনেকে ভুল ও অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করছে। অথচ আমাদের বিজ্ঞ নেতৃবৃন্দ ও সমগ্র জাতি ১৯৪৬ সালে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ভোট প্রদান করেছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ১১৯ জন মুসলিম প্রার্থীর মধ্যে ১১৬ জনকে বেঙ্গল এসেম্বলীতে জয়যুক্ত করে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে রায় দিয়েছিল। একশ্রেণীর লোক বর্তমানে এদেরকে সমাজদ্রোহী-দেশদ্রোহী বলে হেয়প্রতিপন্ন করছে। অথচ যাদেরকে দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে তাঁরা ১৯০ বছরের ইঙ্গ-হিন্দু শাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে হিন্দু ভারতের গোলামী থেকে নিজেদেরকে রক্ষার জন্য পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
৪. দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করে অবশেষে স্যার সৈয়দ আমীর আলীর নেতৃত্বে মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা আদায় করা হয়েছিল। ১৯১৬ সালের চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিষয়টি মেনে নিয়েছিল। অথচ আমাদের একশ্রেণীর ক্ষমতালোভী নেতা ও দল নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অখণ্ড- ভারতে বিশ্বাসী কংগ্রেস দলের সাথে চুক্তি করে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করেছে। যুক্ত নির্বাচনের কুফল সম্পর্কে স্যার সৈয়দ আমীর আলীর বক্তব্য ছিল, “যুক্ত নির্বাচন প্রথা চালু হলে হিন্দুরা শুধু  ঐসব মুসলমানদেরকে ভোট দেবে যারা তাদের তল্পীবাহক পুতুল হবে।” আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে আমরা সৈয়দ আমীর আলীর আশঙ্কাকে প্রত্যক্ষ করতে পারব। বর্তমানে হিন্দুদের তল্পীবাহক পুতুল মুসলমানরা যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে এমপি হয়ে আমাদের সর্বনাশ সাধন করছে। এ দেশের নিষ্ঠাবান মুসলমানরা এখন নিজ দেশে পরবাসী।
৫. আমরা আধুনিক গণতন্ত্রে উজ্জীবিত আমাদের জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছি। এ বিষয়ে সৎ ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ বলেছেন, “বর্তমানে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। পেশীশক্তি ও কালো টাকার মালিক ছাড়া নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ এবং জিতা যায় না। কোটি টাকা না থাকলে বা সন্ত্রাসী লালন না করলে রাজনীতি করা যায় না।... বর্তমানে রাজনীতিকরা ক্ষমতা লাভের আশায় অপশক্তিকে দেশে প্রতিষ্ঠা করে তার ছত্রছায়ায় কৃত্রিম ক্ষমতা ভোগকে সত্যিকার স্বাধীনতা এবং দেশ, জাতির উন্নতি বলে প্রচার করে। ১৭৫৭ সাল থেকে মীরজাফর-উমিচাঁদ ও তাদের ভাবশিষ্যরা অদ্যাবধি এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। এভাবে সৎ রাজনীতিকে অসৎ রাজনীতির বেদীমূলে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। দেশপ্রেমিক রাজনীতিকে দেশদ্রোহীতার বেদীমূলে বিসর্জন দেয়া হয়েছে।

বিসর্জন-পরবর্তী জাতীয় পতনের দৃশ্যাবলী
আমাদের সুযোগ্য পূর্ব পুরুষদের দীর্ঘ ১৯০ বছরের অর্জনসমূহ আমরা পর্যায়ক্রমে বিসর্জন দিয়ে বর্তমানে দেউলিয়া অবস্থায় উপনীত হয়েছি। দেউলিয়া ঘোষণাটি শুধু অবশিষ্ট রয়েছে। আমাদের একশ্রেণীর রাজনীতিকরা গণতন্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত পাকিস্তান ও বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করেছে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে টেনে এনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও আঞ্চলিকীকরণ-এর মাধ্যমে সরকারের প্রধান প্রধান অঙ্গসমূহ যথা আইন-বিচার ও শাসন বিভাগকে পঙ্গুবিতকির্ত ও অচলাবস্থায় উপনীত করেছে। বিচার বিভাগের ঘাড়ে বন্দুক রেখে দেশ পরিচালনার গাইডলাইন সংবিধানকে কচুকাটা করা হয়েছে, আমাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ ও নীতিকে আমাদের শত্রুদের হাতে সমর্পণ করা হয়েছে, আমাদের ’৪৭ সালে অর্জিত সীমান্তকে আমাদের প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে তুলে দেয়া হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে পঙ্গু করা হয়েছে, আইনশৃংখলা বাহিনীকে জাতীয় বাহিনীর পর্যায় থেকে নামিয়ে এনে দলীয় পেটোয়াবাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। উদ্দেশ্যমূলক কার্যকলাপের দ্বারা এলিট ফোর্স র‌্যাবকে মাত্র আড়াই বছরে চরমভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় যে সকল অর্জনের মাধ্যমে আমরা ’৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছিলাম সে সকল অর্জনকে বিসর্জনের মাধমে আমরা পরাধীনতার গভীর গিরিখাদের কিনারায় উপনীত হয়েছি। উল্লেখ্য, অখণ্ড- ভারত তত্ত্বে বিশ্বাসী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এদেশীয় দোসররাই আমাদের সকল অর্জনকে বিসর্জন দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আমাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।

আমাদের করণীয়
১. শাহ ওয়ালী উল্লাহ ও হাজী শরীয়ত উল্লাহর সংস্কার কর্মসূচি এবং স্যার সাইয়েদ আহমদ খান-এর পুনর্গঠন কর্মসূচিকে সমন্বয় করে জাতীয় পুনরুত্থানের রূপরেখা প্রণয়ন এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উক্তরূপভাবে ঢেলে সাজানো।
২. সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিকারের ইতিহাস চর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা, যাতে জনগণ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর আগামী বিনির্মাণে এগিয়ে আসে এবং জাতীয় শত্রুমিত্র চিহ্নিত করতে পারে।
