Tuesday, July 3, 2012

মুজাদ্দেদে আলফে-সানীর সংস্কার আন্দোলন


আহম্মদ সারহিন্দী (র.) ৯৭৫ হিজরীতে (১৫৬৩ খ্রি.) পাঞ্জাবের তৎকালীন পাতিয়ালা রাজ্যের বিখ্যাত সারহিন্দ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হযরত ওমর ফারুক (র.)-এর ২৮তম অধঃস্তন বংশধর। তাঁর বয়সকাল ছিল রাসূল (স.)-এর ন্যায় ৬৩ বছর। তাঁর জীবন ও কর্ম তাঁকে সত্যিকারের ওয়ারাছাতুল আম্বিয়ার মর্যাদা দান করেছে। তিনি হানাফী মাজহাবের অনুসারী ছিলেন, তবে ইমাম শাফেয়ীকে তিনি অত্যন্ত ভক্তি শ্রদ্ধা করতেন এবং কোনো কোনো আমল ইমাম শাফেয়ীর তরীকায় সম্পাদন করতেন।


ফসলের ক্ষেতে যেরূপ আগাছা জন্মায় এবং উক্ত আগাছা যথাযথরূপে উৎপাটন না করলে যেভাবে ফসলের মাঠ আগাছার মাঠে পরিণত হয় ঠিক তদ্রুপ ইসলাম নামক শস্যক্ষেত্রেও শিরক, বেদাত, কুফরীসহ বিভিন্ন আগন্তুক মতবাদের আগাছা জন্মায় অথবা উদ্দেশ্যমূলকভাবে আগাছার বীজ ছড়িয়ে দেয়া হয়, যাতে ইসলামের বাগান বাতিলের বাগানে পরিণত হয়।
এমতাবস্থায় যে ধর্মনেতা পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ ও রাসূল (স.)কে অনুসরণ করে ইসলামের বাগানকে আগাছামুক্ত করার দায়িত্ব পালন করেন তাঁকে বলা হয় মুজাদ্দেদ বা সংস্কার কর্তা।


মুজাদ্দেদ কোনো দাবি করার জিনিস নয়- করে দেখানোর জিনিস। শতাব্দীব্যাপী কুসংস্কার ও অনাচারে ইসলামের সত্য-সুন্দর রূপ আচ্ছন্ন হয়ে বিকৃত হয়ে পড়লে যে মনীষী তাঁর অনুপম পাণ্ডিত্য, অতুলনীয় শাস্ত্রজ্ঞান, বিপুল কর্মশক্তি, দুর্জয় সাহস, তেজোদ্দীপ্ত কণ্ঠ এবং ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে ইসলামকে জঞ্জাল, আবর্জনা ও আগাছা মুক্ত করে ইসলামের সত্য-সুন্দর রূপের বিকাশ ঘটাবেন এবং যুগের চ্যালেঞ্জের মোকাবেলায় ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠায় সক্ষম হবেন তিনিই মুজাদ্দিদ বলে পরিগণিত হন। তাঁর কার্যসীমা মাদ্রাসা কিংবা খানকার চার দেয়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাঁর জীবন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদাত-বন্দেগী, মুরাকাবা-মুশাহাদাতে ব্যয় হবে না বরং তাঁর কাজের ধরন হবে ভিন্নতর। এ প্রসঙ্গে তিনি তাঁর প্রিয় পুত্রকে চিঠির মাধ্যমে বলেছিলেন, “বৎস, আমাকে সৃষ্টি করার পিছনে যে উদ্দেশ্য নিহিত রয়েছে- তা সত্ত্বেও আর একটি বিশাল কারখানা আমার জিম্মায় দেয়া হয়েছে। পীর-মুরিদী করার জন্য আমাকে সৃষ্টি করা হয়নি। মুরীদদের তারবিয়ত এবং মানুষের ইরশাদও এর উদ্দেশ্য নয়। সেটা ভিন্ন এক ব্যাপার এবং অন্য এক কারখানা। এর সাথে যে সম্পর্ক রাখবে সে উপকৃত হবে। অন্যথায় নয়। আমার উপর যে কারখানাটির দায়িত্ব অর্পিত হয়েছে- তার মোকাবিলায় তারবিয়ত ও ইরশাদ এমন একটি ব্যাপার- যেমন রাস্তায় পতিত কোনো বস্তু।” (পত্র নং-৬, ২য় খ-)


শেখ আহমদ সারহিন্দী ছিলেন একজন যুগনায়ক, মরদে মুজাদ্দিদ ও মুজাহিদ। ইসলাম ও মুসলিম মিল্লাতের এক মহাসংকটকালে তিনি জন্মগ্রহণ করেন এবং স্বীয় সাধনা ও কর্মশক্তি গুণে জাতির ইতিহাসে মুজাদ্দিদে আলফেসানী (দ্বিতীয় সহস্রাব্দের মুজাদ্দিদ) নামে পরিচিত হন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (স.) বলেন- “আল্লাহ এই উম্মতের জন্য প্রতি শতাব্দীর অবসানকালে এমন একজন ব্যক্তিকে পাঠাবেন, যিনি উম্মতের স্বার্থে তাঁর দ্বীনের সংস্কার সাধন করবেন।”


মুজাদ্দিদ সাহেবের উপলব্ধি ও শিক্ষা
সম্রাট আকবর রাজত্ব করেন ১৫৫৬ থেকে ১৬০৬ খ্রি. পর্যন্ত। আহমদ সারহিন্দের জন্ম ১৫৬৩ খ্রি. এবং ইন্তেকাল ১৬২৪ খ্রি.। সম্রাট জাহাঙ্গীর ১৬০৬ খ্রি. সিংহাসনারোহণ করেন। সুতরাং আহমদ সারহিন্দ এই উভয় প্রবল প্রতাপান্বিত মোগল সম্রাটদের রাজত্ব প্রত্যক্ষ করেন। মুজাদ্দেদ (র.) যখন সংস্কার আন্দোলন শুরু করেন তখন সম্রাট আকবরের চূড়ান্ত উন্নতি, সমৃদ্ধি ও শানশওকতের কাল। ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার জন্য আকবর তখন ইরানী শিয়া ও ব্রাহ্মণ্যবাদী ঠাকুর-পুরোহিতদের পরামর্শে সঠিক ইসলামকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দ্বীনে ইলাহী নামক কুফরী ধর্ম প্রচারে ব্যস্ত। এমতাবস্থায় শেখ আহমদ সারহিন্দ অভিজ্ঞ ডাক্তারের মতো প্রথমে রোগীর রোগের কারণ নির্ণয় করেন এবং অতঃপর রোগমুক্তির দাওয়াই সংগ্রহ করে প্রয়োগ করা শুরু করেন। ক্রমান্বয়ে তাঁর চিকিৎসা পদ্ধতি সফলতার দিকে এগিয়ে যায় এবং মুরতাদ আকবর শেষ জীবনে তওবা করে নিজ ধর্মে ফিরে আসেন এবং সম্রাট জাহাঙ্গীর পর্যায়ক্রমে সংশোধিত হয়ে এক পর্যায়ে শেখ আহমদ সারহিন্দের মাধ্যমে ইসলামের নিকট আত্মসমর্পণ করেন ও শরীয়া আইন জারি করেন।


মুজাদ্দিদ (র.) রোগের কারণ নির্ণয় করতে গিয়ে দেখতে পান তৎকালীন ভারতবর্ষের বেশির ভাগ মুসলমান মূল ইসলাম থেকে দূরে সরে গিয়ে মনগড়া ইসলাম অনুসরণ করছে। জাতির আলেমগণ তখন দুনিয়াদারীর লোভে পথভ্রষ্ট ও বিপদগামী। বেদায়াত, পীরবাদ, সুফীবাদ আলেম ও জনসাধারণকে ইসলাম থেকে দূরে নিয়ে গেছে। আল্লাহর খলিফারা তখন পীরের খলিফা ও বাদশাহর মোসাহেবে পরিণত হয়েছে। দুনিয়াদার দরবারী আলেম, বিকৃত শিয়া মতবাদ ও ব্রাহ্মণ্যবাদী কূটচালে সম্রাট আকবর তখন পথভ্রষ্ট হয়ে ইসলাম বিরোধী ‘দ্বীনে ইলাহী’ ধর্ম চালু করেছেন। এক আল্লাহকে বাদ দিয়ে সূর্য পূজা, নক্ষত্র পূজা ও শক্তি পূজায় ব্যস্ত। ইসলামের সকল স্তম্ভের উপর আকবর প্রচণ্ড হামলা করে বিধ্বস্ত করে দিয়েছে। অগণিত মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে, অনেকগুলোকে মন্দিরে পরিণত করা হয়েছে। ইসলামের সকল হুকুম-আহকাম পালন আকবরী শাসনে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে সাব্যস্ত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় মুজাদ্দেদ (র.) এই সিদ্ধান্তে উপনীত হলেন যে, সকল রোগ, দুঃখ-দুর্দশা ও অধঃপতন থেকে রক্ষা পাওয়ার মহৌষধ একটাই- আর তাহলো মূল ইসলামের দিকে ফিরে আসা। কেবল এর মাধ্যমেই মুসলমানগণ পুনরায় জেগে উঠবে এবং বিজয়ী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাবে।


১. মূল ইসলামের দিকে ফিরে আসতে হবে-
তিনি লিখেন, একটি বৃক্ষ যত বড়ই হোক মূলের সাথে তাকে সংযোগ বজায় রাখতেই হবে। তাহলেই সে মূল থেকে রস/জীবনীশক্তি টেনে নিতে সক্ষম হবে এবং উর্ধ্বাকাশ ও প্রকৃতি থেকে সূর্যালোক ও নাইট্রোজেন গ্রহণ করে সতেজ থাকতে পারবে। সুস্থ সতেজ অবস্থায় গাছ কখনো উর্ধ্বাকাশ ও প্রকৃতি থেকে ক্ষতিকর কোনো জিনিস গ্রহণ করে না। এভাবেই একটি গাছ বেঁচে থাকে এবং ফলে-ফুলে সুশোভিত হয়। কিন্তু মূলের সাথে সংযোগ বিচ্ছিন্ন বৃক্ষ উর্ধ্বাকাশ থেকে যত খাদ্যই গ্রহণ করুক না কেন তার মৃত্যু অনিবার্য।
ইসলাম ও মুসলমানদের মূল হলো কুরআন ও রাসূল (স.)-এর সুন্নাহ। ইসলাম রূপ বৃক্ষটির সাথে যদি এর মূলের নিবিড় সংযোগ থাকে তবে সে এই মূল থেকেই রস/জীবনী শক্তি আহরণ করবে এবং প্রয়োজনবোধে পৃথিবীর অন্যান্য মতবাদ থেকে প্রয়োজনীয় অংশ গ্রহণ করবে, অপ্রয়োজনীয় অংশ পরিত্যাগ করবে। এভাবেই সে নিজেকে জীবন্ত, সতেজ ও পরিপূর্ণ রাখবে। মুসলমানদের অনুকরণীয় আদর্শ হলো ইসলাম। তাদের ব্যক্তিক, সামষ্টিক, জাতীয় ও রাষ্ট্রীয় ভাবধারা এবং কার্যক্রম এই আদর্শের উপরই নির্ভরশীল। যতদিন তারা এই আদর্শের উপর কায়েম থাকবে ততদিন তারা দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে বেঁচে থাকবে। বিশ্বের নেতৃত্ব তারাই দিবে, কর্তৃত্ব তারাই করবে। কিন্তু মূল থেকে সরে গেলে তারা আর জীবন্ত জাতি হিসেবে টিকে থাকতে সক্ষম হবে না। মূলের সাথে সংযোগহীন বৃক্ষের ন্যায় অন্য জাতির জ্বালানি কাঠে পরিণত হবে। বিশ্বে তারা একটি নিকৃষ্ট, নিপীড়িত, নির্যাতিত ও লাঞ্ছিত জাতিতে পরিণত হবে। জ্বালানি কাঠের ন্যায় অন্যের কাজে, অন্যের উদ্দেশ্য সাধনে ব্যবহৃত হবে। নিজ জাতির কোনো কাজে আসবে না। এমনকি কুঠারের হাতল হয়ে স্বজাতির ধ্বংস সাধনে ব্যবহৃত হবে।


২. মূল ইসলামের জন্য ক্ষতিকর মতবাদসমূহ পরিত্যাগ করা-
তিনি মূল ইসলামের জন্য ক্ষতিকর মতবাদসমূহকে চিহ্নিত করেন। এগুলো হলো- বিদা’ত, পীরবাদ, সুফীবাদ ও বিজাতীয় মতবাদ। এসকল বিষয়ে তার বক্তব্য হলো-
(ক) বিদা’ত : ইসলামে যদি কেউ নতুন কোনো কিছুর উদ্ভাবন বা সংযোজন করে যা তাতে (ইসলামে) নেই তবে তা বিদআত। এ প্রসঙ্গে তিনি রাসূল (র.)-এর বিদায় হজ্বের ভাষণের সময় নাজিল হওয়া পবিত্র কুরআনের সর্বশেষ নাজিলকৃত আয়াত- (“আল্ইয়াত্তমু আক্মালতু লাকুম দ্বীনুকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নে’মাতা, ওয়ারাদীতু লাকুমুল ইসলামা দ্বীনা”; যার অর্থ আজ আমি দ্বীনকে তোমাদের জন্য পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং আমার নেয়ামতকে তোমাদের উপর সম্পূর্ণ করে দিলাম। আর দ্বীন (জীবন বিধান) হিসেবে ইসলামকেই তোমাদের জন্য মনোনীত করলাম।) উল্লেখ করে বলেন, যে বস্তু পরিপূর্ণ হয়ে আছে তাতে বাইরের কোনো বস্তুর জন্য সামান্য কোনো স্থান থাকতে পারে না। যদি স্থান থাকে তবে সে পূর্ণ নয়- অপূর্ণ। আর পূর্ণ পানির গ্লাসে বাইরের কিছু প্রবেশ করালে সেখান থেকে মূল পানি বাইরে বেরিয়ে যাবে এবং অবশিষ্ট পানি ভেজালে পরিপূর্ণ হবে। তিনি আরো বলেন, ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। আল্লাহর কিতাব এবং রাসূল (স.)-এর হাদীসে বর্ণিত আদেশ-নিষেধ কিংবা আমল ও আকীদা ছাড়া অন্য কোনো উদ্ভাবিত বিষয়ের স্থান ইসলামে নেই। কুরআন সুন্নাহর সাথে সামঞ্জস্যহীন কোনো কিছু ইসলামে অনুপ্রবিষ্ট হলে, কিংবা করানো হলে তা হবে সম্পূর্ণ বেদআত- স্থান বিশেষে শিরক ও কুফর।
(খ) বেদআতে হাসানা ও সাইয়্যাহ্
মুজাদ্দেদ (র.) বেদআতে হাসানা ও সাইয়্যাহ্ নামক বিভাজনকে প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেছেন, সকল বেদআতই অন্ধকারের দিকে নিয়ে যাবে। এ প্রসঙ্গে তিনি ৩টি হাদীসের উল্লেখ করেছেন। যার অনুবাদ হলো-
১. ইসলামে যদি কেউ নতুন কোনো কিছুর উদ্ভাবন করে, যা তাতে (ইসলামে) নেই তবে তা পরিত্যাজ্য।
২. রাসূল (স.) বলেছেন- তোমাদের উপর অবশ্য কর্তব্য- আমার ও হেদায়াতপ্রাপ্ত খোলাফায়ে রাশেদীনের আদর্শ অনুযায়ী  চলা। তা থেকেই দলিল প্রমাণ নিবে এবং তাকেই দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরবে। নব-উদ্ভাবিত আমল বেদআত, প্রত্যেক বেদআতই গোমরাহী ও ভ্রান্তি।
৩. হযরত হাস্সান (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূল (স.) বলেছেন, জাতি যদি নিজের দ্বীনে কোনো বেদাআত সৃষ্টি করে তাহলে আল্লাহ তাদের থেকে ঠিক অনুরূপ একটি সুন্নাতকে ছিনিয়ে নেন। এরপর সেই সুন্নাত কেয়ামত পর্যন্ত আর তাদের কাছে ফেরত আসে না।


