Monday, January 16, 2012

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মতবাদ- মুসলিম বিশ্বের মরণফাঁদ(প্রথম প্রকাশ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা, অক্টোবর ২০০৭)


বাস্তবে বর্তমান বিশ্বে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী চার প্রকার। যথা খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, হিন্দু ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী, বৌদ্ধ ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী ও মুসলিম ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী। খ্রিস্টান ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীরা খ্রিস্টান বিশ্ব বাদ দিয়ে বিশ্বের অন্যান্য ধর্মের অনুসারী জাতিসমূহের সর্বনাশ সাধন করার জন্য সদা সর্বদা তৎপর থাকে। অপর দেশ গ্রাস করার লক্ষ্যে এরা প্রথমে নিজেদের ধর্মযাজকগণকে সংশ্লিষ্ট দেশে ধর্ম প্রচারে পাঠায়। উক্ত যাজকগণ ধর্মনিরপেক্ষ স্বদেশের স্বার্থে ভিন জাতির মধ্যে অনুপ্রবেশ করে বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে উক্ত জাতিকে হীনবল করে। এমতাবস্থায় ধর্মনিরপেক্ষতার আলখেল্লাপরা খ্রিস্টান শাসকগণ যাজকদের সহায়তায় অন্য জাতিসমূহের ঘাড় মটকিয়ে রক্ত পান করে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে খ্রিস্টান ধর্মযাজকগণ ভিন জাতির লোকদেরকে সম্মোহিত করে খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষ বলে ঘোষিত সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের পাইপলাইন হিসেবে কাজ করে।

বৌদ্ধ ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদীরা সাধারণত অপর ধর্ম ও জাতির ক্ষতি করার চেষ্টা করে না তবে অপর কোনো জাতি বৌদ্ধ বা বৌদ্ধ ধর্মের ক্ষতি করুক এটাও তারা চায় না বরং দৃঢ়ভাবে প্রতিরোধ করে। এ নিয়ম অবলম্বন করার কালে উত্তর কোরিয়া ও বার্মা অদ্যাবধি নিজেদের স্বাধীন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সক্ষম হয়েছে এবং বামিয়ানের বৌদ্ধ মূর্তি ধ্বংসের জন্য আফগানিস্তানের তালেবান শাসকগণ সমাজতন্ত্রী ও ধর্মনিরপেক্ষ বৌদ্ধ বিশ্বের রক্তচক্ষু হজম করতে বাধ্য হয়েছে।
হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী শুধুমাত্র মুখেই ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলে। বাস্তবে হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, হিন্দু কম্যুনিস্টরা-হিন্দু মৌলবাদী দলসমূহ অন্যান্য ধর্ম ও ধর্মের অনুসারীদের অস্তিত্ব পর্যন্ত সহ্য করতে রাজি নয়। এ জন্য ভারতে মসজিদ, গীর্জা ও প্যাগাডোর ওপর নিয়মিত হামলা করা হয়। ভিন্ন ধর্মের জনগণ ও নিম্নবর্ণের হরিজনদের ভারতে নিয়মিত কচুকাটা করা হয় এবং সংশ্লিষ্ট অপরাধীরা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পদে অবস্থান করে ধর্মনিরপেক্ষতার অমীয় বাণী প্রচার করতে থাকেন। তদুপরি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী, কম্যুনিস্ট, সমাজবাদী বা মৌলবাদী নির্বিশেষে সকল হিন্দু ঘটা করে হরেক রকমের মূর্তিপূজায় নিষ্ঠার সাথে অংশগ্রহণ করেন।

উপরোক্ত তিন প্রকারের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের কমন বৈশিষ্ট্য হলো, তারা সবাই দেশপ্রেমিক। তারা নিজেদের ধর্ম বা জাতির ওপর অন্য ধর্ম বা জাতির আগ্রাসন বরদাস্ত করে না, নিজ জাতির স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্বও আত্মমর্যাদাবোধ রক্ষায় সদা-সর্বদা সচেষ্ট থাকে।

আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষবাদের আজব সৃষ্টি হলো মুসলমান নামধারী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা। তারা নিজেদের ধর্মকে কটাক্ষ করে, ধর্ম নেতাদেরকে বিদ্রুপ করে নিজ ধর্মের লোকজনকে বিশ্বাস না করে অপর সংখ্যালঘু ধর্মবিশ্বাসীদের মাঝে নিজেদের নিরাপত্তা খোঁজে। তারা নিজেদের ধর্মের বিরুদ্ধে, নিজের জাতির বিরুদ্ধে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পক্ষে অবস্থান করে নিজের জাতীয় স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও আত্মমর্যাদাবোধকে বৈষয়িক স্বার্থের বিনিময়ে বিকিয়ে দেয়। নিজ ধর্মের প্রচারপ্রসারে বাধা দেয়। ধর্মীয় নেতাদের ওপর জুলুম, নির্যাতন চালায়। ধর্মীয় শিক্ষা, সংস্কৃতি ও চেতনাকে ধ্বংস করতে সদাসবর্দা সচেষ্ট থাকে। বিদেশী প্রভুদের স্বার্থে তারা স্বদেশের উনড়বতি, অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে এবং গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে স্বৈরাচারের সাথে, সাম্রাজ্যবাদীদের সাথে আঁতাত করে দেশের সর্বনাশ সাধন করে। সর্বোপরি শুধুমাত্র নিজেদের ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থে তারা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিকে ডেকে এনে স্বদেশ দখলে ও লুঠতরাজে সাহায্য করে। লক্ষ কোটি স্বদেশবাসীর লাশ মাড়িয়ে তারা সাম্রাজ্যবাদের পুতুল সরকারে অংশ নিয়ে স্বদেশী হত্যায় অংশ নেয় ও গর্ববোধ করে।
তাদের উপরোক্ত অপকর্মের দু’একটি সাম্প্রতিক উদাহরণ নিম্নরূপ :
১. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী তুর্কী সেনাবাহিনী, আলজেরিয় সেনাবাহিনী, পাকিস্তান সেনাবাহিনী সাম্রাজ্যবাদী (ধর্মনিরপেক্ষ!)- দের স্বার্থে নিজ দেশের গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে এবং দেশবাসীর বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে যুদ্ধ করেছে।
২. তারা ইরাকে, আফগানিস্তানে, সোমালিয়ায় ও সুদানে খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষ, সেনাবাহিনী ডেকে এনে তাদেরকে দিয়ে নিজেদের মা-বোনকে ধর্ষণ করাচ্ছে, ভাইবোন, মা-বাপ, আত্মীয়-স্বজনকে জুলুম, নির্যাতন ও হত্যার ব্যবস্থা করেছে এবং নিজ দেশের মূল্যবান সম্পদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের অভিভাবকদের দেশে পাচার করে দেশকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে।

ফিলিস্তিনের দিকে তাকিয়ে দেখুন। সেখানে দু’টি দল। একটি হলো ধর্মীয় দল হামাস অপরটি হলো ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী দল ফাতাহ। নির্বাচনে ধর্মীয় দল হামাস বিজয়ী হলে ‘ফাতাহ’ তার ধর্মনিরপেক্ষতা-বাদী অভিভাবক আমেরিকা ও ইহুদী ইসরাইলের বরকন্দাজের ভূমিকায় অবস্থান নিয়ে স্বদেশবাসীকে হত্যা করছে এবং স্বদেশের স্বাধীনতার সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে। অথচ পার্শ্ববর্তী ভারতে যখন ধর্মীয় দল বিজেপি ক্ষমতায় এল তখন কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হিন্দুরা বিদেশীদের নিজেদের দেশে ডেকে আনেনি। পাকিস্তানের দিকে তাকিয়ে দেখুন। ধর্মনিরপেক্ষ পারভেজ মোশাররফ স্বীয় দেশের প্রতিষ্ঠিত গণতন্ত্রকে সাম্রাজ্যবাদের স্বার্থে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেশে গৃহযুদ্ধ শুরু করেছে, এতদসত্ত্বেও তার পতন আসন্ন হওয়ায় অপর দুর্নীতিবাজ ধর্মনিরপেক্ষ নেত্রী বেনজীর, মোশাররফের সাথে হাত মিলিয়ে নিজ দেশকে সাম্রাজ্যবাদের হাতে সমর্পণের ব্যবস্থা করছে।

মুসলিম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের বাস্তব অবস্থা অনেকটা ঢাকার এডিস মশার ন্যায়, যে মশা ডেঙ্গু জ্বরের জীবাণু বহন করে মানুষকে রোগগ্রস্ত করে ও মৃত্যু ঘটায়। আর মুসলিম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা সাম্রাজ্যবাদী জীবাণু বহন করে স্বদেশে ছড়িয়ে দিয়ে জাতিকে ডেঙ্গু রোগীতে পরিণত করে। পাঠকবৃন্দ যদি আমার বক্তব্যের সাথে একমত হন তবে কালবিলম্ব না করে সকল এডিস মশা ও তাদের ভাবশিষ্যদের নির্মূলে এগিয়ে আসুন। অন্যথায় সাম্রাজ্যবাদের জীবাণুবাহী ধর্মনিরপেক্ষ এডিস মশা আপনার দেশকে ইরাক ও আফগানিস্তান বানিয়ে ছাড়বে।

অদূর ভবিষ্যতে (আল্লাহ না করুন) যদি ইরান বা আমার প্রিয় মাতৃভূমিতে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হয় তবে আমি নিশ্চিত, সংশ্লিষ্ট দেশের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ও সমাজতন্ত্রীরাই সাম্রাজ্যবাদের বাহন হবে আর স্বদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষায় প্রাণ দেবে ধর্মের পক্ষের জনগণ। সকলের অবগতির জন্য এ মতবাদের অতীত বর্তমান সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করছি।
তত্ত্বগতভাবে ধর্মীয় প্রবণতাকে মানুষের ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সমাজ জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে আল্লাহ ও রাসুলের প্রভাব থেকে মুক্ত রাখার নামই ধর্মনিরপেক্ষতা। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে ধর্মকে পরিত্যাগ করাই এর লক্ষ্য।

তাদের মতে, আল্লাহ এ বিশ্বটা শুধু সৃষ্টি করেছেন, বড়জোর তিনি এ জড়জগতের নিয়ম-কানুন (প্রাকৃতিক নিয়ম) রচয়িতা, মানুষকেও না হয় তিনি পয়দা করেছেন। তাঁকে পূজা-আর্চনা করলে মৃত্যুর পর কোনো কাজে লাগলেও লাগতে পারে। কিন্তু দুনিয়ার জীবনে উন্নতি শান্তি ও প্রগতির জন্য আল্লাহ বা রাসুলের কোনো প্রয়োজন নেই। এটাই আল্লাহ সম্পর্কে বিশুদ্ধ ধর্মনিরপেক্ষতার ধারণা। তাদের মতে, ধর্ম নিতান্তই ব্যক্তিগত ব্যাপার। দুই বা ততোধিক মানুষের সকল প্রকার পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ধারণে ধর্মকে অনধিকার প্রবেশ করতে দেয়া যায় না। কেননা সমাজ জীবনে ধর্মের প্রভাব সম্পূর্ণ প্রগতিবিরোধী এবং প্রতিক্রিয়াশীলতার পরিচায়ক।

ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আর একটি আপাত সুন্দর যুক্তি হলো, একটি দেশে ও পৃথিবীতে বহু ধর্মের লোক বাস করে এছাড়াও রয়েছে বহু উপ-ধর্ম সম্প্রদায় ও নাস্তিক। এমতাবস্থায় ধর্মীয় মতবাদের শাসনে পৃথিবীর দেশে দেশে ধর্মীয় সংখ্যাগুরু সম্প্রদায় কর্তৃক ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায় শোষিত, নির্যাতিত ও নিষ্পেষিত হবে। সুতরাং ধর্মনিরপেক্ষতা মতবাদ সকল আস্তিক ও নাস্তিকের প্রতি সমআচরণের ব্যবস্থা করতে পারে।