৩. সত্যিকারের ইতিহাসভিত্তিক ও জাতিগঠনমূলক চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য রচনা, চর্চা ও প্রদর্শন।
৪. ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধকে শক্তিশালী ও সুসংহতকরণ। মনে রাখতে হবে এটাই আমাদের টিকে থাকার প্রধান রক্ষাকবচ। পরিশেষে ভারতীয় মুসলমানদের প্রধানতম অনুসরণীয় নেতা ও সমাজ সংস্কারক শাহ ওয়ালী উল্লাহর উপলব্ধি ও বাণী উদ্ধৃত করে প্রবন্ধ শেষ করছি। তাঁর উপলব্ধি- সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের অভাবে সমাজ, রাষ্ট্র এবং জাতীয় জীবনে বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয়, ব্যবহারিক বিকৃতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা করে। সমাজ জীবনে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিধান একান্ত জরুরি। কোরআনের ব্যবহারিক মূল্য প্রদর্শন এবং অর্থনৈতিক সমতা বিধান একান্ত জরুরি। এ দুটি ছিল শাহ ওয়ালী উল্লাহর সংস্কার কর্মসূচির বুনিয়াদ। (ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, শাহ ওয়ালীউল্লাহর রাজনৈতিক চিন্তাধারা পৃ. ১৮)।

তাঁর দিক নির্দেশনা-
১. ইসলামের নীতি ও বিধানগুলিকে যুক্তি ও বিবেকের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করার সময় এসেছে। কেবল আল্লাহর আদেশ বলে মানুষ তা পালন করবে সে যুগ আর নাই। (আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ, সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস, পৃ. ১২১)।
২. মুসলমানদের মধ্যে যতদিন জিহাদের মানসিকতা বজায় ছিল ততদিন তাদের বিজয় ও সম্মান অব্যাহত ছিল, কিন্তু যখন থেকে এ মানসিকতা দূর হয়েছে তখন থেকে তারা সর্বত্র অপমানিত ও ঘৃণিত হয়েছে। (জি.এন. জালবানী, লাইফ অফ শাহ ওয়ালীউল্লাহ, পৃ. ৬২)।
বাংলাদেশে যারা ইসলামের কথা বলেন, ইসলামী আন্দোলনের কথা বলেন, তাদের প্রতি আমার আহ্বান- আপনারা অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করে শাহ ওয়ালী উল্লাহর দিল্লী মাদ্রাসার মতো একটি মাদ্রাসা, ইমাম খোমেনী পরিচালিত কোম মাদ্রাসার ন্যায় একটি মাদ্রাসা অথবা স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মতো আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়-এর ন্যায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করুন। ব্যবসার জন্য অসংখ্য মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করে দেশ-জাতি গঠন ও ধর্ম রক্ষার জন্য একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলুন। তাহলে দেশ-জাতি-ধর্ম রক্ষা পাবে। 
সম্পাদকঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা।

Wednesday, January 4, 2012

বিপন্ন বাংলাদেশ, বিতর্কিত বিচার বিভাগএবং একজন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী(প্রথম প্রকাশ জানুয়ারী ২০১১ সংখ্যা,মাসিক ইতিহাস অন্বেষা)


সাম্রাজ্যবাদী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, মুসলিম বিদ্বেষী রক্তশোষক জগৎ শেঠ-উমিচাঁদ গং এবং ক্ষমতালোভী মীরজাফরের ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন স্বাধীনতার প্রতীক নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা সূর্য ১৯০ বছরের জন্য ডুবে গিয়েছিল। ঠিক তদ্রƒপ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরসূরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চক্রান্তকারীদের গডফাদার যায়নবাদী ইসরাইল, জগৎ শেঠ-উমিচাঁদের উত্তরসূরি ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত এবং মীর জাফরের উত্তরসূরি মঈন-উ-আহমদ ও ইহুদীবাদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা ফখরুদ্দীনের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে ১/১১ নামক দ্বিতীয় পলাশী নাটক এ দেশে মঞ্চস্থ হয়। পলাশী বিপর্যয়ের পর প্রথমদিকে ষড়যন্ত্রের সহযোগী মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনগণ ষড়যন্ত্রের সুদূরপ্রসারী পরিণাম সম্পর্কে বেখবর ছিল। তারা এটিকে শুধুমাত্র নবাব সিরাজ থেকে নবাব মীর জাফরের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবেই ধরে নিয়েছিল। ফলে মাত্র ৮০০ ইংরেজ সৈন্য ও ৩২০০ হিন্দু সৈন্য যখন মীর জাফরের সহযোগিতায় বন্দী সিরাজের লাশ মুর্শিদাবাদে প্রদর্শন করছিল তখনও জনগণ বিষয়টির মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেনি। পরবর্তী ৭ বছরের মধ্যেই জনগণ দেখল ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের প্রকৃত শাসক, শোষক ও নির্যাতনকারী এবং সিংহাসনে যথারীতি একজন মুসলমান পুতুল নবাব অধিষ্ঠিত, যার কোনো ক্ষমতা নেই। পলাশী নাটকের পরই নবাব সিরাজের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী ভেঙে বিধ্বস্ত করা হয়। পরবর্তী সাত বছরের মধ্যে ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীদের সহযোগী মুসলিমদের সেনাদল ভেঙে দেয়া হয় এবং তদস্থলে হিন্দু সেনাদল প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর বিভিন্ন আইন-বিধি জারি করে মুসলমানদের ব্যবসাবাণিজ্য  ও জমির অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সর্বশেষ ১৮৩৫ সালে রাজ ভাষা পার্সীর পরিবর্তে ইংরেজি চালু করা হয় এবং সব সরকারি চাকরি থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করা হয়। ৭০০ বছরের শাসক মুসলমানরা উক্ত পলাশী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অশিক্ষিত ভূমিহীন কৃষক, মজুর ও কুলিতে পরিণত হয়। প্রখ্যাত আওয়ামী বুদ্ধিজীবী আবুল মনসুর আহমদ ১৯৩০-এর দশকের মুসলমান সমাজের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে ‘জমিদার-হিন্দু, রায়ত- মুসলমান, শিক্ষক হিন্দু-ছাত্র মুসলমান, অফিসার হিন্দু- ঝাড়–দার মুসলমান, ডাক্তার হিন্দু-রোগী মুসলমান, উকিল হিন্দু- মক্কেল মুসলমান, খেলোয়াড় হিন্দু- দর্শক মুসলমান, শাসক ও শোষক হিন্দু- শাসিত ও শোষিত মুসলমান ইত্যাদি ইত্যাদি। ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা মীর জাফরের উত্তরসূরি মুসলমানদেরকেও লাভবান হতে দেয়নি।