(গ) সুন্নাত ও বেদআতের প্রকারভেদ
মুজাদ্দেদ (র.) বলেছেন, রাসূল (স.)-এর সব আমল দুই ধরনের ছিল। (১) ইবাদাতের পর্যায়ভুক্ত, (২) অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত।
(১) রাসূল (স.) যেসব আমল ইবাদাত হিসেবে করেছিলেন তার বিপরীত আমলই বেদআত-ই-মুনকার (অবশ্যই নিষিদ্ধ)। এর প্রতিরোধ ও গতিরোধে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানো সাচ্চা উম্মতের কর্তব্য।
(২) রাসূল (স.) যেসব কাজ দেশপ্রথা ও অভ্যাস হিসেবে করতেন তার বিপরীত কাজকে আমি (মুজাদ্দেদ) বেদআতে মুনকার মনে করি না। এর প্রতিরোধ ও গতিরোধে অপ্রয়োজনীয় প্রয়াসও চালাই না। কেননা, দ্বীনের সাথে এ কাজের কোনো সম্পর্ক নেই। তার উদ্ভব প্রচলিত প্রথার কারণেই হয়েছিল- দ্বীন ও মিল্লাতের কারণে নয়।
তিনি (মুজাদ্দেদ) আরো বলেছেন, প্রত্যেক বেদআতী ও বিভ্রান্ত ব্যক্তি স্বীয় বাতিল আকিদার যথাযোগ্যতা প্রমাণের জন্য কুরআন ও সুন্নারই আশ্রয় নিয়ে থাকে ও দোহাই পাড়ে। অথচ নিঃসন্দেহে তা নিস্ফল ও নিরর্থক। এজন্য সর্বাগ্রে আকায়েদ পরিশোধন নেহায়েত জরুরি। এরপর হালাল-হারাম, ফরজ-ওয়াজিব প্রভৃতি শরীয়তের হুকুম আহকাম সম্পর্কে জ্ঞানর্জন, তারপর তদানুযায়ী আমল এবং এরপরেই তাজকিয়ার (আত্মার বিশুদ্ধকরণ) স্থান।
(ঘ) পীরবাদ : এ সম্পর্কে মুজাদ্দেদ (র.) বলেছেন, পীরবাদ দ্বারা আল্লাহর খলিফারা মানুষের খলিফা হয়ে যায়। আলাদা হয়ে যায় শরীয়ত থেকে তরীকত। শরীয়তের অধীনে না হলে যে কোনো তরীকতই সুস্পষ্ট গোমরাহী। পীরবাদীরা রাসুলুল্লাহ (স.)-এর অনুসরণের পরিবর্তে পীরের অনুসরণ করে গোমরাহ হয়।
(ঙ) সুফীবাদ : এ সম্পর্কে মুজাদ্দেদ (র.)-এর বক্তব্যের সারকথা হলো, পথভ্রষ্ট সুফীবাদের মাধ্যমে মহাবিপ্লবী মুসলমানেরা হয়ে যায় মহাধ্যানী, মহাযোগী বা বৈরাগীতে। বনের রাজা সিংহরা পরিণত হয় গৃহপালিত বিড়ালে।
মূল ইসলামে উপরোক্ত ক্ষতিকর মতবাদসমূহের অনুপ্রবেশের ফলে সম্রাট আকবরের আমলে ভারতবর্ষের আলেম সমাজ ও মুসলমানদের বেশির ভাগ সদস্যই ঈমান ও আমল হারিয়ে গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়েছিল। আকবর এ সকল গোমরাহ সুফী (বিড়াল)দেরকে শুঁটকী দিয়ে, পীরদেরকে শিরনী দিয়ে, বেদাআতীদেরকে অপকর্মের লাইসেন্স দিয়ে নিজের ইসলামবিরোধী কার্যকলাপের সহযোগীতে পরিণত করেছিল। এ জন্যই সম্রাট আকবরের আমলে ভারতবর্ষের পীর-সুফী বেদআতীরা আকবরের ইসলামবিরোধী অপকর্মের প্রতিবাদ করেনি এবং সঠিক ইসলামপন্থীদের নিশ্চিহ্ন করার জন্য আকবরের সহযোগী হয়েছিল।


মুজাদ্দেদ (র.) সাহেবের আন্দোলনের নেতৃত্ব গ্রহণকারী ও তৃতীয় পুত্র খাজা মাসুম বলেছেন-
তিন ব্যক্তির সংস্পর্শ থেকে দূরে থাকবে-
১. দায়িত্বে অবহেলাকারী আলেম।
২. শরীয়তবিরোধী দরবেশ।
৩. মূর্খ সুফী।
তিনি আরো বলেছেন-
যে ব্যক্তি আধ্যাত্মিক দীক্ষা দানকারী পীরের আসনে আসীন হয়েছে অথচ রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাতের অনুসারী নয় এবং শরীয়তের অলঙ্কারে সুসজ্জিত নয়Ñ তার থেকে দূরে অবস্থান করিও... সে আত্মগোপনকারী চোর এবং শয়তানের এজেন্ট।


৩. শরীয়ত, তরীকত ও হাকিকত সম্পর্কে মুজাদ্দেদ (র.)-এর বক্তব্য
শরীয়তের তিন অংশ- জ্ঞান (ইলম), কর্ম (আমল) ও একাগ্রতা বা নিষ্ঠা (ইখলাস)। যতক্ষণ পর্যন্ত এ তিনটির সম্মিলন না হলো ততক্ষণ শরীয়ত হলো না। যখন শরীয়ত প্রমাণিত ও বাস্তবায়িত হয়ে গেল, আল্লাহর সন্তুষ্টিও হাসিল হয়ে গেল। ইহকালীন ও পরকালীন যাবতীয় সৌভাগ্যের চাবিকাঠি একমাত্র শরীয়ত।
তরীকত ও হাকিকত (আধ্যাত্মিকতা) সুফীদের বৈশিষ্ট্য গুণ। কিন্তু এ দুটি জিনিস শরীয়তের তৃতীয় অংশ অর্থাৎ ইসলাম এর পূর্ণতার জন্য শরীয়তের খাদেম বিশেষ। শরীয়তের পূর্ণতা বিধানই হচ্ছে তরীকত ও হাকিকতের একমাত্র উদ্দেশ্য।


৪. কেয়াস ও ইজতিহাদ
এ প্রসঙ্গে মুজাদ্দিদ (র.)-এর বক্তব্যের মূল কথা হলো- কেয়াস (অনুমান) ও ইজতিহাদের কোনো সম্পর্ক বেদআতের সঙ্গে নেই। কেয়াস ও ইজতিহাদ অতিরিক্ত কোনো কিছুর সৃষ্টি করে না। বরং তা একমাত্র কুরআন ও হাদীসের উদ্দেশ্য ও মর্মার্থকে প্রকাশ করে থাকে।


শেখ আহমদ সারহিন্দীর সংস্কার কর্মসূচি
তিনি সহজ-সরল-বোধগম্য ভাষায় তাঁর উপলব্ধি ও সিদ্ধান্ত মৌখিক ও লিখিত আকারে জাতির সামনে তুলে ধরেন। তিনি বুঝেছিলেন মূল ইসলাম ধর্মে অন্যান্য বিষয় অনুপ্রবেশের ধারাবাহিকতায় ধর্মনেতাদের বেশির ভাগ অংশ বিপদগামী এবং মাতৃভাষায় ইসলামকে না বুঝার কারণে জনগণ গোমরাহীতে নিমজ্জিত হয়ে পড়েছে। তাঁর সমকালীন উপলব্ধি ছিল- শাসকগোষ্ঠীই সকল অনাচারের মূল। আরবীতে একটি প্রবচন আছে যার অর্থ হলো- “জনগণ শাসকদেরই অনুসারী হয়ে থাকে।” এ প্রসঙ্গে পত্র নং-৪৭, (১ম খ-)-এর ৬৫ পৃষ্ঠায় তিনি লিখেছেন, “সাম্রাজ্যের সঙ্গে বাদশাহর সম্পর্ক ঠিক তেমন- যেমন সম্পর্ক দেহের সাথে মনের। মন যদি ঠিক থাকে তবে দেহও ঠিক থাকে। যদি মন বিগড়ে যায় তবে দেহ বিপথগামী হয়। সুতরাং বাদশাহর সংশোধন সাম্রাজ্যেরই সংশোধন। বাদশাহর বিপর্যয় সমগ্র সাম্রাজ্যের ধ্বংসের নামান্তর। এ জন্য তিনি শাসক পরিবর্তনের চাইতে শাসকের দৃষ্টিভঙ্গী পরিবর্তনকেই অগ্রাধিকার দেন। এর আলোকে তাঁর কর্মসূচি ছিল-
(ক) বেসরকারি বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সংশোধন।
(খ) উচ্চপদস্থ সরকারি আমলাদের সংশোধন।
(গ) বাদশাহর সংশোধন।
(ঘ) দুনিয়াদার ও দরবারী আলেমদের সংশোধন।
উক্ত কর্মসূচি বাস্তবায়নের পদ্ধতি ও পন্থা ছিল নিম্নরূপ-
তিনি তাঁর কর্মসূচি বাস্তবায়নে তরবারির আশ্রয় নেননি। তিনি ভারতের নেতৃস্থানীয় সামরিক-বেসামরিক, সরকারি-বেসরকারি গুরত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের এবং জনগণের মনোজগতে বিপ্লব সৃষ্টির পন্থা অনুসরণ করেন। উক্ত বিপ্লব তিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষের চিন্তায় ও দৃষ্টিভঙ্গীতে, নৈতিকতা ও তামাদ্দুনে, রাজনীতি ও শাসন ব্যবস্থায়, সমাজ ও অর্থনীতিতে। তাঁর একমাত্র পাথেয় ছিল- আল্লাহর উপর নির্ভরশীলতা, আল্লাহর সাহায্য এবং দৃঢ় মনোবল। এ লক্ষ্যে তাঁর কার্যক্রম ছিল নিম্নরূপ-
১. তিনি প্রথমত লোকদের সামনে দ্বীনের সঠিক রূপটি তুলে ধরেন, যারা তা গ্রহণ করে তাদেরকে সংঘবদ্ধ করেন এবং তাদের চারিত্রিক দিক অর্থাৎ ঈমান, আকীদা ও আচার-আচরণ সংশোধন করতে সচেষ্ট হন।
২. তিনি বেদআতের প্রকাশ্য বিরোধিতায় না গিয়ে রাসুলুল্লাহ (স.)-এর সুন্নাত অনুসরণের নির্দেশ দিতেন। আর এটাকেই সফলতা ও সৌভাগ্যের একমাত্র পথ বলে ঘোষণা করতেন। তাঁর বক্তব্য ছিল- “বন্দেগীর সকল প্রকার হক আদায় করা এবং আল্লাহর প্রতি সর্বদা ও সব সময় দৃষ্টি নিবদ্ধ রাখাই মানব সৃষ্টির একমাত্র উদ্দেশ্য। এই অবস্থা ঠিক তখনি সৃষ্টি হবে- মানুষ যখন দুনিয়া ও আখেরাতের মহান নেতার আদর্শকে প্রকাশ্যে ও গোপনে সর্বাবস্থায় পূর্ণরূপে অনুসরণ করবে।”
পার্থিব শান্তি ও উন্নতি এবং পরকালীন মুক্তি একমাত্র নবী (স.)-এর আদর্শের অনুসরণের উপরই নির্ভলশীল। একজন মুসলমান যখন পূর্ণভাবে নবী (স.)-এর আদর্শের অনুসরণ করে তখনিই সে আল্লাহর সত্যিকার বান্দায় পরিণত হয়। উন্নীত হয় আল্লাহর প্রেমাষ্পদের পর্যায়ে, লাভ করে সফলতা ও পূর্ণতা। এই সফলতা লাভকারী ও পূর্ণতাপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গ বনী ইসরাইলের নবীগণের সমপর্যায়ে উন্নীত হয়।
৩. তিনি আগ্রা, সারহিন্দ ও লাহোরে উচ্চ মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করেন এবং ছাত্রদেরকে স্বীয় লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের অনুকূলে প্রস্তুত করেন।
৪. তিনি ভারতের বিশিষ্ট বেসরকারি ব্যক্তিদের সাথে যোগাযোগ করেন এবং অনেককে স্বীয় মতে দীক্ষিত করেন।
৫. তিনি সম্রাট আকবরের ঘনিষ্ঠ সুন্নী মতাবলম্বী সভাসদদের সাথে যোগাযোগ করে তাদের অনেককে স্বীয় মতাদর্শে দীক্ষিত করেন। এ সকল সভাসদদের তৎপরতায় সম্রাট আকবর শেষ জীবনে তওবা করে আপন ধর্মে ফিরে আসেন।
৬. আকবরের মৃত্যুর পর ১০১৪ হিজরীতে সম্রাট জাহাঙ্গীর সিংহাসনারোহণ করলে তিনি চূড়ান্ত লক্ষ্যে কাজ শুরু করেন। তিনি স্বমতে দীক্ষিত দরবারের সভাসদদের দ্বারা জাহাঙ্গীরের মনোভাবকে ইসলামের অনুকূলে আনতে সক্ষম হন এবং এক পর্যায়ে সম্রাট জাহাঙ্গীর মুজাদ্দেদ (র.)-এর দাবিগুলো মেনে নেন। অবশ্য দাবি মানার পূর্বে সম্রাট জাহাঙ্গীর মুজাদ্দিদকে স্বীয় সিংহাসনের জন্য হুমকি মনে করে কুখ্যাত গোয়ালিয়র দুর্গে বন্দী করেন। দুর্গাধিপতি এক সময় সম্রাটের নিকট এই মর্মে রিপোর্ট প্রেরণ করেন যে, “আহমদ সারহিন্দ এর সংস্পর্শে থেকে গোয়ালিয়র দুর্গের পশুসুলভ বন্দীরা মানুষে পরিণত হয়েছে এবং মানুষগুলো ফেরেশতায় পরিণত হয়েছে।” এরূপ রিপোর্ট পাওয়ার পর সম্রাট জাহাঙ্গীর নিজের ভুল বুঝতে পারেন এবং মুজাদ্দেদকে মুক্তি দান করে তাঁর সাথে সাক্ষাতের ব্যবস্থা করেন। সাক্ষাতে মুজাদ্দিদ (র.) সম্রাটের নিকট স্বীয় দাবিনামা পেশ করেন। তাঁর দাবিগুলো ছিল-
(ক) সম্রাটকে সেজদা করার রীতি সম্পূর্ণভাবে রহিত করতে হবে।
(খ) মুসলমানদেরকে গরু জবেহ করার অনুমতি দিতে হবে।
(গ) বাদশাহ ও তাঁর দরবারীদের জামায়াতে নামাজ আদায় করতে হবে।
(ঘ) কাজীর পদ ও শরীয়ত বিভাগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে।
(ঙ) সমস্ত বেদায়াত ও ইসলামবিরোধী অনাচারকে সমূলে উৎখাত করতে হবে।
(চ) ইসলামবিরোধী যাবতীয় আইন রহিত করতে হবে।
(ছ) ভগ্ন ও বিধ্বস্ত মসজিদগুলোকে পুনরায় আবাদ করতে হবে।
(উল্লেখ্য, সম্রাট আকবরের আমলে হিন্দুরা ভারতের অনেক মসজিদকে ধ্বংস করেছিল এবং অনেকগুলোকে মন্দিরে পরিণত করেছিল।)
সম্রাট জাহাঙ্গীর মুজাদ্দেদ (র.)-এর দাবিসমূহ সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নেন এবং শাহী ফরমান জারি করে তা কার্যকর করেন।
মুজাদ্দেদ (র.)-এর দাবির সারকথা ছিলÑ নির্ভেজাল ইসলাম প্রতিষ্ঠা করা। অপর কোনো ধর্ম বা ফেরকার বিরোধিতা করা বা ব্যক্তিগত লাভের কোনো ব্যাপার এতে ছিল না।
৭. প্রত্যেক শহর ও পল্লীতে মুজাদ্দেদ (র.) সাহেবের একজন করে প্রতিনিধি ছিলেন যারা নিজেদের উদ্দেশ্যের প্রতি অত্যন্ত নিষ্ঠাবান, একাগ্রচিত্ত ও বজ্রকঠোর।