বাস্তবে ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদ হলো, আল্লাহর ইনসাফপূর্ণ বিধানকে দূরে সরিয়ে রেখে ব্যক্তি, গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের লোভ,স্বেচ্ছাচারিতা ও বেআইনি কার্যকলাপের পথে প্রতিবন্ধক কল্যাণকর নীতি-আদর্শ থেকে পলায়নের মনোবৃত্তি। সত্যিকারভাবে কোনো মানুষ কখনো ধর্মনিরপেক্ষ হতে পারে না, কেননা প্রথম মানব হযরত আদম (আ.) থেকে বর্তমান যুগ পর্যন্ত মানুষের সাথে, মানব সভ্যতার সাথে কোনো না কোনো ধর্ম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে। এমনকি ইতিহাসে যাদেরকে আমরা কাফের হিসেবে জানি তারাও কোনো না কোনো প্রকার ধর্মকে বা মাবুদকে মান্য করতো। উদাহারণ স্বরূপ ফেরআউন-নমরুদের দরবারেও প্রধান ধর্মীয় পুরোহিত ছিল এবং আবু জেহেল, আবু লাহাবের আরাধ্য দেবতা ছিল লাত, উজজা, হুবল ও মানাত। আর যে বৌদ্ধদের মাঝে আল্লাহর ধারণা নাই তারা গৌতমবুদ্ধকে আল্লাহর আসনে প্রতিষ্ঠা করে পূজা-আর্চনা করছে। বর্তমান পৃথিবীতেও এমন কোনো দেশ-জাতি বা সভ্যতা নাই যারা কোনো না কোনো ধর্মের সাথে সম্পৃক্ত নয়। এ প্রসঙ্গে স্বনামধন্য মনীষীদের অভিমত নিম্নরূপ:
১। ঐতিহাসিক টয়েনবির মতে, মানুষের ইতিহাস হলো একাধিক সভ্যতার ইতিহাস। এক একটি সভ্যতা গড়ে উঠেছে এক একটি ধর্ম চেতনাকে নির্ভর করে। মিসর ও ব্যাবিলনীয় সভ্যতায় ইহুদি ধর্মের প্রভাব, গ্রিক-রোমান সভ্যতায় খ্রিস্টধর্মের প্রভাব ভারতীয় সভ্যতায় হিন্দু, বৌদ্ধ, জৈন, ইসলাম ধর্মের প্রভাব, চৈনিক সভ্যতায় কনফুসিয়াস ও লাও ধর্মের প্রভাব, পারস্য সভ্যতায় যরদুস্তর ধর্মের প্রভাব আর ইসলামী সভ্যতায় ইসলাম ধর্মের প্রভাব অস্বীকার করা মানে ইতিহাসকে অস্বীকার করা। (সূত্র : জাতির উত্থান-পতন, সূত্র : প্রবন্ধকার, পৃ. ১৭২)
২। আইনের ইতিহাসের প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ স্যার হ্যানরি মান লিখেছেন, ‘সুষ্ঠুভাবে লিখিত এমন কোনো আইনব্যবস্থা চীন থেকে পেরু পর্যন্ত কোথাও পাওয়া যাবে না, যা তার সূচনাকাল থেকেই ধর্মীয় বিধিব্যবস্থা ও উপাসনারীতির সাথে সম্পৃক্ত নয়। (সূত্র : ঐ, পৃ. ১৭২)।
৩। ড. ফ্রাউডম্যান বলেছেন, ‘ন্যায়বিচারর সত্যিকার মাপকাঠি নির্ধারণের জন্য ধর্মের দিকনির্দেশনা ছাড়া অন্যকিছু পাওয়া যাবে না। আর ন্যায়-বিচারের দৃষ্টান্ত মূলক ধারণাকে বাস্তবরূপ দেয়ার জন্য ধর্ম প্রদত্ত ভিত্তিই হচ্ছে সবচেয়ে স্বাভাবিক ও অকৃত্রিম ভিত্তি। (সূত্র : ঐ, পৃ. ১৭২)।

ধর্মনিরপেক্ষতা মতবাদের উদ্ভব ও বিকাশ:
এই মতবাদ নতুন আবিষ্কৃত কোনো বিষয় নয়। মানব সভ্যতার শুরু থেকে বিভিন্ন লোভী, স্বেচ্ছাচারী ব্যক্তি ও গোষ্ঠী ধর্মীয় আইনের বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে যথেচ্ছাচার করার মানসে ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। কেননা প্রাচীনকাল থেকে অদ্যাবধি কোনো শক্তিশালী শাসক স্রষ্টাকে অস্বীকার করার দুঃসাহস করেনি। তবে কেউ কেউ নিজেকে খোদা বা খোদার ছায়া দাবি করে নিজের সৃষ্ট ধর্ম জনগণের ওপর চাপিয়ে দিয়েছিল। অপরদিকে বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতা কর্তৃক ধর্মগ্রন্থসমূহ বিকৃত হয়ে ঐশ্বরিক স্পিরিটশূন্য হওয়ায় চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ অনেক ক্ষেত্রে উক্ত বিকৃত ও কাল্পনিক ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ধর্মনিরপেক্ষতা বা ধর্মবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। আলোচনার সুবিধার্থে আমরা এই মতবাদের উদ্ভব ও বিকাশের ২টি পর্ব উল্লেখ করছি।
(ক) গ্রিক বা হেলেনীয় যুগ : বিকৃত ধর্মগ্রন্থের ফলে অসংখ্য দেবদেবীর উপসনাকারী গ্রীকগণ শতধা বিচ্ছিন্ন হয়ে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হয়। সমগ্র গ্রীসে অসংখ্য ক্ষুদ্র রাজ্য স্থাপিত হয়। কল্পনাবিলাসী গ্রীকগণ চরম ভোগবিলাস ও যৌন উচ্ছৃঙ্খলতায় নিমজ্জিত হয়। এ সময় এথেন্সে জন্ম নেয় পৃথিবীর সেরা তিনজন দার্শনিক এবং উক্ত দর্শন পৃথিবীব্যাপী ছড়িয়ে দেন দিগবিজয়ী আলেকজান্ডার। নীতি-নৈতিকতাহীন অধঃপতিত গ্রিক সভ্যতার ধ্বংস¯তূপে আবির্ভাব হয় সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল ও আলেকজান্ডারের। বস্তুত উক্ত তিন দার্শনিকের চিন্তাধারাই বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষ মতবাদের মূলভিত্তি। উক্ত তিন দার্শনিকের চিন্তাধারা ও মতবাদ সংক্ষেপে নিম্নরূপ :

সক্রেটিসঃ
(ক) তিনি অসংখ্য ঈশ্বরের স্থলে এক ঈশ্বর চিন্তার সূত্রপাত করেন। প্রথমে তিনি ভালো ও মন্দের স্বরূপ নিয়ে আলোচনার সূত্রপাত করেন। তার দৃষ্টিতে ভালো ও মন্দের পার্থক্য একটি দার্শনিক পার্থক্য মাত্র। মানুষ তার সঙ্কীর্ণ দৃষ্টি ও জ্ঞানের দরুন কোন উচ্চতর অথচ দূরতম মঙ্গলকে নিম্নতর অথচ নিকটতম মঙ্গলের জন্য বিসর্জন দেবে এটিই হচ্ছে মন্দ। তার দৃষ্টিতে ভালো ও মন্দ মানুষের পার্থক্য হচ্ছে প্রমোক্ত ব্যক্তি তার কাজের শেষ পরিণতির কথা চিন্তা করে আর পরবর্তী ব্যক্তি উপস্থিত লাভ-ক্ষতির বিবেচনায় নিজেকে পরিচালিত করে।
(খ) তার দৃষ্টিতে পুণ্য হচ্ছে জ্ঞান আর পাপ হলো অজ্ঞতা। তার মতে, একটি উত্তম নৈতিকতা সৃষ্টির জন্য মানুষকে তার সামাজিক রীতিনীতি থেকে সরে এসে নিছক বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণ থেকে সমস্ত বিষয়-আশয় সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত।

প্লেটোঃ
তিনি ভাবজগত বা আধ্যাত্মিক জগৎকে জড়জগৎ থেকে সম্পূর্ণ পৃথক করে এক কঠোর দ্বৈতবাদের সূচনা করেন। প্লেটোর দর্শনে আল্লাহ এবং জড়জগৎ উভয়ই নিজ নিজ স্থানে দুটি স্বতন্ত্র সত্য। প্লেটো ধারণামূলক সত্য বা আল্লাহকে জগৎ থেকে পৃথক বা ভিন্ন সাব্যস্ত করেন। তিনি আত্মার পুনর্জন্মবাদের ধারণা সৃষ্টি করেন। প্লেটো এই দুটি ধারণাকে এতই যুক্তিপূর্ণ ও শক্তিশালীভাবে উপস্থাপন করেন যে, যার ফলে বিভিন্ন ধর্মের দার্শনিকগণ পরবর্তীকালে প্লেটোর দর্শনের বেড়াজালে পতিত হয়ে নিজেদের ঐশী জ্ঞানকে বিকৃত করে ফেলেন।

এরিস্টটলঃ
তার মতে, আল্লাহ জগতের স্রষ্টা নন। কেননা জগৎ-পূর্ব থেকেই বিদ্যমান ছিল। তিনি আল্লাহকে জগতের গতিদানকারী সাব্যস্ত করেন। তবে একবার গতিদানের পর তিনি জগৎ সম্পর্কে নিস্পৃহ এবং বেখবর। এরিস্টটলের দর্শনে জগৎ আল্লাহর সাথে সংযুক্ত ও সম্পর্কিত কিন্তু আল্লাহ জগৎ থেকে বিচ্ছিন্ন ও সম্পর্কহীন। উক্ত তিন দার্শনিকের চিন্তাধারা ও যুক্তিসমূহ স্রষ্টা কর্তৃক প্রত্যাদেশ প্রাপ্ত না হয়েও অনুসন্ধিৎসু মানুষকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। ফলে তারা ঐশী ধর্মের বিপরীতে এক শক্তিশালী শিরকপূর্ণ ও বস্তুবাদী মতবাদের প্রতিষ্ঠা করেন। উক্ত মতবাদসমূহের বিষময় ফল হলো :
(১) ধর্ম সাধারণ মানুষের চিন্তার অতীত বিষয়।
(২) আল্লাহ এবং জড়জগৎ যেহেতু স্বতন্ত্র সেহেতু দুনিয়ার জীবনে আল্লাহর প্রয়োজন হবে কেন।
(৩) আল্লাহ যেহেতু জগৎকে একবার গতিদানের পর সম্পূর্ণ বেখবর সুতরাং আল্লাহকে বা ঈশ্বরকে পূজা না করে মানুষ পরবর্তীকালে আল্লাহর ছায়া, প্রতিনিধি, কাল্পনিক মূর্তিকে, দেবতাকে পূজা করা শুরু করে। আর যারা এসবে আকৃষ্ট হননি তারা কেউ পরবর্তী সময়ে বৈরাগ্যবাদ, ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, সমাজতন্ত্র বা নৈরাজ্যবাদের কবলে পতিত হয়।

আধুনিক যুগ : ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের আধুনিক সংস্করণ প্রায় আড়াইশ’ বছর পূর্বে ইউরোপে প্রথম প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পনের শতকে এর জন্ম এবং আঠার শতকের শুরুতে তা বিজয়ী আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়। যে সকল কারণে প্রাচীন গ্রিসে এ মতবাদ চালু হয় প্রায় একই রূপ কারণে ইউরোপে এর উদ্ভব ও বিকাশ হয়। এর উদ্ভব ও বিকাশ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ ধারণা পেতে এর জন্মস্থান ইউরোপ, বিশেষ করে ফ্রান্সের সমকালীন ধর্মীয় অবস্থা, ধর্মযাজক, শাসক সম্প্রদায়, বুদ্ধিজীবী, ব্যবসায়ী ও সাধারণ জনগণের সমকালীন অবস্থা অবহিত হতে হবে।

ধর্মীয় অবস্থা : তৎকালে সমগ্র ইউরোপে বিকৃত খ্রিস্টান ধর্ম চালু ছিল এবং এখনো চালু রয়েছে। হযরত ঈসা (আ.)-এর অন্তর্ধানের পর থেকেই মূলত তাঁর অনুসারীগণ কর্তৃক ধর্ম বিকৃতি শুরু হয়। পবিত্র কুরআন ষষ্ঠ শতাব্দীতেই এই ধর্মের বিকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ঘোষণা প্রদান করেছে। এ সংক্রান্ত ঐতিহাসিক তথ্যাদি সংক্ষেপে নিম্নরূপ :
(১) খ্রিস্ট্রীয় গির্জার প্রথম শত বছরে যে মতবাদ লিখিত ও চালু ছিল তা ছিল জুডিও খ্রিস্টান মতবাদ সংবলিত রচনা।
(২) জুডিও খ্রিস্টানিটি ও পৌলিও খ্রিস্টানিটি নিয়ে দ্বন্দ্ব চলাকালীন সময়ে লিখিত হয়েছিল মার্ক, মথি, লুক, যোহনের সুসমাচারসমূহ।
(৩) ৩২৫ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মিসর ও আলেকজান্দ্রিয়ার গির্জাসমূহে বার্নাবাস লিখিত সুসমাচার আইনসম্মত ধর্মগ্রন্থ হিসেবে চালু ছিল। ৩২৫ সালে Nicen Council আইন করে মূল হিব্র“ ভাষার বাইবেল ধ্বংস করে এবং সেসব গ্রন্থের সংরক্ষণকারীদের মৃত্যুদণ্ডের বিধান দেয়। পাশ্চাত্য গির্জাসমূহের ৩৮২ খ্রিস্টাব্দের ডিক্রি বলে পোপ ইনোসেন্ট ৪৬৫ সালে বার্নাবাসের সুসমাচার নিষিদ্ধ করেন। সর্বশেষ Glesian Decree of 496-এর মাধ্যমে অসংখ্য গসপেলের সাথে ইভানজেলিজম বার্নাবিও নিষিদ্ধ করা হয়। এভাবে পৌলিও খ্রিস্টানগণ কর্তৃক মূল ইঞ্জিল কিতাবের পরিবর্তে গ্রিক দর্শন ও রোমান পৌত্তলিকতাসমৃদ্ধ বর্তমান বাইবেলের বিজয় নিশ্চিত করা হয়।
(৪) এছাড়াও রয়েছে আলেকজান্দ্রিয়ার ইহুদিগণ কর্তৃক রচিত সেপ্টোজিস্ট (পুরাতন নিয়ম) নামক বাইবেল যার ভিত্তিতে পরবর্তীতে রচিত হয় বাইবেলের নিউ টেস্টামেন্ট।
(৫) এছাড়াও রয়েছে বাইবেলের Codex Vaticanus, Codex Sinaiticus, Vulget I walton Bibel London (1657) নামক সংস্করণসমূহ।