দীর্ঘ ১০০ (১৭৫৭-১৮৫৭) বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ভারতের কোটি কোটি মুসলমান নিহত, আহত, পঙ্গু ও কারান্তরীণ হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে হিন্দু শক্তির উত্থান ঠেকাতে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী মুসলমানদেরকে আনুকূল্য প্রদান শুরু করে। এক পর্যায়ে দীর্ঘ ৪২ (১৯০৫-১৯৪৭) বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূখ- হাসিল করে। আমাদের অদূরদর্শিতায় ও হঠকারিতায় পাকিস্তান ভেঙে যায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়।প্রতিকুল পরিস্থিতির কারণে আমরা সমগ্র ভারতের অধিকার ছেড়ে দিয়ে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের বাংলাদেশে সুখের স্বর্গ নির্মাণ করা শুরু করি। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। আমাদের জাত-শত্রু ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা মীর জাফরের উত্তরসূরিদের সাথে মিলিত হয়ে এ ক্ষুদ্র ভূখ-টিতেও আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। মীর জাফরের উত্তরসূরিরা বিদেশী প্রভুদের ইশারায় বর্তমানে সিরাজের উত্তরসূরিদেরকে হামলা-মামলা-নির্যাতনের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রশাসন থেকে অভিজ্ঞ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিকদের বিতাড়িত, ওএসডি করা হয়েছে, সেনাবাহিনীর কোমর ভেঙে দেয়া হয়েছে, বিডিআরকে ধ্বংস করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এ বাহিনীকে ধ্বংস করলে জনগণ নিশ্চুপ থাকে। (উল্লেখ্য, ১/১১-এর পর সেনাবাহিনী দ্বারা জনস্বার্থবিরোধী কাজ করানোর মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা হয়। ফলে পিলখানা বিদ্রোহের সময় জনগণ সেনাবাহিনী রক্ষায় নির্লিপ্ত ছিল)। একইভাবে নিম্নমানের লোকদেরকে নমিনেশন দিয়ে এমপি নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত ও বিতর্কিত করা হয়। ’৭২-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিপথে পরিচালনাকারী এবং জনগণ কর্তৃক বারবার প্রত্যাখ্যাত বামপন্থী ঘরানার লোককে আইনমন্ত্রী করা হয় এবং হাইকোর্ট কর্তৃক দুর্নীতিবাজ হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তিকে আইন প্রতিমন্ত্রী করে আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে চরমভাবে বিতর্কিত করা হয়। সর্বশেষ এলএলবি পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ নিম্নমানের চিহ্নিত দলীয় উকিল, হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত প্রধান আসামি ও প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুরকারী ব্যক্তিদেরকে বিচারপতি নিয়োগ করে আমাদের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি চরমভাবে বিনষ্ট করা হয়। এরূপ নাজুক পরিস্থিতিতে যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আশীর্বাদপুষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমাদের নতুন শাসক হিসেবে উড়ে এসে জুড়ে বসে এবং বিতর্কিত আইন-বিচার ও সংসদকে বিধ্বস্ত করে, বিতর্কিত বাহিনীসমূহ ভেঙে দেয় তবে জনগণের নির্লিপ্ত থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এভাবেই একটি দেশের স্বাধীনতা স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের মৌলিক স্তম্ভসমূহকে বিতর্কিত ও দুর্বল করে আগ্রাসনকে নির্বিঘ্ন করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কোনো দেশে প্রবেশ করার পূর্বেই তার তল্পীবাহক পুতুল সরকার কর্তৃক আগ্রাসন প্রতিরোধে সক্ষম ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশ এখন এরূপ ক্রান্তিকাল অতিক্রম  করছে।


১/১১-এর পর যেভাবে বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করা হয়েছে
১/১১-এর পরিকল্পনাকারীরা ক্ষমতারোহণের পূর্বেই সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট শ্রেণীর কিছুসংখ্যক আইনজীবী দ্বারা সুপ্রিমকোর্টে ব্যাপক ত্রাসের সৃষ্টি করে এবং প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুর করে। এতে বিচারকগণ এমন ভীতসন্ত্রস্ত হয় যে, পরবর্তীতে তাঁরা বেআইনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইচ্ছানুযায়ী দেশপ্রেমিক সম্মানিত নাগরিকদের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই রায় প্রদান করে। সময়ের বিবর্তনে তাদের উক্ত রায়সমূহ হাসি-তামাশার বিষয়ে পরিণত হয় এবং উক্ত কোর্টকে জনগণ ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ নামে আখ্যায়িত করে ও উক্ত বিচারকে ক্যামেরা ট্রায়াল নামে অভিহিত করে। ক্ষমতায় এসে বর্তমান ডিজিটাল সরকার উপরোক্ত বিচারকদের তিরষ্কার না করে পুরস্কৃত করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ও সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামক অপর একটি ক্যাঙারু কোর্ট গঠন করে দেশপ্রেমিক সম্মানিত নাগরিকদের হয়রানিতে লিপ্ত রয়েছে। অদ্য ৩০/১২/২০১০ তারিখ সকাল ১০টায় আমি প্রথমবারের মতো উক্ত ক্যাঙ্গারু কোর্টে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং যথারীতি বাধাগ্রস্ত হই। শুধু আমি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি তা নয়- দু-একজন সাংবাদিক ব্যতিত সকল সাংবাদিক গেটের বাইরে সারাক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর পক্ষের অনেক সিনিয়র আইনজীবীকেও গেটের ভিতর ঢুকতে দেয়া হয়নি। তাঁর পরিবারের সদস্য যথাক্রমে তাঁর ভাই সাইফুদ্দীন কাদের চৌধুরী ও স্ত্রী, তাঁর বোন হাসিনা কাদের সিনহা অনেক তদ্বির করেও ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পায়নি। পক্ষান্তরে বর্তমান এটর্নি জেনারেল, ২ জন সহকারী এটর্নি জেনারেল এবং এটর্নি জেনারেল অফিসের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীগণ সদলবলে ট্রাইব্যুনালে হাজির থেকে বিচার কাজ প্রভাবিত করেছেন। অথচ আইনগতভাবে এটার্নি জেনারেল বিচার চলাকালে তথাকথিত ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করে অবস্থান করা ন্যায়সঙ্গত নয়। সংবিধান লংঘন করে নিজস্ব ঘরানার হাইকোর্টের বিচারপতিকে ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগ দেয়া, দলীয় আইনজীবীদেরকে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া, দলীয় বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া, দলীয় লোককে বাদী করে দলীয় সাক্ষীদের থেকে সাক্ষী নিয়েও আটককৃতদের বিরুদ্ধে ফরমায়েশী চার্জশীট দিতে ব্যর্থ হওয়ার দরুন সরকার সম্ভবত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এরই বহিঃপ্রকাশ ছিল তথাকথিত স্বাধীন ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজে সদলবলে এটর্নি জেনারেলের অনাহুত উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ। ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী সাংবাদিকদের উদ্দেশে কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু পুলিশ তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি। উপরন্তু প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত নেতাকর্মীদের প্রতি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানানোর অধিকারটুকুও তাঁকে দেয়া হয়নি। তাঁর স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নিয়োগকৃত আইনজীবীদেরকে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে। অথচ এটার্নি জেনারেলসহ মোট ৩৩ জন আইনজীবী/প্রসিকিউটর আমার স্বামীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।


বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগ বিতর্কিত হওয়ার প্রধান প্রধান কারণ সমূহ
মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে, দেশের পচন শুরু হয় নেতা থেকে। একইভাবে একটি পচা মাছ যদি শত শত মাছের মধ্যে থাকে তবে সব মাছেই দ্রুত পচন শুরু হয়। এ জন্য জেলেরা পচা মাছকে ভাল মাছ থেকে আলাদা করে রাখে। আমাদের অশিক্ষিত জেলেদের বুদ্ধিটুকুও বর্তমান সরকারের আছে বলে মনে হয় না। অথবা বর্তমান সরকার পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই আমাদের দেশের আইন ও বিচার বিভাগ ধ্বংসে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আইন প্রতিমন্ত্রীকে নির্বাচিত করেছেন যাতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থা ধ্বংস হয় এবং দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করে। বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ শাসনামলে জজকোর্টে পিপি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পত্রত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন অপকর্ম প্রকাশিত হলে হাইকোর্টের বিচারপতি মোঃ আলী আজগর খান ও বিচারপতি এস কে সিনহা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সুয়োমুটো রুল জারি করেন। উক্ত রুলে হাইকোর্ট বলেছিল, “পত্রিকায় প্রকাশিত গুরুতর অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে রেকর্ডপত্র দেখার পর কোর্ট মনে করেন, এই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট মামলায় (ডিবি সোর্স জালাল হত্যা মামলা, ১. সেশন কেস নং ৩৭১২/১৯৯৯। ডেইলী স্টার বনাম রাষ্ট্র মামলা/ ৫৩ ডি.লে.আর-২০০১) পিপি হিসেবে নিহত পরিবারের হয়ে তার দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ও মনোযোগী নন। সুতরাং তার এ পদে থাকলে সংশ্লিষ্টরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সংশ্লিষ্টদের ন্যায বিচার নিশ্চিত করার জন্য কামরুলকে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দায়িত্বশীল কাউকে কেন নিয়োগ করা হবে না মর্মে রুল ইস্যু করা হয়। ২০০১ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে এ রুল এবসলিউট করে সাতদিনের মধ্যে অন্য পিপি নিয়োগ করার নির্দেশ দেয়া হয়। উপরোক্ত রায় মতে, দেখা
যায়-  ১। এডভোকেট কামরুল দায়িত্বশীল ব্যক্তি নন, ২। তিনি ন্যায়বিচারের পক্ষে বাধাস্বরূপ।
উপরোক্ত ঘটনার আলোকে কয়েকটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে।
১। বর্তমান সরকার কি জনগণকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার জন্য আইন প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এডভোকেট কামরুলকে নিয়োগ দিয়েছেন?
