Wednesday, January 4, 2012

বিপন্ন বাংলাদেশ, বিতর্কিত বিচার বিভাগএবং একজন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী(প্রথম প্রকাশ জানুয়ারী ২০১১ সংখ্যা,মাসিক ইতিহাস অন্বেষা)


সাম্রাজ্যবাদী ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি, মুসলিম বিদ্বেষী রক্তশোষক জগৎ শেঠ-উমিচাঁদ গং এবং ক্ষমতালোভী মীরজাফরের ত্রিমুখী ষড়যন্ত্রে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন স্বাধীনতার প্রতীক নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতনের মাধ্যমে আমাদের স্বাধীনতা সূর্য ১৯০ বছরের জন্য ডুবে গিয়েছিল। ঠিক তদ্রƒপ ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানির উত্তরসূরি ইউরোপীয় ইউনিয়ন, চক্রান্তকারীদের গডফাদার যায়নবাদী ইসরাইল, জগৎ শেঠ-উমিচাঁদের উত্তরসূরি ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত এবং মীর জাফরের উত্তরসূরি মঈন-উ-আহমদ ও ইহুদীবাদ কর্তৃক নিয়ন্ত্রিত বিশ্বব্যাংক কর্মকর্তা ফখরুদ্দীনের সম্মিলিত ষড়যন্ত্রে ১/১১ নামক দ্বিতীয় পলাশী নাটক এ দেশে মঞ্চস্থ হয়। পলাশী বিপর্যয়ের পর প্রথমদিকে ষড়যন্ত্রের সহযোগী মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও জনগণ ষড়যন্ত্রের সুদূরপ্রসারী পরিণাম সম্পর্কে বেখবর ছিল। তারা এটিকে শুধুমাত্র নবাব সিরাজ থেকে নবাব মীর জাফরের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর হিসাবেই ধরে নিয়েছিল। ফলে মাত্র ৮০০ ইংরেজ সৈন্য ও ৩২০০ হিন্দু সৈন্য যখন মীর জাফরের সহযোগিতায় বন্দী সিরাজের লাশ মুর্শিদাবাদে প্রদর্শন করছিল তখনও জনগণ বিষয়টির মর্মার্থ অনুধাবন করতে পারেনি। পরবর্তী ৭ বছরের মধ্যেই জনগণ দেখল ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা দেশের প্রকৃত শাসক, শোষক ও নির্যাতনকারী এবং সিংহাসনে যথারীতি একজন মুসলমান পুতুল নবাব অধিষ্ঠিত, যার কোনো ক্ষমতা নেই। পলাশী নাটকের পরই নবাব সিরাজের ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী ভেঙে বিধ্বস্ত করা হয়। পরবর্তী সাত বছরের মধ্যে ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীদের সহযোগী মুসলিমদের সেনাদল ভেঙে দেয়া হয় এবং তদস্থলে হিন্দু সেনাদল প্রতিস্থাপন করা হয়। এরপর বিভিন্ন আইন-বিধি জারি করে মুসলমানদের ব্যবসাবাণিজ্য  ও জমির অধিকার কেড়ে নেয়া হয়। সর্বশেষ ১৮৩৫ সালে রাজ ভাষা পার্সীর পরিবর্তে ইংরেজি চালু করা হয় এবং সব সরকারি চাকরি থেকে মুসলমানদের বিতাড়িত করা হয়। ৭০০ বছরের শাসক মুসলমানরা উক্ত পলাশী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অশিক্ষিত ভূমিহীন কৃষক, মজুর ও কুলিতে পরিণত হয়। প্রখ্যাত আওয়ামী বুদ্ধিজীবী আবুল মনসুর আহমদ ১৯৩০-এর দশকের মুসলমান সমাজের বর্ণনা দিয়েছেন এভাবে ‘জমিদার-হিন্দু, রায়ত- মুসলমান, শিক্ষক হিন্দু-ছাত্র মুসলমান, অফিসার হিন্দু- ঝাড়–দার মুসলমান, ডাক্তার হিন্দু-রোগী মুসলমান, উকিল হিন্দু- মক্কেল মুসলমান, খেলোয়াড় হিন্দু- দর্শক মুসলমান, শাসক ও শোষক হিন্দু- শাসিত ও শোষিত মুসলমান ইত্যাদি ইত্যাদি। ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা মীর জাফরের উত্তরসূরি মুসলমানদেরকেও লাভবান হতে দেয়নি।


দীর্ঘ ১০০ (১৭৫৭-১৮৫৭) বছরের রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ভারতের কোটি কোটি মুসলমান নিহত, আহত, পঙ্গু ও কারান্তরীণ হয়ে নিস্তেজ হয়ে পড়ে। পরবর্তীতে হিন্দু শক্তির উত্থান ঠেকাতে ইংরেজ শাসকগোষ্ঠী মুসলমানদেরকে আনুকূল্য প্রদান শুরু করে। এক পর্যায়ে দীর্ঘ ৪২ (১৯০৫-১৯৪৭) বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের মাধ্যমে আমাদের পূর্বপুরুষগণ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান ভূখ- হাসিল করে। আমাদের অদূরদর্শিতায় ও হঠকারিতায় পাকিস্তান ভেঙে যায় এবং স্বাধীন বাংলাদেশ সৃষ্টি হয়।প্রতিকুল পরিস্থিতির কারণে আমরা সমগ্র ভারতের অধিকার ছেড়ে দিয়ে ক্ষুদ্র ভূখণ্ডের বাংলাদেশে সুখের স্বর্গ নির্মাণ করা শুরু করি। কিন্তু তা আর সম্ভব হলো না। আমাদের জাত-শত্রু ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীরা মীর জাফরের উত্তরসূরিদের সাথে মিলিত হয়ে এ ক্ষুদ্র ভূখ-টিতেও আমাদেরকে শান্তিতে থাকতে দিচ্ছে না। মীর জাফরের উত্তরসূরিরা বিদেশী প্রভুদের ইশারায় বর্তমানে সিরাজের উত্তরসূরিদেরকে হামলা-মামলা-নির্যাতনের মাধ্যমে নিশ্চিহ্ন করার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের প্রশাসন থেকে অভিজ্ঞ, মেধাবী ও দেশপ্রেমিকদের বিতাড়িত, ওএসডি করা হয়েছে, সেনাবাহিনীর কোমর ভেঙে দেয়া হয়েছে, বিডিআরকে ধ্বংস করা হয়েছে। পুলিশ বাহিনীকে প্রতিনিয়ত বিতর্কিত করা হচ্ছে, যাতে ভবিষ্যতে এ বাহিনীকে ধ্বংস করলে জনগণ নিশ্চুপ থাকে। (উল্লেখ্য, ১/১১-এর পর সেনাবাহিনী দ্বারা জনস্বার্থবিরোধী কাজ করানোর মাধ্যমে সেনাবাহিনীকে বিতর্কিত করা হয়। ফলে পিলখানা বিদ্রোহের সময় জনগণ সেনাবাহিনী রক্ষায় নির্লিপ্ত ছিল)। একইভাবে নিম্নমানের লোকদেরকে নমিনেশন দিয়ে এমপি নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত ও বিতর্কিত করা হয়। ’৭২-৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বিপথে পরিচালনাকারী এবং জনগণ কর্তৃক বারবার প্রত্যাখ্যাত বামপন্থী ঘরানার লোককে আইনমন্ত্রী করা হয় এবং হাইকোর্ট কর্তৃক দুর্নীতিবাজ হিসেবে ঘোষিত ব্যক্তিকে আইন প্রতিমন্ত্রী করে আইন ও বিচার ব্যবস্থাকে চরমভাবে বিতর্কিত করা হয়। সর্বশেষ এলএলবি পরীক্ষায় তৃতীয় শ্রেণীতে উত্তীর্ণ নিম্নমানের চিহ্নিত দলীয় উকিল, হত্যা মামলার চার্জশীটভুক্ত প্রধান আসামি ও প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুরকারী ব্যক্তিদেরকে বিচারপতি নিয়োগ করে আমাদের বিচার বিভাগের ভাবমূর্তি চরমভাবে বিনষ্ট করা হয়। এরূপ নাজুক পরিস্থিতিতে যদি সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আশীর্বাদপুষ্ট কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী আমাদের নতুন শাসক হিসেবে উড়ে এসে জুড়ে বসে এবং বিতর্কিত আইন-বিচার ও সংসদকে বিধ্বস্ত করে, বিতর্কিত বাহিনীসমূহ ভেঙে দেয় তবে জনগণের নির্লিপ্ত থাকাটা অস্বাভাবিক নয়। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এভাবেই একটি দেশের স্বাধীনতা স্থিতিশীলতা ও সার্বভৌমত্বের মৌলিক স্তম্ভসমূহকে বিতর্কিত ও দুর্বল করে আগ্রাসনকে নির্বিঘ্ন করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কোনো দেশে প্রবেশ করার পূর্বেই তার তল্পীবাহক পুতুল সরকার কর্তৃক আগ্রাসন প্রতিরোধে সক্ষম ব্যক্তি ও গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার কার্যক্রম পরিচালনা করে। বাংলাদেশ এখন এরূপ ক্রান্তিকাল অতিক্রম  করছে।