খ্রিস্টানদের গির্জার যেমন বিভিন্নতা রয়েছে, তেমনি গির্জাভিত্তিক বিভিন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বাইবেল। পর্যায়ক্রমে ২ হাজার বছর যাবৎ খ্রিস্টান পাদ্রি-পুরোহিতগণ নিজেদের ভোগবাদী স্বার্থের অনুকূলে ধর্মগ্রন্থকে বারবার পরিবর্তন করে ঐশী স্পিরিট শূন্য করেছে। আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের উদ্ভবের সময় ইউরোপে এবং ফ্রান্সে পাদ্রি-পুরোহিতদের বৈষয়িক স্বার্থে উক্ত বিকৃত ধর্মগ্রন্থগুলো অনুসরণ করা হতো এবং ধর্মের নামে জনগণকে পৈচাশিক শাসন, শোষণ, নিষ্পেষণ করা হতো।
ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ফরাসি বিপ্লবের সময়ে ফ্রান্সে ধর্মযাজকদের সংখ্যা ছিল প্রায় ১ লাখ ৩০ হজার। তন্মধ্যে ১৩৯ জন ছিল বিশপ, বাকিরা ছিল পাদ্রি। বিশপরা ছিল অভিজাত বংশের, পাদ্রিরা ছিল তৃতীয় শ্রেণীর জনসমাজ থেকে আগত। জনগণ গির্জাকে ধর্মকর, মৃত্যুকর, বিবাহকর ও অন্যান্য পার্বন উপলক্ষে কর দিতে হতো। গির্জার বার্ষিক আয় ছিল প্রায় ১৩ কোটি লিভ্র। এর অধিকাংশই বিশপরা ভোগ করতো। নিম্নশ্রেণীর পাদ্রিরা খুব সামান্য ভাগ পেতো। যা দিয়ে তারা অতি কষ্টে দিনাতিপাত করতো। বিপ্লবের সময় এ সকল পাদ্রি বিপ্লবের পক্ষে ছিল।

অভিজাত শ্রেণী বা শাসক সম্প্রদায় : তখন ফ্রান্সের মোট লোকসংখ্যা ছিল ২৫ লাখ। ফরাসি বিপ্লবের অন্যতম নেতা অ্যাবেসিয়েসের মতে, তখন ফ্রান্সে অভিজাতদের মোট সংখ্যা ছিল ১ লাখ ১০ হাজার। দেশের মোট জমির তিন ভাগের এক অংশ ছিল তাদের মালিকানাধীন। রাজার সভাসদ, সেনাপতি, বিচার বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তা, মন্ত্রী, রাজদূত, প্রাদেশিক শাসনকর্তা, প্রশাসক, আইনবিদ, জমিদার ও ইন্টেনডেন্টগণ এ শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত ছিল। তারা নামের পূর্বে লর্ড, ব্যারন ও মার্কুইস খেতাব ব্যবহার করতো। দার্শনিক মন্টেস্কুর ভাষায় : ‘যারা রাজার সাথে সাক্ষাৎ করতে পারে, মন্ত্রীর সাথে বাক্যালাপ করতে পারে, যাদের বংশ কৌলিন্য আছে, ঋণ ও পেনশন আছে তারাই অভিজাত।’

তৃতীয় শ্রেণী : ব্যবসায়ী, বুদ্ধিজীবী, কৃষক, ভূমিহীন ও ভবঘুরে শ্রেণী ছিল তৃতীয় শ্রেণীর অন্তর্ভুক্ত। এরা ছিল দেশের ৯৩ শতাংশ জনগোষ্ঠী। যাজকশ্রেণী ও অভিজাত শ্রেণীর শাসন, শোষণ, নিপীড়ন এদেরকেই সহ্য করতে হতো। এ শ্রেণীর ব্যবসায়ী ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীই ছিল ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী ফরাসি বিপ্লবের চালিকাশক্তি। এদের আহ্বানে ও নেতৃত্বে কৃষক, ভূমিহীন ও ভবঘুরে শ্রেণী ঐক্যবদ্ধ হয়ে ফরাসি বিপ্লব সংগঠিত করে। ধর্মের নামে চরম অধার্মিক শাসন-শোষণ এদেরকে প্রথমে অভিজাত শ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অনুপ্রাণিত করে এবং পরবর্তীতে অভিজাত শ্রেণীর ছত্রছায়া দানকারী যাজক ও গির্জার বিরুদ্ধে এবং প্রকারান্তরে ধর্মের বিরুদ্ধে তৃতীয় শ্রেণীর জনগণ বিদ্রোহ করে। গির্জার নেতৃত্বে শাসকশ্রেণী যতোই বিদ্রোহ দমনে সচেষ্ট হয় ততোই জনগণ ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এক পর্যায়ে ধর্মবিরোধী শক্তিতে পরিণত হয়।

গির্জাকেন্দ্রিক যাজক সম্প্রদায় ও অভিজাতদের বিরুদ্ধে ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লব বিজয়ী হওয়ার পর সমগ্র ইউরোপে ধর্মবিরোধী বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ে। উভয়পক্ষ প্রচণ্ড সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। অবশেষে আপোষ প্রস্তাব নিয়ে এগিয়ে আসেন মার্টিন লুথার কিং। তার আন্দোলন ইতিহাসে আপোষ আন্দোলন নামে খ্যাত। এ আন্দোলনের প্রস্তাব ছিল, ‘ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত জীবনে সীমাবদ্ধ থাকুক এবং মানুষের ধর্মীয় জীবনের পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা থাকবে চার্চের হাতে। কিন্তু সমাজের পার্থিব জীবনে সকল দিকের নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব রাষ্ট্রের ওপর ন্যস্ত থাকবে এবং পার্থিব কোনো বিষয়েই চার্চের কোনো কর্তৃত্ব থাকবে না। অবশ্য রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দকে চার্চের নিকটেই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের শপথ নিতে হবে। এ প্রস্তাব উভয়পক্ষ মেনে নিলো। ধর্মনেতাদের সান্তনা ছিল, রাষ্ট্র পরিচালকদের চার্চের নিকট শপথ গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতায় পাদ্রিদের সম্মান রক্ষা পেল। আর বিদ্রোহীরা চিন্তা করলো পার্থিব জীবনের কোনো ক্ষেত্রেই যদি ধর্ম ও গির্জা প্রাধান্য না পায় তবে বিষদাঁতহীন এ সাপকে ভয় করার কোনো কারণ নেই। এভাবে ফরাসি বিপ্লবে ভোগবাদী যাজক ও অভিজাত শ্রেণীকে উদীয়মান বুদ্ধিজীবী ও ব্যবসায়ী শ্রেণী ক্ষমতাচ্যুত করে। ঐতিহাসিক লেফেভার বলেন, ফরাসি বিপ্লব শেষ পর্যন্ত প্যাট্রিসিয়ান বা অভিজাত শ্রেণীকে ক্ষমতাচ্যুত করে বুর্জোয়া শ্রেণীর আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করে।

ফরাসি বিপ্লবের মনস্তাত্ত্বিক কারণ : ফরাসিবিপ্লবের এবং ইউরোপীয় রেনেসাঁর প্রধান কারণগুলো ছিল বিকৃত ধর্মগ্রন্থের মাধ্যমে যাজকতন্ত্রের ধর্মের নামে অধার্মিক শাসন-শোষণ, খ্রিস্টান শাসকদের জনগণের খোদার অবস্থানে আসন গ্রহণ, বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর উত্থান, অবৈজ্ঞানিক ধর্মের বিরুদ্ধে বিজ্ঞানের দ্বন্দ্ব ও নতুন ব্যবসায়ী শ্রেণীর উত্থান। তবে এসবের মধ্যে সর্বপ্রধান কারণ নিঃসন্দেহে সভ্যতার আলোকপ্রাপ্ত বুদ্ধিজীবীগণ। উক্ত বুদ্ধিজীবীদের যুক্তিপূর্ণ মতবাদসমূহই মূলত সর্বস্তরের জনগণকে গির্জাতান্ত্রিক শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে বিদ্রোহে অনুপ্রেরণা দেয়। আমার মতে, ইউরোপীয় মুক্তি সংগ্রাম কখনো ধর্মবিরোধী হতো না যদি তখনকার ইউরোপীয় ধর্ম যুক্তি ও বিজ্ঞানবিরোধী না হতো।

এখন প্রশ্ন হলো যে মহাদেশের ধর্মযাজকগণ অজ্ঞতার অন্ধকারে নিমজ্জিত, যে মহাদেশের শাসকগণের নিকট মানবীয় মূল্যবোধ সম্পূর্ণ অপরিচিত ছিল, সে মহাদেশে আলোকিত বুদ্ধিজীবী এলো কোত্থেকে? এ প্রশ্নের সদুত্তরও রয়েছে ইউরোপীয় বুদ্ধিজীবীদের স্বীকারোক্তিতে। উক্ত স্বীকারোক্তির কয়েকটি নিম্নরূপ :
১। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক হিট্টি বলেন, ‘আরবরাই ৮ম শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ১৩ শতকের শেষভাগ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্বের বুদ্ধিবৃত্তি ও সভ্যতার আলোকবর্তিকাবাহী, যাদের মাধ্যমে প্রাচীন বিজ্ঞান ও দর্শন হয়েছিল পুনরুজ্জীবিত, সংযোজিত ও সম্প্রসারিত।’ (History of the Arabs, Page 557)
২। দার্শনিক রজার বেকন তার ছাত্রদেরকে বলেন, ‘সত্যিকার অর্থে জ্ঞান আহরণের একমাত্র উপায় হলো, আরবি ভাষায় ব্যুৎপত্তি অর্জন।’ (সূত্র : জর্জ সার্টন, An Introduction to the History of Science, Vol.-1 Baltimore, 1927,Page-17|
৩। During the Darkest Period of European History the Arabs for five hundred years held up the torch of Learning to humanity. (সূত্র : Revernd Boswath Smith,Mohammad and Mohamedanism)।
৪। ‘বিজ্ঞানে মুসলমানদের অবদান’ শীর্ষক প্রবন্ধে ইসলামিক ফাউন্ডেশন, বাংলাদেশের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আশরাফ আলী লিখেছেন, ‘পোপ জারাবার্তের (১০৯৯- ১১০৩) ন্যায় বিখ্যাত ধর্ম সংস্কারক ও শিক্ষাবিদ কর্ডোভা মাদ্রাসার ছাত্র ছিলেন।’
৫। উক্ত প্রবন্ধে তিনি আরো লিখেন, ‘লন্ডনস্থ বিজ্ঞান জাদুঘরে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বিধৃত রয়েছে যে, Were it not for Islam, Greek Learning Might not have Survived the dark age. (অর্থাৎ ‘মুসলমান জ্ঞানসাধকরাই গ্রিক জ্ঞান বিজ্ঞানকে অতীতের অন্ধকার থেকে বর্তমানের আলোয় এনেছেন)।’

ইতিপূর্বেকার আলোচনা ও উদ্ধৃতিসমূহ থেকে আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, জ্ঞান বিজ্ঞান-ধর্ম-মানবিক মূল্যবোধ, সুশাসন ও জনকল্যাণমূলক চিন্তা ভাবনার সাথে অপরিচিত অন্ধকার ইউরোপ মহাদেশের কিছুসংখ্যক জ্ঞানপিপাসু ইউরোপীয় নাগরিক বাগদাদ, কায়রো, কর্ডোভা, স্পেন, সেভিল ও মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য স্থানে স্থাপিত মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন শেষে স্বদেশে গিয়ে জ্ঞানের মশাল প্রজ্বলিত করার কাজ শুরু করেন। তাদের সংগ্রাম ও প্রচেষ্টায় ইউরোপের মানুষ সজাগ ও সচেতন হয়ে বিজ্ঞান ও যুক্তিহীন ধর্মের বিরুদ্ধে এবং রক্তলোলুপ স্বেচ্ছাচারী রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের ঝাণ্ডা উত্তোলন করে। কায়েমী স্বার্থবাদী ধর্মযাজকগণ স্বৈরাচারী রাজাদের সহায়তায় বিদ্রোহীদের ওপর চরম দমননিপীড়ন চালায়। ফলে বিপ্লবীরা এক পর্যায়ে ধর্ম, যাজকতন্ত্র ও অভিজাত শ্রেণীকে অস্বীকার করে। দীর্ঘ ২শ’ বছরের সংগ্রামের পর বুর্জোয়া, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ জনতার বিজয় সূচিত হয়। বিজয়ের শুরুতে প্রথমে ১৬৮৮ সালে ইংল্যান্ডের স্বৈরতন্ত্র ধ্বংস হয়, ১৭৭৬ সালে স্বৈরাচারী ইংল্যান্ডের শাসন থেকে আমেরিকা মুক্ত হয় এবং ১৭৮৯ সালে ফরাসি বিপ্লবের মাধ্যমে ফরাসি অভিজাত শ্রেণী ও যাজকশ্রেণীর স্বৈরতান্ত্রিক জুলুমের অবসান হয় এবং খ্রিস্টানধর্ম বিরোধী বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর রাজত্ব কায়েম হয়।