মুজাদ্দেদে আলফেসানী (র.) কেন সশস্ত্র যুদ্ধের পথে যাননি?
রোগ বুঝে চিকিৎসা করা মুজাদ্দেদ (র.)-এর নীতি ছিল। তিনি জানতেন, একশ্রেণীর দুনিয়াদার দরবারী আলেম, পীর ও সুফী সম্রাট আকবরকে ইসলামবিমুখ করেছে। তার সাথে যোগ হয়েছিল শিয়া মূলহেদ সম্প্রদায় ও হিন্দুরা। অথচ প্রথম জীবনে আকবর ধর্মপ্রাণ মুসলমান ছিলেন। এমতাবস্থায় তিনি প্রথমে আকবরের সভাসদদের শুদ্ধ করেন এবং অতঃপর উক্ত সভাসদদের মাধ্যমে আকবরের মানসিক পরিবর্তনের প্রয়াস গ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া আরো যেসব কারণ অনুমান করা যায় তা হলো-
১. হাদীসের নির্দেশ অনুযায়ী কোনো মুসলিম শাসনকর্তার বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিপ্লব ঠিক তখনই জায়েজ, যখন প্রমাণিত হবে যে, তিনি প্রকাশ্যে কুফরীতে ও ইসলামদ্রোহীতায় লিপ্ত রয়েছেন। মুশরেকী ও কাফেরী কার্যকলাপ সংগঠিত হওয়া যদিও হারাম তবুও কোনো ব্যক্তিকে ঠিক তখনই কাফের ঘোষণা করা যায়, যখন তাকে মুসলমান বলার মতো আর কোনো কারণই বিদ্যমান থাকে না। সম্ভবত আকবরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র জিহাদে অবতীর্ণ হওয়ার শক্তি মুজাদ্দিদ সাহেব তখনও অর্জন করতে পারেননি। অথচ শরীয়তের দৃষ্টিতে জেহাদ ঘোষণার জন্য শর্ত হলো- এতটুকু বৈষয়িক শক্তি অর্জিত হতে হবে, যা দ্বারা বিজয়ী ও সফল হওয়ার কিছুটা আশা করা যায়। তাছাড়া আকবরের জীবনে ধীরে ধীরে পরিবর্তন আসাটাও সশস্ত্র যুদ্ধ না করার কারণ হতে পারে।
২. মুজাদ্দেদ সাহেব আকবরকে স্বার্থপর ও ফাসেক মুসলমান বলতেন। অসাধু চাটুকার ও স্বার্থপর লোকদের দ্বারা আকবর পরিবেষ্টিত ছিলেন। এ জন্য আকবরের তুলনায় তিনি এসব স্বার্থপর আলেম, বিলাসপ্রিয় সভাসদ এবং চাটুকারদের সমালোচনাই বেশি করেছিলেন। সম্রাটের সংশোধনের জন্য তাঁর পারিষদদের সংশোধনকেই তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন।
৩. সরকারের সংস্কার ও সংশোধনই যার একমাত্র লক্ষ্য সে রক্তাক্ত সংগ্রামকে ঠিক তখনই জরুরি মনে করেন যখন এ ছাড়া আর গত্যন্তর থাকে না। ক্ষমতাসীনদের সংশোধনই মুজাদ্দিদ সাহেবের উদ্দেশ্য ছিল। এ লক্ষ্যেই তিনি কাজ করেছেন। শরীয়তের হুকুম-আহকাম কায়েম করাই তাঁর উদ্দেশ্য ছিল। এ জন্য নিজেকেই ক্ষমতাসীন হতে হবে এমন বিষয়কে তিনি জরুরি মনে করেননি। 
৪. মুসলমান রাজা-বাদশাহরা তখন গৃহযুদ্ধে লিপ্ত ছিলেন। প্রত্যেকেই অন্যের বিরুদ্ধে অযোগ্যতা, দুর্নীতিপরায়ণতা ও বিলাসিতার দোহাই পাড়তেন এবং সংশোধনের দাবি জানিয়েই যুদ্ধ ঘোষণা করতেন। ঠিক এই অবস্থায় মুজাদ্দিদ সাহেবও যদি সশস্ত্র যুদ্ধের ডাক দিতেন তবে জনগণ বিষয়টিকে ক্ষমতার লড়াই হিসেবে মনে করতেন। এমতাবস্থায় ক্ষমতার হাতবদল হলেও ভিতর থেকে সংশোধন ও সংস্কার সাধিত হতো না বরং মুসলমানদের রক্ত ঝরত।
তদুপরি আকবরের অনুসৃত ধ্বংসাত্মক নীতির ফলে সাম্রাজ্যের উপর হিন্দু ও শিয়ারা বিশেষ আধিপত্য বিস্তার করে ফেলেছিল। তারা একটি আত্মঘাতি যুদ্ধ লাগার অথবা লাগানোর অপেক্ষায় ছিল। মুজাদ্দিদ সাহেব যুদ্ধ ঘোষণা করলে তারা সে সুযোগটি পেয়ে যেত এবং ভারতবর্ষের মুসলমানরা আত্মঘাতি যুদ্ধে নিঃশেষ হয়ে যেত।
এ সকল কারণে মুজাদ্দেদ (র.) সমস্যার সমাধান ও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে অহিংস নীতি অবলম্বন করেছিলেন।


তথ্যসূত্র : মুজাদ্দিদ-ই-আলফেসানীর সংস্কার আন্দোলন, মোহাম্মদ রুহুল আমিন, ১ম প্রকাশ, ইফাবা প্রকাশনী


লেখক : সম্পাদক, মাসিক ইতিহাস-অন্বেষা

Wednesday, June 13, 2012

আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের স্বরূপ


একটি দেশ স্বাধীন হওয়ার শর্তাদি হলো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি নির্দিষ্ট ভূখণ্ড- ও সীমান্ত, সংশ্লিষ্ট ভূখণ্ডের অধিবাসীদের স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতা, উক্ত ভূখণ্ডে প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন সরকার বা শাসক, উক্ত দেশের থাকবে স্বাধীন বিচার বিভাগ, প্রতিরক্ষানীতি, পররাষ্ট্রনীতি ও অর্থনীতি। উক্ত শর্তাদি বাস্তবে পূরণ হলেই একটি দেশ স্বাধীন ও সার্বভৌম দেশ হিসেবে মর্যাদালাভ করে। পক্ষান্তরে একটি দেশের যদি শুধুমাত্র নির্দিষ্ট ভূখণ্ড থাকে কিন্তু সীমান্ত হয় অরক্ষিত, সরকার যদি হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাঁবেদার, প্রতিরক্ষানীতি হয় পরনির্ভরশীল, পররাষ্ট্রনীতি হয় নতজানু এবং অর্থনীতি হয় ভঙ্গুর ও শোষণের শিকার তবে উক্ত দেশকে কখনও স্বাধীন-সার্বভৌম বলা যায় না।


একটি দেশের জনগণকে তখনই স্বাধীন বলা যায়, যখন উক্ত দেশের সরকার হয় স্বাধীন ও সার্বভৌম, নাগরিকদের যদি থাকে ব্যক্তি স্বাধীনতা, বাক্ স্বাধীনতা, বৈধ পথে সম্পদ অর্জন ও ব্যয়ের স্বাধীনতা, অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার, ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার, সংখ্যাগরিষ্ঠের পছন্দমাফিক সরকার গঠন ও পরিবর্তনের অধিকার, মেধা ও যোগ্যতা অনুসারে চাকরি পাওয়ার ও ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার এবং ধর্মীয়, রাজনৈতিক মতামত প্রকাশ ও চর্চা করার অধিকার। দেশের নাগরিকগণ যদি উক্ত অধিকারসমূহের একটি থেকেও বঞ্চিত হয় তবে সে নাগরিক তার দেশে পরিপূর্ণ স্বাধীন তা বলা যাবে না।


উপরোক্ত মৌলিক শর্তাদির আলোকে আমরা যদি বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থাকে পর্যালোচনা করি তবে আমরা দেখতে পাই-
১. ভূখণ্ড ও সীমান্ত : ১৯৪৭ সালের ভূখণ্ড ও সীমান্ত নিয়েই ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ গঠিত হয়। ১৯৭১-পরবর্তী শাসক আমাদের বেরুবাড়ি ভারতকে প্রদান করেছে; কিন্তু বিনিময়ে প্রাপ্য আমাদের ছিটমহল ও করিডোরে আমরা এখনও সার্বভৌমত্ব অর্জন করতে পারিনি। প্রতিবেশী ভারতের দাবির কারণে আমাদের সমুদ্রসীমা এখনও চিহ্নিত হয়নি। তদুপরি আমাদের সরকার প্রতিবেশী ভারতের মদদপুষ্ট শান্তিবাহিনীর নিকট দেশের এক-দশমাংশ ভূমি তুলে দেওয়ার আয়োজন করেছে। একতরফা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সীমান্তের নিয়ন্ত্রণ বর্তমানে ভারতের একক নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে, আমাদের সীমান্তরক্ষী বাহিনীকে বাঘ থেকে বিড়ালের স্তরে নামিয়ে আনা হয়েছে। আমাদের ৫৪টি নদী পানির অভাবে মরা খালে পরিণত হতে চলেছে। এই হলো আমাদের ভূখণ্ড ও সীমান্তের হাল-হকিকত।


২. স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতা : বর্তমান সরকার সচেতনভাবে দেশের জনগণের স্বাধীন থাকার ইচ্ছা ও মানসিকতাকে ধ্বংস ও অবনমিত করার কর্মসূচি পালন করছে। স্বাধীন থাকার জন্য সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র বজায় রাখা অপরিহার্য। আমাদের সরকার আমাদের নিজস্ব সংস্কৃতির বিপরীত সংস্কৃতি লালন-পালন করছে যাতে জনগণের স্বাতন্ত্রবোধ বিলুপ্ত হয়।


৩. স্বাধীন সরকার ও শাসক : দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ইচ্ছা অনুযায়ী গঠিত সরকারই স্বাধীন সরকার হওয়ার পূর্বশর্ত। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির চাপিয়ে দেয়া সরকারকে স্বাধীন সরকার বলা হয় না; বরং তাঁবেদার সরকার বলা হয়। বর্তমান সরকারটি তথাকথিত ১/১১-এর ফসল। আর ১/১১ সংগঠিত করেছিল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা, ইসরাইল, ইউরোপ ও ভারত। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদের চাপিয়ে দেয়া সরকার স্বাধীন সরকার নয়- সরকার প্রধানও স্বাধীন শাসক নয়। তাই সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নই এ সরকারের প্রধান কাজ।


৪. স্বাধীন বিচার বিভাগ : স্বাধীন বিচার বিভাগের পূর্বশর্ত হলো সৎ, যোগ্য, নীতিবান ও নিরপেক্ষ আইনমন্ত্রী ও বিচারক। বাংলাদেশের বর্তমান আইনমন্ত্রী নৈরাজ্যবাদী গণআদালতের সমন্বয়কারী ছিলেন, আইন প্রতিমন্ত্রী যখন এপিপি ছিলেন তখন হাইকোর্ট সুয়োমোটো রুল জারি করে তাঁকে এপিপি পদ থেকে অসততার দায়ে পদত্যাগে বাধ্য করেছিলেন। আর এই সরকার বিচার বিভাগে দলীয় ক্যাডার, খুনের আসামি ও প্রধান বিচারপতির এজলাসে লাথি মারার দায়ে দোষী ব্যক্তিকে পর্যন্ত বিচারক নিয়োগ করে বিচার বিভাগকে পক্ষপাতদুষ্ট ও চরম বিতর্কিত করেছে। ফলে বর্তমানে বিচার বিভাগ নৈরাজ্য সৃষ্টিতে ও অবিচার করার ব্যাপারে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করছে।


৫. প্রতিরক্ষানীতি : আমাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে বিগত সাড়ে তিন বছরে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, গোপালগঞ্জীকরণ ও ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে প্রতিরক্ষা বাহিনীর সৎ, যোগ্য, মেধাবী ও দেশপ্রেমিক কর্মকর্তাদেরকে হত্যা, নির্যাতন, বরখাস্ত ও চাকরিচ্যুত করে বিশ্বমানের এ বাহিনীকে পর্যুদস্ত করা হয়েছে। প্রতিরক্ষা ক্রয়ের ব্যাপারে সম্ভাব্য প্রতিপক্ষের উপর নির্ভরশীলতা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রতিরক্ষা সামর্থ্যকে হুমকির মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে।


৬. পররাষ্ট্রনীতি : আধুনিক সরকারে প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রীর পর যে গুরুত্বপূর্ণ পদ রয়েছে সেটি হলো পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বর্তমান সরকার পররাষ্ট্র বিষয়ে সম্পূর্ণ অনভিজ্ঞ ব্যক্তিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করেছে, বিদেশের বাংলাদেশ মিশনগুলোতে অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পদায়ন করে বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলী দিয়েছে। একদেশ নির্ভর পররাষ্ট্রনীতির কারণে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশ বন্ধুহীন হয়ে পড়েছে। বিপদের দিনে বন্ধুহীন ব্যক্তির ক্ষেত্রে যা হয় বাংলাদেশের বেলায়ও তাই হবে।


৭. অর্থনীতি : সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তার টার্গেটকৃত দেশের অর্থনীতি ধ্বংসকে প্রধান কর্তব্যকর্ম হিসেবে নির্ধারণ করে। দেশ ও জনগণ যদি অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী থাকে তবে তারা সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মোকাবেলায় দৃঢ় অবস্থান নেয়। অপরদিকে ভুখা-নাঙ্গা জনগণ সামান্য খুঁদ-কুড়ার লোভে সাম্রাজ্যবাদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। এ জন্যই অতীতে আমরা দেখেছি ১৭৫৭ সালের ২৩ জুনের পলাশী ষড়যন্ত্রের মাত্র ১৯ বছরে সমৃদ্ধ বাংলাকে দুর্ভিক্ষের বাংলায় পরিণত করে এক-তৃতীয়াংশ জনগণকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছিল, ১৯৭১ সাল-পরবর্তী তিন বছরে বাংলাদেশে দুর্ভিক্ষ সৃষ্টি করে লাখ লাখ লোককে মেরে ফেলা হয় এবং বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয়। একই লক্ষ্যে ২০০৭ সালের ১/১১-এর পর থেকে অদ্যাবধি এদেশের ব্যক্তি পর্যায়ে, রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে অর্থনীতি ধ্বংসের অব্যাহত প্রক্রিয়া চালু রাখা হয়েছে। অর্থনীতির প্রধান প্রধান সেক্টরসমূহ ধ্বংস করে সাম্রাজ্যবাদীদের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। বিভিন্ন নিয়ম-কানুন তৈরি করে, ড্যাব, পরিবেশের অজুহাতে এবং নতুন গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগ বন্ধ করে এদেশের সমৃদ্ধ আবাসন খাতকে ধ্বংস করে বর্তমানে ভারতের সাহারা গ্রুপের নিকট আবাসন খাতকে তুলে দেয়া হচ্ছে। শেয়ারবাজার, ইউনি-পে-টু ইউ, স্পীক এশিয়ার মাধ্যমে এদেশের জনগণকে সর্বস্বান্ত করা হয়েছে। কৃত্রিম গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট তৈরি করে শিল্প-কারখানাকে ধ্বংস করে ভারতীয়দের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে, সম্ভাবনাময় গার্মেন্টস খাতে বিশৃঙ্খলা জিইয়ে রেখে ধ্বংস করা হচ্ছে, ভ্রান্ত ও উদ্দেশ্যমূলক পররাষ্ট্রনীতির মাধ্যমে জনশক্তি রফতানি খাতকে সংকুচিত করে বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের পথ বন্ধ করা হচ্ছে, মৎস্য, পোলট্রিশিল্পসহ সকল ক্ষুদ্র ও কুটিরশিল্পকে ধ্বংস করে ভারতের হাতে তুলে দেয়া হচ্ছে। এই হলো আমাদের বর্তমান অর্থনৈতিক স্বাধীনতা।


উপরোক্ত অবস্থার আলোকে একথা নির্দ্বিধায় বলা যায় যে, বর্তমানে আমাদের দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের মান দ্রুত নিম্নমুখী হচ্ছে এবং আমরা পরাধীনতার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হচ্ছি।