২। যে দুজন বিচারপতি এডভোকট কামরুলকে ন্যায় বিচারের পক্ষে বাধাস্বরূপ বলে চিহ্নিত করেছিলেন তাঁরা কেন বর্তমানে সুয়োমোটো রুল জারি করে বলছেন না যে, “যে ব্যক্তি পিপি হিসেবে ন্যায়বিচারের পক্ষে বাধা ছিলেন তিনি আইন প্রতিমন্ত্রী থাকলে জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিচার বিভাগ বিতর্কিত হবে।


বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করার ক্ষেত্রে আইন প্রতিমন্ত্রীর বর্তমান ভূমিকা
প্রবন্ধের কলেবরে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয় বিধায় এক্ষেত্রে আমি তাঁর একটি কর্ম যা আইন-শৃঙ্খলার অবনতির জন্য দায়ী, তার উল্লে করব এবং বিচারকাজে হস্তক্ষেপকারী ২টি বক্তব্য উল্লেখ করছি।
১। বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রীকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রধান নিযুক্ত করা হয়েছে। এ পদে থেকে তিনি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যত হত্যা/ ছিনতাই/ রাহাজানি/ চাঁদাবাজি/ ডাকাতি/ নারী নির্যাতন মামলা ছিল সেগুলোকে রাজনৈতিক হয়রানি আখ্যায়িত করে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছেন। ফলে ইতোমধ্যে ৬৬৫৫টি মামলার হাজার হাজার চিহ্নিত খুনি, ডাকাত, চাঁদাবাজ, নারী নির্যাতনকারী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ খোদ রাজধানীসহ সারা দেশে ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, ছাত্রী বাণিজ্য, ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানি, রাজনৈতিক হত্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত ২টি তথ্য হলো-
(ক) গত ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৬৫ জন নিহত ও ১১৩০২ জন আহত হয়েছে। (সংগ্রাম, ২৯/১২/১০)
(খ) ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানির কারণে এ বছর ৩১ জন মেয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং এ কাজে বাধা দেয়ায় ১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে যাদের মধ্যে মা, শ্বশুর, ভাই ও শিক্ষক রয়েছেন। (সূত্র : ২৮/১২/১০-এর এনটিভি নিউজ)
২। (ক) চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হবে। (নয়া দিগন্ত, ৪/১২/২০১০)
(খ) সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে। (দিগন্ত টিভি, ১৭/১২/২-১০) উপরোক্ত ১ম উক্তিতে দর্শকরা বুঝে নেবেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নয়- আইন প্রতিমন্ত্রীই স্বাধীন নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয় উক্তিটির ব্যাপারে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তা হলো, ১৫/১২/২০১০ তারিখে সরকার সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে গ্রেফতারের জন্য ট্রাইব্যুনালের নিকট আবেদন করে। ট্রাইব্যুনাল ১৯/১২/২০১০ইং তারিখ আবেদনের উপর শুনানির দিন ধার্য করে। ১৫/১২/২০১০ইং তারিখ দিবাগত রাতে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে চরম নির্যাতনের পর রিমান্ডে নেয়া হয়। ১৭/১২/২০১০ইং তারিখে আইন প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদেরকে জানান, “১৯/১২/২০১০ তারিখে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে।’ এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো ১৯ তারিখ শুনানির পর স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল কি নির্দেশ দেবে আইন প্রতিমন্ত্রী তা আগাম জানলেন কিভাবে? তবে কি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মামলা ও মামলার রায় আইন প্রতিমন্ত্রী পূর্বেই ট্রাইব্যুনালকে লিখে দিয়েছেন?


বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগ বিতর্কিত হলো কেন?