১/১১-এর পর যেভাবে বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করা হয়েছে
১/১১-এর পরিকল্পনাকারীরা ক্ষমতারোহণের পূর্বেই সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ট শ্রেণীর কিছুসংখ্যক আইনজীবী দ্বারা সুপ্রিমকোর্টে ব্যাপক ত্রাসের সৃষ্টি করে এবং প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুর করে। এতে বিচারকগণ এমন ভীতসন্ত্রস্ত হয় যে, পরবর্তীতে তাঁরা বেআইনি তত্ত্বাবধায়ক সরকারের ইচ্ছানুযায়ী দেশপ্রেমিক সম্মানিত নাগরিকদের বিরুদ্ধে যাচ্ছেতাই রায় প্রদান করে। সময়ের বিবর্তনে তাদের উক্ত রায়সমূহ হাসি-তামাশার বিষয়ে পরিণত হয় এবং উক্ত কোর্টকে জনগণ ‘ক্যাঙারু কোর্ট’ নামে আখ্যায়িত করে ও উক্ত বিচারকে ক্যামেরা ট্রায়াল নামে অভিহিত করে। ক্ষমতায় এসে বর্তমান ডিজিটাল সরকার উপরোক্ত বিচারকদের তিরষ্কার না করে পুরস্কৃত করে এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে ও সাম্রাজ্যবাদের এজেন্ডা বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নামক অপর একটি ক্যাঙারু কোর্ট গঠন করে দেশপ্রেমিক সম্মানিত নাগরিকদের হয়রানিতে লিপ্ত রয়েছে। অদ্য ৩০/১২/২০১০ তারিখ সকাল ১০টায় আমি প্রথমবারের মতো উক্ত ক্যাঙ্গারু কোর্টে যাওয়ার চেষ্টা করি এবং যথারীতি বাধাগ্রস্ত হই। শুধু আমি বাধাপ্রাপ্ত হয়েছি তা নয়- দু-একজন সাংবাদিক ব্যতিত সকল সাংবাদিক গেটের বাইরে সারাক্ষণ অপেক্ষায় ছিল। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর পক্ষের অনেক সিনিয়র আইনজীবীকেও গেটের ভিতর ঢুকতে দেয়া হয়নি। তাঁর পরিবারের সদস্য যথাক্রমে তাঁর ভাই সাইফুদ্দীন কাদের চৌধুরী ও স্ত্রী, তাঁর বোন হাসিনা কাদের সিনহা অনেক তদ্বির করেও ভিতরে প্রবেশের অনুমতি পায়নি। পক্ষান্তরে বর্তমান এটর্নি জেনারেল, ২ জন সহকারী এটর্নি জেনারেল এবং এটর্নি জেনারেল অফিসের সাথে সংশ্লিষ্ট আইনজীবীগণ সদলবলে ট্রাইব্যুনালে হাজির থেকে বিচার কাজ প্রভাবিত করেছেন। অথচ আইনগতভাবে এটার্নি জেনারেল বিচার চলাকালে তথাকথিত ট্রাইব্যুনালে প্রবেশ করে অবস্থান করা ন্যায়সঙ্গত নয়। সংবিধান লংঘন করে নিজস্ব ঘরানার হাইকোর্টের বিচারপতিকে ট্রাইব্যুনালের বিচারক নিয়োগ দেয়া, দলীয় আইনজীবীদেরকে ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর নিয়োগ দেয়া, দলীয় বিবেচনায় ট্রাইব্যুনালের কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ দেয়া, দলীয় লোককে বাদী করে দলীয় সাক্ষীদের থেকে সাক্ষী নিয়েও আটককৃতদের বিরুদ্ধে ফরমায়েশী চার্জশীট দিতে ব্যর্থ হওয়ার দরুন সরকার সম্ভবত দুশ্চিন্তাগ্রস্ত। এরই বহিঃপ্রকাশ ছিল তথাকথিত স্বাধীন ট্রাইব্যুনালের বিচার কাজে সদলবলে এটর্নি জেনারেলের অনাহুত উপস্থিতি ও হস্তক্ষেপ। ট্রাইব্যুনাল থেকে বেরিয়ে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী সাংবাদিকদের উদ্দেশে কিছু বলতে চেয়েছিলেন কিন্তু পুলিশ তাঁকে সে সুযোগ দেয়নি। উপরন্তু প্রিজন ভ্যানে করে নিয়ে যাওয়ার সময় উপস্থিত নেতাকর্মীদের প্রতি হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানানোর অধিকারটুকুও তাঁকে দেয়া হয়নি। তাঁর স্ত্রী ফরহাত কাদের চৌধুরী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের নিয়োগকৃত আইনজীবীদেরকে ট্রাইব্যুনালে প্রবেশে বাধা দেয়া হয়েছে। অথচ এটার্নি জেনারেলসহ মোট ৩৩ জন আইনজীবী/প্রসিকিউটর আমার স্বামীর বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছে।


বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগ বিতর্কিত হওয়ার প্রধান প্রধান কারণ সমূহ
মাছের পচন শুরু হয় মাথা থেকে, দেশের পচন শুরু হয় নেতা থেকে। একইভাবে একটি পচা মাছ যদি শত শত মাছের মধ্যে থাকে তবে সব মাছেই দ্রুত পচন শুরু হয়। এ জন্য জেলেরা পচা মাছকে ভাল মাছ থেকে আলাদা করে রাখে। আমাদের অশিক্ষিত জেলেদের বুদ্ধিটুকুও বর্তমান সরকারের আছে বলে মনে হয় না। অথবা বর্তমান সরকার পূর্ব পরিকল্পিতভাবেই আমাদের দেশের আইন ও বিচার বিভাগ ধ্বংসে চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ আইন প্রতিমন্ত্রীকে নির্বাচিত করেছেন যাতে দেশের আইন-শৃঙ্খলা ও বিচার ব্যবস্থা ধ্বংস হয় এবং দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী আকাক্সক্ষা বাস্তবায়ন করে। বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী এডভোকেট কামরুল ইসলাম ১৯৯৬-২০০১ সালের আওয়ামী লীগ শাসনামলে জজকোর্টে পিপি হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন। পত্রত্রিকায় তাঁর বিভিন্ন অপকর্ম প্রকাশিত হলে হাইকোর্টের বিচারপতি মোঃ আলী আজগর খান ও বিচারপতি এস কে সিনহা স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে সুয়োমুটো রুল জারি করেন। উক্ত রুলে হাইকোর্ট বলেছিল, “পত্রিকায় প্রকাশিত গুরুতর অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে রেকর্ডপত্র দেখার পর কোর্ট মনে করেন, এই ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট মামলায় (ডিবি সোর্স জালাল হত্যা মামলা, ১. সেশন কেস নং ৩৭১২/১৯৯৯। ডেইলী স্টার বনাম রাষ্ট্র মামলা/ ৫৩ ডি.লে.আর-২০০১) পিপি হিসেবে নিহত পরিবারের হয়ে তার দায়িত্ব পালনে আন্তরিক ও মনোযোগী নন। সুতরাং তার এ পদে থাকলে সংশ্লিষ্টরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। সংশ্লিষ্টদের ন্যায বিচার নিশ্চিত করার জন্য কামরুলকে এ দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দিয়ে দায়িত্বশীল কাউকে কেন নিয়োগ করা হবে না মর্মে রুল ইস্যু করা হয়। ২০০১ সালের ২৮ জানুয়ারি হাইকোর্টের রায়ে এ রুল এবসলিউট করে সাতদিনের মধ্যে অন্য পিপি নিয়োগ করার নির্দেশ দেয়া হয়। উপরোক্ত রায় মতে, দেখা
যায়-  ১। এডভোকেট কামরুল দায়িত্বশীল ব্যক্তি নন, ২। তিনি ন্যায়বিচারের পক্ষে বাধাস্বরূপ।
উপরোক্ত ঘটনার আলোকে কয়েকটি বিষয় আলোচনার দাবি রাখে।
১। বর্তমান সরকার কি জনগণকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করার জন্য আইন প্রতিমন্ত্রীর মতো গুরুত্বপূর্ণ পদে এডভোকেট কামরুলকে নিয়োগ দিয়েছেন?
২। যে দুজন বিচারপতি এডভোকট কামরুলকে ন্যায় বিচারের পক্ষে বাধাস্বরূপ বলে চিহ্নিত করেছিলেন তাঁরা কেন বর্তমানে সুয়োমোটো রুল জারি করে বলছেন না যে, “যে ব্যক্তি পিপি হিসেবে ন্যায়বিচারের পক্ষে বাধা ছিলেন তিনি আইন প্রতিমন্ত্রী থাকলে জনগণ ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হবে এবং বিচার বিভাগ বিতর্কিত হবে।


বিচার বিভাগকে বিতর্কিত করার ক্ষেত্রে আইন প্রতিমন্ত্রীর বর্তমান ভূমিকা
প্রবন্ধের কলেবরে বিস্তারিত লেখা সম্ভব নয় বিধায় এক্ষেত্রে আমি তাঁর একটি কর্ম যা আইন-শৃঙ্খলার অবনতির জন্য দায়ী, তার উল্লে করব এবং বিচারকাজে হস্তক্ষেপকারী ২টি বক্তব্য উল্লেখ করছি।
১। বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রীকে রাজনৈতিক হয়রানিমূলক মামলা প্রত্যাহার সংক্রান্ত জাতীয় কমিটির প্রধান নিযুক্ত করা হয়েছে। এ পদে থেকে তিনি আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে যত হত্যা/ ছিনতাই/ রাহাজানি/ চাঁদাবাজি/ ডাকাতি/ নারী নির্যাতন মামলা ছিল সেগুলোকে রাজনৈতিক হয়রানি আখ্যায়িত করে প্রত্যাহারের সুপারিশ করেছেন। ফলে ইতোমধ্যে ৬৬৫৫টি মামলার হাজার হাজার চিহ্নিত খুনি, ডাকাত, চাঁদাবাজ, নারী নির্যাতনকারী জেল থেকে মুক্তি পেয়ে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটাচ্ছে। এর ফলস্বরূপ খোদ রাজধানীসহ সারা দেশে ছিনতাই, রাহাজানি, ডাকাতি, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ভর্তি বাণিজ্য, ছাত্রী বাণিজ্য, ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানি, রাজনৈতিক হত্যা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছে। এ সংক্রান্ত ২টি তথ্য হলো-
(ক) গত ৯ মাসে রাজনৈতিক সহিংসতায় ১৬৫ জন নিহত ও ১১৩০২ জন আহত হয়েছে। (সংগ্রাম, ২৯/১২/১০)
(খ) ইভ টিজিং বা যৌন হয়রানির কারণে এ বছর ৩১ জন মেয়ে আত্মহত্যা করেছে এবং এ কাজে বাধা দেয়ায় ১৮ জনকে হত্যা করা হয়েছে যাদের মধ্যে মা, শ্বশুর, ভাই ও শিক্ষক রয়েছেন। (সূত্র : ২৮/১২/১০-এর এনটিভি নিউজ)
২। (ক) চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীদের গ্রেফতারের নির্দেশ দেয়া হবে। (নয়া দিগন্ত, ৪/১২/২০১০)
(খ) সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে। (দিগন্ত টিভি, ১৭/১২/২-১০) উপরোক্ত ১ম উক্তিতে দর্শকরা বুঝে নেবেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল নয়- আইন প্রতিমন্ত্রীই স্বাধীন নিরপেক্ষ ট্রাইব্যুনালকে নির্দেশ দিয়ে থাকেন। দ্বিতীয় উক্তিটির ব্যাপারে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তা হলো, ১৫/১২/২০১০ তারিখে সরকার সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে গ্রেফতারের জন্য ট্রাইব্যুনালের নিকট আবেদন করে। ট্রাইব্যুনাল ১৯/১২/২০১০ইং তারিখ আবেদনের উপর শুনানির দিন ধার্য করে। ১৫/১২/২০১০ইং তারিখ দিবাগত রাতে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে মিথ্যা মামলায় গ্রেফতার করে চরম নির্যাতনের পর রিমান্ডে নেয়া হয়। ১৭/১২/২০১০ইং তারিখে আইন প্রতিমন্ত্রী সাংবাদিকদেরকে জানান, “১৯/১২/২০১০ তারিখে সাকা চৌধুরীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হবে।’ এক্ষেত্রে প্রশ্ন হলো ১৯ তারিখ শুনানির পর স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল কি নির্দেশ দেবে আইন প্রতিমন্ত্রী তা আগাম জানলেন কিভাবে? তবে কি তাঁর বিরুদ্ধে আনীত মামলা ও মামলার রায় আইন প্রতিমন্ত্রী পূর্বেই ট্রাইব্যুনালকে লিখে দিয়েছেন?