পূর্বেই বলা হয়েছে, সার্বভৌম দেশ ও স্বাধীন সরকারই কেবলমাত্র জনগণের নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করতে পারে। পক্ষান্তরে আধা স্বাধীন, আধা সার্বভৌম অথবা তাঁবেদার দেশ ও সরকার সাম্রাজ্যবাদের চাহিদা মেটাতে গিয়ে জনগণের স্বাধীনতা হরণ করে। এরূপ সরকার সাম্রাজ্যবাদীদের চোখ দিয়ে জনগণকে দেখে। এমতাবস্থায় তাঁবেদার সরকারের দৃষ্টিতে গোলামী মানসিকতার নাগরিকগণ হয় সরকারের বন্ধু এবং স্বাধীনচেতা নাগরিকগণ হয় সরকারের শত্রু। এরূপ সরকার প্রভুরাষ্ট্রকে খুশি করার জন্য স্বাধীনতাকামী জনগণের অধিকার হরণে সদাসর্বদা তৎপর থাকে এবং একপর্যায়ে সাম্রাজ্যবাদের মদদে নিজ দেশের জনগণের উপর হত্যা, নির্যাতন, গুম, খুন চাপিয়ে দেয় এবং দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।


বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের নাগরিক স্বাধীনতার স্বরূপ
১. ব্যক্তি স্বাধীনতা : আমি একজন ব্যক্তি। আমি আমার যোগ্যতা অনুযায়ী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে চাই। কিন্তু আমার সে পথ বন্ধ। কেননা আমি সরকারি দল করি না, সরকারি দলের ক্যাডারদেরকে চাঁদা দিতেও রাজি নই। সুতরাং ভার্সিটিতে ভর্তি হওয়া আমার কপালে জুটবে না, কোনোভাবে ভর্তি হতে সক্ষম হলেও চাঁদা ব্যতীত হলে সিট পাবো না, চাঁদা না দিলে জানমালের নিরাপত্তা থাকবে না। এভাবে সরকারি, দল দলীয়কৃত প্রশাসন ও বিচার বিভাগ আমার নাগরিক স্বাধীনতাকে টুঁটি চেপে ধরছে।


২. বাক্ স্বাধীনতা : আমি আমার মনের কথাটা সমাজ ও রাষ্ট্রকে জানাতে চাই। কিন্তু উক্ত কথাটা যদি সরকারি লোকদের পছন্দ না হয় তবে আমাকে শারীরিক-মানসিকভাবে লাঞ্ছিত হতে হবে, মিথ্যা মামলা, হামলা, রিমান্ডের শিকার হতে হবে। সুতরাং আমাকে হয় বোকার মতো থাকতে হবে অথবা জুলুমের শিকার হতে হবে।


৩. বৈধ পথে সম্পদ অর্জন : আমি একজন দোকানদার বা ঠিকাদার। আমি সরকারি দলকে চাঁদা দেয়া ব্যতীত ব্যবসা করতে পারি না, টেন্ডারবাক্সে টেন্ডার জমা দিতে পারি না। কেননা ঠিকাদারীর কাজ পেতে হলে আমাকে সরকারি দলের ক্যাডার হতে হবে অন্যথায় ক্যাডারদের হাতে প্রাণ হারাতে হবে। সুতরাং বৈধ পথে সম্পদ অর্জনেও আমি স্বাধীন নই।


৪. চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার : আমি কঠিন রোগগ্রস্থ। প্রাইভেট হাসপাতালে চিকিৎসা করানোর সামর্থ্য নাই। সরকারি হাসপাতালই একমাত্র ভরসা। হাসপাতালে ভর্তি হতে হলে ঘুষ দিতে হবে, সিট পেতেও ঘুষ লাগবে, চিকিৎসার জন্য অভিজ্ঞ ডাক্তার নেই হাসপাতালে। তারা হয় অনুপস্থিত অথবা বসে আড্ডা দিচ্ছে। আমি এর প্রতিবাদ করলে স্বাধীনতা চিকিৎসা পরিষদের নেতাকর্মীদের দ্বারা হেনস্থা হতে পারি, অনভিজ্ঞ স্বাচিপ চিকিৎসকদের অবহেলা ও অপচিকিৎসায় মারা যেতে পারি। সুতরাং আমার চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার নেই।


৫. ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার : আমার বসতবাড়ি একব্যক্তি জোরপূর্বক দখল করে নিলো। আমি থানায় মামলা করতে গেলাম। দখলকারী যদি বিত্তশালী হয় অথবা সরকারি দলের লোক হয় তবে পুলিশ আমার মামলা গ্রহণ করবে না, মামলা নিলেও সঠিকভাবে চার্জশিট দেবে না, চার্জশিট দিলেও প্রতিপক্ষের ভয়ে সাক্ষীরা আদালতে গেল না, সাক্ষী যদিও যায় তবে দেখা গেল বিচারক ঘুষ খেয়ে আমার বিরুদ্ধে রায় দিলো অথবা আমার জীবদ্দশায় রায় দিলো না। এমতাবস্থায় আমার ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার কোথায়?


৬. পছন্দসই সরকার গঠনের অধিকার : আমি চাই আমার পছন্দের দল সরকার গঠন করুক। আমার দলকে আমি ভোটে বিজয়ী করতে চাই। আমি সরকারি দলের নজরে পড়লাম। ভোটের আগেই আমাকে মিথ্যা মামলায় জেলে নিয়ে গেল অথবা ভোটকেন্দ্রে যেতে বাধা দিলো। এমতাবস্থায় আমার পছন্দসই সরকার গঠনের অধিকার থাকলো না।


৭. ধর্মচর্চা করার অধিকার : আমি একজন মুসলমান। আমি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে চাই। আমার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নামাজ আদায় করলে সরকারি দল মৌলবাদী বলে আমার উপর হামলা করলো। আমি সরকারি চাকরিজীবী, নামাজ-রোজা করার অপরাধে বরখাস্ত হওয়া, ওএসডি হওয়া এখন স্বাভাবিক ব্যাপার। আমি একজন সাধারণ নাগরিক। নামাজের সময় হওয়ায় বায়তুল মোকাররম মসজিদে প্রবেশ করতে চাই। কিন্তু সহজে তা সম্ভব নয়। এদেশের মন্দির-গীর্জা-প্যাগোডা পাহারায় কোনো পুলিশ না থাকলেও বায়তুল মোকাররম মসজিদ গেটে সারি সারি পুলিশ, রায়টকার, জলকামান সদা তৎপর। দুরু দুরু মনে মসজিদের গেটে ঢুকতে চাইলে দেখা গেল পুলিশ যন্ত্র দিয়ে, হাত দিয়ে আমার জামার নিচে লাদেন খুঁজছে। সুতরাং ছেড়ে দে মা-কেঁদে বাঁচি।


৮. জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা পাওয়ার অধিকার : বর্তমান বাংলাদেশে জান-মাল ও ইজ্জতের নিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন। বেডরুমের নিরাপত্তা দেয়া সরকারের কাজ নয়- এ কথাটি প্রধানমন্ত্রী নিজেই জাতিতে জানিয়ে দিয়েছেন। প্রতিদিন ২০-২৫টি খুন, সড়ক দুর্ঘটনায় ১৫-২০ জনের মৃত্যু এবং একাধিক গুমের ঘটনা ঘটছে। সুতরাং এখানে প্রত্যেকেই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে। তদুপরি খালে, নদীতে, পাটক্ষেতে, ম্যানহোলে, পানির ট্যাংকে, ডোবায় প্রতিদিন বেওয়ারিশ লাশ পড়ে থাকে। যা ইতিপূর্বের কোনো সরকারের আমলে এত ব্যাপকভাবে দেখা যায়নি। একইভাবে পাড়াগাঁ থেকে রাজধানী ঢাকা পর্যন্ত কোথাও আপনার মালের-সম্পদের নিরাপত্তা নেই। সরকারি দলের ক্যাডার, একশ্রেণীর পুলিশ স্বতন্ত্রভাবে ও ক্ষেত্রবিশেষে যৌথভাবে নাগরিকদের মাল-সম্পদ আত্মসাতে লিপ্ত রয়েছে। গ্রামাঞ্চলে নির্দলীয়  বিরোধী দলীয় জনগণের বাগানের গাছ, পুকুরের মাছ, ক্ষেতের ফসল অহরহ লুটপাটের শিকার হচ্ছে। শহরাঞ্চলে চাঁদাবাজি, ছিনতাইয়ের মাধ্যমে নাগরিকদের সম্পদ লুটে নেয়া হচ্ছে। আর ইজ্জত! তার অবস্থা আরও করুণ। সরকারি দলের ক্যাডার, সন্ত্রাসী, মাস্তান- এমনকি শিক্ষকরাও মা-বোনদের ইজ্জত আবরু লুণ্ঠন করছে, তথাকথিত ইভটিজিং বা যৌন হয়রানি এ সরকারের আমলে মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছে।


৯. পরিবেশের ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার অধিকার : সরকারের তাবেদারী মনোভাব এবং নতজানু পররাষ্ট্রনীতির কারণে প্রতিবেশী দেশ নদীর পানি আটকে দিয়ে, আমাদের সমুদ্র এলাকায় বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে এদেশের মারাত্মক ক্ষতি করছে। সরকারি দলের নেতাকর্মীরা সরকারি রাস্তার গাছ, পাহাড়ের গাছ, উপকূলীয় বনভূমির গাছ কেটে অবাধে পরিবেশ ও সম্পদের ধ্বংস করছে। নদীর পাড়, নদীর পাড়ের পাবলিকের জমি ডেজার দিয়ে কেটে মাটি বিক্রি করছে। পাহাড় কেটে পাহাড়ের মাটিও বিক্রি করছে। ফলে নদীর গতিপথ পরিবর্তন হচ্ছে, নদী ভাঙনে ফসলি জমি-বসতবাড়ি বিলীন হচ্ছে, উপকূলীয় জনগণের নিরাপত্তা চরম হুমকির সম্মুখীন হয়েছে। সাধারণ জনগণের উপায় নেই এসবের প্রতিকার চাওয়ার- ন্যায় বিচার পাওয়ার।


এই হলো আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের বর্তমান বাস্তবতা। আমরা কি এরূপ অবস্থা অব্যাহতভাবে চলতে দিয়ে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হবো- নাকি জান দেবো, তবু স্বাধীনতা ও অধিকার বিসর্জন দেবো না। আমাদের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে আমাদের ভবিষ্যৎ।

Saturday, May 19, 2012

আমাদের Aim in life আছে- Aim of Nation নাই



সম্ভবতঃ ৩য় বা ৪র্থ শ্রেণীতে অধ্যয়নকালে আমার এক শিক্ষক ক্লাসে প্রশ্ন করেছিলেন, তোমরা বড় হলে কে কি হতে চাও? উপস্থিত অনেকেই, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা ব্যক্ত করে। আমি বলেছিলাম, বিমানের পাইলট হবো। কিন্তু বাস্তবে বিমানের পাইলট হওয়া দূরের কথা- নিজের গাড়ি চালাতেই ভয় পাই। পরবর্তীতে বহু পরীক্ষায় ‘তোমার জীবনের লক্ষ্য’ বা ‘Your Aim in Life’ রচনার উপর লিখেছি, পাসও করেছি। রচনা বইয়ের অনুকরণে কখনও ডাক্তার হয়ে দেশসেবা করার কথা, কখনও বিজ্ঞানী হয়ে নতুন নতুন আবিষ্কার করার কথা, উকিল হয়ে জনগণকে আইনী সহায়তা প্রদানের কথা লিখেছিলাম। কিন্তু বাস্তব জীবনে এসে এর কোনো কিছু করার সুযোগ হয় নাই। এর কারণ খুঁজতে গেলে দেখা যাবে, পরিবারের অর্থনৈতিক সচ্ছলতার অভাব, স্বশিক্ষিত ও আদর্শ নাগরিক হওয়ার শিক্ষানীতির অভাব, জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজনীয় নীতিমালার অভাবের জন্যই আমাদের কিশোর বয়সের সুন্দর-সুন্দর সপ্নগুলো নিজের অজান্তে বিলীন হয়ে গেছে। পারিপার্শ্বিক, আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির শিকার হয়ে আমরা যা হতে চাই, তা হতে পারি না, আমাদের মহৎ ও সৃষ্টিশীল চিন্তাসমূহ বাস্তব জীবনের দূষিত পরিবেশে এসে এইড্স রোগীর ন্যায় নিঃশেষ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়, আমাদের যেসব সহপাঠী তাদের কাংখিত ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক হওয়ার সুযোগ পেয়েছে তাদের অনেকে বাস্তব জীবনে এসে শুধুমাত্র অধিক অর্থ উপার্জনের লক্ষ্যে বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণের পর স্বনামধন্য পুলিশ বাহিনীতে যোগ দিয়েছে।


আমাদের Aim in life-এর এই দুরবস্থার কারণ সম্ভবত এই যে : ১. আমরা আবেগের বশবর্তী হয়ে Aim ঠিক করেছিলাম। অথবা রচনা বইয়ে লিখিত Aim-কে নিজের Aim হিসেবে উল্লেখ করে পরীক্ষা পাসের চেষ্টা করেছিলাম। ২. আমাদের Aim-কে আমাদের অভিভাবক সমাজ ও রাষ্ট্র জানার চেষ্টা করেনি এবং গুরুত্ব দেয়নি। ৩. লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যে সাপোর্ট প্রয়োজন ছিল তা আমরা পাইনি। ৪. লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য যে দৃঢ় মনোবল সৃষ্টির দরকার ছিল, মনোবল সৃষ্টির জন্য যেরূপ নৈতিক শিক্ষার দরকার ছিল আমরা তা অর্জন করার সুযোগ পাইনি।
৫. আমাদের পাঠ্যপুস্তকে আদর্শ মানব সৃষ্টির সিলেবাস অনুপস্থিত ছিল বরং খারাপ হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা আমাদের সিলেবাসে অন্তর্ভুক্ত ছিল। দু-একটি উদাহরণের মাধ্যমে বিষয়টি বোধগম্য হবে।
ক. আমরা অংক করেছি এক সের দুধের সাথে কি পরিমাণ পানি মিশ্রিত করলে কত টাকা লাভ হবে। সুতরাং বর্তমানে আমরা ভেজাল মিশানোয় বিশ্বচ্যাম্পিয়নে পরিণত হয়েছি।
খ. আমরা টোনা-টুনির গল্পে পড়েছি, টোনা এবং টুনি কিভাবে বনের পশুদেরকে দাওয়াত দিয়ে নিজেরা পালিয়ে গিয়ে গাছের ডালে অবস্থান নিয়ে আনন্দ করছে এবং উক্ত গল্পে সরল বিশ্বাসে দাওয়াতে আগমনকারী পশুদেরকে বোকা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। এই গল্পের মাধ্যমে প্রতারক টোনা-টুনিকে বুদ্ধিমান সাব্যস্ত করা হয়েছে এবং প্রতারিত পশুকুলকে বোকা আখ্যায়িত করা হয়েছে। সম্ভবত এইরূপ গল্পের শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে আমাদের সমাজে প্রতারকগণ বাহবা পায় আর প্রতারিত জনগণ বোকা সাব্যস্ত হয়।
গ. একটি গল্পের শিরোনাম ছিল ‘বাঘ ও বক’। উক্ত গল্পের সারকথা হলো- বাঘের গলায় হাঁড় বিদ্ধ হয়েছিল। বক পুরস্কারের প্রতিশ্র“তিতে বাঘের গলা থেকে উক্ত হাঁড় বের করে বাঘকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে বাঁচিয়েছিল। বিপদ থেকে উদ্ধারের পর বক প্রতিশ্র“ত পুরস্কার দাবি করায় বাঘ পুরস্কারের পরিবর্তে বককে মৃত্যুর হুমকি প্রদান করেছিল। পাঠকবৃন্দ একটু লক্ষ্য করলেই দেখতে পাবেন, আমাদের দেশের বেশিরভাগ রাজনীতিকের আচরণ উক্ত বাঘের ন্যায় আর জনগণ হচ্ছে উক্ত বকের ন্যায়।


সুতরাং দেখা যাচ্ছে, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, শিক্ষা পদ্ধতি ও সিলেবাসের করুণ শিকারে পরিণত হচ্ছে সমগ্র জাতি। এই শিক্ষা ব্যবস্থাই কাউকে তৈরি করছে ভেজাল মিশ্রণকারী হিসেবে, কাউকে প্রতারক হিসেবে আর কাউকে অকৃতজ্ঞ হিংস্র জানোয়ার হিসেবে। হয়তো এজন্যই ব্যবসায়ী ঠকাচ্ছে দেশ ও জনগণকে, রাজনীতিকগণ জনগণকে, উকিল মক্কেলকে, ডাক্তার রোগীকে, শিক্ষক ছাত্রকে, হাকিম ন্যায়বিচার প্রার্থীকে, পুলিশ নির্যাতিতকে, আমলা নাগরিককে, আলেম ভক্তদেরকে, পীর মুরীদদেরকে। ফলে যে যত বেশি ঠক বিদ্যায় পারদর্শী সে এদেশে ততো বেশি প্রতিষ্ঠিত হচ্ছে।