বিচার বিভাগ বিতর্কিত হওয়ার প্রধান কারণ বর্তমান সরকারের অনুসৃত নীতি দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও গোপালগঞ্জীকরণ। দ্বিতীয় কারণ বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী, তৃতীয় কারণ কিছু সংখ্যক লোভী, মেরুদণ্ড-হীন বিচারপতি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হলো-
১. খুনের মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিকে বিচারপতি নিয়োগ।
২. প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুরকারীকে বিচারপতি নিয়োগ।
৩. প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুরকারীদের বেকসুল খালাস প্রদান কিন্তু সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান ও অলিউল্লাহ নোমানকে সত্য সংবাদ পরিবেশন করায় জেল জরিমানা ও আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা।
৪. পঞ্চম সংশোধনী ও ৭ম সংশোধনী বিষয়ক এখতিয়ার বহির্ভূত রায় প্রদান।
৫. এলএলবিতে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত এবং চিহ্নিত দলীয় আইনজীবীদের বিচারক নিয়োগ।
৬. এটর্নি জেনারেল কর্তৃক বারবার পেশীশক্তি প্রদর্শন ও বিদায়ী প্রধান বিচারপতিকে নজিরবিহীন অশালীন বিদায় সংবর্ধনা প্রদান।
৭. জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ প্রদান।
৮. সংবিধান লংঘন করে মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও পরিচালনা।
৯. শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল কি রায় দেবেন তা সরকারের মন্ত্রীদের আগাম ঘোষণা দেয়া।
১০. আদালত অবমাননার দায়ে সাবেক সচিব, ডিসি ও ওসিকে আদালতে তলব করে আদালক কর্তৃক অবমাননাকর আচরণ করা।
১১. সরকারদলীয় শোক দিবসকে আদালত কর্তৃক জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে আদালতের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া।
১২. মামলার শুনানিতে আপত্তি করায় বিচারপতি কর্তৃক আইনজীবীদের গ্রেফতারের হুমকি প্রদান।
১৩. আগাম জামিনের ব্যাপারে হাইকোর্টের কঠোরতা।
১৪. হাইকোর্ট কর্তৃক জামিনপ্রাপ্ত বিরোধী নেতাকর্মীদের মুক্তি আটকে দেয়ার জন্য এটর্নি জেনারেলের দফতর থেকে কারাগারে ফোন করা।
১৫. বিদেশী নাগরিককে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া।
১৬. বিনা শুনানিতে বেগম জিয়ার লীভ টু আপীল খারিজ করা।
১৭. মাহমুদুর রহমান ও অলিউল্লাহ নোমানের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের সুযোগ না দেয়া।
১৮. রিমান্ডের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া গাইড লাইন নিম্ন আদালত ও পুলিশ কর্তৃক অমান্য করা।
১৯. বিরোধী নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে রিমান্ড প্রদান এবং শ্যোন এরেস্ট দেখানো।
২০.মিথ্যা মামলা জেনেও আদালত কর্তৃক শ্যোন এরেস্ট দেখানো।
২১. উচ্চ ও নিম্ন আদালতে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ।


বিশিষ্টজনদের বক্তব্যে বিচার ব্যবস্থা
১. কোনো কোনো বিচারক ও তাদের কর্মচারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত। ...টিআইবি’র রিপোর্ট অতিরঞ্জিত নয়। -দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, যুগান্তর, ২৮/১২/১০
২. বিডিআর জওয়ানরা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ব্যাপারে শংকিত। (জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, আমার দেশ ২৯/১২/১০)
৩. দেশে আইনের শাসন নেই। চলছে অঘোষিত ফ্যাসিবাদ। বর্তমানে কাউকে ধরলেই রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। (সুজনের গোলটেবিল বৈঠকে টিআইবি চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দীন খান। যুগান্তর-২৮/১২/১০
৪. প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে। (সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ) সূত্র-ঐ
৫. প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে বিচার কার্যক্রম প্রভাবিত করা।
৬. সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, দেশের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে নির্বাহী বিভাগ তথা প্রশাসন ও সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিচার বিভাগের উপর মানুষের আস্থা নেই। সরকারের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কেউ আইনের তোয়াক্কা করছেন না। গণতান্ত্রিক শাসনের নামে স্বৈরতন্ত্র চলছে।... মামলা দিয়ে যাকে তাকে রিমান্ডে নিয়ে বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সরকার আইনেরশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নাগরিকদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে ও প্রতিবাদীদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। (সূত্র-ঐ)
৭. বক্তারা আরো বলেন-
(ক) আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।
(খ) সরকারের লোকজনই নগ্নভাবে আইনের শাসন ধ্বংস করছে। সংগ্রাম-২৮/১২/১০