বর্তমান সরকারের আমলে বিচার বিভাগ বিতর্কিত হলো কেন?
বিচার বিভাগ বিতর্কিত হওয়ার প্রধান কারণ বর্তমান সরকারের অনুসৃত নীতি দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও গোপালগঞ্জীকরণ। দ্বিতীয় কারণ বর্তমান আইন প্রতিমন্ত্রী, তৃতীয় কারণ কিছু সংখ্যক লোভী, মেরুদণ্ড-হীন বিচারপতি। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য কারণসমূহ হলো-
১. খুনের মামলার এজাহারভুক্ত প্রধান আসামিকে বিচারপতি নিয়োগ।
২. প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুরকারীকে বিচারপতি নিয়োগ।
৩. প্রধান বিচারপতির এজলাস ভাঙচুরকারীদের বেকসুল খালাস প্রদান কিন্তু সাংবাদিক মাহমুদুর রহমান ও অলিউল্লাহ নোমানকে সত্য সংবাদ পরিবেশন করায় জেল জরিমানা ও আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা।
৪. পঞ্চম সংশোধনী ও ৭ম সংশোধনী বিষয়ক এখতিয়ার বহির্ভূত রায় প্রদান।
৫. এলএলবিতে তৃতীয় শ্রেণীপ্রাপ্ত এবং চিহ্নিত দলীয় আইনজীবীদের বিচারক নিয়োগ।
৬. এটর্নি জেনারেল কর্তৃক বারবার পেশীশক্তি প্রদর্শন ও বিদায়ী প্রধান বিচারপতিকে নজিরবিহীন অশালীন বিদায় সংবর্ধনা প্রদান।
৭. জ্যেষ্ঠতা লংঘন করে বর্তমান প্রধান বিচারপতিকে নিয়োগ প্রদান।
৮. সংবিধান লংঘন করে মানবতাবিরোধী আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠন ও পরিচালনা।
৯. শুনানি শেষে ট্রাইব্যুনাল কি রায় দেবেন তা সরকারের মন্ত্রীদের আগাম ঘোষণা দেয়া।
১০. আদালত অবমাননার দায়ে সাবেক সচিব, ডিসি ও ওসিকে আদালতে তলব করে আদালক কর্তৃক অবমাননাকর আচরণ করা।
১১. সরকারদলীয় শোক দিবসকে আদালত কর্তৃক জাতীয় শোক দিবস ঘোষণা করে আদালতের রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়া।
১২. মামলার শুনানিতে আপত্তি করায় বিচারপতি কর্তৃক আইনজীবীদের গ্রেফতারের হুমকি প্রদান।
১৩. আগাম জামিনের ব্যাপারে হাইকোর্টের কঠোরতা।
১৪. হাইকোর্ট কর্তৃক জামিনপ্রাপ্ত বিরোধী নেতাকর্মীদের মুক্তি আটকে দেয়ার জন্য এটর্নি জেনারেলের দফতর থেকে কারাগারে ফোন করা।
১৫. বিদেশী নাগরিককে হাইকোর্টের বিচারপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনের সুযোগ দেয়া।
১৬. বিনা শুনানিতে বেগম জিয়ার লীভ টু আপীল খারিজ করা।
১৭. মাহমুদুর রহমান ও অলিউল্লাহ নোমানের মামলার রায়ের বিরুদ্ধে আপীলের সুযোগ না দেয়া।
১৮. রিমান্ডের বিষয়ে হাইকোর্ট বিভাগের দেয়া গাইড লাইন নিম্ন আদালত ও পুলিশ কর্তৃক অমান্য করা।
১৯. বিরোধী নেতাকর্মীদের ঢালাওভাবে রিমান্ড প্রদান এবং শ্যোন এরেস্ট দেখানো।
২০.মিথ্যা মামলা জেনেও আদালত কর্তৃক শ্যোন এরেস্ট দেখানো।
২১. উচ্চ ও নিম্ন আদালতে সরকারের নগ্ন হস্তক্ষেপ।


বিশিষ্টজনদের বক্তব্যে বিচার ব্যবস্থা
১. কোনো কোনো বিচারক ও তাদের কর্মচারীরা দুর্নীতিগ্রস্ত। ...টিআইবি’র রিপোর্ট অতিরঞ্জিত নয়। -দুদক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, যুগান্তর, ২৮/১২/১০
২. বিডিআর জওয়ানরা ন্যায়বিচার নিশ্চিতের ব্যাপারে শংকিত। (জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান, আমার দেশ ২৯/১২/১০)
৩. দেশে আইনের শাসন নেই। চলছে অঘোষিত ফ্যাসিবাদ। বর্তমানে কাউকে ধরলেই রিমান্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। (সুজনের গোলটেবিল বৈঠকে টিআইবি চেয়ারম্যান এম হাফিজউদ্দীন খান। যুগান্তর-২৮/১২/১০
৪. প্রতিবাদী কণ্ঠকে স্তব্ধ করার সুপরিকল্পিত ষড়যন্ত্র চলছে। (সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ) সূত্র-ঐ
৫. প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী ও দলীয় নেতাদের বক্তব্যে বিচার কার্যক্রম প্রভাবিত করা।
৬. সুজন আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে বক্তারা বলেন, দেশের প্রধান তিনটি অঙ্গের মধ্যে নির্বাহী বিভাগ তথা প্রশাসন ও সংসদ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। বিচার বিভাগের উপর মানুষের আস্থা নেই। সরকারের শীর্ষ থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত কেউ আইনের তোয়াক্কা করছেন না। গণতান্ত্রিক শাসনের নামে স্বৈরতন্ত্র চলছে।... মামলা দিয়ে যাকে তাকে রিমান্ডে নিয়ে বর্বর নির্যাতন চালানো হচ্ছে। সরকার আইনেরশাসন প্রতিষ্ঠার পরিবর্তে নাগরিকদের রিমান্ডে নিয়ে নির্যাতন চালাচ্ছে ও প্রতিবাদীদের দমিয়ে রাখার চেষ্টা করছে। (সূত্র-ঐ)
৭. বক্তারা আরো বলেন-
(ক) আইনের শাসনের অনুপস্থিতিতে রাষ্ট্র ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার আশঙ্কা।
(খ) সরকারের লোকজনই নগ্নভাবে আইনের শাসন ধ্বংস করছে। সংগ্রাম-২৮/১২/১০
(গ) আইনের শাসনের দুর্বলতার কারণে কেউ কোথাও বিচার পাচ্ছেন না। (সুজন সভাপতি অধ্যাপক মোজাফফর) আঃ সময়-২৮/১২/১০।
৮. বিতর্কিত ব্যক্তিরা আদালতের শীর্ষ পর্যায়ে থাকায় মানুষ ন্যায়বিচার পাচ্ছে না। (এনার্জি সলিউশন অব বাংলাদেশের গোলটেবিল আলোচনায় বক্তারা, নয়া দিগন্ত- ০৪/১২/২০১০।


মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধকারী নাকি রাজনৈতিক অপরাধী
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিঘোষিত লক্ষ্য ঘোষণা করা হয়েছে। যারা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটসহ মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে তাদের বিচার করা। অথচ সরকার এ পর্যন্ত যাদেরকে এই অভিযোগে অভিযুক্ত হিসেবে আটক রেখেছে তাদের কাউকে সরাসরি উক্ত অপরাধের জন্য গ্রেফতার করা হয়নি। এখানেই নিহিত রয়েছে মূল রহস্য। এ পর্যন্ত যে ছয়জনকে চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করে গ্রেফতার দেখানো হয়েছে তাঁরা হলেন জামায়াতের আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুহাম্মদ মুজাহিদ, নায়েবে আমীর মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী, সহ-সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লা, মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং বিএনপির ষ্ট্যান্ডিং কমিটির সদস্য সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই এ সকল নেতৃবৃন্দকে গ্রেফতারের হুমকি দেয়া হচ্ছিল। অবশেষে ২৯/০৬/১০ ইং তারিখে ‘ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত দেয়ার’ কথিত সাজানো মামলায় মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ও মাওলানা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীকে গ্রেফতার করা হয়। ইসলাম ধর্মের অস্তিত্বে আঘাতকারী ধর্মনিরপেক্ষ সরকার হঠাৎ করে ধর্মের পক্ষে এসে ইসলামী আন্দোলনরত শীর্ষ নেতৃত্বকে গ্রেফতার করে দেশবাসীকে ডিজিটাল চমক দেখিয়েছে বটে। ইসলাম বিদ্বেষী ইহুদী-খ্রিস্টান শক্তির প্রেসক্রিপশন নিয়ে যারা ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করছে তাদের দ্বারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মামলা যেন ভূতের মুখে রাম নাম। জুলাই মাসে সুপ্রিম কোর্টের গেট থেকে মুহাম্মদ কামারুজ্জামান ও আবদুল কাদের মোল্লাকে গ্রেফতারের পর জানানো হয় তারা ২০০৮ সালের পল্লবী থানায় দায়ের করা মামলার আসামি। এর আগে তাঁরা কেউ এ মামলা সম্পর্কে জানতেন না। জানলে জামিন নিতেন। উক্ত পাঁচজনকে আটকের পরই শুরু হয় নিত্যনতুন সাজানো মিথ্যা মামলা দায়ের ও রিমান্ডের নামে নির্যাতন। উক্ত নিত্য নতুন মামলার মধ্যে কয়েকটি হলো ১। ২৭ জুন রমনা থানায় দায়ের করা গাড়ি ভাঙচুরের মামলা। ২। ১৭ ফেব্রুয়ারি পল্টন থানায় দায়ের করা পুলিশের কাজে বাধাদান মামলা। কদমতলী থানায় সন্ত্রাস বিরোধী আইনের মামলা, উত্তরা থানার বই বিতরণপূর্বক রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি নষ্টের মামলা, রমনা থানার হুমায়ুন আজাদ হত্যা মামলা ও উত্তরা থানায় দায়েরকৃত রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা প্রভৃতি। উক্ত মামলাসমূহের মধ্যে গাড়ি ভাঙচুর মামলা, পুলিশের কাজে বাধাদান মামলা ও বই বিতরণ মামলাসমূহ হলো সবচেয়ে হাস্যকর ও উদ্ভট মামলা। কেননা এ দেশের কেউ কখনও বিশ্বাস করবে না যে, নিজামী সাঈদীর মত লোক গাড়ি ভাঙচুর করতে পারে, আর পুলিশের কাজে বাধাদান মামলাটি আরও হাস্যকর। কেননা সরকারি দলের নেতাকর্মীরা প্রতিনিয়ত পুলিশকে পেটাচ্ছে, থানায় হামলা করছে, অথচ পুলিশের কাজে বাধাদান মামলা করা হচ্ছে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে। বই বিতরণ মামলার ব্যাপারে জিজ্ঞাস্য হলো তারা কোনো নিষিদ্ধ বই বিতরণের সাথে জড়িত কিনা। জড়িত থাকলে উক্ত বইয়ের নাম কি জনগণ তা জানতে চায়। কেননা তাদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে পরিকল্পিত, সাজানো ও হাস্যকর মামলায় অথচ বলা হচ্ছে তারা চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী। অর্থাৎ তারা ১৯৭১ সালে হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাটে জড়িত ছিল। এ বিষয়ে জনগণের জিজ্ঞাসা হলো-
১. তাঁরা ১৯৭২ সালে দালাল আইনে আটক হয়েছিল কিনা? তাদের বিরুদ্ধে ১৯৭২-৭৫ সালে দালাল আইনে বা হত্যা, লুণ্ঠন ও ধর্ষণের অভিযোগে কোনো মামলা হয়েছিল কিনা?
২. ১৯৭১ সালে তাদের কার বয়স কত ছিল? উক্ত রূপ অপরাধ করার বয়স তাদের হয়েছিল কিনা? অথবা ১৯৭২-২০১০ সময়কালে তারা কোনো লুটপাট ও ধর্ষণের কাজে জড়িত ছিল কিনা/ নাকি তারা ১৯৭১ সালে হঠাৎ ভায়াগ্রা/ইয়াবা সেবন করে ধর্ষণে লিপ্ত হয়েছিল এবং যুদ্ধের পর উক্ত বদঅভ্যাস ত্যাগ করেছে?
৩. লুটপাটের মাধ্যমে তারা ১৯৭১ সালে অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছিল কিনা? নাকি যারা তাদের লুটপাটের বিচার করতে চাইছে তারা ১৯৭২-৭৫ সালে এবং বর্তমানে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ হচ্ছে?
সরকার যদি মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ বা যুদ্ধাপরাধীদের বিচারে আন্তরিক হতো তাহলে প্রথমে তালিকাভুক্ত ১৯৫ জন যুদ্ধাপরাধীদেরকে যারা ছেড়ে দিয়েছে তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতো এবং তৎপর ১৯৭২-৭৩ সালে যারা দালাল আইনে ও অন্যান্য অপরাধে অভিযুক্ত হয়েছিল তাদেরকে ধরে এনে পুনরায় বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাত। অথচ সরকার উক্ত দালাল ও অপরাধীদের ব্যাপারে নিশ্চুপ থেকে বর্তমান রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন করার লক্ষ্যে উদোরপিণ্ডি বুদোর ঘাড়ে চাপাচ্ছে এবং এর অংশ হিসেবে জামায়াতের ৫ জন শীর্ষ নেতা ও বিএনপির শক্তিশালী ও প্রতিভাবান নেতা সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর উপর হামলে পড়েছে। সত্যি কথা হলো, সরকার শুধুমাত্র ক্ষমতায় থাকার লোভে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধে সক্ষম জাতীয় নেতাদেরকে হয়রানি ও নির্যাতন করে দেশকে নেতৃত্বশূন্য করার বিদেশী এজেন্ডা বাস্তবায়নে লিপ্ত রয়েছে। সরকার যদি মনে করেন দেশবাসী এসবের কিছুই বুঝে না তবে সরকারকেই এর মাশুল দিতে হবে।