অথচ পরিতাপের বিষয়, এতো ত্যাগতিতীক্ষা, সংগ্রাম, রক্তদানের পরও কিন্তু ইউরোপে হানাহানি, যুদ্ধ-বিগ্রহ ও মানবতার ধ্বংসযজ্ঞ অদ্যাবধি বন্ধ হয়নি। জনগণ অত্যাচারী ও স্বৈরাচারী শাসকদের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পরপরই পুঁজিপতি বুর্জোয়া শ্রেণীর যাঁতাকলে পিষ্ট হতে থাকে। পূর্বে তারা যাজক ও অভিজাতশ্রেণী কর্তৃক নিগৃহীত হয়েছিল, বিপ্লবের পর রক্তশোষক সুদখোর মহাজন, পুঁজিবাদী বুর্জোয়াদের ও স্বৈরাচারী একনায়কদের শাসন-শোষণে নিষ্পেষিত হতে থাকে। সর্ব মানবের কল্যাণোপযোগী কোনো নীতি-আদর্শ বা ধর্ম সকল পক্ষের নিকটই অজানা বিধায় একশ্রেণীর অপসারণের পর অন্যশ্রেণী ক্ষমতায় এলেও দৃশ্যপটের কোনো পরিবর্তন হয় নাই।

যাজক-অভিজাতশ্রেণীকে অপসারণ করে বুর্জোয়া শ্রেণী ক্ষমতায় আসার পর জনগণের অবস্থা পূর্ববত তিমিরেই থেকে যায়। ক্রমে ক্রমে গণঅসন্তোষ ব্যাপকতা লাভ করে। এহেন অবস্থায় সংকট মোচনে অনেক হাতুড়ে ডাক্তার, কবিরাজ, বৈদ্য, বুদ্ধিজীবীর পরিচয়ে ইউরোপের ভূমিতে আবির্ভূত হতে থাকে। ইউরোপের জনগণ তখন যে কোনো নতুন মতবাদকে নিয়ে মাতামাতি শুরু করে দেয়। এ সময়কার সকল ডাক্তার, কবিরাজের কাহিনী লিখতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। প্রবন্ধের কলেবরে তা সম্ভবও নয়। তাই আমি সংক্ষেপে এরূপ কয়েকজন ইউরোপীয় পণ্ডিত অথবা তথাকথিত দার্শনিকদের দর্শন সম্পর্কে ও এর পরিণতি সম্পর্কে আলোকপাত করবো।
১. কার্লমাক্স ও সমাজতন্ত্র : তিনি দেখলেন, কূপমুণ্ডুক যাজকতন্ত্র ও অভিজাতদের রাজতন্ত্র থেকে দেশের শাসনক্ষমতা পুঁজিপতি ও ব্যবসায়ীদের নিকট হস্তান্তর হওয়ায় জনগণের অবস্থা আরো শোচনীয় হয়ে পড়েছে। এমতাবস্থায় তিনি সর্বহারার শাসন কায়েমের আহ্বান করলেন। সংক্ষেপে সমাজতন্ত্র ও তার পরিণাম নিম্নরূপ :
সমাজতন্ত্রের মূলকথা : ভূমি ও শিল্পসম্পর্কিত পুঁজির ক্ষেত্রে সব ব্যক্তিগত সম্পত্তির অধিকার বিলোপ করে একে সামাজিক ও যৌথ স্বত্বাধিকারের আওতায় বা যৌথ মালিকানায় আনতে হবে। সংক্ষেপে সমাজতন্ত্র হচ্ছে এমন একটি আন্দোলন যা দেশের সকল ভূমি ও শিল্পপুঁজিকে সমাজতান্ত্রিক দলের প্রশাসনের দ্বারা পরিচালনার ব্যবস্থা করবে। এতে কার্যত কিছুসংখ্যক দলীয় ক্যাডার দেশের সকল ভূমি ও পুঁজি ভোগ করার অবাধ অধিকার লাভ করে এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ শ্রমদাসে পরিণত হয়।
বাস্তবে সমাজতন্ত্র : মানুষ যখন দরিদ্র থাকে, তখন তারা প্রায়শঃ উৎসাহ সহকারে (সমাজতান্ত্রিক) পরিকল্পনা উপস্থাপন করে, কিন্তু অর্থশালী হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয় ধারায় এতে তারা আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। তদুপরি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ভয়ে সকল শ্রেণীর টুঁটি চেপে ধরে সমগ্র দেশকে জেলখানায় পরিণত করে ও জনগণকে রোবটে পরিণত হতে বাধ্য করে।
সমালোচকদের মতে, সমাজতন্ত্রের কাজ হচ্ছে “বিফল ও হতাশ মানুষকে সাফল্যের পথ ধরানো আর সফল মানুষকে সর্বস্বান্ত করা।”

মেকিয়াভেলীর (১৪৬৯-১৫২৭) রাজনৈতিক দর্শন
পনেরো শতকের মেকিয়াভেলীর দর্শন থেকে আমরা যা পাই তা হলো :
১. তিনি ধর্ম ও রাজনীতিকে আলাদা বিষয় হিসেবে সাব্যস্ত করেন এবং নীতি নৈতিকতাকে দু’ভাগে ভাগ করেন। একটি হলো সরকারি ও অপরটি হলো ব্যক্তিগত।
২. খ্রীস্ট ধর্মের সম্পর্ক থাকবে কেবল অপার্থিব তথা পারলৌকিক জীবনের সঙ্গে। পার্থিব ও জাগতিক জীবনের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
৩. ধর্মভীরু ও সৎ লোকদের কোনো প্রয়োজন রাষ্ট্রের নেই। কেননা ধার্মিকেরা নীতি-নৈতিকতার বাধা অতিক্রম করতে পারে না, অথচ রাজা-বাদশাহ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের শৃগালের মতো ধূর্ত হতে হয়, রাষ্ট্র রাজনীতি ও স্বার্থের প্রয়োজনে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ, মিথ্যা কথন, ধোঁকা ও প্রতারণা, খেয়ানত ও মুনাফেকীর ন্যায় কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়।

ডারউইনের বিবর্তনবাদ
১৮৫৯ সালে চার্লস ডারউইন তার চমকসৃষ্টিকারী বই Origin of Species (প্রজাতিসমূহের উৎপত্তি) লিখেন। উক্ত বইতে তিনি প্রমাণ করার চেষ্টা করেন যে, “মানুষ মূলত পশুরই ক্রমবিবর্তিত একটি রূপ মাত্র, যা হাজার হাজার বছরের ক্রমোন্নতি ও ক্রমবিবর্তনের মাধ্যমে জীবাণু বিশেষ (Amoebu) থেকে বানর ও অতঃপর মানবাকৃতিতে রূপান্তরিত হয়েছে। ডারউইনের যুগে ইউরোপে যে কোনো নতুন মতবাদকে লুফে নেয়ার একটি প্রবণতা ছিল। সুতরাং আর যায় কোথায়? সমগ্র ইউরোপবাসী ধরে নিলো যে, তারা নিশ্চয়ই লাল বানরের পরবর্তী রূপ। সুতরাং বানরের ন্যায় সকল বাঁদরামী করা তাদের মৌরসী অধিকার।

ডারউইনের আর একটি ধ্বংসাত্মক মতবাদ ছিল ‘Survival of the fittest’ অর্থাৎ যোগ্যতমরাই অথবা 
শক্তিশালীরাই শুধুমাত্র বেঁচে থাকার অধিকারী আর দুর্বলদেরকে অবশ্যই মরতে হবে। মানবের পশুত্বের মতবাদ ও শক্তিশালী হিংস্র পশুরাই শুধু টিকে থাকবে এরূপ মতবাদ ইউরোপীয় চরিত্রের সাথে এমনভাবে মিশে গেল যে, যেরূপ পানিতে চিনি মিশে যায়। এ জন্যই যুদ্ধ-বিগ্রহ, অপর দেশ ও জাতিকে নিশ্চিহ্ন করা, পাশবশক্তিতে অপরের সর্বস্ব কেড়ে নেয়ার কাজটি ইউরোপ সমগ্র দুনিয়ায় অব্যাহত রেখেছে। মানবতা কাকে বলে, মনুষ্যত্ব কাকে বলে, দয়া-মায়া-মমতা কি জিনিস তা সকল যুগে তাদের নিকট অজ্ঞাত রয়েছে।

ইউরোপের বা পাশ্চাত্যের এরূপ অমানবিকতার ও পশুপ্রবৃত্তির ঐতিহাসিক কারণও রয়েছে। প্রথমত, ইউরোপ কখনো কোনো নবী/রাসুলের জন্মস্থান বা কর্মস্থান ছিল না, নবী-রাসুলদের নেতৃত্বাধীন কোনো শাসনব্যবস্থা তারা প্রত্যক্ষ করেনি। নবী/রাসুলের জীবদ্দশায় যে প্রকৃত ধর্ম এশিয়াবাসী সকল যুগে প্রত্যক্ষ করেছে ইউরোপ কখনো তা দেখেনি। কেবলমাত্র আংশিক বা পুরোপুরি বিকৃত ধর্মসমূহ শ্রু“তি পরস্পরায় ইউরোপে প্রবেশ করেছিল। ফলে এশিয়া যেভাবে দাউদ (আ.), সম্রাট দারায়ুস, সোলায়মান (আ.), মুহাম্মদ (সা.), খলিফা উমর (রা.), খলিফা হারুন,খলিফা মামুন, উমর ইবনে আবদুল আজিজ, আওরঙ্গজেব আলমগীর ও সম্রাট অশোকের ন্যায় শাসক ও শাসনব্যবস্থা পেয়েছিল ইউরোপ তা কখনো পায়নি। আমি দৃঢ়তার সাথে বলতে চাই- নবী/রাসুল ছাড়াও এশিয়ায় আরো শত শত ন্যায়পরায়ণ শাসক যেরূপ সর্বদা মানবতার কল্যাণ সাধন করেছেন, সমগ্র ইউরোপে এরূপ একজন শাসকও কখনো জন্ম নেয়নি। সমগ্র ইতিহাস খুঁজেও ইউরোপে একজন খলিফা হারুন বা সালাউদ্দীন আইয়ুবীর সন্ধান পাওয়া যাবে না। এ জন্যই অর্থ-বিত্ত-ভোগবিলাসের পক্ষের সকল মতবাদকেই ইউরোপ লুফে নেয়। ডারউইনের মতবাদকেও তারা এভাবে লুফে নিয়েছিল, কোনো প্রকার সত্যাসত্য যাচাই না করে।

ফ্রয়েড/দরখায়েম/কার্ল মার্কসের যৌন মতবাদ : ডারউইন মানুষকে পশু বানিয়েছেন আর ফ্রয়েড মানুষকে পশুর চেয়েও জঘন্য হিসেবে চিত্রিত করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষের সমস্ত কাজের মৌল উৎস হচ্ছে যৌনতা। এ জন্য দার্শনিকটি আরো বলেছেন, ‘শিশু মায়ের স্তন চুষে যৌন সুড়সুড়ি লাভের জন্য। একই কারণে শিশু তার বৃদ্ধাঙ্গুল চুষে থাকে। মানুষ প্রস্রাব-পায়খানা করে যৌন সুখ পায় বলে। তার গ্রন্থিসমূহ নাড়ায় যৌন সুখের আশায়। যৌন সুখের তাড়নায় মানুষ তার মায়ের প্রতি প্রেমবোধ করে। ফ্রয়েডের মতে, মানুষের ধর্ম পালন, নৈতিকতাসহ সকল কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে যৌন-অগ্নির তাপ ও চাপের জন্য। তার মতে, ধর্ম, নৈতিকতা, সমাজ, ঐতিহ্য হচ্ছে মানুষের সাফল্যের পথে প্রতিবন্ধক, তাই এটি বাতিলযোগ্য ও মূল্যহীন। সুতরাং এসবকে অবশ্যই নির্মূল করতে হবে।

দরখায়েম বলেছেন, আইনগত বা নৈতিক নিয়ম-কানুন বলতে কোথাও কিছু নেই। নৈতিকতাবিশারদরা মানুষের নিজের ওপর কর্তব্যসমূহকে নৈতিকতার ভিত্তি সাব্যস্ত করে। আসলে নৈতিকতা স্থিতিশীল কোনো বিষয় নয়- এটি আপেক্ষিক ধারণা মাত্র। কার্ল মার্কসের মতে, যৌন পবিত্রতা গ্রামীণ সামন্তবাদী সমাজের অবশিষ্ট চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বটে। তার যা কিছু মূল্য, তা সেই সময়কার অর্থনৈতিক স্তরের সাথে সংশ্লিষ্ট ছিল।
সংক্ষেপে পনের শতক থেকে বিংশ শতাব্দী পর্যন্ত ইউরোপীয় দার্শনিকদের চিন্ত ধারাসমূহ উল্লেখ করা হলো। এছাড়াও এ সময়ে ইউরোপে আরো শত শত দার্শনিক আবির্ভূত হয়েছিল যাদের দর্শনসমূহ মূলত উপরোক্ত দার্শনিকদের চিন্তাধারা সমূহের অনুরূপ। এসব দার্শনিক ও দর্শনের ফলে ইউরোপে প্রথমে প্রতিষ্ঠিত হয় Secularism বা ধর্মনিরপেক্ষতা! (ধর্মহীনতা)। তৎপর একনায়কতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ফ্যাসিবাদ, নাজীবাদ এবং সবশেষে তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ পুঁজিবাদী গণতন্ত্র। বস্তুবাদ বা বৈষয়িক ক্ষেত্রে, বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের ক্ষেত্রে ইউরোপ অনেক এগিয়ে গেল আর ভাববাদের ক্ষেত্রে ইউরোপ অতল অন্ধকারে হারিয়ে গেল। ধর্ম, নীতি-নৈতিকতা, আদর্শ, মূল্যবোধহীন ইউরোপীয় জনগণ মানুষের স্তর অতিক্রম করে হিংস্র-হায়েনাসদৃশ ভোগবাদী কামুক দানবে পরিণত হলো। মূলত ধর্মনিরপেক্ষতা বা ঝবপঁষধৎরংস যেদিন থেকে ইউরোপে প্রতিষ্ঠিত হলো সেদিন থেকে রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, পররাষ্ট্রনীতি, নৈতিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল আর নৈতিকতা এর আসল উৎস ধর্ম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লো।