এদেশের ১৪ কোটি লোকের ১৪ কোটি Aim in life আছে। প্রকাশ্যে উক্ত Aim in life-এ দোষণীয় কোনো উপাদান নেই। উক্ত Aim in life-এর ফলে আমরা ডাক্তার, কবিরাজ, প্রফেসর, অফিসার, দেশ নেতা, দেশ নেত্রী হচ্ছি, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী হচ্ছি, আলেম-উলামাসহ অনেক কিছু হচ্ছি কিন্তু আমাদের সবকিছুই পরিচালিত হচ্ছে ব্যক্তিস্বার্থে- জাতীয় স্বার্থে নয়। কারণ আমাদের Aim in life শিখানো হয়েছে Aim of Nation নয়।


জাতীয় স্বার্থে নয় কেনো? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যাবে আমরা স্বাধীনতার এত বছর পরও জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করিনি, লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজন মনে করিনি। প্রত্যেকেই আমরা ব্যক্তিস্বার্থে/ দলীয় স্বার্থে কাজ করে যাচ্ছি- জাতীয় স্বার্থ আমরা এখনও নির্ধারণ করিনি। পৃথিবীর সকল মহান এবং শক্তিশালী জাতি তাদের জাতীয় স্বার্থ নির্ধারণ করেছে, জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, লক্ষ্যে পৌঁছার একটি সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে এবং একটি সময়সীমা নির্ধারণ করেছে। ফলে উক্ত জাতির সদস্যগণ তাদের সকল ব্যক্তিস্বার্থকে জাতীয় স্বার্থের অনুকূলে বিন্যস্ত করেছে। তাদের ব্যক্তিস্বার্থ ও জাতীয় স্বার্থ সমান্তরালভাবে প্রবাহিত হয়ে জাতিকে সমৃদ্ধ করছে, জাতীয় স্বার্থ ব্যক্তিস্বার্থের উপরে প্রাধান্য পাচ্ছে। কয়েকটি দেশের উদাহরণই এ ব্যাপারে যথেষ্ট বিবেচিত হবে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে আমেরিকা নিজেকে বিশ্বশক্তির কাতারে দাঁড় করানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করে। লক্ষ্যে পৌঁছতে সক্ষম হওয়ার পর সে তার প্রতিপক্ষ সোভিয়েত ইউনিয়নকে শক্তিহীন করতে সচেষ্ট হয় এবং বিভিন্নমুখী পরিকল্পনা গ্রহণ করে। ১৯৯০ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নকে ভাঙ্গার ব্যবস্থা করে সে বিশ্বের একক পরাশক্তিতে পরিণত হয়। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় লক্ষ্য হলো- পৃথিবীর অপর কোনো শক্তি যাতে তার সমকক্ষ হতে না পারে তার ব্যবস্থা করা এবং নিজেকে আরও শক্তিশালী করা। এ লক্ষ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শিক্ষা ব্যবস্থা, মিডিয়াসমূহ ও সকল জাতীয় সংস্থাসমূহ, সরকারি ও বিরোধীদলসমূহ কাজ করে যাচ্ছে। ফলে জাতীয় স্বার্থে তারা একই টেবিলে সমবেত হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে।


দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পরাজয়ের পর জাপান ও জার্মানী ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। মিত্রশক্তির সাথে গোলামী চুক্তি করতে বাধ্য হয়েও তারা জাতীয় অগ্রগতির অভিন্ন লক্ষ্য নির্ধারণ করে। চুক্তির কারণে সামরিকভাবে শক্তিশালী হওয়ার পথ রুদ্ধ হওয়ায় উভয় দেশ নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করার ব্রত গ্রহণ করে। মাত্র কয়েক দশকের প্রচেষ্টায় তারা প্রত্যেকে বিশ্ব অর্থনীতির নীতি নির্ধারকের ক্ষমতা অর্জন করতে সক্ষম হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় বর্তমানে তারা নিজেদেরকে সামরিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে নিরলসভাবে বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে।


১৯৬২ সালে বর্তমান মালয়েশিয়া স্বাধীনতা ঘোষণা করে এবং ইন্দোনেশিয়ার শাসন থেকে মুক্ত হয়। উপযুক্ত নেতৃত্বের বাস্তবধর্মী পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে মালয়েশিয়া বর্তমানে মধ্যম সারির অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের জাতীয় লক্ষ্য বা Aim of Nation নির্ধারণ করেছে। লক্ষ্যে পৌঁছার সময়সীমা নির্ধারণ করেছে ২০২০ সাল। এর সুন্দর নাম দিয়েছে ভিশন টুয়েন্টি-টুয়েন্টি। তাদের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলে তাদের সাফল্যের ব্যাপারে কোনো প্রকার সংশয়ের সম্ভাবনা দৃষ্টিগোচর হবে না।


১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়। ভারতের নেতা পণ্ডিত নেহেরু অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী পারমাণবিক শক্তিধর ভারত গড়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করে এবং ব্রিটিশ শাসিত সমগ্র উপমহাদেশকে ভারতের শাসনাধীন করার ব্রত গ্রহণ করে। ইতিমধ্যে ভারত নেহেরু ঘোষিত শক্তিশালী অর্থনীতির দেশে, পারমাণবিক শক্তিধর দেশে পরিণত হয়েছে। হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, সিকিম, গোয়া-দমন-দিউসহ শতাধিক ছোট-বড় দেশীয় রাজ্য দখল করে ভারতের অন্তর্ভুক্ত করেছে। শক্তিশালী প্রতিপক্ষ পাকিস্তানকে দুই টুকরা করেছে। নিজের প্রভাব বলয় সৃষ্টি করে নেহেরু-ডকট্রিনের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার লক্ষ্যে প্রতিবেশী সকল দেশে অশান্তি সৃষ্টির মাধ্যমে তাবেদার সরকার, তাবেদার দল, গোষ্ঠী সৃষ্টি করে লক্ষ্যপানে এগিয়ে চলেছে। প্রতিবেশীদের জন্য ভারতের এহেন নীতি যতই ক্ষতিকর হোক না কেনো, জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের দিক থেকে ভারতীয়দের দৃষ্টিতে এই নীতি তাদের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছার কর্মসূচি মাত্র। এজন্যই জাতীয় লক্ষ্য অর্জনের ক্ষেত্রে ভারতের সকল প্রকার বিরোধী মতাদর্শের দলসমূহ একযোগে কাজ করে।


পক্ষান্তরে আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী কারো জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে চিন্তা করার সময় পর্যন্ত নেই। জাতির কর্ণধারগণ যদি এ ব্যাপারে সজাগ-সচেতন হতেন তবে অবশ্যই ভারতের মতো না হলেও মালয়েশিয়ার মতো সমন্বিত জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণে সক্ষম হতেন। এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের অভাবে এদেশের জনগণ হয়েছে মাঝিবিহীন নৌকার যাত্রীর ন্যায়, যেখানে দাঁড়িরা অর্থের বিনিময়ে দাঁড় টানে কিন্তু মাঝি না থাকায়, নৌকার গন্তব্য নির্ধারিত না হওয়ায় ডানদিকের দাঁড়িদের টানে আমরা ডানদিকে যাই আর বামদিকের দাঁড়িদের টানে বামদিকে যাই। অথবা কখনও সামনে যাই, কখনও যাই পিছনে। এমতাবস্থায় কখনও যদি সত্যিকারের হ্যারিকেন-টর্নেডো উক্ত নৌকায় আঘাত হানে তবে আমরা ১৭৫৭ সালের পলাশী বিপর্যয়ের ন্যায় সমুদ্রের গভীরে তলিয়ে যাব। আমাদের মহান পূর্বপুরুষদের বিগত ২৫০ বছরের সমস্ত ত্যাগ ও অর্জন বিলুপ্ত হবে।


আমাদের করণীয়-
১. Aim of Nation নির্ধারণ- ঐকমত্যের ভিত্তিতে সমন্বিত জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে। সৎ এবং অসৎ এর মধ্যে ঐকমত্য হবে না। তাই সৎ ও জ্ঞানী ব্যক্তিরা যাতে রাজনৈতিক নেতৃত্বে আসীন হতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। এ লক্ষ্যে প্রথমত দলীয় সংসদ সদস্য প্রার্থী মনোনয়নে ক্রয়-বিক্রয় নীতি পরিহার করতে হবে। সরকার গঠনের পর মন্ত্রীত্ব বেচা-কেনার সংস্কৃতি, স্বজনপ্রীতি কঠোরভাবে পরিহার করতে হবে।
২. শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার সাধন- শিক্ষা ব্যবস্থাকে, পাঠক্রমকে, পাঠ্যসূচিকে জাতীয় লক্ষ্য নির্ধারণের অনুকূলে বিন্যস্ত করতে হবে। সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টির সিলেবাস প্রণয়ন করতে হবে। জাতীয় চেতনা বিরোধী প্রবন্ধকার/ সাহিত্যিকদের লেখা পাঠ্যসূচি থেকে বাদ দিতে হবে। ধর্মীয় ও জাগতিক শিক্ষার সমন্বয় সাধন করে একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থার প্রচলন করতে হবে। কর্মহীন ধর্ম নয়- কর্মের মাধ্যমে ধর্ম পালনের শিক্ষা প্রদান করতে হবে।
৩. জাতীয় সংস্কৃতি নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন- আমার বিশ্বাস, বর্তমান বাংলাদেশে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের চেয়ে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্ব অনেক বেশি। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয় জাতির মানস গঠন করতে পারে, দেশপ্রেমিক ও আত্মমর্যাদা সম্পন্ন নাগরিক সৃষ্টিতে প্রধান ভূমিকা পালন করতে পারে। আমাদের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও স্বাতন্ত্র্য সমুন্নত রাখার লক্ষ্যে জাতীয় সংস্কৃতির রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। উক্ত রূপরেখা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সক্ষম এমন ব্যক্তিকে উক্ত মন্ত্রণালয়ের পূর্ণ মন্ত্রী পদে মনোনীত করতে হবে। সংস্কৃতির সাথে জড়িত সকল গুরুত্বপূর্ণ পদে উপযুক্ত ব্যক্তি নিয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি সকল উপজেলায় উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ‘উপজেলা সংস্কৃতি বিষয়ক কর্মকর্তা’র পদ সৃষ্টি করতে হবে।
জাতীয় সংস্কৃতির রূপরেখার অনুপস্থিতিতে বর্তমানে বিজাতীয় সংস্কৃতির আগ্রাসন চলছে। আমাদের জাতীয় নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধের বিরোধী নাটক, সিনেমা, সাহিত্য প্রচারিত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তিসমূহ জাতির মন-মানসকে কলুষিত-বিভ্রান্ত করে জাতিকে আদর্শহীন ও নিস্তেজ করছে, জাতির প্রতিরোধ ক্ষমতা ধ্বংস করছে।


পরিশেষে আমি আমাদের জাতির বর্তমান কর্ণধারগণের নিকট এই সতর্ক বার্তা পৌঁছাতে চাই যে, উন্নত তথ্য প্রযুক্তির কল্যাণে ২৮ কোটি চক্ষু আপনাদের কর্মকাণ্ড প্রত্যক্ষ করছে। জনগণ দেখছে, আপনারা জাতীয় স্বার্থকে বাদ দিয়ে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ নিয়ে কাড়াকাড়ি করছেন। আপনারা জনগণের সমস্যার কথা জাতীয় সংসদে তুলে ধরার জন্য জনগণের নিকট ভোটভিক্ষা চেয়েছেন, জনগণ আপনাদেরকে সংসদে যাওয়ার টিকেট দিয়েছে। আপনারা উক্ত টিকেট লাভ করে সংসদে না গিয়ে জনগণের গাড়ি ভাংচুর করছেন, জাতীয় স্বার্থে আপনারা ঐকমত্যে পৌঁছতে পারেন না, অথচ আপনাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির বিলের ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেন, জনগণের টাকায় বিলাসবহুল শুল্কমুক্ত পোরশে, বিএমডব্লিউ, ক্যাডিলাক, ল্যাক্সাস গাড়ি প্রাপ্তির ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছেন। ব্যক্তিস্বার্থে রাজাকার-মুক্তিযোদ্ধা এক হতে পারেন- জাতীয় স্বার্থের প্রশ্নে আপনারা দুই দলের দুই মুক্তিযোদ্ধাও এক হতে পারেন না। জাতীয় স্বার্থেই আপনাদেরকে এমপি নির্বাচিত করা হয়েছিল। অচিরেই আপনারা আপনাদের এ সকল কর্মকাণ্ডের উপযুক্ত প্রতিফল ভোগ করবেন।


সম্পাদকীয়ঃ মে ২০১২(মাসিক ইতিহাস অন্বেষা)

Saturday, March 31, 2012

কূটনীতিক খালাফ আল আলী হত্যাকাণ্ড- এবং বাংলাদেশে ন্যায় বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনা...



৫ মার্চ সোমবার দিবাগত রাত ১.১৩ থেকে ১.১৫ মিনিটের  মধ্যে ঢাকাস্থ রাজকীয় সৌদি দূতাবাসের সিটিজেন্স্ এফেয়ার্স বিষয়ক কূটনীতিক খালাফ-আল-আলী নিজ বাস ভবনের ৫০ গজ অদূরে গুলিবিদ্ধ হন। প্রত্যক্ষদর্শী পর্তুগাল দূতাবাসের নিরাপত্তাকর্মী জুলফিকার আলী বলেন, তিনি রাত ১.১৫ মিনিটের সময় গুলির শব্দ শুনতে পান। শব্দ শুনে তিনি এবং অপর নিরাপত্তাকর্মী তালেব শব্দের দিকে এগিয়ে যান। তখন তারা দু’ব্যক্তিকে একটি সাদা প্রাইভেটকারযোগে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে দেখেন। জুলফিকার আলী তাৎক্ষণাৎ থানায় খবর দিলে কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশ এসে আহত ও অচেতন কূটনীতিককে নিয়ে যায়। পুলিশের মতে, কূটনীতিককে সাথে সাথে ইউনাইটেড হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তখন তাঁর বুকের বামপাশে গুলিবিদ্ধ ছিল। ভোর সাড়ে পাঁচটার মধ্যে ইউনাইটেড হাসপাতালের ডাক্তার খালাফ-আল-আলীকে মৃত ঘোষণা করেন।
উল্লেখ্য, খালাফ-আল-আলীর ফ্ল্যাটে নিরাপত্তাকর্মী তাপস রেমা জানান, আলী প্রতি রাতে জগিং করতে বের হতেন। প্রায় সময়ই তিনি সাইকেল নিয়ে বের হতেন। ঘটনার দিন তিনি ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে তার সাইকেলটি নষ্ট দেখতে পান। এজন্য তিনি নিচের নিরাপত্তাকর্মী ও কর্মচারীদেরকে বকাঝকা করে হেঁটে বেরিয়ে যান। তাঁর সাথে শুধু একটি মাম পানির বোতল ছিল। ব্যায়ামের পোশাক পরে বের হওয়ায় তিনি সাথে সেলফোন নেননি।