নবাব সিরাজের সার্থক উত্তরসূরি সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী
যায়নবাদী ইহুদীদের ষড়যন্ত্রের দলিল চৎড়ঃড়পড়ষ ড়ভ ঃযব বষফবৎং ড়ভ ঃযব তরড়হ বইতে রয়েছে, আন্তঃকোন্দলে লিপ্ত একটি জাতি বা বিশাল সেনাবাহিনী অপেক্ষা সৎ প্রতিভাবান ও অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন ঠেকাতে অধিকতর কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদের টার্গেটকৃত দেশের প্রতিভাবান, সৎ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিকে প্রথম আঘাতেই নির্মূল করতে উদ্যোগী হয়। এরই অংশ হিসেবে ১৭৫৭ সালে প্রথম সুযোগেই নবাব সিরাজকে হত্যা করা হয়। উন্নত প্রযুক্তি ও মিডিয়া না থাকলে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীকে ও প্রথম আঘাতেই হত্যা করা হতো। নবাব সিরাজ যেভাবে ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেষ্টিত থেকেও দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় আমৃত্যু লড়াই করেছেন সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীও তদ্রুপ ঘরে বাইরে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থায় থেকে ও দেশের আজাদী ও মর্যাদা রক্ষার সংগ্রামে আমৃত্যু লড়াই করতে সংকল্পবদ্ধ। নবাব সিরাজের সুবিধা ছিল- তিনি ছিলেন দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী। ফলে তিনি নিজ সিদ্ধান্তকে বাস্তবায়নে সক্ষম হতেন। অপরদিকে সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী প্রধান নির্বাহী বা দলীয় প্রধান নন। ফলে তাঁর সুচিন্তিত সংকল্প বাস্তবায়নে তিনি সব সময় সক্ষম ছিলেন না। ফলে তাঁর প্রবল বিরোধীতাকে উপেক্ষা করে মীর জাফরের উত্তরসূরি মঈন-উ-আহমদকে প্রধান সেনাপতি করা হয়েছিল এবং দেশ বর্তমান দুরবস্থায় পতিত হয়। সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরী কেবলমাত্র একজন ব্যক্তি বা রাজনৈতিক কর্মী নন। তিনি নিজে একাই একটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান। দেশের দুই শীর্ষ নেত্রীর পরই জনমনে তাঁর স্থান। জরুরি সরকারের আমলে সকল নেতানেত্রী যখন গর্তে লুকিয়েছিল, সবার কণ্ঠ যখন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল তখনও তাঁর হুংকারে জাতি জেগে উঠতো ও সম্বিত ফিরে পেত। বন্দী হওয়ার পর জরুরি সরকারের দায়ের করা মামলাসমূহ তিনি নিজেই আদালতে মোকাবেলা করে সকল মামলায় বেকসুর খালাস পেয়ে মুক্তি লাভ করেছেন এবং আদালতে ও আদালতে আনা-নেয়ার ফাঁকে যখনই সুযোগ পেতেন তখনই সিংহ নিনাদে জাতিকে প্রয়োজনীয় দিক নির্দেশনা প্রদান করতেন। বর্তমান ডিজিটাল সরকারের আমলেও তাঁর ভূমিকা অপরিবর্তিত ছিল এবং থাকবে। তাঁর এই অকুতোভয় উচ্চারণ ও যুক্তিপূর্ণ প্রশ্নের উত্তর দিতে ব্যর্থ হয়েই বর্তমান ডিজিটাল সরকার ২৬ জুনের তথাকথিত গাড়ি পোড়ানো ও হত্যা মামলায় তাঁকে গ্রেফতার দেখিয়ে অমানুষিক নির্যাতন করেছে এবং ধারাবাহিকভাবে নতুন মামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে। অথচ ২৬ জুন তিনি চট্টগ্রামে ছিলেন। ঠিক একইভাবে ১৯৭১ সালের মে মাস থেকে ১৯৭৪ সাল পর্যন্ত তিনি ছাত্র হিসেবে বিদেশে ছিলেন। তিনি দালাল আইনে আটক হননি। তাঁর বিরুদ্ধে উক্ত সময়ে কোনো মামলা হুলিয়া বা গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হয়নি। তাঁর পিতার মৃত্যুর পর বঙ্গবন্ধুর অনুরোধে তিনি ব্যারিস্টারী পড়া অসমাপ্ত রেখে লন্ডন থেকে দেশে ফিরে আসেন। অথচ বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার আমলে তাঁকে যুদ্ধাপরাধীর মামলায় গ্রেফতার করে পৈচাশিক নির্যাতন করা হচ্ছে।

বর্তমান অবস্থায় আমাদের করণীয়
প্রিয় দেশবাসী, শুধুমাত্র ক্ষমতা ও অর্থের লোভে দেশের একটি জনগোষ্ঠী আগ্রাসী শক্তির দোসর হয়েছে। অথচ আগ্রাসী শক্তিকে প্রতিহত করা সম্ভব না হলে আমাদের অবস্থা ইরাক আফগানিস্তানের ন্যায় হবে। জনগণ এতদিন মনে করতো ৪ দলীয় জোট হয়তো সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। কিন্তু গত ৪ বছরের ঘটনা-পরম্পরায় জনগণ দেখতে পাচ্ছে, লক্ষ্যহীন, জিয়ার আদর্শহীন, প্রশিক্ষণহীন ও বিশৃঙ্খল বিএনপি এবং পরাশ্রয়ী চড়ুইয়ের মানসিকতা সম্পন্ন জামায়াত নেতৃত্ব জাতিকে নেতৃত্ব দিতে অক্ষম। অথচ উক্ত দুই দলে ও অন্যান্য ছোট দলে অনেক যোগ্য নেতাকর্মী রয়েছে যারা দূরদর্শী, গতিশীল ও সাহসী নেতৃত্ব পেলে জনগণকে সংগঠিত করে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন কার্যকরভাবে প্রতিরোধ করতে সক্ষম হবে। আমাদের এখন এমন একজন নেতৃত্ব প্রয়োজন যিনি শ্রীলঙ্কার মাহেন্দ্র রাজাপাকসের মতো সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত প্রতিহত করে সাম্রাজ্যবাদের এজেন্টদেরকে নির্মূল করবেন। আমাদের এমন একজন নেতার প্রয়োজন যিনি প্রকাশ্য জনসভায় দাঁড়িয়ে নেপালের বীর যোদ্ধা পুষ্পকমল দাহাল প্রচন্ডের মতো বলতে পারবেন, ‘সামন্তবাদী শক্তি ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদ আমাদের চিরশত্রু। এখন ভারতের বিরুদ্ধে জাতীয় যুদ্ধ ও জনযুদ্ধের জন্য আমাদের প্রস্তুতি নিতে হবে।’ বর্তমান অবস্থায় সালাউদ্দীন কাদের চৌধুরীর মধ্যেই আমি রাজাপাকসে ও প্রচন্ডের মতো গুণাবলী ও সাহসিকতা প্রত্যক্ষ করছি। সুধী পাঠক, আমি স্বাধীন দেশে জন্মেছিলাম। স্বাধীনভাবেই জীবনের এতটি বছর কাটিয়েছি। ফলে প্রবন্ধটি আমার ব্যক্তিগত স্বাধীন মতামত। এমতাবস্থায় কেউ মনোক্ষুণ্ণ হলে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আমার সংকল্প,স্বাধীনভাবে মতামত প্রকাশে অক্ষম হলে আর লিখব না।

Monday, January 2, 2012

খাল কেটে কুমির আনার পরিণতি থেকে শিক্ষা নিন (প্রথম প্রকাশ সেপ্টেম্বর ২০০৭ সংখ্যা,মাসিক ইতিহাস অন্বেষা)


খাল কেটে কুমির আনার প্রবাদটি বাংলা ভাষায় বহুল প্রচলিত প্রবাদ। এই প্রবাদটি শুধুমাত্র প্রাকৃতিক খাল কাটা অর্থে ব্যবহৃত হয় না। এর রয়েছে বহুমাত্রিক অর্থ ও তাৎপর্য। প্রাকৃতিক খাল কেটে সাধারণত সেচ ব্যবস্থা ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন সাধন করা হয়। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়নে খাল কাটা দোষের নয় কিন্তু যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে যে খাল কাটা হয় সেটি অনেক সময় সংশ্লিষ্ট দেশের অস্তিত্বের সংকট সৃষ্টি করে। এছাড়া অর্থনৈতিক খাল কাটা, সাংস্কৃতিক খাল কাটা, রাজনৈতিক ও সামাজিক খাল কাটা সম্ভব। আপনি যদি বিচার-বিবেচনা ও লাভক্ষতির হিসাব না করে খাল কাটেন এবং আপনি যদি দুর্বল হন তবে উক্ত খাল কাটার মাধ্যমেই আপনার সলিল সমাধি হবে। আলোচনার শুরুতে আমরা প্রাকৃতিক খালকাটা সম্পর্কে আলোচনা করবো, এরপর সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক খাল কাটার বিষয়ে আলোকপাত করবো। প্রাকৃতিক খাল কাটার বিষয়ে আমরা পৃথিবীর বিখ্যাত ২টি খাল যথাক্রমে সুয়েজ খাল ও পানামা খাল কাটা, সংশ্লিষ্ট দেশে এর প্রভাব-প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করবো।