শুধু এখানেই শেষ নয়। এই নৈতিকতাহীন দানবগণ বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতির অধিকারী হয়ে প্রথমে নিজেদের মধ্যে ও পরবর্তীতে সারাবিশ্বের প্রতিটি জনপদে তাদের হিংস্র আক্রমণ পরিচালনা করে বিশ্বের নিভূত কোণের বাসিন্দাদেরকেও হত্যা, নির্যাতন ও শোষণ করা শুরু করে। তাদের সীমাহীন লোভ-লালসার শিকার আজ সমগ্র বিশ্বের প্রকৃতি, পরিবেশ ও মানবসন্তানগণ। তাদের হাতে নিষ্পেষিত হচ্ছে, ধর্ষিত হচ্ছে, লাখ লাখ বছরের মানবসভ্যতা, সকল মানবীয় গুণাবলী ও মূল্যবোধ। তারা সত্য কথা বলে যদি এতে তাদের বস্তুগতলাভ হয়, তারা সুন্দর কথা বলে যদি এতে তাদের শোষণের পথ উন্মুক্ত হয়, তারামানবসেবা করে ‘গরু মোটা-তাজাকরণ প্রকল্পের’ অংশ হিসেবে, তারা দরিদ্রদেরকে সাহায্য করে তাদের ভবিষ্যৎ শ্রমশোষণকরার জন্য, তারা খাদ্য সাহায্য দেয়-শ্রমদাসের ঘাটতি মোকাবিলার জন্য, তারাচুক্তি করে নিজেরা লাভবান হওয়ার জন্য,পরিবেশ-পরিস্থিতির কারণে লাভ না হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিলে, উক্ত চুক্তির কপি টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলে দেয়, তারা ওয়াদা করে ও ভঙ্গ করে নিজেদের লাভের জন্য, তারা যুদ্ধ করে তেল, গ্যাস ও সোনা-রুপার জন্য, শান্তিচুক্তি করে অশান্তি কে দীর্ঘস্থায়ী করার জন্য, তারা আইন রচনা করে ও তা বাতিল করে বৈষয়িক সুবিধার লক্ষ্যে এবং তাদের বর্তমান ধর্মযাজকগণ যীশুর বাণী প্রচার করে অপর দেশ ও জাতির ঘাড় মটকিয়ে রক্ত পান করার জন্য।

অনেকে হয়তো চমকে উঠবেন এই ভেবে যে, Secularism মতবাদে তো ধর্ম ও রাজনীতি আলাদা বিষয়, সেক্ষেত্রে ধর্মযাজকগণ অপর জাতির ঘাড় মটকাবে কেন? তাদের অবগতির জন্য বলছি, ইউরোপ-আমেরিকার সেক্যুলারিজম মতবাদ বর্তমানে তাদের নিজের জন্য নয়- যাদেরকে তারা গোলাম বানাতে চায় তাদের জন্য। সেক্যুলার ইউরোপের ধর্মযাজকদের কার্যকলাপ সম্পর্কে প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ভিজি কিরনান,‘আমেরিকা-নয়া সাম্রাজ্যবাদ’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘১৮৩৮ সালের দিকে নিম্নবার্মা থেকে যেসব মিশনারিকে বের করে দেয়া হয়েছিল তারা ১৮৫১ সালে বার্মা দখলের ব্যাপারে ব্রিটিশদেরকে খুব সহায়তা প্রদান করেছিল। (পৃ. ১৬৫, অনুবাদ : বিনোদ দাশ গুপ্ত)।

উপরোক্ত আলোচনা ও তথ্যাদির আলোকে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, বহু দেব-দেবীর উপাসনাকারী ভোগবাদী ও যৌন উচ্ছৃঙ্খল স্বেচ্ছাচারী গ্রিক ধর্ম ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে খ্রিস্টপূর্ব যুগে সক্রেটিস, প্লেটো, এরিস্টটল যে ধর্মবিরোধী আন্দোলনের সূচনা করেছিলেন তার আধুনিক সংস্করণ হলো- মেকিয়াভেলী, ডারউন, কার্ল মার্কস, ফ্রয়েড, দরখায়েম নির্দেশিত ইউরোপীয় ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ বা Secularism ও সমাজতন্ত্র সক্রেটিসের যুক্তিবাদ, প্লেটোর দ্বৈতবাদ ও রাজনৈতিক দর্শন এবং এরিস্টটলের জগৎ নিরপেক্ষ খোদায়ী দর্শনের ভাবধারায় সম্পৃক্ত। উক্ত তিন গ্রিক দার্শনিকের ভাবশিষ্য মেকিয়াভেলীর সেক্যুলারিজম, ডারউইনের বিবর্তনবাদ, কার্ল মার্কসের সমাজতান্ত্রিক মতবাদ, ফ্রয়েড ও দরখায়েমের যৌনতাবাদ, হবস, লক, রুশো, ভলতেয়ার, মন্টেস্কুসহ অসংখ্য বুদ্ধিজীবী ও দার্শনিকের মতবাদসমূহ বর্তমান দানবীয় পাশ্চাত্য সভ্যতার সৃষ্টি করে। পাশ্চাত্য শিক্ষাব্যবস্থা ও সিলেবাসের অনিবার্য ফলশ্রুতিতে সেক্যুলারিজম বর্তমানে প্রাচ্যকে গ্রাস করার পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।

পাশ্চাত্য ধর্মনিরপেক্ষতার বর্তমান রূপ-
গীর্জাকেন্দ্রিক শাসন, শোষণ, স্বেচ্ছাচার, বিজ্ঞান ও যুক্তি বিরোধিতা ও ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর সীমাহীন জুলুম,অত্যাচারের ফলস্বরূপ পনের শতকে মোকিয়াভেলী সেকুলারিজমের যে তত্ত্ব নিয়ে হাজির হন তা হলো সরকার, সরকারি নীতিআদর্শ, জাগতিক বিষয়াদিতে ধর্ম ও নৈতিকতার কোনো ভূমিকা থাকা চলবে না, তবে ব্যক্তিগতভাবে কেউ ধর্ম পালন করতে চাইলে, ধর্মীয় মনোভাব পোষণ করলে বা অপার্থিব বিষয়াদির সাথে জড়িত হতে চাইলে রাষ্ট্র কোনো প্রকার বাধা প্রদান করবে না। তদুপরি ধর্মযাজকগণ যেহেতু অভিজাত শ্রেণীর সাহায্যে ধর্মের নামে কুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে, সেহেতু ইউরোপের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী বিপ্লবীদের প্রধান লক্ষ্য ছিল ধর্মযাজক ও অভিজাতদের নির্মূল করা অথবা নিদেনপক্ষে ধর্মযাজক ও অভিজাতদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করে জনগণের শাসন প্রতিষ্ঠা করা। ১৭৮৯ সালের ফরাসি বিপ্লবের পর সমগ্র ইউরোপে এই বিপ্লব দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ইউরোপের অন্যান্য রাজতন্ত্র ও যাজকতন্ত্র ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিপ্লবী ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হয়। বিপ্লব ও যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর দেখা গেল, ইতোমধ্যে নতুন শাসকশ্রেণী অভিজাত শ্রেণীতে পরিণত হয়েছে আর ধর্মযাজকগণ নতুন শাসকশ্রেণীর সহায়তাকারী অগ্রবর্তী বাহিনীতে পরিণত হয়েছে। পূর্বে পোপের ভাষণে রোমাঞ্চিত হয়ে জনগণ যুদ্ধে যোগদান করত আর বর্তমানে ধর্মনিরপেক্ষ(?) শাসকের নির্দেশে ও ধর্মগুরুদের গোপন তৎপরতায় জনগণ যুদ্ধে যোগদান করে অপরের সর্বস্ব হরণ করে।

যে লাউ সে কদু-
সত্যিই পাঠকবৃন্দ! কি বিচিত্র এই ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী খ্রিস্টান বিশ্ব। ১০৯৫ সালে পোপ দ্বিতীয় আরবান ইউরোপের রাজন্যবর্গকে একত্রিত করে ফ্রান্সের ক্লারমাউন্ট্রের উন্মুখ প্রান্তরে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের ঘোষণা দিয়েছিলেন আর ৯/১১-এর পর গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী মার্কিন প্রেসিডেন্ট বুশ হোয়াইট হাউসে দাঁড়িয়ে মুসলমানদের বিরুদ্ধে ক্রুসেডের ডাক দিয়েছেন। অথচ উপরোক্ত পোপ ছিলেন ধর্মরাজ্যের প্রধান আর বুশ হলেন ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী রাষ্ট্রের প্রধান। দু’জনের বিঘোষিত নীতি সম্পূর্ণ বিপরীত হওয়া সত্ত্বেও দু’জনেই ধর্মের নামে মুসলমান হত্যায়, ভিন্ন জাতির সর্বস্ব হরণে, মানবাধিকার ও সব ধরনের ন্যায়নীতি বিসর্জনে ও মানবীয় মূল্যবোধ ধ্বংসে এক ও অভিন্ন। পোপ আরবান দ্বিতীয় এর ভাষণের শেষ বাক্য কয়টি ছিল- ‘জেরুজালেমের পুনরুদ্ধারে অগ্রসরমান ক্রুসেডারদের বর্মে যতক্ষণ থাকিবে ক্রুশচিহ্ন ততক্ষণ তাহাদের জন্য থাকিবে ইহলোকে আর্থিক সকল সুযোগ এবং পরলোকে স্বর্গ লাভের নিশ্চয়তা। উদ্ধার কর জেরুজালেম, ইহাই গড চান।’ উপস্থিত শ্রোতাদের গগনবিদারী স্লোগান লক্ষ কণ্ঠে প্রতিধ্বনি হলো- ‘গড ইহাই চান’। (সূত্র : The Crusades, Hans Eberhurd Mayer, 1972, P. 9)

ওই গ্রন্থের ৬০ পৃষ্ঠায় জেরুজালেম দখলকরার পরবর্তী দৃশ্য সম্পর্কে প্রফেসর মেয়ার লিখেন, ‘জেরুজালেমের গভর্নর ও তার অনুচরবর্গ ছিলেন একমাত্র পলাতক মুসলমান। বিজয়ের প্রমত্ততা, ধর্মীয় অন্ধ গোঁড়ামি এবং তিন বছরের অবরুদ্ধ কষ্টের স্মৃতি ফেটে পড়ল ভয়ঙ্কর এক রক্তস্নানের মধ্য দিয়ে, যাতে ক্রুসেডাররা ফালি ফালি করে কেটে ফেলল ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে প্রতিটি মানুষকে, যারা দুর্ভাগ্যক্রমে এসে পড়ল তাদের তরবারির নাগালের মধ্যে। লাশে ঢাকা রাস্তা দিয়ে পায়ের গোঁড়ালি সমান রক্তধারা পেরিয়ে অতিকষ্টে তারা হেঁটে যেতে লাগল।’ ধর্মান্ধ পোপ আরবানের নেতৃত্বাধীন ক্রুসেড আর তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষ পাশ্চাত্যের নেতা বুশ-ব্লেয়ারের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বীভৎসতায় ও চেতনায় সে পার্থক্য আছে কি? বসনিয়া, ফিলিস্তিন, ইরাক, আফগানিস্তানে যারা রক্তবন্যা বইয়ে দিচ্ছে তারা কি ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী? না নব্য ক্রুসেডার। ধর্ম ব্যক্তিগত ব্যাপার- জাতীয় নয়, ধর্মের নামে রাজনীতি করা যাবে না, এরূপ বক্তব্যের সাথে বাস্তবের কোনো মিল খুঁজে পাওয়া যাবে কি?