(গ) আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে কেউ কোথাও বিচার পাচ্ছেন না। (সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর) আঃ সময়-২৮/১২/১০।
৮. বিতর্কিত ব্যক্তিরা আদালতের শীর্ষ পর্যায়ে থাকায় মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। (এনার্জি সলিউশন অব বাংলাদেশের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা, নয়া দিগন্ত- ০৪/১২/২০১০।


মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী নাকি রাজনৈতিক অপরাধী
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিঘোষিত লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচার করা। অথচ সরকার এ পর্যন্ত যাদেরকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে আটক রেখেছে তাদের কাউকে সরাসরি উক্ত অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা হয়নি। এখানেই নিহিত রয়েছে মূল রহস্য। এ পর্যন্ত যে ছয়জনকে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে তাঁরা হলেন জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহ-সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপির ষ্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ সকল নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারের হুমকি দেয়া হচ্ছিল। অবশেষে ২৯/০৬/১০ ইং তারিখে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার’ কথিত সাজানো মামলায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করা হয়। ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বে আঘাতকারী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার হঠাৎ করে ধর্মের পক্ষে এসে ইসলামী আন্দোলনরত শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেফতার করে দেশবাসীকে ডিজিটাল চমক দেখিয়েছে বটে। ইসলাম বিদ্বেষী ইহুদী-খ্রিস্টান শক্তির প্রেসক্রিপশন নিয়ে যারা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাদের দ্বারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মামলা যেন ভূতের মুখে রাম নাম। জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের গেট থেকে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতারের পর জানানো হয় তারা ২০০৮ সালের পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলার আসামি। এর আগে তাঁরা কেউ এ মামলা সম্পর্কে জানতেন না। জানলে জামিন নিতেন। উক্ত পাঁচজনকে আটকের পরই শুরু হয় নিত্যনতুন সাজানো মিথ্যা মামলা দায়ের ও রিমান্ডের নামে নির্যাতন। উক্ত নিত্য নতুন মামলার মধ্যে কয়েকটি হলো ১। ২৭ জুন রমনা থানায় দায়ের করা গাড়ি ভাঙচুরের মামলা। ২। ১৭ ফেব্রুয়ারি পল্টন থানায় দায়ের করা পুলিশের কাজে বাধাদান মামলা। কদমতলী থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলা, উত্তরা থানার বই বিতরণপূর্বক রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্টের মামলা, রমনা থানার হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলা ও উত্তরা থানায় দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা প্রভৃতি। উক্ত মামলাসমূহের মধ্যে গাড়ি ভাঙচুর মামলা, পুলিশের কাজে বাধাদান মামলা ও বই বিতরণ মামলাসমূহ হলো সবচেয়ে হাস্যকর ও উদ্ভট মামলা। কেননা এ দেশের কেউ কখনও বিশ্বাস করবে না যে, নিজামী সাঈদীর মত লোক গাড়ি ভাঙচুর করতে পারে, আর পুলিশের কাজে বাধাদান মামলাটি আরও হাস্যকর। কেননা সরকারি দলের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত পুলিশকে পেটাচ্ছে, থানায় হামলা করছে, অথচ পুলিশের কাজে বাধাদান মামলা করা হচ্ছে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে। বই বিতরণ মামলার ব্যাপারে জিজ্ঞাস্য হলো তারা কোনো নিষিদ্ধ বই বিতরণের সাথে জড়িত কিনা। জড়িত থাকলে উক্ত বইয়ের নাম কি জনগণ তা জানতে চায়। কেননা তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে পরিকল্পিত, সাজানো ও হাস্যকর মামলায় অথচ বলা হচ্ছে তারা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী। অর্থাৎ তারা ১৯৭১ সালে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে জড়িত ছিল। এ বিষয়ে জনগণের জিজ্ঞাসা হলো-
১. তাঁরা ১৯৭২ সালে দালাল আইনে আটক হয়েছিল কিনা? তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭২-৭৫ সালে দালাল আইনে বা হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের অভিযোগে কোনো মামলা হয়েছিল কিনা?
২. ১৯৭১ সালে তাদের কার বয়স কত ছিল? উক্ত রূপ অপরাধ করার বয়স তাদের হয়েছিল কিনা? অথবা ১৯৭২-২০১০ সময়কালে তারা কোনো লুটপাট ও ধর্ষণের কাজে জড়িত ছিল কিনা/ নাকি তারা ১৯৭১ সালে হঠাৎ ভায়াগ্রা/ইয়াবা সেবন করে ধর্ষণে লিপ্ত হয়েছিল এবং যুদ্ধের পর উক্ত বদঅভ্যাস ত্যাগ করেছে?
৩. লুটপাটের মাধ্যমে তারা ১৯৭১ সালে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিল কিনা? নাকি যারা তাদের লুটপাটের বিচার করতে চাইছে তারা ১৯৭২-৭৫ সালে এবং বর্তমানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে?