সুয়েজ খাল : এই খালটি ভূমধ্যসাগর ও লোহিত সাগরকে একত্রিত করেছে এবং এশিয়া ও আফ্রিকার সমভূমিকে পৃথক করেছে। বর্তমানে এর দৈর্ঘ্য ১০৭ মাইল, প্রস্থ ১৯৭ ফুট, গভীরতা ৪২.৫ ফুট। ১৮৬৯ সালের ১৬ নভেম্বর বর্তমান খালটি চালু করা হয়। সুয়েজ খাল খননের ইতিহাস চার হাজার বছরের প্রাচীন। খ্রি : পূ: ২০০০ সালের ফেরআউন ১ম Sesostris এই খাল খনন করেন। টলেমির যুগ এবং রোমান যুগ পর্যন্ত এ খালটি চালু ছিল। <b>ইসলামের ২য় খলিফা হযরত উমরের আমলে মিসর বিজেতা আমর ইবনুল আস এ খালের সংস্কার করেন। তবে হযরত উমর রা. পরবর্তীতে আমর ইবনুল আসকে এ খালের পুনসংস্কারে নিরুৎসাহিত করেন। কারণ তাঁর আশঙ্কা ছিল, এই খালের পথে ইউরোপীয় জলদস্যুরা আরব ভূমিতে এসে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে। ৮ম শতাব্দীতে আব্বাসীয় খলিফা আল মানসুর সামরিক কারণে এই খালটি বন্ধ করে দেন।</b>


১৭৯৮ সালে ফরাসি সম্রাট নেপোলিয়ান বোনাপার্ট মিসর দখল করেন। যদিও ফ্রান্স বেশিদিন মিসর দখলে রাখতে সক্ষম হয়নি তবুও মিসরের সাথে পরবর্তীতে ফ্রান্সের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ স্থাপিত হয়। এ সূত্রে ফরাসি কোম্পানি “Societe d’ Etudes pour le canal de suez” সুয়েজ খাল খনন কার্যক্রম শুরু করার পরিকল্পনা করে কিন্তু নিরাপত্তার কারণে মিসর শাসক মুহাম্মদ আলী পাশা ও পরবর্তীতে খেদিভ আব্বাস এর বিরোধিতা করায় উক্ত কোম্পানির প্রয়াস ব্যর্থ হয়। কিছু দিনের মধ্যেই খেদিভ আব্বাস দেশী-বিদেশী চক্রান্তে নিহত হন। তাঁর স্থলে ক্ষমতাসীন হন খেদিভ সাঈদ পাশা। তৎকালীন ফরাসি সম্রাজ্ঞীর ভাই “Fedinand le lesseps ছিলেন খেদিভ সাঈদ পাশার অন্তরঙ্গ বন্ধু। তিনি সুয়েজ খাল খননে সাঈদ পাশাকে রাজি করার জন্য বলেছিলেন, “Your name will be on, when the name of Kings who built pyramid are forgotten’  অর্থাৎ ‘যখন মানুষ পিরামিড নির্মাতা মিসরের রাজাদের কথা ভুলে যাবে তখনো লোকেরা সুয়েজ খাল খননের জন্য তোমাকে স্মরণ করবে।” (সূত্র :Rifat Bey, The anakening of Moder Egypt- Page 127)
(পাঠকবৃন্দ, পরবর্তী আলোচনায় আপনারা দেখতে পাবেন সাম্রাজ্যবাদী ফরাসি নাগরিক লেসেপস-এর সহিত সাঈদ পাশার বন্ধুত্বের ঋণ মিসরবাসী অনেক রক্তের বিনিময়ে এখনো শোধ করতে পারেনি।) সাঈদ পাশা খাল খননে রাজি হওয়ার পর ফরাসি সংস্থা ‘Compagnee
Universelle’  খাল খননের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং নিম্ন লিখিত শর্ত মোতাবেক উভয়পক্ষের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।


শর্তাবলী:
১. সুয়েজ খাল ৯৯ বছর পর্যন্ত ফরাসি কোম্পানির অধিকারে থাকবে। এর ৬০ ভাগ শেয়ারের মালিক হবে ফ্রান্স, ৪০ ভাগের মালিক হবে মিসর।
২. মিসরকে ১,৭৬,৬০২টি শেয়ার ক্রয় করতে হবে যা ইংল্যান্ড, অস্ট্রিয়া ও আমেরিকার নিকট হস্তান্তরযোগ্য নয়।
৩. খনন কাজে প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির চার-পঞ্চমাংশ সরবরাহ করবে মিসর এবং এর নিরাপত্তার জন্য খাল এলাকায় ২০ হাজার মিসরীয় সৈন্য মোতায়েন রাখতে হবে।
৪. বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য মিসরের খরচে নীলনদ থেকে সুয়েজ এলাকা পর্যন্ত খাল খনন করতে হবে।
৫. খাল খননের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের খরচ স্বাগতিক দেশ হিসেবে মিসরকে বহন করতে হবে। 
৬. নিট লভ্যাংশের ১৫% পাবে মিসর।
<b>সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা চুক্তির পরিণতি তৃতীয় বিশ্বের রাষ্ট্রনায়ক ও আমলাগণ সাদা চামড়ার লোকদের প্রশংসা পেতে সর্বদা চাতক পাখির ন্যায় হাঁ করে থাকে। কিন্তু সাম্রাজ্যবাদীরা যে কখনো বিদেশী দেশপ্রেমিকদের প্রশংসা করতে জানে না এক কথাটা আমরা ভুলে যাই। আমাদের দেশের হীনম্মন্য রাজনৈতিক, আমলা ও বুদ্ধিজীবীর ক্ষেত্রেও দেখা যায় প্রেসিডেন্ট বুশ এ সরকারের কার্যক্রমে  প্রশংসা করেছেন, অমুক আমলা বা বুদ্ধিজীবীকে পুরস্কৃত করছেন এ কথা টেলিভিশনের পর্দায় বার বার দেখানো হয়। সাম্রাজ্যবাদীরা এ সকল হীনমনা লোকদেরকে সহজে ফাঁদে ফেলে। ফরাসি নাগরিক লেসেপস-এর প্রশংসাসূচক কথায় বিগলিত হয়ে সাঈদ পাশা কিরূপে খাল কেটে কুমির এনে মিসরবাসীকে উক্ত কুমিরের খাদ্যে পরিণত করেছিল তার ইতিহাস নিম্ন রূপ :</b>
১. উক্ত খাল খননে ১২০০০ মিসরি নিহত হয়। এতে গণঅসন্তোষ দেখা দিলে মিসর সরকার শ্রমিক সরবরাহ হ্রাস করে। তখন ফরাসি সরকার মিসরকে চুক্তির শর্ত লঙ্ঘনের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করে এবং ৪ কোটি ফ্রঁ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করে।
২. খাল খনন বাবদ মিসর সরকার ১ কোটি ৮০ লাখ পাউন্ড ব্যয় করে এবং জাঁকজমকপূর্ণ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান ও মেহমানদারিতে ব্যয় হয় আরো ১০ লক্ষাধিক পাউন্ড।
৩. এ সকল ব্যয় নির্বাহ করতে গিয়ে মিসর সাম্রাজ্যবাদীদের ঋণের জালে জড়িয়ে পড়ে। চক্রবৃদ্ধি হারে ঋণের পরিমাণ বেড়ে ১৮৭৫ সাল নাগাদ এর পরিমাণ ৯ কোটি ১০ লাখ পাউন্ডে উন্নীত হয়। এবার শুরু হয় ঋণ পরিশোধের অব্যাহত চাপ। ঋণদাতাদের চাপে মিসর সরকার স্বীয় সকল শেয়ার মাত্র ৪০ লাখ পাউন্ডের বিনিময়ে ইহুদি শিল্পপতি রথচাইল্ডের নিকট বিক্রয় করতে বাধ্য হয়। ১৮৭৯ সাল নাগাদ মিসর তার প্রাপ্য লভ্যাংশের ১৫ শতাংশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। (সুতরাং আমরা দেখতে পাচ্ছি, নীল নদ থেকে সুয়েজ খাল পর্যন্ত দীর্ঘ খাল খনন, ৪ কোটি ফ্রাঁ ক্ষতিপূরণ, ৯ কোটি ১০ লক্ষ পাউন্ড ঋণ পরিশোধ, দীর্ঘ ১০ বছর ২০ হাজার সৈন্যের পাহারা, ১২ হাজার মিসরীয় মৃত্যুর বিনিময় স্বরূপ মিসরের নিট প্রাপ্য দাঁড়ালো সকল অধিকার পরিত্যাগ করে ৪০ লাখ পাউন্ড অর্জন। (সাম্রাজ্যবাদী চুক্তির ফাঁদে পা দিলে এমনই হয়।) কিন্তু পাঠকবৃন্দ এখানেই শেষ নয়।
৪. ব্রিটেনের প্রতিপক্ষ ফ্রান্সের সাথে সুয়েজ খাল খনন চুক্তি করায় ব্রিটেন মিসর সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষিপ্ত হয়ে ১৮৮২ সালে ‘তেল-এল-কবিরের’ যুদ্ধ শুরু করে এবং মিসরে স্থায়ীভাবে সেনাশিবির গড়ে তোলে।
৫. সুয়েজ খালের ভবিষ্যত নিরাপত্তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে ইউরোপীয় শক্তিবর্গ ১৮৮৮ সালে কন্সট্যান্টিনোপলে ‘সুয়েজ খাল কনভেনশনে মিলিত হয় এবং মিসর সরকারকে একটি চুক্তি স্বাক্ষরে বাধ্য করে। উক্ত চুক্তির বিষময় ফলাফল ছিল মিসর ১৯০৪ সাল পর্যন্ত ব্রিটেনের আশ্রিত রাজ্য হিসেবে থাকতে বাধ্য হওয়া।
৬. প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়কালে (১৯১৪-১৭ খ্রি:) ব্রিটেন সুয়েজ খাল এলাকায় বিশাল সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ করে। ১৯২২ খ্রি: ব্রিটেন সুয়েজ খালকে ব্রিটেনের নিজস্ব সম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে। মিসরীয়দের প্রবল আন্দোলন-সংগ্রামেও ব্রিটেন সুয়েজ এলাকা ত্যাগ করতে রাজি হয়নি।
৭. মিসর পার্লামেন্ট ১৯৫১ সালে ফারুককে মিসরের বাদশাহ হিসেবে ঘোষণা করে। বাদশাহ ফারুক সুয়েজ খাল বিষয়ক ১৯৩৬ সালের অসম চুক্তি বাতিল করেন। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেন মাইনাস ফর্মুলা নিয়ে অগ্রসর হয়। বাদশাহ ফারুক ১৯৫২ সালে জেনারেল নাজিব কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত হন। জনমতের চাপে তিনিও ব্রিটেনকে সুয়েজ এলাকা ত্যাগ করতে চাপ সৃষ্টি করেন। আবার শুরু হলো সাম্রাজ্যবাদী মাইনাস ফর্মুলার চক্রান্ত। ১৯৫৪ সালে কর্নেল জামাল আবদুন নাসের কর্তৃক জেনারেল নাজিব ক্ষমতাচ্যুত হন।
৮. কর্নেল নাসের ১৯৫৬ সালে মিসরের প্রেসিডেন্ট পদ দখল করেন। রুশপন্থী নাসের সমাজতান্ত্রিক শিবির থেকে অস্ত্র আমদানি শুরু করলে ক্ষিপ্ত ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্র নীলনদের উপর নির্মাণাধীন আসওয়ান বাঁধের জন্য বরাদ্দকৃত ঋণ প্রত্যাহার করে। নাসের সুয়েজ খাল জাতীয়করণ করে উক্ত খালের আয় দ্বারা আসওয়ান বাঁধ নির্মাণের কাজ অব্যাহত রাখেন। এমতাবস্থায় ব্রিটেন, ফ্রান্স ও ইসরাইল মিসর আক্রমন করে। ১৯৬৭ এবং ১৯৭০ সালের আরব-ইসরাইল যুদ্ধের প্রধান কারণও ছিল সুয়োজ খালের কর্তৃত্ব লাভ। অদ্যাবধি মিসরীয় জনগণ নিজ দেশে পরবাসীর ন্যায় জীবনযাপন করছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এখনো নিজেদের তল্পিবাহক হোসনি মোবারককে মিসরের ক্ষমতায় বহাল রেখেছে। উক্ত হোসনি মোবারককে মিসরের ক্ষমতায় বহাল রেখেছে। উক্ত হোসনি মোবারক ও তার পূর্বসূরি আনোয়ার সা’দতের কাজ হলো পাশ্চাত্যের সেবাদাসত্ব করা, নিজ দেশের জনগণ ও মুসলিম বিশ্বের সর্বনাশ সাধন করা। (তথ্য সূত্র : ১. Rifat Bey, The anakening of modern Egypt. 2. William Benton, Encyelopaedia Britanica ৩. ইসলামী বিশ্বকোষ, ২.৪শ খণ্ড ২য় ভাগ, পৃ: ৫১৭-৫২৪।)