মার্টিন লুথার কিংয়ের আপস আন্দোলনের ফলে সমগ্র ইউরোপে বনাম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদের লড়াই থেমে যায় এবং ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের নেতৃত্বে বিভিন্ন দেশের সরকারগুলো গঠিত হয়। ধর্ম নিয়ে যুদ্ধ বন্ধ হওয়ার পর যুদ্ধপ্রিয় শ্বেতাঙ্গরা লিপ্ত হয় দেশ দখল ও লুটতরাজের যুদ্ধে। এ সময়ের মধ্যে তারা এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশের প্রায় সব দেশে নিজেদের উপনিবেশ স্থাপন করে এবং সংশ্লিষ্ট দেশের খনিজ সম্পদসহ সব ধরনের সম্পদ লুণ্ঠনের প্রতিযোগিতা শুরু করে। এই প্রতিযোগিতায় তারা এতই উন্মত্ত হয়ে পড়ে যে, লুটের মালের ভাগাভাগি নিয়ে অসংখ্য যুদ্ধের সাথে দু’দুটি বিশ্বযুদ্ধও উপহার দেয় বিশ্ববাসীকে। খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের আধিপত্যের লড়াইয়ের একপর্যায়ে ১৯১৪ সালে শুরু হয় বিশ্বযুদ্ধ। এ যুদ্ধে জার্মানি, ইতালি ও মুসলিম তুরস্ককে নিয়ে গঠিত হয় অক্ষশক্তি আর ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও আমেরিকাকে নিয়ে গঠিত হয় মিত্রশক্তি। তখন আরব উপদ্বীপ ছিল তুরস্ক সালতানাতের অংশ। ১৮৬৭ সালে মিশনারি কলেজ হিসেবে চালু হওয়া বৈরুতে আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে এবং খ্রিস্টান বংশোদ্ভূত সাইফেল আফলাফের প্রচেষ্টায় ইতিমধ্যে আরব বিশ্বে ইসলামি জাতীয়তার বিপরীতে আরব জাতীয়তাবাদের সৃষ্টি হয়েছিল। মিত্রশক্তি ওই আরব জাতীয়তাবাদীদের সাথে এক গোপন অঙ্গীকারে আবদ্ধ হয়। ওই অঙ্গীকারের মূল কথা ছিল, যুদ্ধে মিত্রশক্তি বিজয় লাভ করলে সমগ্র আরব, ফিলিস্তিন ও সিরিয়াকে তুরস্ক সালতানাতের কবল থেকে উদ্ধার করে স্বাধীনতা প্রদান করা হবে। বিশ্ববাসী বিগত ৯০ বছর ধরে দেখছে, মিত্রশক্তি আরবদের সাথে প্রদত্ত ওয়াদা কীভাবে রক্ষা করছে। আমার আলোচ্য বিষয় তা নয়। আমার বক্তব্য হচ্ছে- প্রথম বিশ্বযুদ্ধ ছিল ইউরোপীয়দের আধিপত্য প্রতিষ্ঠার লড়াই, ধর্মযুদ্ধ নয়। যুদ্ধে অক্ষশক্তি পরাজিত হলে তুরস্কের খেলাফতকে উচ্ছেদ করা হয় ও ধর্মনিরপেক্ষ (ধর্মবিরোধী) মোস্তফা কামাল পাশাকে তুরস্কের ক্ষমতায় বসানো হয় এবং আরবদের তুরস্কের কবল থেকে উদ্ধার করে নিজেদের গোলামে পরিণত করা হয়। এ যুদ্ধ প্রকাশ্যে ধর্মযুদ্ধ না হলেও খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের অন্তরে ছিল তীব্র মুসলমান বিদ্বেষ। ধর্ম ও রাজনীতির পৃথকীকরণের ব্যাপারে সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও তার চর্চা পাশ্চাত্যে অনুপস্থিত, অমুসলিম বিশ্বেও অনুপস্থিত। কয়েকটি উদাহরণের সাহায্যে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে।
১. খ্রিস্টানদের বন্ধু এবং আরব জাতীয়তাবাদী সরকার শরীফ হোসাইনের সহায়তায় ৯ ডিসেম্বর ১৯১৮ সালে মিত্রশক্তি বায়তুল মুকাদ্দাস দখল করে। ১ অক্টোবর ১৯১৮ সালে শরীফ পুত্র আমীর ফয়সাল ও জেনারেল গুরবানী বিজয়ীর বেশে সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কে প্রবেশ করেন। ফরাসি জেনারেল গোর বায়তুল মুকাদ্দাস বিজেতা সুলতান সালাউদ্দীন আইয়ুবীর কবরে পদাঘাত করে বলল, রে সালাউদ্দীন! আমরা এসে পড়েছি। আমরা সিরিয়া জয় করেছি। উঠে দেখ! (সূত্র: ত্রৈমাসিক সাময়িক, ইসলামী ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, ২৪ বর্ষ, ২য় সংখ্যা, অক্টোবর-ডিসেম্বর, ১৯৮৪)
২. যুদ্ধে একজন সেমিনোল সর্দারের মৃত্যুর পর একজন আমেরিকান অফিসার তার মাথা কেটে নিয়ে পেপার ওয়েট হিসেবে ব্যবহার করছিল। জেনারেল কিচেনার সুদানের প্রতিরোধ আন্দোলনের নেতা মেহেদীর মাথার খুলি দোয়াত হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। (সূত্র : আমেরিকা : নয়া সাম্রাজ্যবাদ, ডিজি, ফিরনান, পৃ. ১১৫)।
৩. খ্রিস্টান ধর্মনেতা রেভারেঞ্জ জোসিয়া স্ট্রং পৃথিবীর অপরাপর জনগোষ্ঠীর নির্মূল করার পক্ষে ‘অধিক জনসংখ্যার বিপদ’ নামক একটি তত্ত্ব প্রচার করেন। যার সারকথা হলো- ‘আমার মনে হয় যে, ঈশ্বর তাঁর অসীম প্রজ্ঞা ও দক্ষতাবলে এংলো-স্যাক্সন জনগোষ্ঠীকে প্রশিক্ষণ দান করেছেন। এটাই হলো বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর মধ্যে চূড়ান্ত প্রতিযোগিতার মুহূর্ত ...... যদি আমি সঠিকভাবে বুঝে থাকি তাহলে এই মানবগোষ্ঠী (এংলো-স্যাক্সন) মেক্সিকো, সেন্ট্রাল এবং দক্ষিণ আমেরিকা, সমুদ্রে অবস্থিত দ্বীপমালা, আফ্রিকা এবং আরো অনেকদূর পর্যন্ত এগিয়ে যাবে। এটা কাউকে নিশ্চিহ্ন করার যুদ্ধ নয়, নিরীহ এবং দুর্বল মানবগোষ্ঠী ঈশ্বরের নির্দেশে সহজেই বিলীন হয়ে যাবে, তারা উন্নত মানবগোষ্ঠীর পথ রচয়িতা। (সূত্র : ওই, পৃ. ১৪১-৪২)।
৪. মার্কটোয়েন খ্রিস্টান মিশনারি তৎপরতাকে ‘সভ্যতা প্রচারের বুলি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘গির্জা এবং রাষ্ট্র একই লক্ষ্যের অভিমুখে চলেছিল। ধর্মপ্রচার তৎপরতাও আমেরিকার মর্যাদার স্বার্থে নিজেকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল এবং এভাবে সে নিজেকে সত্যিকার আমেরিকান হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করছিল। এই একই পদ্ধতিতে ফ্রান্সের ক্যাথলিক ধর্মযাজকরা তৃতীয় রিপাবলিক দলের মধ্যে নিজেদের সুদৃঢ় করার মাধ্যমে ইন্দোচীন দখলে কার্যকর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করছিল। একদিন একজন মৌলবাদী যাজক এবং যুদ্ধে ব্যাপৃত জেনারেল কোন এক বড়দিনে ভিয়েতনামের মাটিতে একসঙ্গে দাঁড়িয়ে আগুন জ্বালাবে এবং বিদ্রোহীদের হত্যাযজ্ঞের আয়োজন করবে। (সূত্র : ঐ, পৃ. ১৪৬)।
৫. বিশ্বব্যাংকের একজন প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট (আমেরিকান) পরবর্তী সময়ে বলেছেন, ‘যেসব আমেরিকান বিদেশে তৎপরতা চালিয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই কোনো না কোনোভাবে মিশনারি কাজের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এর উল্টোটাও সমানভাবে সত্য। আমেরিকান ও অন্য দেশের খ্রিস্টান মিশনারিরা কখনো তাদের জাতীয়তার কথা ভুলেনি এবং স্বর্গের পথকে তারা নিজ দেশের তৈরি রাজপথ বলেই বিবেচনা করে। ... একজন ব্রিটিশ বাণিজ্য মুখপাত্র বলেছিলেন, ‘চীনে অবস্থানরত মিশনারি দলগুলোর সদস্যরা শুধু যদি আমাদের কানসালগুলোর সাথে মিলেমিশে সে দেশ শোষণে আমাদের সহায়তা করতেন তবে তারা আমাদের বাণিজ্য স্বার্থের অনুকূলে অশেষ কল্যাণ সাধন করতে পারতেন।’ (সূত্র : ঐ, পৃ. ১৪৬-১৪৭)।
৬. কেবলমাত্র আধ্যাত্মিক চিন্তার দিক থেকে বলা যায় যে, আমেরিকা চীনকে রক্ষা করেছিল। ১৯২০ সালের মধ্যে এখানে আমেরিকার ১৩টি এবং ২৫০০ মিশনারি কেন্দ্র ছিল।
৭. ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী পাশ্চাত্যের ২য় প্রধান নেতা জন মেজরের ২/৫/১৯৯৩ইং তারিখের লেখা একটি পত্র যা ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ দফতরের প্রতিমন্ত্রী ডগলাস হগকে প্রদান করা হয়েছিল। তার সারকথা ছিল নিম্নরূপ-
ক. ইউরোপের বুকে কোনো সম্ভাব্য ইসলামী রাষ্ট্র সহ্য করা হবে না। তাই বসনিয়া, হারজেগোভিনা খণ্ড-বিখণ্ড না হওয়া পর্যন্ত এবং ইসলামী রাষ্ট্র হিসেবে দেশটি ধ্বংস না হওয়া পর্যন্ত সে দেশের মুসলমানদের কোনো রকম সাহায্য প্রদান না করার নীতি ব্রিটেন অনুসরণ করে যাবে।
খ. বসনিয়ার মুসলমানদের এখন কিংবা ভবিষ্যতে সমরাস্ত্র দিয়ে অস্ত্রসজ্জিত কিংবা প্রশিক্ষণ প্রদান করতে ব্রিটেন কখনই রাজি হবে না। ব্রিটেন সে অঞ্চলে জাতিসংঘের অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও কার্যকর করতে সাহায্য প্রদান অব্যাহত রাখবে।
গ. ব্রিটেন জানে গ্রিস, রাশিয়া ও বুলগেরিয়া সার্বীয়দের অস্ত্র ও ট্রেনিং দিচ্ছে। জার্মানি-অস্ট্রিয়া, শ্লোভেনিয়া এমনকি ভ্যাটিকান ও সে অঞ্চলে ক্রোয়েশিয়া ও বসনিয়ার ক্রোট বাহিনীকে অনুরূপ সাহায্য দিচ্ছে। এ সত্ত্বেও ব্রিটেনকে নিশ্চিত করতে হবে যাতে কোনো ইসলামী দেশ কিংবা গ্র“প বসনিয়ার মুসলমানদের এ ধরনের সাহায্য প্রদানের প্রচেষ্টায় সফল না হয়। এটা পশ্চিমাদের জন্য অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ঘ. সাবেক সোভিয়েত বাহিনীর বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদদের ট্রেনিং প্রদান ও অস্ত্র সজ্জিত করা ভুল হয়েছে। এর ফলে সেখানে ইসলামী মুজাহিদ বাহিনী গড়ে উঠেছে। বসনিয়া-হারজেগোভিনার মুসলিম জনগোষ্ঠীর ব্যাপারে একই ভুল করা যায় না।
ঙ. জন মেজর লিখেন, টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে বসনিয়া-হারজেগোভিনার অস্তিত্ব লোপ না পাওয়া পর্যন্ত এবং এর মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সম্পূর্ণ উৎখাত না করা পর্যন্ত ভ্যান্স-ওয়েন শান্তি আলোচনার অভিনয় চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন।
চ. ভবিষ্যৎ ইউরোপের মূল্যমান পদ্ধতি হবে ও অবশ্যই হতে হবে খ্রিস্টান সভ্যতাভিত্তিক এবং নৈতিকতাভিত্তিক। তার এ অভিমত প্রতিটি ইউরোপীয় ও উত্তর আমেরিকার দেশগুলোও দৃঢ় মত। তাই পশ্চিমা দেশগুলো বসনিয়ার মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রক্ষা করার জন্য সেখানে হস্তক্ষেপ করবে না কিংবা তাদের ওপর থেকে অস্ত্র নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পদক্ষেপ নেবে না। (সূত্র : ক্রুসেডের ইতিবৃত্ত, আশকার ইবনে শাইখ, পৃ. ১৩০-১৩২)।