খালাফ-আল-আলীর মৃত্যুর ব্যাপারে পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ভিন্ন। পুলিশ বলছে তাঁরা ঘটনার পরপরই হাসপাতালে নিয়ে যায়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে তারা রাত সাড়ে তিনটায় খালাফ-আল-আলীকে গ্রহণ করেন। পুলিশ ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য কিছু বাস্তব প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। যথা-
১. পুলিশের বক্তব্য সত্য হলে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রাত দেড়টা থেকে ভোর সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত কেন খালাফ-আল-আলীর দেহ থেকে গুলি বের করেনি। এই দীর্ঘ সময়ে তারা আহতকে কি কি চিকিৎসা দিয়েছিল। অপরদিকে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য সত্য হলে পুলিশ রাত সোয়া একটা থেকে সাড়ে তিনটা পর্যন্ত খালাফ-আল-আলীকে কোথায় রেখেছিল? তদন্তকারীরা কি এজন্য পুলিশ বা হাসপাতালকে জবাবদিহি করেছিল। এরূপ দায়িত্বজ্ঞানহীন অমানবিক কাজের জন্য পুলিশ বা কোনো ডাক্তারের বিরুদ্ধে কি কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে? ব্যবস্থা নেয়া না হলে কি বুঝতে হবে সরিষার মধ্যে ভূত ছিল- নাকি এদেশের সাধারণ নাগরিকদের মতো খালাফ-আল-আলী পুলিশ ও ডাক্তারদের অবহেলা ও অবজ্ঞার শিকার হয়েছিল?
২. খালাফ-আল-আলী ফ্ল্যাট থেকে নিচে নেমে তাঁর সাইকেল নষ্ট হওয়ার কারণ জানতে কর্মচারীদেরকে বকাঝকা করেছিল। এতে বুঝা যায় তাঁর জানামতে তাঁর সাইকেলটি ভালো অবস্থায় ছিল কিন্তু কেউ না কেউ তাঁর সাইকেলটি অসাবধানতাবশত অথবা পরিকল্পিতভাবে নষ্ট করে দিয়েছিল। এ বিষয়টি তদন্ত হয়েছে কিনা?
৩. তদন্তকারীরা তাপস রেমা সম্পর্কে খোঁজ খবর নিয়েছে কি? যেমন তার জাতীয়তা, বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানা, তার সাথে কোন কোন মহলের যোগাযোগ রয়েছে ইত্যাদি ইত্যাদি।
৪. গুলিবিদ্ধের ঘটনা রাত সোয়া একটা হলেও সিআইডির ক্রাইম সিনের কর্মকর্তারা পরদিন দুপুরে ঘটনার আলামত সংগ্রহে ঘটনাস্থলে যায়। এই বিষয়ে সিআইডির ক্রাইস সিনের কর্মকর্তা জানান, পুলিশ আমাদেরকে ঘটনার কথা সাথে সাথে জানালে আমরা তাৎক্ষণাৎ আসতাম। কিন্তু আমাদেরকে আজকে জানিয়েছে বিধায় আমরা আজকে আলামত সংগ্রহে এসেছি। দীর্ঘ ১১ ঘণ্টা পর ঘটনাস্থলে আসায় অনেক আলামত নষ্ট হয়ে গেছে। সিআইডি ঘটনাস্থলে রক্তের দাগ বা গুলির খোসা পায়নি। বিষয়টি সন্দেহজনক নাকি রহস্যজনক তদন্ত করে দেখা দরকার। কেননা দীর্ঘ ১১ ঘণ্টায় কেউ আলামত সরিয়ে ফেলেনি এর নিশ্চয়তা কোথায়?
৫. খালাফ হত্যার আগে গোয়েন্দা সংস্থা কূটনৈতিক জোন নিয়ে বিভিন্ন আশঙ্কা প্রকাশ করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দিয়েছিল। উক্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল- “একটি মহল সরকারকে বেকাদায় ফেলতে কূটনীতিক এলাকাকে টার্গেট করতে পারে।” ঘটনার তদন্তকারীরা উক্ত বিশেষ মহলকে তদন্তের অন্তর্ভুক্ত করেছে কিনা?
৬. কূটনীতিক এলাকার নিরাত্তাহীনতার কথা আগেই জানিয়েছিল ৪২টি দূতাবাস। সরকার বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তবুও এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়নি কেন? পুলিশের মতে, গুলশান এলাকায় সন্ত্রাসী সংখ্যা ৯২ জন; তন্মধ্যে ১২ জন বর্তমানে কারাগারে রয়েছে। বাকি ৮০ জন সন্ত্রাসীর ব্যাপারে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন? উক্ত ৮০ জন কি সরকারি দলের প্রভাবশালী সন্ত্রাসী?


খালাফ-আল-আলী হত্যার সম্ভাব্য কারণ-
তদন্তকারীরা সম্ভাব্য কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে- ছিনতাইকারী, নিজেদের মধ্যে মতবিরোধ ও জনশক্তি রফতানিতে বাধা সৃষ্টির লক্ষ্যে সৌদি-বাংলাদেশ বিরোধ সৃষ্টি এবং বাংলাদেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করা। বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়। 
(ক) ছিনতাইকারী : ব্যায়ামের ড্রেস পরা ও মাম পানির বোতল হাতে পায়চারীরত ব্যক্তির নিকট যে কিছু পাওয়া যাবে না এটা একজন বোকা ব্যক্তিও বুঝে। সুতরাং এরূপ একজন কপর্দকশূন্য ব্যক্তিকে কোন ছিনতাইকারী টার্গেট করতে পারে না।
(খ) নিজেদের মধ্যে বিরোধ : খালাফ-আল-আলীর ভাই ও সৌদি নাগরিকদের মতে, খালাফ-আল-আলীর কোনো শত্রু ছিল না। তিনি যদি সৌদি সরকারের নিকট বিতর্কিত ব্যক্তি হতেন তবে তাঁর অতীত ক্যারিয়ারে তার ছাপ থাকত এবং তাঁর চাকরি অব্যাহত থাকত না। পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে আমরা জানতে পেরেছি চলতি মাসেই তিনি রাজকীয় সৌদি দূতাবাস জর্দানে যোগ দেয়ার কথা চূড়ান্ত হয়েছিল। এমতাবস্থায় কারো সাথে ব্যক্তিগত বিরোধ থাকলে সে বিদায়ী ব্যক্তির ভালোয় ভালোয় প্রস্থানই কামনা করবে।
(গ) জনশক্তি রফতানিতে বাধা সৃষ্টি করা : হত্যাকাণ্ডের মাত্র কয়েকদিন পূর্বে আমাদের প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী সৌদি আরব সফরে গিয়ে ফিরে এসে আশান্বিত ফলাফল জানিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খুব শীঘ্রই একটি সৌদি প্রতিনিধি দল জনশক্তি রপ্তানী বিষয়ক বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা করতে বাংলাদেশ সফরে আসবেন। এ খবরে সরকার এবং দেশের জনগণ আশান্বিত হয়েছিল দীর্ঘদিন পর বাংলাদেশীদের জন্য সৌদি শ্রমবাজারের দরজা উন্মুক্ত হবে। এরূপ প্রেক্ষাপটে কূটনীতিক খুন বাংলাদেশের বৃহত্তম শ্রমবাজার ধ্বংসের একটি নীলনকশা হওয়াটা অমূলক নয়।


উল্লেখ্য, ১/১১-এর অবৈধ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমল থেকে রাজনৈতিক কারণে সৌদি আরবের সাথে বাংলাদেশের দূরত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে এবং পরবর্তীতে ১/১১-এর ফসল বর্তমান সরকারের ইসলাম ও মুসলিমবিরোধী কার্যকলাপ, আলেম-উলামাবিরোধী দমনাভিযানের কারণে সৌদি আরবের শ্রমবাজার দীর্ঘদিন বাংলাদেশের জন্যে বন্ধ রয়েছে। এ সুযোগে প্রতিবেশী ভারত বাংলাদেশী শ্রমিকদের শূন্যস্থান পূরণে আশাতীত সাফল্য অর্জন করেছে। ৫ বছর পূর্বে মক্কার বৃহত্তম শ্রমিক কলোনীর প্রায় ৬ হাজার অধিবাসীর সবাই ছিল বাংলাদেশী, কিন্তু বর্তমানে উক্ত শ্রমিক কলোনীর অর্ধেক বাসিন্দাই হলো ভারতীয়। এতদসত্ত্বেও উক্ত কলোনী সংশ্লিষ্ট দোকানপাট ব্যবসা-বাণিজ্য এখনও বাংলাদেশীদের নিয়ন্ত্রণে। খালাফ-আল-আলী হত্যাকাণ্ডের পর উক্ত কলোনীর ভারতীয়রা তুচ্ছ কারণে বাংলাদেশীদের উপর হামলা করে তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য ছিনিয়ে নেয়ার চেষ্টা করে। আমি নিজে গত নভেম্বর মাস মক্কায় অবস্থানে করে বাংলাদেশীদের নিকট শুনেছি কিভাবে ভারতীয়রা নিজেদের অপকর্ম বাংলাদেশীদের ঘাড়ে চাপিয়ে বাংলাদেশীদেরকে সৌদি আরব ত্যাগে বাধ্য করছে। এমতাবস্থায় খালাফ আলী হত্যাকাণ্ডকে বাংলাদেশের শ্রমবাজার ধ্বংসের ভারতীয় চক্রান্ত মনে করাটা অমূলক নয়। এতদসত্ত্বে বিষয়টির ব্যাপারে আরও বৃহত্তর পর্যালোচনা দাবি রাখে। ঘটনাটির আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট আরও ব্যাপক হওয়াটা বিচিত্র নয়।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বব্যাপী কূটনৈতিক হত্যাপ্রচেষ্টা ও দোষারোপ
১. ২০১১ সালের মে মাসে পাকিস্তানের করাচী শহরে ২ জন বন্দুকধারী একজন সৌদি কূটনীতিককে হত্যা করেছিল।
২. ২০১১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত সৌদি রাষ্ট্রদূতকে হত্যার ব্যর্থ চেষ্টার দায়ে যুক্তরাষ্ট্র ইরানকে অভিযুক্ত করেছে। 
৩. চলতি বছর ভারত, থাইল্যান্ড ও জর্জিয়ায় কর্মরত ইসরাইলী কূটনীতিকদের উপর হামলার চেষ্টা চালানোর জন্য ইসরাইল ইরানকে অভিযুক্ত করেছে। অথচ ইসরাইল অনেক ইরানী বিজ্ঞানীকে ইতোমধ্যে হত্যা করেছে।
৪. মার্চ-২০১২তে ঢাকায় সৌদি কূটনীতিক খালাফ-আল-আলীকে হত্যা করা হয়।


উপরোক্ত ৪টি তথ্যকে আন্তর্জাতিকভাবে বিশ্লেষণ করতে হলে আমাদেরকে আমেরিকা ও ইসরাইলের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য এবং তাদের দোসর ইইউ ও ভারতের লক্ষ্য উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে হবে। যায়নবাদী ইসরাইলের নেতৃত্বাধীন উক্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর থেকে মুসলিম বিশ্বকে টুকরো করা, গ্রাস করা ও লুণ্ঠন করাকে নিজেদের প্রধান কর্মসূচিতে পরিণত করেছে। এ লক্ষ্য অর্জনে তারা মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে বিবাদ-বিসংবাদ, যুদ্ধ ছড়িয়ে দিতে তৎপর রয়েছে। মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু দ্বন্দ্ব-সংঘাত, শাসক-শাসিতের দ্বন্দ্ব-সংঘাত লাগিয়ে গৃহযুদ্ধ লাগানোর চেষ্টা করছে। যাতে আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বে ও পারস্পরিক দ্বন্দ্বে মুসলিম বিশ্ব শক্তিহীন হয়ে সাম্রাজ্যবাদী শকুনের খাদ্যে পরিণত হয়। এ সংক্রান্ত কয়েকটি তথ্য নিম্নরূপ-
(১) মার্কিন সরকারের পরামর্শদাতা রিচার্ড পার্ল, ডগলাস ফেইথ, ডেভিড ওরমসহ কয়েকজন ১৯৯৬ সালে “A clean break : A New strategy for securing the Realms” শিরোনামে একটি প্ল্যান প্রস্তুত করেন, যাতে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইরানের সরকার পরিবর্তনের নীলনকশা উপস্থাপন করা হয়।
(২) মার্কিন সামরিক জার্নালে প্রকাশিত মার্কিন কর্নেল রাল্ফ পিটার অংকিত Broader Middle East  প্ল্যান-এ দেখা যায় যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা কিভাবে সৌদি আরবসহ প্রায় প্রতিটি মুসলিম দেশকে টুকরো করে শক্তিহীন করে গ্রাস করবে। সাম্রাজ্যবাদীরা বাংলাদেশকেও আপাতত তিন টুকরো করার প্ল্যান গ্রহণ করেছে। এ প্লানের সারকথা হলো- (১) তিন পার্বত্য জেলা, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারকে বাংলাদেশ থেকে আলাদা করে একটি খ্রিস্টান রাজ্য বানানো। (২) খুলনাসহ সাবেক ৬টি জেলা নিয়ে হিন্দুরাষ্ট্র বঙ্গভূমি। (৩) ঢাকা কেন্দ্রীক অবশিষ্ট অংশ নিয়ে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক হত্যার উক্ত ৪টি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা হত্যাকাণ্ডের মোটিভ ও হত্যাকারীদের সম্পর্কে মোটামুটি ধারণা লাভ করতে পারি।
১. করাচী হত্যাকাণ্ড : ২ জন আঁততায়ী এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয়। সৌদি আরবের সাথে পাকিস্তানে দূরত্ব বৃদ্ধি পেলে লাভবান হবে তাদের শত্রুরা। কেননা সৌদি আরব পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ ও পরীক্ষিত বন্ধু। সৌদি আরবে রয়েছে পাকিস্তানের বিশাল শ্রমবাজার। উক্ত শ্রমবাজার থেকে পাকিস্তান বঞ্চিত হলে পাকিস্তানের ভঙ্গুর অর্থনীতি ধ্বংস হবে এবং সাম্রাজ্যবাদীরা পাকিস্তানের উপর নিজেদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিতে পারবে। পাকিস্তানের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ভারতকে দক্ষিণ এশিয়ার অপ্রতিদ্বন্দ্বী দেশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সহজ হবে।
২. যুক্তরাষ্ট্রে হত্যা প্রচেষ্টা : রিচার্ড পার্লের উক্ত প্ল্যানে আমরা দেখতে পেয়েছি ইরান যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের টার্গেটকৃত দেশ। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানে হামলার প্রকাশ্য প্রস্তুতি নিচ্ছে ও হুমকি দিচ্ছে। ইরানকে পরাজিত করতে হলে সৌদি আরবের সাহায্য অতীব প্রয়োজন। এমতাবস্থায় সৌদি কূটনীতিক হত্যা চেষ্টায় ইরানের ঘাড়ে দোষ চাপালে ইরান-সৌদি বিরোধ আরও তীব্র হবে যা সাম্রাজ্যবাদীদের কাম্য।
৩. ইসরাইলী কূটনীতিক হত্যাপ্রচেষ্টা : যেসব দেশের সাথে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে সেসব দেশেই ঘটনাগুলো সংঘটিত হওয়ার কথা বলা হচ্ছে। আর ঘটনার পরই ইরানকে দোষারোপ করা হচ্ছে। যায়নবাদী ইসরাইলের অপকৌশল সম্পর্কে যারা ওয়াকিবহাল। তাদের মতে, ইসরাইল ঘটনাস্থলের বন্ধুরাষ্ট্রের দ্বারা তদন্ত করে ইরানের বিরুদ্ধে দলিল প্রস্তুত করে ইরানে হামলার একটি যুৎসই অজুহাত খুঁজে পাবে এবং ইরানী বিজ্ঞানী হত্যার দায় থেকে নিজেকে মুক্ত করবে।
৪. ঢাকার হত্যাকাণ্ড : খালাফ-আল-আলীর হত্যা হত্যাকাণ্ডকে আমি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বাংলাদেশবিরোধী ষড়যন্ত্রের অংশ বলে মনে করি। কেননা এই হত্যাকাণ্ড বাংলাদেশের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে বাংলাদেশ-সৌদি আরব সম্পর্ককে ক্ষতিগ্রস্ত করা হবে। সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলো থেকে বাংলাদেশী শ্রমিকদের বিতাড়ন করা গেলে বাংলাদেশের ভঙ্গুর অর্থনীতি ধ্বংস হয়ে যাবে। অভাব, দুর্ভিক্ষ ও রাজনৈতিক হানাহানি দেশকে গৃহযুদ্ধের দিকে নিয়ে যাবে এবং উক্ত গৃহযুদ্ধ বন্ধে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি শান্তিরক্ষী নিয়ে সদলবলে হাজির হবে। ভবিষ্যতে চীন-ভারত-মার্কিন যুদ্ধে বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করা সহজ হবে।