এই হলো মিসরের খেদিভ ইসমাইল পাশার খাল কেটে কুমির আনার গল্প। মিসরবাসী ও ফিলিস্তিনিরা আজও উক্ত খাল কেটে কুমির আনার ঋণ শোধ করছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে অসম চুক্তির বিষময় ফল এরকমই হয়। তেলসমৃদ্ধ নাইজেরিয়া অদ্যাবধি দরিদ্র দেশের তালিকায় রয়েছে শুধুমাত্র সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে অসম চুক্তির জালে জড়িয়ে পড়ার জন্য। তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্র নায়কের এর থেকে শিক্ষা নেয়া উচিত।


২. পানামা খাল:
১৯১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র ৩৮ কোটি ডলার ব্যয়ে এ খাল খনন শুরু করে এবং ১৯১৪ সালে এটি চালু করা হয়। এই খাল প্রশান্ত মহাসাগরকে আটলান্টিক মহাসাগরের সাথে যুক্ত করেছে। এই খাল খনন পানামাবাসী ও মধ্য আমেরিকার দেশ কলম্বিয়াকে এখনো মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তাবেদার কলোনি হিসেবে থাকতে বাধ্য করেছে।


১৮২১ সাল থেকে পানামা কলম্বিয়ার একটি রাজ্য হিসেবে ছিল। যুক্তরাষ্ট্র পানামা খাল খনন পরিকল্পনা গ্রহণ করার পর পানামাকে কলম্বিয়া থেকে আলাদা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সিদ্ধান্ত মোতাবেক পানামাবাসীদের মধ্য থেকে কিছুসংখ্যক স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি সংগ্রহ করে। উক্ত স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি পানামাকে কলম্বিয়া থেকে স্বাধীন করার আন্দোলন শুরু করে। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থে, অস্ত্রে ও সক্রিয় সহযোগিতায় বলীয়ান হয়ে ১৯০৩ সালে পানামা কলম্বিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে স্বাধীনতা! লাভ করে এবং স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি পানামার ক্ষমতা দখল করে।<b> ১৯০৪ সালে স্বাধীনতার চেতনা সম্পন্ন পানামা সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সাথে একটি মহান চুক্তিতে আবদ্ধ হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কলোনিতে পরিণত হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র পানামা খাল, খাল অঞ্চলের ৩ লাখ ৬০ হাজার ২৪০ একর ভূমির ব্যবহার ও যাবতীয় স্বত্বাধিকার লাভ করে। চুক্তির আর একটি শর্ত মোতাবেক যুক্তরাষ্ট্র পানামার প্রধান সড়ক ও রেলপথের নিয়ন্ত্রণ লাভ করে।</b>


উক্ত অসম চুক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনচেতা পানামাবাসী তুমুল আন্দোলন শুরু করে কিন্তু স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তির সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতায় উক্ত আন্দোলন কঠোরহস্তে দমন করে। এতদসত্ত্বেও ১৯০৩, ১৯৫৫ ও ১৯৬৪ সালে পানামাবাসীদের সাথে মার্কিন সৈন্যদের ব্যাপক সংঘর্ষ ঘটে। তখন থেকে অদ্যাবধি যুক্তরাষ্ট্রের পুতুল সরকারগণই পানামা শাসন করছে। ১৯৮০র দশকে প্রেসিডেন্ট নরিয়েগা পানামাবাসীর স্বার্থ সংরক্ষণের পদক্ষেপ গ্রহণ করলে যুক্তরাষ্ট্র নরিয়েগাকে মাদক চোরাচালানে জড়িত থাকার অভিযোগ করে এবং মার্কিন সেনাবাহিনী পানামার প্রেসিডেন্ট নরিয়েগাকে পানামা থেকে ধরে নিয়ে যায়। আজও নরিয়েগা যুক্তরাষ্ট্রের কারাগারে মাদক চোরাচালানি হিসেবে আটক রয়েছে। <b>নরিয়েগাকে আটক করার পর পানামাব্যাপী তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি হয়। উক্ত অসন্তোষের প্রতিক্রিয়া থেকে রক্ষা পেতে যুক্তরাষ্ট্র ৩১ ডিসেম্বর ১৯৯৯ সালে পানামা খালের কর্তৃত্ব পানামা সরকারের নিকট প্রত্যর্পণ করে কিন্তু পানামা সরকারের কর্তৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র এখনো বহাল রয়েছে। বন্ধুগণ, স্বাধীনতার সপক্ষ শক্তি কিভাবে নিজ দেশকে সাম্রাজ্যবাদের পদতলে সমর্পণ করে তার জ্বলন্ত উদাহরণ পানামা নামক দেশটি।</b>


পাঠকবৃন্দ, সুয়েজ খাল ও পানামা খাল কাটার গল্প ও কুমিরের গল্প শুনলেন। এগুলো হলো প্রাকৃতিক খাল। এর বাইরে রয়েছে অর্থনৈতিক খাল কেটে কুমির আনা, সাংস্কৃতিক খাল কেটে কুমির আনা এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক খাল কেটে কুমির আনার গল্প। পৃথিবীর বহু জাতি এরূপ এক বা একাধিক খাল কেটে কুমির এনে স্বীয় দেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে হারিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে।
<b>রাজনৈতিক খাল কেটে কুমির আনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশের রাজনীতিকগণ অতিশয় পারদর্শী। নিজেদের রাজনৈতিক মতপার্থক্য দূর করতে আমরা বিদেশী দূতাবাসে ধরনা দিই, বিদেশে মিছিল-মিটিং, স্মারকলিপি দিয়ে বিদেশীদেরকে নিজেদের দেশের রাজনীতিতে নাক গলানোর সুযোগ করে দিই। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের দেওয়া এ সুযোগ লুফে নেয়। আর তাই আমাদের দেশের সকল রাজনৈতিক বিশৃঙ্খলা ও অসন্তোষে বিদেশীরা সাগ্রহে হস্তক্ষেপ করে চলেছে। আমাদের নেতৃবৃন্দের এ সকল অবার্চীন কার্যকলাপের ফলে আমাদের সুখ, সমৃদ্ধি ও অগ্রগতি আজ হুমকির সম্মুখীন। আমাদের যেসব নেতানেত্রী রাজনৈতিক খাল কেটে বিদেশী কুমিরদেরকে এদেশে এনেছেন তাদের অনেকেই এবং তাদের প্রতিপক্ষরা এখন কুমিরের ছোবলে আহত-অর্ধমৃত। যারা এখনো আহত হননি তাদের আনন্দিত হওয়ার সুযোগ নেই। কেননা কুমির শুধু খেতে চায়। তার খাদ্য তালিকায় বাঙালি না বাংলাদেশী, মৌলবাদী না সংস্কারবাদী, বাছবিচার করার নিয়ম নেই। এমতাবস্থায়, আমরা যারা এখনো আহত হইনি তাদের উচিত অবিলম্বে ক্ষমতালোভী রাজনীতিকদের কাটা খালসমূহ কংক্রিটের দেয়াল দিয়ে বন্ধ করা। নইলে আমাদেরকে মিসর ও পানামাবাসীর ভাগ্যবরণ করতে হবে।</b>


এস, এম, নজরুল ইসলাম। 
০১৭১১৭২০৯২৩ 
সম্পাদকঃমাসিক ইতিহাস অন্বেষা।
ঢাকা, ০৮.০৯.০৭

সাম্রাজ্যবাদের তাবেদার সরকার এবং গৃহযুদ্ধ (প্রথম প্রকাশ জানুয়ারী ২০১২ সংখ্যা,মাসিক ইতিহাস অন্বেষা)