ধর্মনিরপেক্ষতার মুখোশধারী খ্রিস্টান ধর্মান্ধ নেতাদের উপরোক্ত মানসিকতার ও অপকর্মের হাজারো তথ্য উল্লেখ করা যায়। তবে প্রবন্ধের কলেবরে এ বিষয়ে আর কোনো উদাহরণ না দিয়ে আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই, তথাকথিত খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা সদাসর্বদা ধর্মান্ধ ও লুটেরার দল বৈ নয়। তাদের ধর্মনিরপেক্ষতার আলখেল্লার নিচে সজ্জিত থাকে হিংস্র ধর্মান্ধতা, তাদের সুন্দর সুন্দর কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকে হিংস্র-হায়েনার চতুর হাসি। তাদের সভ্যতা কেবলমাত্র খ্রিস্টান সভ্যতা- মানব সভ্যতা নয়, ইতিহাসের কোনো একটি যুগেও তারা মানবীয় আচরণ করতে শিখেনি। এজন্য খ্রিস্টানদের ব্যাপারে বলা হয়- প্রথমে মিশনারি, অতঃপর রণতরী, এরপর গৃহযুদ্ধ ও ধ্বংস, সবশেষে শোষণ ও লুণ্ঠন। অপর জাতিগোষ্ঠীর সর্বস্ব হরণের লক্ষ্যেই তাদের ধর্ম, দর্শন, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এতদসত্ত্বে যেসব অর্বাচীন নামধারী মুসলমান পাশ্চাত্য সভ্যতা ও ধর্মনিরপেক্ষতার অনুসারী হিসেবে নিজেদের দাবি করে তারা হয় আহাম্মক নতুবা সাম্রাজ্যবাদী শোষকদের দালাল ও দাসানুদাস এবং নিজ দেশ-জাতি-ধর্ম-সভ্যতা ও উন্নতির চরম দুশমন।
এস, এম, নজরুল ইসলাম।
সম্পাদকঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা।

Saturday, January 14, 2012

জাতীয় অর্জনসমূহের বিসর্জন আমাদের পতন নিশ্চিত করবে(প্রথম প্রকাশ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা, জুন ২০১১ সংখ্যা)


দীর্ঘদিন তিলে তিলে গড়া মূর্তিটিকে পুজো করে অবশেষে দীর্ঘ শ্রমের ও আকাংখার ধনকে পুকুর-খালনদী-সাগরে বিসর্জন দেয়া হিন্দু সংস্কৃতির ও ধর্মের প্রধানতম রীতি। অপরদিকে নিজেদের আকাংখা ও শ্রমের অর্জনকে সম্মান ও সংরক্ষণ করার রীতি ও মানসিকতা মুসলিম সংস্কৃতির রীতি। মুসলিম সম্প্রদায়ের যে সকল সদস্য তাদের নিজেদের ও নিজেদের পূর্বপুরুষদের শ্রম, ঘাম ও রক্তের বদলে অর্জিত অর্জনসমূহ যখন সম্মান ও সংরক্ষণের পরিবর্তে বিসর্জনের রীতি গ্রহণ করে নিজ দেশ-জাতির অপূরণীয় ক্ষতি সাধন করে ও মুসলিম বিদ্বেষী বিজাতীয়দের চরণতলে নিজেদের অস্তিত্বকে বিসর্জন দেয় তখন শুধুমাত্র আরবী নামের জন্য তাদেরকে মুসলিম বলা যাবে কি? আরব দেশসমূহের ইহুদী-খ্রিস্টান-কাফের-মুশরেকদের নামও আরবী ভাষায় রাখা হয়। কিন্তু তাদের ধর্ম-বিশ্বাস-সংস্কৃতি ও কর্ম ইসলামসম্মত নয় বিধায় তাদেরকে মুসলিম বলা হয় না। এমতাবস্থায় মুসলিম বিশ্বের দেশে দেশে মুসলিম নামধারী যেসব ব্যক্তি নিজ জাতি ও ধর্মের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, নিজ জাতির অস্তিত্ব, মর্যাদা ও অর্জনকে মুসলিম বিদ্বেষীদের নিকট বিসর্জন দেয় তাদের ধর্মীয় পরিচয় বাস্তবে কি হওয়া উচিত তা নির্ণয় করা সময়ের দাবি। এ দাবি অনুযায়ী সত্ত্বর বাস্তব ও কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে মুসলিম বিশ্ব সংকট থেকে উদ্ধার পাবে না। ধর্মীয় সংজ্ঞানুযায়ী যারা আল্লাহর অস্তিত্বকে অস্বীকার করে তারা কাফের। যারা আল্লাহকে স্বীকার করে কিন্তু আল্লাহর আইনের বিরোধিতা করে অথবা আল্লাহর সাথে অপর কাউকে শরীক করে বা আল্লাহকেও পূজা করে, মূর্তি, দেবদেবী, পীর-পুরোহিতের নিকটও সাহায্য চায় তারা মুশরিক। অপরদিকে যারা মসজিদ/মাহফিলে গিয়ে ইসলামের পক্ষে কথা বলে আবার মন্দির-গীর্জায় গিয়ে দেবদেবীর স্তূতি গায় অথবা দিনের আলোয় মুসলমানদের পক্ষে কথা বলে আর রাতের আঁধারে কাফের/মুশরিক ও ইসলামবিরোধীদের সাথে মুসলিমবিরোধী ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয় এবং বিজাতীয় সংস্কৃতি অনুসরণ করে তারা মুনাফিক।

আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেননি। তিনি যুদ্ধ করেছেন মুশরিক, মুনাফিক ও স্বধর্মত্যাগী মুরতাদদের বিরুদ্ধে। তাঁর যামানায় আরবে স্রষ্টায় অবিশ্বাসী লোক ছিল না কিন্তু তারা স্রষ্টার ক্ষমতাকে বিভিন্ন দেবদেবীর মধ্যে আরোপ করে দিয়ে উক্ত দেবদেবীদের পূজা করত বিধায় রাসুল (সা.)-এর সাথে তাদের বিরোধ ও সংঘর্ষ শুরু হয়। পাঠকবৃন্দ যদি তখনকার নামসমূহ বিশ্লেষণ করেন তবে বিষয়টি হৃদয়ঙ্গম করতে সক্ষম হবেন।
রাসুল (সা.)-এর পিতার নাম ছিল আবদুল্লাহ (আল্লাহর জাত নামের সাথে সম্পর্কিত)। তাঁর দাদার নাম ছিল আবদুল মুত্তালিব (আল্লাহর সিফাতী নামের সাথে সম্পর্কিত) নাম শুদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও তাদের কর্ম ও বিশ্বাস ছিল দেবদেবীদের পক্ষে। এ জন্য তাঁরা মুসলিম ছিলেন না। এভাবে মুশরিক সর্দার আবু সুফিয়ান, খালিদ, উমর যাঁরা পরবর্তীতে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন তাঁদের ইসলাম-পূর্ব নামসমূহ একই ছিল। মুশরিক থেকে মুসলিম হওয়ার পর তাঁদের নামের কোনো পরিবর্তন করতে হয়নি। শুধুমাত্র বিশ্বাস ও কর্ম পরিবর্তন করতে হয়েছিল। এমতাবস্থায় বর্তমান বিশ্বের যে সকল মুসলিম নামধারী ও পরিচয়ধারী ব্যক্তি তাদের বিশ্বাস ও কর্মে ইসলামবিরোধী তারা মুসলমান হয় বা থাকে কিভাবে? যারা “আল্লাহর উপর পূর্ণাঙ্গ আস্থা ও বিশ্বাস’ বাক্যটিকে নিজেদের দেশের সংবিধান থেকে উচ্ছেদ করার পক্ষে কথা বলে এবং উচ্ছেদের জন্য মুশরিক ঠাকুর-পুরোহিতকে দায়িত্ব দেয় তারা কোন ধর্মাবলম্বী? আল্লাহর উপর আস্থা নাই ঘোষণা দেওয়ার পর বিস্মিল্লাহির রাহমানির রাহীম বলা কি সুস্পষ্ট মুনাফেকী নয়? যে রাষ্ট্রনায়করা আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাসকে উচ্ছেদ করার পক্ষে তাদের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম থাকার যুক্তি কোথায়? তবে কি তাদের ইসলাম-আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ইসলাম থেকে ভিন্ন? তবে কি তারা নতুন কোনো ইসলাম, নতুন কোনো রাহমানির রাহীমের উপর আস্থাশীল? পাঠকবৃন্দই সিদ্ধান্ত নেবেন এরূপ বিশ্বাস ও কর্মের অনুসারী ব্যক্তি ও দলের ধর্মীয় পরিচয় কি হতে পারে?

এখন বিসর্জনের সংস্কৃতির আলোচনায় ফিরে আসি। একশ্রেণীর আরবী নামধারী ও মুসলিম পরিচয়ধারী ব্যক্তি ১৭৫৭ সালে শুধুমাত্র ক্ষমতা দখল ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য ইহুদী-খ্রিস্টান ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের সাথে আঁতাত করে আমাদের ৭০০ বছরের অর্জনকে ইসলামবিরোধীদের পদতলে বিসর্জন দিয়েছিল। উক্ত শ্রেণীর অর্থ ও ক্ষমতালোভী মুসলমান নামধারীদের বিশ্বাসঘাতকতার জন্য আমাদের ১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালের ও ১৯৪৭-১৯৭১ সময়কালের মৌলিক অর্জনসমূহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে এবং ১৯৭১-২০১১ সন অবধি সকল মৌলিক অর্জন ব্রাহ্মণ্যবাদের পদতলে, ঠাকুর দেবতার বেদীমূলে বিসর্জিত হওয়ার প্রহর গুনছে। কেউ হয়তো প্রশ্ন তুলতে পারেন আপনাদের মধ্যে কি দেশ জাতি বিরোধীরা সংখ্যাগিরষ্ঠ? প্রশ্নের উত্তর হবে না। তবে দেশ-জাতি-ধর্ম বিরোধী বিভীষণরা আমাদের জাতশত্রু বিজাতীয়দেরকে সাহায্য করায় আমরা আমাদের অর্জনকে ধরে রাখতে সক্ষম হচ্ছি না এবং দেশী-বিদেশী চক্রান্তে আমরা উপযুক্ত নেতৃত্ব নির্বাচন করতে সক্ষম হচ্ছি না। সৎ-যোগ্য ও দূরদর্শী নেতৃত্বের অবর্তমানে জাতি বহুধাবিভক্ত ও শক্তিহীন হয়ে পড়েছে। ১৭৫৭-২০১১ অবধি আমাদের প্রধান প্রধান মৌলিক অর্জন ও বিসর্জনের ঘটনাবলী নিম্নরূপ:
উক্ত অর্জন ও বিসর্জনের আলোচনার পূর্বে ভারতবর্ষ থেকে ৭০০ বছরের মুসলিম শাসন বিলুপ্তির কারণসমূহ আলোচনা করা জরুরি।

নিরক্ষর ও কিশোর সম্রাট আকবর তাঁর কুচক্রি পরামর্শদাতাদের পরামর্শে মোগল সাম্রাজ্যের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সহযোগী ও তাঁর অভিভাবক রৈরাম খানকে পদচ্যুত ও হত্যা করার ব্যবস্থা করে নিজে সৎ ও যোগ্য অভিভাবক হারান। এমতাবস্থায় ভারতের বর্ণহিন্দু কুচক্রীরা আকবরকে নিজেদের কন্যা ও বোন উপঢৌকন দিয়ে মোঘল রাজদরবারে নিজেদেরকে প্রতিষ্ঠা করে, আকবরকে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী কাজকর্মে লিপ্ত করায় এবং আকবর-পরবর্তী মোগল শাসকদের মধ্যে ভ্রাতৃঘাতী ও আত্মঘাতি দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে মুসলিম শক্তিকে হীনবল করে। আকবর ও আকবরের পরবর্তী মোঘল শাসকদেরকে ব্রাহ্মণ্যবাদী সংস্কৃতিতে নিমজ্জিত করে। শাসকদের দেখাদেখি সাধারণ মুসলমানরাও মুসলিম সংস্কৃতির পরিবর্তে হিন্দু সংস্কৃতিতে আসক্ত হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব, মর্যাদা, শক্তি সামর্থ হারিয়ে পতন নিশ্চিত করে। ১৭৫৭ সময়কালে মুসলমানদের অবস্থা বুঝার জন্য দুটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করা হলো।
১. মুসলিম সম্প্রদায়ের নিম্নশ্রেণীর লোকজন হিন্দু রায়তদের আচার-অনুষ্ঠান এমনভাবে পালন করতো যে, তাদেরকে শুধু অনুষ্ঠানে নয়, বরং নামেও পৃথক করা দুষ্কর হতো। মুসলমানদের নামের মধ্যে এরূপ নামও ছিল যথা- গোপাল, নেপাল, গোবর্ধন ইত্যাদি। (আবদুল বারী, The Reform Movement in Bengal, History of The Freedom Movement : Vol. 1, 1960)
২. হিন্দু ধর্ম থেকে ধর্মান্তরিত বাংলার অসংখ্য মুসলমান তাদের প্রাক্তন ধর্মীয় পদ্ধতি ও দেবদেবীর প্রতি আকর্ষণ বজায় রাখে। তাদের কেউ কেউ সর্পদেবী মনসা, ব্যাঘ্র দেবতা দক্ষিণা রায়, বাসন্তী দেবী, শীতলার পূজাকে নবরূপ দান করে। কেউ কেউ শিবের পূজাও করতো। সঠিক ইসলাম সম্পর্কে অজ্ঞতাই এর প্রধান কারণ। (ঐ vol-111 part-1)