বাংলাদেশে ন্যায় বিচার প্রাপ্তির সম্ভাবনা
বাংলাদেশে এখন মৎস্য ন্যায় অবস্থা। এখানে এখন রাষ্ট্র-সরকার ও সরকারি দল একাকার। দেশের সকল সুযোগ-সুবিধা আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, শাসন বিভাগ কেবল মাত্র সরকারি দলের সেবায় নিয়োজিত। সরকার জনকল্যাণের পরিবর্তে প্রভুরাষ্ট্রের কল্যাণে সদা-সর্বদা সজাগ ও সতর্ক। কেননা প্রভুরাষ্ট্রসমূহ ১/১১-এর ধারাবাহিকতায় বর্তমান সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। সরকার প্রধানকে বিপদ থেকে বাঁচাতে সামরিক হেলিকপ্টার পাঠানোসহ সম্ভাব্য সকল সাহায্য প্রদানের প্রকাশ্য ঘোষণা দিচ্ছে। ফলে সরকার দেশ-জনগণের কল্যাণের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজ দল ও প্রভুরাষ্ট্রের কল্যাণ কামনাকে নিজের পরবর্তী মেয়াদের ক্ষমতাসীন হওয়ার প্রধান অবলম্বন মনে করছে। এমতাবস্থায় রাষ্ট্রের সকল বিভাগ এখন বিশৃঙ্খল ও বেসামাল হয়ে রাষ্ট্রকে অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত করেছে। নিজ দল,  সরকারের মন্ত্রী-এমপি অথবা প্রভুরাষ্ট্রের স্বার্থ পরিপন্থী কোনো তদন্ত কার্যক্রম এদেশে বাধাহীনভাবে চলতে পারে না, তদন্ত প্রতিবেদন আলোর মুখ দেখে না। কয়েকটি তদন্ত ও তদন্ত প্রতিবেদন সম্পর্কে আলোচনা করলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে।
১. বিডিআর বিদ্রোহ ও সেনা হত্যাকাণ্ড: ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ তারিখে ঢাকার পিলখানার বিডিআর হেডকোয়ার্টারে সংঘটিত এ ঘটনায় ৫৭ জন সেনাকর্মকর্তাসহ ৭৩ ব্যক্তি নিহত হন। বাংলাদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীর অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হয়। সমকালীন পত্র-পত্রিকায় এতদসংক্রান্ত যে সব তথ্য প্রকাশিত হয়েছে তা ছিল নিম্নরূপ :
ক. বিডিআর বিদ্রোহের উস্কানিদাতা ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সাথে বর্তমান সরকারের ৮ জন মন্ত্রী এমপি জড়িত ছিল। যাদের মধ্যে তিনজন প্রধানমন্ত্রীর নিকটাত্মীয়।
খ. মুখোশ পরিহিত বহিরাগতের নৃশংস হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করে যারা বিডিআরের সদস্য ছিল না। (The Daily Star, Dhaka, 5 March, 2009)
গ. ১২ জন ভারতীয় ব্ল্যাক ক্যাট কমান্ডো হত্যাকাণ্ডে অংশ নেয় এবং কাজ শেষে নিরাপদে ভারত প্রত্যাবর্তন করে। (দৈনিক সংগ্রাম, ঢাকা, ১৬ মার্চ, ২০০৯)। 
ঘ. ২ মার্চ ২০০৯ তারিখের হিন্দুস্থান টাইমস লিখেছে, “বাংলাদেশ সরকারকে সাহায্য করার জন্য ভারত আসামের জোড়াহাট বিমানঘাঁটিতে জঙ্গীবিমান মোতায়েন রেখেছিল এবং কলিকাতার নিকটস্থ কালাইকুন্তায় এক ব্রিগেড প্যারাসুট বাহিনী প্রস্তুত রেখেছিল।


উক্ত দেশবিরোধী হত্যাকাণ্ডের তদন্তের জন্য তিনটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছিল। প্রথমটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক, দ্বিতীয়টি সেনাবাহিনী কর্তৃক, তৃতীয়টি সিআইডি কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি। পত্রিকান্তরে আমরা জানতে পেরেছি, সরকার তদন্ত কমিটির ক্ষমতার সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছিল যাতে ঘটনার মদদদাতা, উস্কানিদাতা ও বহিঃশক্তির হস্তক্ষেপের ব্যাপারে তদন্ত করা না যায়। সেনা তদন্ত দলের সদস্যরা সরকারি শর্তাবলী মান্য করার ব্যাপারে ১০-০৫-২০০৯ তারিখে একটি হলফনামায় স্বাক্ষর করতে বাধ্য হয়। এতদসত্ত্বেও সেনা তদন্তদলের তদন্ত রিপোর্ট, সিআইডির তদন্ত রিপোর্ট আলোর মুখ দেখেনি। শুধুমাত্র স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটির ৩০৯ পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদনের ৭টি পৃষ্ঠা প্রকাশ করা হয়েছে।
২. শেয়ার বাজার কেলেঙ্কারি : ১৯৯৬-২০০১ মেয়াদের আওয়ামী লীগ সরকার শেয়ার বাজার লুট করেছিল। তখনকার তথ্য যা পাওয়া গিয়েছিল তা হলো- সরকারের শীর্ষ ব্যক্তির ঘনিষ্ঠ আত্মীয় ও ৩ জন মাড়োয়ারী ব্যবসায়ী উক্ত শেয়ার কেলেঙ্কারির হোতা ছিল। ২০১১ সালের শেয়ার কেলেঙ্কারিতে ৩৩ লাখ বিনিয়োগকারী সর্বস্বান্ত হয় এবং ২ জন ইতোমধ্যে আত্মহত্যা করেছে। এ ঘটনার তদন্ত রিপোর্ট ও আলোর মুখ দেখেনি। তদন্ত রিপোর্টে মূল অপরাধীদের চিহ্নিত করা হলেও তারা সরকারের নিজস্ব লোক হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। 
সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ড : মাছরাঙ্গা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক সাগর সরোয়ার ও এটিএন বাংলার সিনিয়র রিপোর্টার মেহেরুন রুনী নিজেদের বাসায় খুন হলেও এ খুনের ঘটনার তদন্তে কোনো অগ্রগতি নেই। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও বিচার বিভাগ অযাচিতভাবে এ ঘটনায় নাক গলিয়েছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, সরকার প্রধানের স্বার্থ অথবা সরকারের প্রভু রাষ্ট্রের স্বার্থ এখানে জড়িত আছে। এ ঘটনার ব্যাপারে ২ জন রাজনীতিকের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য-
(ক) ২৭-২-২০১২ তারিখে লালমনিরহাটের বিশাল জনসভায় বিএনপি সভানেত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, “সাগর-রুনীর নিকট সরকারের দুর্নীতির গোপন তথ্য থাকায় উক্ত তথ্য আদায়ে সাগর-রুনীকে খুন করা হয়। হত্যার পর তাদের বাসা থেকে ল্যাপটপ ও মোবাইল ছাড়া আর কোনো বস্তু চুরি হয়নি। খুনীরা সরকারের ঘনিষ্ঠ লোক হওয়ায় তাদেরকে বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়েছে।”
(খ) বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী প্রেসক্লাবের সেমিনারে বলেছেন, সাগর-রুনী হত্যাকারীরা প্রধানমন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজন হওয়ায় তদন্তের কোনো অগ্রগতি হচ্ছে না।
৪. ১২ ও ১৪ মার্চ ২০১২-এর জনসভা : ৪ দলীয় জোট ঘোষিত ১২ মার্চের জনসভাকে বানচাল করতে সরকার তার সকল প্রশাসনিক ক্ষমতা ও বাহিনীসমূহকে ব্যবহার করেছে। সারাদেশের যোগাযোগ ব্যবস্থা অঘোষিতভাবে তিন দিন বন্ধ করা হয়েছিল। আবাসিক হোটেল, মোটেল, কমিউনিটি সেন্টার ও রেস্টুরেন্টগুলো বন্ধ রাখতে বাধ্য করা হয়। সরকারের নিকট ন্যায় বিচার চেয়ে লাভ হয়নি এবং নাগরিক অধিকার রক্ষায় হাইকোর্ট রিট করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যায়নি।
পক্ষান্তরে ১৪ মার্চের সরকারি জোটের জনসভা সফল করার জন্য সরকার প্রশাসন ও পুলিশকে প্রকাশ্যে ব্যবহার করেছে। সরকারি কর্মচারীরা প্রকাশ্যে ব্যানার নিয়ে উক্ত জনসভায় যোগদান করেছে। এ প্রসঙ্গে ১৫ মার্চের দৈনিক নয়া দিগন্ত শিরোনাম করেছে-
“বিরোধী দলের জন্যে রায়টকার-জলকামান সরকারি দলের জন্য বিশুদ্ধ পানি আর মোবাইল টয়লেট।” এতে আরও বলা হয়েছে, সরকারি দলের জনসভায় যোগ দিতে আসা কর্মীদের বাস-ট্রেনের ভাড়া দিতে হয়নি, পেট্রোল পাম্প ও সিএনজি স্টেশনের তেল-গ্যাস ছিল ফ্রী। 


বর্তমান সরকারের এরূপ অপকর্ম-অবিচারের কথা লিখে শেষ করা যাবে না। এরূপ অন্যায়-অবিচার ও জুলুমের দেশে সৌদি কূটনীতিক খালাফ-আল-আলী হত্যাকাণ্ডের তদন্ত যে আলোর মুখ দেখবে না, খুনীরা যে চিহ্নিত হবে না, শাস্তি পাবে না তা নিশ্চিত করে বলা যায়। কেননা খালাফ হত্যাকাণ্ডে সরকারি দল, সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি অথবা সরকারের কোনো প্রভুদেশ জড়িত থাকলে হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কোনোদিন আলোর মুখ দেখবে না। আমার মনে হচ্ছে সাগর-রুনী হত্যাকাণ্ডের মতোই খালাফ-আল-আলীর হত্যাকাণ্ডের তদন্ত প্রথমে পুলিশ করবে, পুলিশ ব্যর্থ হবে এবং তা ডিবিতে হস্তান্তরিত হবে, কিছুদিন পর ডিবি ব্যর্থ হবে এবং তদন্তভার সিআইডির কাছে ন্যস্ত হবে অতঃপর হিমাগারে চলে যাবে।

বাংলাদেশের করণীয় : বাংলাদেশ সরকার যদি নিজ দেশের স্বার্থকে প্রাধান্য দেয় তবে তাকে অবশ্যই দেশি-বিদেশি গোয়েন্দা সংস্থার সাহায্য নিয়ে দ্রুততম সময়ে বন্ধুপ্রতিম সৌদি কূটনীতিক হত্যারহস্যের সমাধান করতে হবে। হত্যাকারী চিহ্নিত করতে হবে। বিদেশি প্রভুদের নাম উচ্চারণ করতে ভয় পেলে প্রকৃত সত্যটি গোপনে সৌদি আরবকে জানিয়ে দিতে হবে। যাতে সৌদি আরব যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারে। সরকারকে মনে রাখতে হবে, সরকারের ভ্রান্তনীতির কবলে পতিত হয়ে দেশের অর্থনীতি ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় যদি সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের রেমিটেন্সের উৎস বন্ধ হয়ে যায় তবে দেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে জানাচ্ছি যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব মতে গত অর্থবছরে বাংলাদেশে আগত রেমিটেন্সের পরিমাণ ছিল ১১৬০ কোটি ডলার, তন্মধ্যে সৌদি আরব থেকে এসেছে ৩৬০ কোটি ডলার, মধ্যপ্রাচ্যের জিসিসি দেশগুলো থেকে এসেছে ৩৮৬ কোটি ডলার এবং বাকি বিশ্ব থেকে এসেছে মাত্র ৪১৪ কোটি ডলার। উল্লেখ্য, ১৯৯০ সালে থাইল্যান্ডের রাজধানী ব্যাংককে রাজকীয় সৌদি দূতাবাসের একজন কর্মচারী নিহত হওয়ার প্রতিক্রিয়ায় সৌদি আরব সকল থাই শ্রমিককে থাইল্যান্ডে ফেরত পাঠিয়েছিল।


সৌদি আরবের করণীয় : যে কোনো সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে সৌদি আরবকে নিম্নের কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় আনতে অনুরোধ করব।
১. বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ সৌদি আরবকে নিজেদের পুণ্যভূমি মনে করে এবং সৌদি আরবের ভালো খবরে খুশি হয়, মন্দ খবরে দুঃখ পায়। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীদের চক্রান্তে বর্তমান বাংলাদেশে ইসলামপ্রিয়- সৌদি আরবপ্রিয় জনগণ শক্তিহীন ও অসহায়। সুতরাং থাইল্যান্ডের ন্যায় আচরণ করলে এদেশবাসী অতিশয় দুঃখকষ্টে নিমজ্জিত হবে।
২. বাংলাদেশের বর্তমান সরকার সংবিধান থেকে আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস মুছে দিয়েছে, তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ইহুদী-নাছারা ও মুশরিকদেরকে নিজেদের বন্ধু ও আত্মীয় হিসেবে গ্রহণ করেছে। জনগণ নয়- ইসলামবিরোধী শক্তিই বর্তমান সরকারের প্রধান পৃষ্ঠপোষক। এমতাবস্থায় এই সরকারের সদিচ্ছার উপর ভরসা না করে সৌদি আরবকে নিজেদের গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা অথবা বন্ধুপ্রতীম গোয়েন্দা সংস্থা দ্বারা প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করার প্রচেষ্টা গ্রহণ করতে হবে। প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩. আমার ব্যক্তিগত ধারণা হলো- বাংলাদেশের বর্তমান সরকার বা সরকারি দল এই অপকর্মের সাথে জড়িত নয়। কিন্তু তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সহযোগিতায় ক্ষমতাসীন হওয়ায় প্রভুদেশের বিরুদ্ধে কোনো কিছু করার ব্যাপারে ক্ষমতাহীন ও ভীত।
৪. কূটনীতিক খালাফ-আল-আলী হত্যাকাণ্ডকে বিচ্ছিন্নভাবে চিন্তা না করে পাকিস্তানে সৌদি কূটনীতিক হত্যা, যুক্তরাষ্ট্রে সৌদি কূটনীতিক হত্যাপ্রচেষ্টা ও দোষারোপ, ভারত-থাইল্যান্ড ও জর্জিয়ায় ইসরাইলী কূটনীতিক হত্যাপ্রচেষ্টা ও দোষারোপের আলোকে বিচার করলে বিশ্বরাজনীতির আলোকে সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া সহজ হবে। এর মাধ্যমে দোষী ব্যক্তি বা শক্তিকে চিহ্নিত করে ভবিষ্যত করণীয় নির্ধারণ করা সহজ হবে।
৫. প্রাপ্ত তথ্যমতে খালাফ-আল-আলী চলতি মাসেই তাঁর নতুন কর্মস্থল জর্ডানের রাজধানী আম্মানে যোগ দেয়ার কথা ছিল। তাঁর জর্ডানে যোগ দেয়ার ব্যাপারে ইসরাইল বা অন্য কোনো শক্তির স্বার্থ জড়িয়ে আছে কিনা তাও খতিয়ে দেখতে হবে। 
৬. বাংলাদেশ এখন সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অভয়ারণ্য। তাঁবেদার সরকার রক্ষার নামে, দূতাবাস পাহারার অজুহাতে এবং প্রশিক্ষণ প্রদানের বাহানায় একাধিক সাম্রাজ্যবাদী দেশের সৈন্য ও বিশেষ বাহিনী এদেশে অবস্থান করার কথা পত্র-পত্রিকার মাধ্যমে জানা গেছে। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির স্বার্থে যে কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হতে পারে।
পরিশেষে মরহুম খালাফ-আল-আলীর রুহের মাগফিরাত কামনা করছি এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করছি।


২৮ মার্চ ২০১২  
সম্পাদকীয়ঃ মাসিক  ইতিহাস-অন্বেষা, এপ্রিল ২০১২
প্রবন্ধকার : সম্পাদক, ইতিহাস-অন্বেষা