প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পূর্বে শক্তিশালী রাজা-বাদশাহ-একনায়ক কর্তৃক দুর্বল প্রতিবেশী দেশ দখল ছিল স্বাভাবিক বিষয়। তখন ‘জোর যার মুল্লুক তার’ নীতিই কার্যকর ছিল। সে সময় বিশাল আকারের ভূমির মালিক রাজশক্তি দূরবর্তী এলাকায় দখলিকৃত ভূখণ্ডে আশ্রিত রাজ্য ও করদ রাজ্য স্থাপন করত। ১ম ও ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদী দেশ দখল প্রক্রিয়া আধুনিকতার মুখোশ পরে এবং দখলে রাখার চেয়ে বিভিন্ন কৌশলে টার্গেটরত দেশের সম্পদ লুণ্ঠন করার নীতি গ্রহণ করে। এ নীতিকে বৈধতা দেয় সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট জাতিসংঘ। এভাবে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ লাভ করে। প্রাচীনকালে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দখলিকৃত দেশের জনগণের ভালো-মন্দ, সুখ-দুঃখের ব্যাপারে কম-বেশি যত্নবান ছিল কিন্তু তথাকথিত আধুনিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তি টার্গেটকৃত দেশের জনগণের সুখ-দুঃখ ভালো-মন্দ বা জীবনমৃত্যু নিয়ে মাথা ঘামায় না। তাদের লক্ষ্যের কেন্দ্র বিন্দু হলো সংশ্লিষ্ট দেশকে লুণ্ঠন করা, গৃহযুদ্ধ লাগিয়ে দেশের জনগণকে নিশ্চিহ্ন বা ভূমিদাসে পরিণত করে ভূখণ্ড-টি অবাধে ব্যবহার করার অধিকার লাভ করা। এ জন্য বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি সংশ্লিষ্ট দেশে ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে অথবা জোরপূর্বক তাবেদার শক্তি প্রতিষ্ঠা করে উক্ত তাবেদারকে দিয়ে দেশপ্রেমিকদের নিশ্চিহ্ন করার লক্ষ্যে গৃহযুদ্ধ বাধায় এবং গৃহযুদ্ধ বন্ধের অজুহাতে সংশ্লিষ্ট দেশে বহুজাতিক বাহিনী অথবা জাতিসংঘ বাহিনী প্রেরণ করে। উক্ত বাহিনীর কাজ হলো তাবেদার পুতুল সরকারকে রক্ষা করা এবং সাম্রাজ্যবাদী লুটপাট নির্বিঘ্ন করা। শোষণলুণ্ঠন নির্বিঘ্ন করার স্বার্থে তাবেদার সরকারের অনুষঙ্গ হিসেবে সংশ্লিষ্ট দেশে গৃহযুদ্ধ অনিবার্যভাবে সংগঠিত হয়। কেননা সংশ্লিষ্ট জাতির আত্মমর্যাদা সম্পন্ন স্বাধীনচেতা জনগণ তাবেদার সরকার ও তার প্রভুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়।


বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির মানসিকতা :
বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির গডফাদার হলো যায়নবাদী ইসরাইল, গডফাদারের বরকন্দাজরা হলো- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন, ফ্রান্স, জার্মানি ও বর্ণবাদী ভারত। বর্ণবাদী ইহুদী ও বর্ণবাদী ব্রাহ্মণ্যবাদের মানসিকতা প্রায় একই অর্থাৎ “ভিন্ন বর্ণের জনগণের সর্বস্ব কেড়ে নেওয়াতে কোনো পাপ নেই, কেননা তাদের বিধাতার নিয়ম হলো- নিম্নবর্ণের জনগণের কোনো সম্পদ থাকা অপরাধ।” যুক্তরাষ্ট্র ও সাদা চামড়ার ইউরোপীয়দের মানসিকতা বোঝার জন্য নিম্নে তাদের কয়েকটি বিখ্যাত উক্তি উল্লেখ করা হলো :
১. “মৃত ইন্ডিয়ানদের চেয়ে ভালো ইন্ডিয়ান আমি আর কখনও দেখিনি” (আমেরিকার মাটি থেকে রেড ইন্ডিয়ানদের নিশ্চিহ্ন করার যুদ্ধে নিয়োজিত জেনারেল শেরিডানের উক্তি। এটা বর্তমানে আমেরিকানদের জনপ্রিয় প্রবচন)। (সূত্র : বই, আমারে কবর দিও হাঁটুভাঙ্গার বাঁকে, মূল : ডি ব্রাউন, অনুবাদ : দাউদ হোসেন, পৃ-১৪৮), ১ম সংস্করণ-১৯৯৭।
২. মার্কিন সেনাপতি, শিল্পপতি ও কংগ্রেসম্যান নিজেদের অস্ত্র ব্যবসার স্বার্থে বিশ্বে যুদ্ধ জিইয়ে রাখবে। (দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মার্কিন সেনাপতি ও পরবর্তীতে প্রেসিডেন্ট জেনারেল আইসেন হাওয়ার)।
৩. আগামীকাল যদি সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাসাগরে ডুবে বিলীন হয়ে যায় তবুও মার্কিন সামরিক শিল্প টিকে থাকা চাই আগের মতো, যে পর্যন্ত না অন্য কোনো প্রতিপক্ষ আবিষ্কার করা যায়। (উল্লেখ্য, বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি প্রতিপক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করেছে উদীয়মান মুসলিম বিশ্ব ও চীনকে।) (জন কেনান, স্নায়ুযুদ্ধের রণকৌশলবিদ)
৪. আমরা বোমা বানাতে চাই- তাই আগে শত্রু বানাই। (স্যার সাইমন জেন্কিন্স, দি টাইমস এবং লন্ডন ইভিনিং-এর সাবেক সম্পাদক।)
৫. শান্তি দুর্বলের জন্য, প্রকৃত মানুষেরা বোমা কেনে আর সেগুলো উপর থেকে ফেলে। (মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী রবার্ট গেটস এর বিদায়ী ভাষণ থেকে) উল্লেখ্য, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন যতদিন কম্যুনিস্ট শাসনাধীন ছিল ততদিন তারাও সাম্রাজ্যবাদী ছিল। সমাজতন্ত্রের তাত্ত্বিক কার্ল মার্কস থেকে শুরু করে রুশ কম্যুনিস্টদের প্রায় সকল নেতাই ছিল যায়নবাদী ইহুদী।
উপরোক্ত ৩ ও ৪নং উক্তির অনুষঙ্গ হিসেবে মার্কিন বুদ্ধিজীবী হান্টিংটন রচনা করে “সভ্যতার সংঘাত” থিওরী। সোভিয়েত ইউনিয়নের সলিল সমাধির পর হান্টিংটনের নির্দেশনা মোতাবেক উদীয়মান মুসলিম বিশ্ব ও চীন হয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নতুন প্রতিপক্ষ। তখন থেকে বোমা বানিয়ে উপর থেকে নিক্ষেপ করা হচ্ছে মুসলিম বিশ্বের উপর এবং একশ্রেণীর নামধারী মুসলিম, (যারা ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, ধর্ম ব্যবসায়ী ও কম্যুনিস্ট হিসেবে পরিচিত) সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দোসর ও তাবেদার হিসেবে নিজ দেশ ও জনগণকে সীমাহীন দুর্দশায় নিমজ্জিত করেছে ও করার চেষ্টা করছে। পাশাপাশি চীনকেও চতুর্দিক থেকে ঘেরাও করার কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।


বর্তমান সাম্রাজ্যবাদীদের মুসলিম দেশ দখল প্রক্রিয়া :
যায়নবাদী ইহুদীগণ কর্তৃক রচিত উনবিংশ শতাব্দীর বিভিন্ন মতবাদ যথা- ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মতবাদ, সমাজতান্ত্রিক মতবাদ, ডারউইনিজম, ভৌগোলিক, আঞ্চলিক, ভাষাগত জাতীয়তাবাদী মতবাদসমূহ এবং বস্তুবাদী ও ভোগবাদী সভ্যতা উন্নত তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে সারা বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিশ্বের প্রতিটি দেশে নীতি-নৈতিকতাহীন পাশ্চাত্যপন্থী অসংখ্য তাবেদার সৃষ্টি হয়। চরিত্রহীন, লম্পট, মদ, নারী ও নেশায় আকণ্ঠ নিমজ্জিত এসব মেরুদ-হীন লোভী ব্যক্তিদেরকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি দেশে বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে প্রতিষ্ঠিত করে। সময় সুযোগ মতো এদেরকে অর্থ-বিত্ত ক্ষমতার লোভ দেখিয়ে নিজ দেশ ও জনগণের সর্বনাশ সাধনে কাজে লাগায় এবং এদেরকে দিয়ে তাবেদার সরকার ও দল গঠন করে। যে সকল সেক্টর থেকে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের এজেন্ট রিক্রুট করে তা হলো :
নৈরাজ্যবাদী কম্যুনিস্ট, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী দল ও গোষ্ঠী, জাতিসংঘ-বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ-আমেরিকান সিটি ব্যাংক-এর সংশ্লিষ্ট দেশের কর্মচারী, সাম্রাজ্যবাদী দেশ কর্তৃক পরিচালিত বহুজাতিক কোম্পানি ও এনজিওর কর্মচারী, গোত্রীয় জাতিগত ধর্মীয় সংখ্যালঘু গোষ্ঠী, পাশ্চাত্যপন্থী বুদ্ধিজীবী, চরিত্রহীনলম্পট-অর্থ আত্মসাৎকারী ব্যক্তি, পলাতক সন্ত্রাসী, নেশাখোর ব্যক্তি, দুর্নীতিপরায়ণ ও লোভী রাজনীতিক-সামরিক কর্মকর্তা- আমলা ও ব্যবসায়ী, যায়নবাদী ইহুদীগণ কর্তৃক পরিচালিত লায়ন ও রোটারী ক্লাব সদস্য, কাদিয়ানী ও বাহাই সম্প্রদায়, ইসকন,ধর্ম ব্যবসায়ী মোল্লাহ, সংখ্যালঘু ফেরকার লোকজন যথা- বিদেশী মদদপুষ্ট পীর-ফকির-কবর পূজারী-মাযার পূজারী ইত্যাদি সেক্টরের স্বদেশী ব্যক্তিবর্গ। বর্তমান বিশ্বের সকল তাবেদার দল ও সরকারের শ্রেণীচরিত্র একই। সাম্রাজ্যবাদীরা সব সময় সংখ্যালঘু ও চরিত্রহীনদের নিয়ে তাবেদার দল ও সরকার গঠন করে। যাতে সংখ্যালঘুদের নিয়ে গঠিত সরকার সংখ্যাগুরুদের ভয়ে সাম্রাজ্যবাদের পক্ষপুটে আশ্রয় নিয়ে করদ রাজ্যে বা আশ্রিত রাষ্ট্রে পরিণত হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি প্রমাণিত হবে-
১. আমাদের ফখরুদ্দীন, ভারতের মনমোহন সিং, আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই ও ইরাকের নূরী আল মালিকী বিশ্বব্যাংক ও বহুজাতিক কোম্পানি কর্মকর্তা ছিলেন।
২. ভারত ত্যাগের প্রাক্কালে সাম্রাজ্যবাদী বৃটেন ভারতের সংখ্যালঘু ব্রাহ্মণদের নিকট (যারা তখন ছিল ৭% এবং বর্তমানে ৯%) ভারতের শাসনভার হস্তান্তর করে। এই সংখ্যালঘুরা ভারতের সংখ্যাগরিষ্ঠ ৯১% লোকের ভয়ে সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা-ইসরাইল ও বৃটেনের সাথে গাঁটছড়া বেঁধে ক্ষমতা চিরস্থায়ী করার প্রচেষ্টায় লিপ্ত।
৩. ২য় বিশ্বযুদ্ধের পর সাম্রাজ্যবাদী শক্তি বিভিন্ন দেশে যাদেরকে
ক্ষমতাসীন করে তারা ছিল সংখ্যালঘু। যথা-
(ক) সিরিয়ায় যে হাফেজ-আল আসাদ সরকার প্রতিষ্ঠা করা হয় সে সরকারের শাসক সম্প্রদায়, বড় ব্যবসায়ী ও সামরিক কর্মকর্তারা আলভী শিয়া (মাত্র ৭%) অথচ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ সুন্নি মতাবলম্বী।
(খ) বাহরাইনের সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শিয়া কিন্তু শাসক সম্প্রদায় সুন্নি।
(গ) মিসরের চলমান নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে- সে দেশের ৬৫% জনগণ ইসলামপন্থী; এমতাবস্থায় মিসরে যাতে ইসলামপন্থীরা ক্ষমতাসীন হতে না পারে সে লক্ষ্যে কাজ করছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। ফিলিস্তিন ও আলজেরিয়ার ইতিহাসও একইরূপ।