সরকার যদি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তরিক হতো তাহলে প্রথমে তালিকাভুক্ত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদেরকে যারা ছেড়ে দিয়েছে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতো এবং তৎপর ১৯৭২-৭৩ সালে যারা দালাল আইনে ও অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিল তাদেরকে ধরে এনে পুনরায় বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাত। অথচ সরকার উক্ত দালাল ও অপরাধীদের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকে বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার লক্ষ্যে উদোরপিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে জামায়াতের ৫ জন শীর্ষ নেতা ও বিএনপির শক্তিশালী ও প্রতিভাবান নেতা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর উপর হামলে পড়েছে। সত্যি কথা হলো, সরকার শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার লোভে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধে সক্ষম জাতীয় নেতাদেরকে হয়রানি ও নির্যাতন করে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত রয়েছে। সরকার যদি মনে করেন দেশবাসী এসবের কিছুই বুঝে না তবে সরকারকেই এর মাশুল দিতে হবে।


নবাব সিরাজের সার্থক উত্তরসূরি সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী
যায়নবাদী ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের দলিল চৎড়ঃড়পড়ষ ড়ভ ঃযব বষফবৎং ড়ভ ঃযব তরড়হ বইতে রয়েছে, আন্তঃকোন্দলে লিপ্ত একটি জাতি বা বিশাল সেনাবাহিনী অপেক্ষা সৎ প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ঠেকাতে অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের টার্গেটকৃত দেশের প্রতিভাবান, সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রথম আঘাতেই নির্মূল করতে উদ্যোগী হয়। এরই অংশ হিসেবে ১৭৫৭ সালে প্রথম সুযোগেই নবাব সিরাজকে হত্যা করা হয়। উন্নত প্রযুক্তি ও মিডিয়া না থাকলে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে ও প্রথম আঘাতেই হত্যা করা হতো। নবাব সিরাজ যেভাবে ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেষ্টিত থেকেও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমৃত্যু লড়াই করেছেন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীও তদ্রুপ ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় থেকে ও দেশের আজাদী ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে আমৃত্যু লড়াই করতে সংকল্পবদ্ধ। নবাব সিরাজের সুবিধা ছিল- তিনি ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী। ফলে তিনি নিজ সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়নে সক্ষম হতেন। অপরদিকে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী প্রধান নির্বাহী বা দলীয় প্রধান নন। ফলে তাঁর সুচিন্তিত সংকল্প বাস্তবায়নে তিনি সব সময় সক্ষম ছিলেন না। ফলে তাঁর প্রবল বিরোধীতাকে উপেক্ষা করে মীর জাফরের উত্তরসূরি মঈন-উ-আহমদকে প্রধান সেনাপতি করা হয়েছিল এবং দেশ বর্তমান দুরবস্থায় পতিত হয়। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কর্মী নন। তিনি নিজে একাই একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। দেশের দুই শীর্ষ নেত্রীর পরই জনমনে তাঁর স্থান। জরুরি সরকারের আমলে সকল নেতানেত্রী যখন গর্তে লুকিয়েছিল, সবার কণ্ঠ যখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তখনও তাঁর হুংকারে জাতি জেগে উঠতো ও সম্বিত ফিরে পেত। বন্দী হওয়ার পর জরুরি সরকারের দায়ের করা মামলাসমূহ তিনি নিজেই আদালতে মোকাবেলা করে সকল মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে মুক্তি লাভ করেছেন এবং আদালতে ও আদালতে আনা-নেয়ার ফাঁকে যখনই সুযোগ পেতেন তখনই সিংহ নিনাদে জাতিকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। বর্তমান ডিজিটাল সরকারের আমলেও তাঁর ভূমিকা অপরিবর্তিত ছিল এবং থাকবে। তাঁর এই অকুতোভয় উচ্চারণ ও যুক্তিপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েই বর্তমান ডিজিটাল সরকার ২৬ জুনের তথাকথিত গাড়ি পোড়ানো ও হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেছে এবং ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ ২৬ জুন তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন। ঠিক একইভাবে ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্র হিসেবে বিদেশে ছিলেন। তিনি দালাল আইনে আটক হননি। তাঁর বিরুদ্ধে উক্ত সময়ে কোনো মামলা হুলিয়া বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়নি। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে তিনি ব্যারিস্টারী পড়া অসমাপ্ত রেখে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসেন। অথচ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আমলে তাঁকে যুদ্ধাপরাধীর মামলায় গ্রেফতার করে পৈচাশিক নির্যাতন করা হচ্ছে।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের করণীয়
প্রিয় দেশবাসী, শুধুমাত্র ক্ষমতা ও অর্থের লোভে দেশের একটি জনগোষ্ঠী আগ্রাসী শক্তির দোসর হয়েছে। অথচ আগ্রাসী শক্তিকে প্রতিহত করা সম্ভব না হলে আমাদের অবস্থা ইরাক আফগানিস্তানের ন্যায় হবে। জনগণ এতদিন মনে করতো ৪ দলীয় জোট হয়তো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু গত ৪ বছরের ঘটনা-পরম্পরায় জনগণ দেখতে পাচ্ছে, লক্ষ্যহীন, জিয়ার আদর্শহীন, প্রশিক্ষণহীন ও বিশৃঙ্খল বিএনপি এবং পরাশ্রয়ী চড়ুইয়ের মানসিকতা সম্পন্ন জামায়াত নেতৃত্ব জাতিকে নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। অথচ উক্ত দুই দলে ও অন্যান্য ছোট দলে অনেক যোগ্য নেতাকর্মী রয়েছে যারা দূরদর্শী, গতিশীল ও সাহসী নেতৃত্ব পেলে জনগণকে সংগঠিত করে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। আমাদের এখন এমন একজন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি শ্রীলঙ্কার মাহেন্দ্র রাজাপাকসের মতো সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত প্রতিহত করে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদেরকে নির্মূল করবেন। আমাদের এমন একজন নেতার প্রয়োজন যিনি প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে নেপালের বীর যোদ্ধা পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডের মতো বলতে পারবেন, ‘সামন্তবাদী শক্তি ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ আমাদের চিরশত্রু। এখন ভারতের বিরুদ্ধে জাতীয় যুদ্ধ ও জনযুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।’ বর্তমান অবস্থায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মধ্যেই আমি রাজাপাকসে ও প্রচন্ডের মতো গুণাবলী ও সাহসিকতা প্রত্যক্ষ করছি। সুধী পাঠক, আমি স্বাধীন দেশে জন্মেছিলাম। স্বাধীনভাবেই জীবনের এতটি বছর কাটিয়েছি। ফলে প্রবন্ধটি আমার ব্যক্তিগত স্বাধীন মতামত। এমতাবস্থায় কেউ মনোক্ষুণ্ণ হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমার সংকল্প,স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশে অক্ষম হলে আর লিখব না।