Monday, March 12, 2012

এশিয়াকেই বিশ্বের নেতৃত্ব প্রদানে এগিয়ে আসতে হবে





স্মরণাতীতকাল থেকে এশিয়া পৃথিবীকে নেতৃত্ব দিয়েছে। পৃথিবীর সকল প্রাচীন সভ্যতা, সকল ধর্মের জন্মস্থান ও বিকাশের স্থান এশিয়া। এ জন্যই সকল ধর্মের মৌলিক প্রেরণা রয়েছে এশিয়ায়, অন্য কোনো মহাদেশে নয়। অন্যান্য মহাদেশ এশীয় ধর্মের অনুসারী। কিন্তু ধর্মের আবির্ভাব ও বিকাশ এশিয়ায় হওয়ায় ধর্ম, মানবতা, মানবিক সভ্যতার তীর্থস্থান এশিয়া। অন্যান্য মহাদেশে এশীয় ধর্ম পৌঁছতে দীর্ঘ সময় লেগেছে, উক্ত দীর্ঘ সময়ে বেশিরভাগ ধর্মই বিকৃত হয়ে অন্যান্য মহাদেশে পৌঁছেছে। ফলে খাঁটি ধর্ম, মানবসভ্যতা, মানবিকতা সভ্যতা-ভব্যতার মৌলিক স্বাদ অপরাপর মহাদেশবাসীরা আস্বাদন করতে পারেনি। একারণেই মৌলিক মানবিক গুণাবলীসমূহ অপরাপর মহাদেশে খুব কমই দৃষ্টিগোচর হয়।স্পেন ও ইউরোপের আরো কিছু কিছু অঞ্চলে মুসলমান শাসনের ফলে ইউরোপ জেগে ওঠে এবং জ্ঞান-বিজ্ঞানে একসময় মুসলমানদেরকে ছাড়িয়ে যায়। একপর্যায়ে ইউরোপীয়রা পৃথিবীর দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং ছলে-বলে- কৌশলে এশীয়দের মধ্যে অনুপ্রবেশ করে এবং এশিয়ার দেশে দেশে অর্থ ও ক্ষমতালোভী একশ্রেণীর মানুষের সহযোগিতায় কালক্রমে এশিয়া ও অপরাপর মহাদেশে নিজেরা একাধিপত্য কায়েম করে। উন্নত প্রযুক্তির অধিকারী হয়ে তারা মানবিক সভ্যতার স্থলে যান্ত্রিক ও অমানবিক সভ্যতা প্রতিষ্ঠা করে। লুণ্ঠন ও নৃশংসতাই ইউরোপীয় সভ্যতার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত হয়। সততা, ন্যায়পরায়ণতা, শালীনতা, সভ্যতা-ভব্যতার কবর রচিত হয়। তাদের দস্যুতা ও অমানবিকতা বিশ্বের প্রতিটি নিভৃত কোনের জনগোষ্ঠীকে বর্তমানে সীমাহীন দুর্ভোগে পতিত করেছে। এ দুর্ভোগ থেকে বাঁচতে হলে বিশ্বের নেতৃত্বে আসীন হতে হবে এশীয়দেরকে। তবেই বিশ্বে শান্তি ফিরে আসবে।

বর্তমানে বিশ্ব নেতৃত্বের পালাবদলের সময় এসেছে। অগ্রসর চিন্তার ক্ষেত্রে এশিয়াও ক্রমান্নয়ে ইউরোপের সমকক্ষতা অর্জন করেছে। এশিয়ার সচেতন নাগরিকগণ বর্তমানে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করছে যে, এশিয়ার সকল অশান্তির মূলে রয়েছে যায়নবাদী ইসরাইল ও তার বরকন্দাজ ইউরোপ এবং আমেরিকা। যায়নবাদীদের বিশ্বশাসনের আকাংখা এবং ইউরোপ-আমেরিকার লুণ্ঠনবৃত্তিই মূলত সমগ্র পৃথিবীর অশান্তির জন্য দায়ী। যায়নবাদীদের ষড়যন্ত্রের নীলনকশা Protocol of the Elders of the Zion- এর অনুসরণে রচিত মনরো ডকট্রিন, আইসেন হাওয়ার ডকট্রিন, হিটলারের মাইন ক্যাম্প পৃথিবীকে ২টি বিশ্বযুদ্ধ এবং অসংখ্য যুদ্ধে লিপ্ত করেছে। ১৯৪৭ সালে বৃটিশরা ভারতবর্ষ থেকে বিদায় নেয়ার সময় এদেশে কিছু ভাবশিষ্য রেখে যায় যারা রচনা ও চর্চা করছে নেহেরু ডকট্রিন, গুজরাল ডকট্রিন তথা দি ইন্ডিয়া ডকট্রিন। উক্ত Protocol ও ডকট্রিনের মূল কথা হলো অপরাপর জাতিকে হত্যা-লুণ্ঠনের মাধ্যমে নিজ জাতির সমৃদ্ধি ও আধিপত্য বিস্তার করা।

সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের জন্য, পৃথিবীকে শান্তির আবাসভূমি হিসেবে পরিণত করার জন্য উপরোক্ত Protocol ও ডকট্রিনের অনুসারীদের নিকট থেকে বিশ্বের নেতৃত্ব কেড়ে নিতে হবে এবং মানবীয় সভ্যতার পাদপীঠ এশিয়াকে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে আসীন করতে হবে। এশিয়া বর্তমানে বিশ্ব নেতৃত্বের আসনে আসীন হওয়ার যোগ্যতা ও ক্ষমতা অর্জন করেছে তবে উক্ত যোগ্যতা ও সামর্থ্য সমন্বিত রূপলাভ করেনি। ক্ষমতা ও সামর্থ্যরে সমন্বয় করার জন্য প্রয়োজন একটি থিংকট্যাংক যা নিউক্লিয়াসের ন্যায় ভূমিকা রাখবে এবং লক্ষ্য পানে এগিয়ে যাবে। এশিয়ার সমর্থ্য ও করণীয় সম্পর্কে এশিয়ার দুইজন অর্থনীতিবিদের বক্তব্য নিমড়বরূপ-
আগস্ট ’০৯ সালে মালয়েশিয়ার পেনাংয়ে অনুষ্ঠিত 'Conference on the effects of
the Global economic crisis on Asia' শীর্ষক সম্মেলনে চীনের ব্যাংকিং রেগুলেটরি কমিশনের প্রধান উপদেষ্টা দাতুক সেরি আঞ্জুসের ও ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ওয়াই-ভি-রেড্ডি বলেন, “বিশ্বের মোট মজুদ মুদ্রার ৬৭%, মোট জনসংখ্যার ৫৫% এবং বিশ্ব জিএনপি (GNP)’র উল্লেখযোগ্য অংশ এশিয়ার হওয়া সত্ত্বেও বিশ্বের প্রভাবশালী ২টি ঋণসংস্থা ও সংবাদ সংস্থার মালিক পশ্চিমারা। এশিয়া যদি নেতৃত্ব দিতে চায় তবে এশীয় ঐক্য অপরিহার্য এবং এশিয়ায় একটি থিংকট্যাংক, ঋণসংস্থা ও সংবাদ সংস্থা প্রতিষ্ঠা প্রয়োজন।” সূত্র : স্টার, মালয়েশিয়া, ২৪.০৮.২০০৯)।

উপরোক্ত দুইজন অর্থনীতিবিদের প্রস্তাবিত এশীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদেরকে প্রথমে চিহ্নিত করতে হবে এশিয়ার ঐক্যের বাধাসমূহ কি কি? এশিয়ার বর্তমান যুদ্ধ-বিগ্রহ, রক্তপাত, উদ্বাস্তু সমস্যা, অমানবিক কার্যকলাপ কি এশীয়দের স্বার্থে হচ্ছে- নাকি আমেরিকা, ইসরাইল ও ইউরোপের স্বার্থে হচ্ছে? এশিয়ার ভূখণ্ডে বসবাস করে ইউরোপীয়দের স্বার্থে কাজ করছে কোন গোষ্ঠী ও কোন দেশ? এর সহজ-সরল উত্তর হলো এশিয়ার তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ গোষ্ঠীসমূহ শুধুমাত্র অর্থ ও ক্ষমতার লোভে নিজ দেশ ও জাতির সুখ-সমৃদ্ধি ইউরোপীয়দের হাতে তুলে দিচ্ছে। এশিয়ার একটি মাত্র দেশ ভারত নিজের আগ্রাসী মনোবৃত্তি চরিতার্থ করার জন্য ইউরোপীয়দের সাথে গাঁটছড়া বেঁধেছে ও ইউরোপীয় অস্ত্রে এশিয়ায় রক্তপাত ঘটাচ্ছে এবং ভয়াবহ যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে। এশিয়ার অপরাপর দেশসমূহ শুধুমাত্র আত্মরক্ষার জন্য অস্ত্র সংগ্রহ করছে এবং যুদ্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। ভারতের এরূপ অর্বাচীন কার্যকলাপ অব্যাহত থাকলে সমগ্র এশিয়ায় যুদ্ধের দাবানল ছড়িয়ে পড়বে, যাতে ভারত নিজেও পুড়ে ছাই হয়ে যাবে।

পাঠকবৃন্দ! যদি এমন হতো যে, ভারত তার আগ্রাসী পরিকল্পনা থেকে সরে এলো এবং ইউরোপ-আমেরিকা-ইসরাইলের সাথে যুক্ত হয়ে এশিয়ায় ক্ষতি করার মনোবৃত্তি পরিত্যাগ করলো। এমতবাস্থায় পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যেই আমেরিকা-ইউরোপ ও তাদের রোপিত বিষবৃক্ষ ইসরাইল এশিয়া থেকে পাততাড়ি গুটাতে বাধ্য হবে। বিশ্ববাসী ইতিমধ্যে লক্ষ্য করেছে যে, অর্থনীতি ও জনসংখ্যা স্বল্পতায় আমেরিকা-ইউরোপ পতণোন্মুখ। ইরাক-আফগানিস্তানে ইউরোপ-আমেরিকার অস্ত্রের কার্যকারিতা পরখ হয়ে গেছে। হামাস-হিজবুল্লাহর সাথে ইসরাইলি সক্ষমতার পরীক্ষা হয়ে গেছে। এমতাবস্থায় পতণোন্মুখ আমেরিকা- ইউরোপের পতন ঠেকাতে দরিদ্র কিন্তু উদীয়মান ভারত নিজের পতন ডেকে আনছে কেন? ভারত যদি যুদ্ধ প্রস্তুতির বদলে নিজ দেশের জনগণের জীবনমান উন্নত করার প্রচেষ্টায় নিজেকে নিয়োজিত করে তবে ভারতের সাধারণ জনগণ চরম দারিদ্র্যসীমা থেকে মুক্ত হয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ জীবনযাপনে সক্ষম হতো, ভারতের সকল রক্তপাত ও গৃহযুদ্ধ বন্ধ হতো এবং ভারতের প্রতিবেশীরা শান্তিতে ঘুমাতে পারতো। আমেরিকা ও ভারতের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক হালচাল সংক্ষেপে নিম্নরপঃ

মার্চ ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থ মন্ত্রণালয় কর্তৃক প্রকাশিত রিপোর্টে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় রিজার্ভ ফান্ডে দেনার পরিমাণ ১১ ট্রিলিয়ন ডলার। তন্মধ্যে বিদেশীরা পাবে ৩.৩ ট্রিলিয়ন ডলার। উক্ত দেনার পরিমাণ নিমড়বরূপ- ১. জাপান- ৬৮৬.৭ বিলিয়ন ডলার। ২. চীন- ৭৭৬.৯ বিলিয়ন ডলার। ৩. ক্যারিবীয় দেশসমূহ- ২১৩.৬ বিলিয়ন ডলার। ৪. ভারত, ফ্রান্স, মেক্সিকো, কোরিয়া, সিঙ্গাপুর, তুরস্ক- ২০৪ বিলিয়ন ডলার। ৫. মিসর, ইসরাইল, ইতালি, নেদারল্যান্ড, থাইল্যান্ড- ১২৪.৩ বিলিয়ন ডলার। ৬. আলজেরিয়া, বাহরাইন, ইকুয়েডর, গ্যাবন, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, ইরাক, কুয়েত, লিবিয়া, নাইজেরিয়া, ওমান, কাতার, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, ভেনিজুয়েলা- ১৯২ বিলিয়ন ডলার। ৭. বেলজিয়াম, কানাডা, চিলি, কলম্বিয়া, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন, সুইডেন- ৮৯.৫ বিলিয়ন ডলার। ৮. ব্রাজিল- ১২৬.৬ বিলিয়ন ডলার। ৯. লুক্সেমবার্গ- ১০৬.১ বিলিয়ন ডলার। ১০. জার্মানি- ৫৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১১. বৃটেন- ১২৮.২ বিলিয়ন ডলার। ১২. আয়ারল্যান্ড- ৫৪.৭ বিলিয়ন ডলার। ১৩. তাইওয়ান- ৭৪.৮ বিলিয়ন ডলার। ১৪. হংকং- ৭৮.৯ বিলিয়ন ডলার। ১৫. সুইজারল্যান্ড- ৬৭.৭ বিলিয়ন ডলার। ১৬. রাশিয়া- ১৩৮.৪ বিলিয়ন ডলার। ১৭. অন্যান্য দেশ- ১৫৬.৭ বিলিয়ন ডলার। উল্লেখ্য, অক্টোবর ২০০৯ পর্যন্ত চীনের নিকট যুক্তরাষ্ট্রের দেনার পরিমাণ হয়েছে ৮৪০ বিলিয়ন ডলার (আল-জাজিরা : ২০.১০.০৯)। এছাড়া অন্যান্য দেশ থেকে আরো ঋণ সংগ্রহ করেছে এবং হাজার হাজার কোটি টাকার বন্ড বিক্রয় করেছে যুক্তরাষ্ট্র।

<b>ভারতের দারিদ্র্য</b>
দিল্লি সরকার পশ্চিমের কয়েকটি রাজ্যের সমৃদ্ধির জন্য বাকি রাজ্যগুলোকে শোষণ করছে। বিহার, উড়িষ্যা, পশ্চিমবঙ্গ, কাশ্মীর রাজ্যের জনগণের মাথাপিছু আয় অপেক্ষা মহারাষ্ট্র, গুজরাট, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্ণাটক ও কেরালা রাজ্যের জনগণের মাথাপিছু আয় ৫ থেকে ১০ গুণ বেশি। উত্তর-পূর্ব ভারতের রাজ্যগুলোর স্থানীয় জনগণের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে। ২০০৫ সালের হিসাব অনুযায়ী ভারতের ৮৫.৭% লোকের দৈনিক আয় ২.৫ ডলারের নিচে এবং ৪১.৬ ভাগ লোকের আয় দারিদ্র্যসীমার নিচে অর্থাৎ ১.২৫ ডলার। বিশিষ্ট সাংবাদিক সিরাজুর রহমান ৮/৯/০৯ সালে দৈনিক নয়াদিগন্তে লিখেছেন, ভারতের মোট জনসংখ্যার ৭৬% চরম দরিদ্র। ঋণের দায়ে ও অনাহারে বিগত ১০ বছরে ভারতের ২ লাখ কৃষক আত্মহত্যা করেছে। বর্তমানে প্রতি আধঘণ্টায় একজন কৃষক আত্মহত্যা করে।

উপরোক্ত তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, পরের ধনে পোদ্দারি করা আড়তদার আমেরিকা যদি লুটপাট করার সুযোগ না পায় তবে অচিরেই নব্বইয়ের দশকের সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাগ্যবরণ করবে। আর ভারত হচ্ছে সর্বাঙ্গে ক্যান্সার আক্রান্ত সুন্দর মুখ-মণ্ডলের মানুষের ন্যায় যার উপরের অংশই শুধু সুন্দর।
মানবজাতির সুখ-সমৃদ্ধি ও উন্নতির জন্য যান্ত্রিক ও পাশবিক সভ্যতার ধারক-বাহক পাশ্চাত্যের নিকট থেকে মানবিক সভ্যতার অধিকারী প্রাচ্যকে বিশ্ব নেতৃত্বে আসীন হতে হবে। এ জন্য প্রাচ্যের বুদ্ধিজীবী ও জনগণকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রাচ্যের স্বাধীনতাকামী বুদ্ধিজীবী ও রাষ্ট্রনায়করা যদি এ লক্ষ্যে সুচিন্তিত পদক্ষেপে অগ্রসর হয়ে জনগণকে সচেতন করে তবে জনগণ পাশ্চাত্যের আজ্ঞাবহ- অর্থ ও ক্ষমতালোভী সেবাদাসদেরকে ক্ষমতার মসনদ থেকে ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষেপ করবে এবং পাশ্চাত্যের স্বার্থে প্রাচ্যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী দেশ ও গোষ্ঠীকে সমুচিত শিক্ষা দেবে। এরূপ আকাংখা এ মুহূর্তে অসম্ভব মনে হলেও বাস্তবে অপশক্তির পরাজয় অবশ্যম্ভাবী। নইলে পৃথিবীতে মানবজাতি এতদিন টিকে থাকতে সক্ষম হতো না।

০১/১০/২০০৯

সম্পাদকীয়ঃ ইতিহাস অন্বেষা ডিসেম্বর ২০০৯।