তাবেদার সরকারের দেশে গৃহযুদ্ধ বাধানোর নিয়ম :
পূর্বেই বলা হয়েছে কিরূপ শ্রেণীচরিত্রের লোকজন দিয়ে টার্গেটকৃত দেশে তাবেদার দল, জোট ও সরকার গঠন করা হয়। যেহেতু ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে সংখ্যালঘুদেরকে দিয়ে তাবেদার সরকার গঠন করা হয় সেহেতু সংখ্যাগুরু দেশপ্রেমিক জনগণ তাবেদার সরকার ও তার প্রভুর বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায়। এমতাবস্থায় তাবেদার সরকার ক্ষমতা হারানোর ভয়ে সাম্রাজ্যবাদের সাথে দেশবিরোধী গোলামী চুক্তি করে, দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও মর্যাদাকে সাম্রাজ্যবাদের পদতলে বিসর্জন দেয়। এমতাবস্থায় সংখ্যাগুরু সংখ্যালঘু দ্বন্দ্ব উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেতে থাকে। এ সময় প্রভু রাষ্ট্রের প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী তাবেদার সরকার এমন সব পদক্ষেপ গ্রহণ করে, যা দেশকে গৃহযুদ্ধে নিমজ্জিত করে। পদক্ষেপসমূহ হলোঃ
১. দেশপ্রেমিক জনগণের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দকে বিভিন্ন অজুহাতে আটক করে এবং বিচারের নামে তাদেরকে নিশ্চিহ্ন করার পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
২. সংখ্যাগুরু দেশপ্রেমিক শক্তিকে শক্তিহীন করার জন্য দেশব্যাপী গুপ্তহত্যা, গুম, হামলা-মামলা ও অরাজকতা সৃষ্টি করে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে।
৩. পারিবারিকীকরণ, গোত্রীয়করণ, আত্মীয়করণ ও দলীয়করণের মাধ্যমে দেশের সামর্থ, সম্ভাবনা, বিশ্বাসযোগ্যতা, সুশাসন সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে আসে এবং দেশ দুর্বল ও পঙ্গু হয়ে সাম্রাজ্যবাদের আকাংখা  পূরণ করতে বাধ্য হয়।
৪. সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে অধীনতামূলক মিত্রতা চুক্তি করে ক্ষমতাকে দীর্ঘস্থায়ী করার প্রচেষ্টা নেয়া হয়। প্রতিবাদীদেরকে কঠোরহস্তে দমন করা হয়, মানবাধিকার ও নাগরিক অধিকার ভূলুণ্ঠিত হয়, দেশপ্রেমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায় এবং মরণপণ প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু হয়।
৫. প্রতিরোধ আন্দোলন নস্যাত করার জন্য বিভিন্ন কৌশলে মধ্যবিত্তের কোমর ভেঙে দেয়া হয়, লুটপাট ও অর্থপাচারের মাধ্যমে দেশকে তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত করা হয় যাতে দেশে দুর্ভিক্ষ, অস্থিতিশীলতা ও গৃহযুদ্ধ শুরু হয়।
৬. আইন বিভাগ, শাসন বিভাগ ও বিচার বিভাগকে সাম্রাজ্যবাদের অনুকূলে সাজানো হয়, যাতে দেশপ্রেমিক সুনাগরিকরা কোথাও আশ্রয় বা বিচার না পায়। দুষ্টের লালন ও শিষ্টের দমন তাবেদার সরকারের স্থায়ী নীতিতে পরিণত হয়।
৭. সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট তাবেদার সরকারটির জনপ্রিয়তা তলানীতে এসে পৌঁছলে অস্বাভাবিকভাবে প্রধান তাবেদারকে সরিয়ে অধিকতর খারাপ ও নৃশংস অপর তাবেদারকে ক্ষমতাসীন করে সরকার গঠন করা হয়। এমতাবস্থায় গৃহযুদ্ধ চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়।


টার্গেটকৃত দেশকে কেন গৃহযুদ্ধে নিক্ষেপ করা হয়
১. টার্গেটকৃত দেশকে ভিতর থেকে ধ্বংস করা এবং দেশের প্রতিরোধ শক্তিকে ধ্বংস করাই এর প্রধান লক্ষ্য।
২. সাম্রাজ্যবাদীদের দরকার দেশটির সম্পদ ও ভূরাজনৈতিক অবস্থান। দেশটির জনগণ কতজন আহত-নিহত-পঙ্গু-বিধবা ও উদ্বাস্তু হলো তা দেখার দায়িত্ব সাম্রাজ্যবাদীদের নয়।
৩. নিরাপত্তাহীনতায় নিমজ্জিত ও ভবিষ্যতে বিচারের সন্মুখীন হওয়ার ভয়ে ভীত দুর্বল তাবেদার সরকারের উপর অনবরত চাপ সৃষ্টি করে বেশি বেশি স্বার্থ হাসিল করা।
৪. গৃহযুদ্ধ থামানোর নামে জাতিসংঘ বাহিনী বা আঞ্চলিক বাহিনী নিয়ে টার্গেটকৃত দেশের গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক অবস্থান দখল করা ও সর্বাত্মক লুণ্ঠনকে স্থায়ী করা।


তাবেদার সরকারের বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপঃ
১. যে সরকার দেশের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দেয় এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন ও চাহিদা পূরণকে অগ্রাধিকার দেয়।
২. এ সরকারের বিদেশনীতি ও বাণিজ্যনীতি প্রণীত হয় সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খার অনুকূলে এবং দেশ ও জনগণের আশা-আকাংখা, লাভ-ক্ষতি, ইতিহাস-ঐতিহ্যের প্রতিকূলে। তাবেদার সরকারের প্রধান শিখণ্ডী, তার পরিবার ও দলের অনুকূলে এবং দেশপ্রেমিক জনগণের প্রতিকূলে।।
৩. এ সরকার নিজেদের ব্যক্তি স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থ ও দলীয় স্বার্থ চাপিয়ে দেয় রাষ্ট্রের ঘাড়ে।
৪. সৎ, দক্ষ, অভিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক নাগরিকরা এ সরকার কর্তৃক নির্মম-নিষ্ঠুর নিপীড়নের শিকার হয় এবং লোভী, অসৎ, চোর- ডাকাত সমাজ ও দেশবিরোধীরা হয় পুরস্কৃত।
৫. এ সরকার সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সাথে বিভিন্ন গোলামী চুক্তিতে দেশকে আবদ্ধ করে। তন্মধ্যে অন্যতম হলো তাবেদার সরকারের গদিরক্ষা চুক্তি।
৬. জনগণের মৌলিক অধিকার, মানবিক অধিকার ও নাগরিক অধিকারকে পদদলিত করে।
৭. এ সরকারের সদস্যগণ হয় নিষ্ঠুর-অমানবিক ও লুটেরা।সাম্রাজ্যবাদ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত আফগানিস্তানের হামিদ কারজাই-এর তাবেদার সরকার ও ইরাকের নূরী আল মালিকীর তাবেদার সরকারের সদস্যদের হাজার হাজার কোটি ডলারের অর্থ আত্মসাতের ঘটনাই এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। ধ্বংসপ্রায় স্বদেশ পুনর্গঠনের অর্থ আত্মসাৎ করতে এদের বিবেকে বাধে না।


সাম্রাজ্যবাদের কবল থেকে দেশ উদ্ধারে ও স্বীয় অস্তিত্ব রক্ষায় করণীয়ঃ
১. দেশপ্রেমিক দলসমূহের অভ্যন্তরে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে থাকা বিদেশী এজেন্টদেরকে চিহ্নিত করে বহিষ্কার করে দলকে পরিশুদ্ধ করা ও দলীয় কর্মী বাহিনীকে দলীয় আদর্শের অনুকূলে কার্যকর প্রশিক্ষণ প্রদান।
২. দলমতের উর্ধ্বে উঠে সকল দলমত ও সেক্টরের সৎ, সাহসী, অভিজ্ঞ ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তিদের নিয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ প্লাটফরম গঠন।
৩. সাহসী, অভিজ্ঞ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তিদের নিয়ে আন্তর্জাতিক মানের থিংক ট্যাংক গঠন। উক্ত থিংক ট্যাংক জাতিকে দিকনিদের্শনা দেবে ও বিশ্বের সকল স্বাধীনতাকামীদের সাথে সেতু বন্ধন স্থাপন করবে।
৪. রোগের উপসর্গের চিকিৎসায় সময়, শ্রম ও অর্থ বিনষ্ট না করে মূল রোগের চিকিৎসায় সর্বশক্তি নিয়োগ করা অর্থাৎ তাবেদার সরকার উৎখাত করাই হবে একমাত্র এজেন্ডা।
৫. গ্লোবাল রাজনৈতিক আবহাওয়া বিশ্লেষণ করে সম্ভাব্য আসন্ন দুর্যোগ মোকাবেলায় দেশপ্রেমিকদেরকে সজাগ-সতর্ক করা ও প্রাক-প্রস্তুতি গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করা।
৬. বর্ণবাদী ও বস্তুবাদী সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিকট পদানত হলে কিরূপ ভয়াবহ অবস্থায় পড়তে হবে তা অতীত ও বর্তমান ইতিহাসের আলোকে জাতিকে জানানো ও সজাগ করা।
<b>মনে রাখতে হবে, দেশ স্বাধীন-সার্বভৌম থাকলে আমি থাকব, আমার বর্তমান পদ-পদবী, ব্যবসা-বাণিজ্য-ভূখ- অস্তিত্ব টিকে থাকবে ও উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যাবে। পক্ষান্তরে দেশ যদি সাম্রাজ্যবাদের হাতে পুরোপুরি চলে যায় তবে আমার পদ- পদবী, ব্যবসা-বাণিজ্য, ভূখ-, বাড়ি-গাড়ি, বালাখানা, পোশাকপরি” ছদ কিছুই থাকবে না। এমনকি ইরাক-আফগানিস্তানের জনগণের ন্যায় আমাদের লাশ শৃগাল-কুকুরের খাদ্যে পরিণত হবে। আর গৃহযুদ্ধ হলো দুনিয়ার জীবনে মানুষের জন্য সবচেয়ে বড় খোদায়ী গজব।</b>


এস, এম, নজরুল ইসলাম।
০১৭১১৭২০৯২৩
সম্পাদকঃমাসিক ইতিহাস অন্বেষা।