আমার দৃঢ় বিশ্বাস তৎকালে মাতৃভাষায় কোরআনের অনুবাদ, হাদিসের অনুবাদ ও ইসলামী সাহিত্য না থাকায় ধর্মান্তরিতরা ইসলামের মর্মবাণী উপলব্ধি করতে সক্ষম হতো না বিধায় পূর্ব ধর্মের আচার-অনুষ্ঠান সম্পূর্ণভাবে পরিত্যাগ করতে সক্ষম হতো না
 মুসলমানের অন্তর যখন আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করে এবং তাঁর রাসুল (সা.)-এর কর্মপন্থাকে নিঃশর্ত অনুসরণ করে তখন সে হয় বিশ্বের সবচেয়ে নৈতিক মানসম্পন্ন সাহসী ব্যক্তি। অপরদিকে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের উপর ঈমানের ব্যাপারে মুসলমানের অন্তর যদি দোদুল্যমান অবস্থায় থাকে অথবা বেখবর থাকে তখন শুরু হয় মুসলমানদের নৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়। এমতাবস্থায় উক্ত মুসলমান আল্লাহকে বাদ দিয়ে পীর পূজা, কবর পূজা, দরগাহ পূজা, দেবদেবী পূজায় লিপ্ত হয় এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে নিজেদের ধ্বংস ডেকে আনে।
আধুনিক ভারতের মুসলমানদের উত্থানের রূপকার হযরত শাহ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দেস দেহলভী (১৭০৩-১৭৬২) স্বচক্ষে ভারতীয় মুসলমানদের ১৭৫৭ সময়কালের পতন প্রত্যক্ষ করেছেন। মুসলিম সমাজ, রাষ্ট্র ও ধর্মের পতনের যেসব কারণ তিনি চিহ্নিত করেছেন তা হলো-
১. আত্মকলহ ও ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত।
২. শরীয়তবিরোধী বিদআতের প্রসার।
৩. ভ্রান্ত সুফী মতবাদের প্রসার।
৪. হিন্দু দেবদেবীর পূজা অর্চনা।
৫. পীর পূজা, কবর পূজা, দরগায় মানত।
৬. তাবিজ, কবজ, মাদুলী ও কুলজীতে বিশ্বাস।
৭. হোলি উৎসব উদযাপন (সমকালীন মোঘল সম্রাটগণ ও নবাব সিরাজউদ্দৌলা এ অনুষ্ঠান পালন করতেন)।
৮. নারীর উত্তরাধিকারের শরীয়তী আইন লঙ্ঘন (পাঞ্জাব ও যুক্ত প্রদেশে)।
৯. মাতৃতান্ত্রিক উত্তরাধিকার প্রথার প্রচলন (মালাবারে)।
১০. জ্যোতিষশাস্ত্র, ভবিষ্যদ্বাণী ও ভূতপ্রেতে বিশ্বাস।
১১. বিদআতী পীর, ফকির ও ধর্মনেতা।
[বি. দ্র. : বাংলাদেশের বর্তমান সরকার, সরকারি দল ও মহাজোটের শরীক দলগুলি উপরোক্ত পতনের কারণসমূহের প্রায় সবগুলির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে এবং সঠিক ইসলাম, সমাজ ও রাষ্ট্র সংস্কারকদের দমনে তৎপর রয়েছে। তবে কি তারা বাংলাদেশ ভূখণ্ডে মুসলিম শাসনের বিলুপ্তি চায়? তারা কাদের স্বার্থে এসব করছে?]

মুসলমানদের পতনের উক্ত কারণসমূহ চিহ্নিত করে শাহ ওয়ালীউল্লাহ এক যুগধর্মী সংস্কার আন্দোলনের গোড়াপত্তন করেন। আন্দোলনের সূতিকাগার হিসেবে তিনি তাঁর পিতা আবদুর রহীম কর্তৃক দিল্লীর মেহেন্দিয়ুকা মহল্লায় স্থাপিত মাদ্রাসাকে ব্যবহার করেন। ছাত্রদেরকে সঠিক ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত করে সমগ্র ভারতে ছড়িয়ে দেন। তাঁর মাদ্রাসার ছাত্ররাই পরবর্তী ১০০ বছর প্রত্যক্ষভাবে ভারতীয় মুসলমানদেরকে নেতৃত্ব প্রদান করেন। বিংশ ও একবিংশ শতাব্দীতে ও তার শিক্ষা জীবন্ত রয়েছে। তাঁর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ শিষ্য ও সহযাত্রীবৃন্দ যথাক্রমে শাহ আবদুল আজিজ, শাহ ইসমাইল শহীদ, মাওলানা আবদুল হাই, সৈয়দ আহমদ বেরেলভী, মাওলানা এনায়েত আলী, মাওলানা বেলায়েত আলী, মাওলানা কেরামত আলী জৌনপুরী, হাজী শরীয়ত উল্লাহ, সৈয়দ নিসার আলী তিতুমীর ও স্যার সাইয়েদ আহমদ খান। উল্লেখ্য, ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ বিষয়ে স্যার সাইয়েদ আহমদ খান ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করলেও তাঁর মানস গঠন হয়েছিল শাহ ওয়ালীউল্লাহর চিন্তাধারায় সিক্ত হওয়ার মাধ্যমে। এ সংক্রান্ত প্রামাণ্য তথ্য নিম্নরূপঃ
১. স্যার সৈয়দ আহমদ খান নকসবন্দীয়া-মুজাদ্দেদীয়া তরীকার বুজুর্গ শাহ গোলাম আলীর শিষ্য হন। গোলাম, আলী হযরত শেখ আহমদ সরহিন্দের তরীকার লোক ছিলেন। (এস এম ইকরাম, Modern
Muslim India and the Birth of Pakistan, P-20)
২. দিল্লীতে অবস্থানকালে স্যার সৈয়দ আহমদ খান ওহাবী আন্দোলন (সংস্কার আন্দোলনের বৃটিশ প্রদত্ত উদ্দেশ্যমূলক নাম) এর সপক্ষে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেন। (ড. মুহাম্মদ ইনাম-উল-হক, ভারতের মুসলমান ও স্বাধীনতা আন্দোলন পৃ. ৬৪)
১৮৫৭ সালের রক্তাক্ত স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রশ্নে শাহওয়ালী উল্লাহর অনুসারীরা ২ ভাগে বিভক্ত হয়ে যায়। বৃহত্তর অংশ ইঙ্গ-হিন্দু শাসন শোষণের বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামের পক্ষে আর অপরপক্ষ স্যার সাইয়েদ আহমদ খানের নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণের পক্ষে। পরবর্তীকালে একপক্ষের নাম হয় দেওবন্দপন্থী অপর পক্ষের নাম হয় আলীগড়পন্থী। ১৮৫৭ সালের যুদ্ধে ও তৎপরবর্তী দমন-পীড়নে দেওবন্দপন্থীরা প্রায় নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়। ধ্বংসস্তূপের উপর স্যার সাইয়েদ আহমদ খান আলীগড় আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরিরা হলো নবাব মুহসিন- উল-মূলক (১৮৩৭-১৯০৭), নবাব ভিখারউল মুলক (১৮৪১-১৯১৭), নবাব আবদুল লতিফ (১৮২৮-১৮৯৩), সৈয়দ আমীর আলী (১৮৪৯-১৯২৮) এবং মহামান্য আগা খান, নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ও মোহাম্মদ আলী জিন্নাহসহ অসংখ্য জাতীয় ও আঞ্চলিক নেতৃবৃন্দ। জিহাদের পক্ষের মুসলিম নেতৃবৃন্দ সমগ্র ভারতে মুসলিম শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। পক্ষান্তরে সমঝোতাপন্থী আলীগড় আন্দোলনের উত্তরসূরিরা পরবর্তীতে ভারতের একটি ক্ষুদ্র অংশে মুসলিম শাসন কায়েম করতে সক্ষম হন ১৯৪৭ সালে। আমাদের পূর্বপুরুষদের শতাব্দীব্যাপী বিরামহীন শ্রমের ফসল পাকিস্তানকে আমরা বিসর্জন দিয়েছি ১৯৭১ সালে এবং বাংলাদেশকে বিসর্জন দেওয়ার কার্যাবলী এখন চূড়ান্ত পর্যায়ে উপনীত হয়েছে।
১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালে আমাদের কোটি কোটি পূর্বপুরুষ ইঙ্গ-হিন্দু প্রতিপক্ষের হাতে আহত-নিহত, পঙ্গু-দ্বীপান্তর-দেশান্তরী হওয়ার বিনিময়ে আমাদের মৌলিক অর্জনসমূহ ছিল-
১. পৃথক মুসলিম জাতিসত্তার স্বীকৃতি।
২. সংস্কার আন্দোলনের মাধ্যমে পরিশীলিত ও জাগ্রত একটি মুসলিম সমাজ।
৩. ভারতবর্ষের দুই প্রান্তে আমাদের জন্য আলাদা একটি নিজস্ব রাষ্ট্র।
৪. মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা।
৫. আধুনিক গণতন্ত্রে উজ্জীবিত একটি সচেতন জাতি। (উল্লেখ্য, এ বিষয়ে কেউ কেউ দ্বিমত পোষণ করতে পারেন। এ সংক্রান্ত আমার বক্তব্য হলো- এ দেশের জনগণ যখনই সুষ্ঠু গণভোটের সুযোগ পেয়েছে তখনই তারা ভোটের মাধ্যমে সঠিক ও যৌক্তিক রায় প্রদান করেছে। দেশী-বিদেশী ষড়যন্ত্রে প্রতিষ্ঠিত একশ্রেণীর নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি গণরায়কে বানচাল করেছে। গণতন্ত্র হত্যা করেছে, দেশকে অনিশ্চয়তার দিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু জনগণ বারবার নিজেদের গণতান্ত্রিক অভিব্যক্তির সুস্পষ্ট স্বাক্ষর রেখেছে।)

দীর্ঘদিনের অর্জনসমূহ বিসর্জনের ধারাবাহিকতা :
১. পৃথক মুসলিম জাতিসত্তার স্বীকৃতির মাধ্যমেই আমরা পাকিস্তান অর্জন করেছিলাম। কিন্তু আমাদের জাতির একটি অংশ ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার পরপরই ভাষার প্রশ্নে অসহিষ্ণু হয়ে মুসলিম জাতিসত্তার মূলে কুঠারাঘাত করে ভাষাভিত্তিক জাতীয়তার বেদীমূলে ধর্মীয় জাতীয়তাকে বিসর্জন দেয়। অথচ ধর্মীয় জাতীয়তাই আমাদের ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা অর্জনের প্রধান উপাদান ছিল। একথা শতভাগ নিশ্চিত যে, ১৯৪৭-এর স্বাধীনতা ও মানচিত্রই আমাদের স্বাধীনতার মূল ভিত্তি।
২. ১৯৪৭ সালে আমাদের মধ্যে অনেক সৎ, যোগ্য, নির্লোভ ও দূরদর্শী নেতৃবৃন্দ ছিল এবং আমদের জনগোষ্ঠীও ছিল ঐক্যবদ্ধ, উদীয়মান ও বিকাশমান। আমাদের একশ্রেণীর ক্ষমতা ও অর্থের লোভ এবং বিদেশী চক্রান্তে আমরা আমাদের সৎ লোকদেরকে দৃশ্যপট থেকে বিদায় করেছি এবং অসৎ নেতৃত্বকে বরণ করে নিয়েছি। এতে করে সমগ্র জাতি খুব দ্রুত নৈতিক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে এবং বহুধা বিভক্ত হয়েছে।
৩. ১৯৪৭ সালের পাকিস্তান অর্জনকে অনেকে ভুল ও অযৌক্তিক বলে আখ্যায়িত করছে। অথচ আমাদের বিজ্ঞ নেতৃবৃন্দ ও সমগ্র জাতি ১৯৪৬ সালে ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠায় ভোট প্রদান করেছিল। ১৯৪৬ সালের নির্বাচনে ১১৯ জন মুসলিম প্রার্থীর মধ্যে ১১৬ জনকে বেঙ্গল এসেম্বলীতে জয়যুক্ত করে পাকিস্তান সৃষ্টির পক্ষে রায় দিয়েছিল। একশ্রেণীর লোক বর্তমানে এদেরকে সমাজদ্রোহী-দেশদ্রোহী বলে হেয়প্রতিপন্ন করছে। অথচ যাদেরকে দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দেয়া হচ্ছে তাঁরা ১৯০ বছরের ইঙ্গ-হিন্দু শাসন থেকে শিক্ষা নিয়ে হিন্দু ভারতের গোলামী থেকে নিজেদেরকে রক্ষার জন্য পাকিস্তানের পক্ষে ভোট দিয়েছিল।
৪. দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রাম করে অবশেষে স্যার সৈয়দ আমীর আলীর নেতৃত্বে মুসলিম স্বার্থ রক্ষায় পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা আদায় করা হয়েছিল। ১৯১৬ সালের চুক্তির মাধ্যমে ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেস বিষয়টি মেনে নিয়েছিল। অথচ আমাদের একশ্রেণীর ক্ষমতালোভী নেতা ও দল নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য জাতীয় স্বার্থকে বিসর্জন দিয়ে অখণ্ড- ভারতে বিশ্বাসী কংগ্রেস দলের সাথে চুক্তি করে পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা বাতিল করেছে। যুক্ত নির্বাচনের কুফল সম্পর্কে স্যার সৈয়দ আমীর আলীর বক্তব্য ছিল, “যুক্ত নির্বাচন প্রথা চালু হলে হিন্দুরা শুধু  ঐসব মুসলমানদেরকে ভোট দেবে যারা তাদের তল্পীবাহক পুতুল হবে।” আমাদের দেশের বর্তমান অবস্থা পর্যালোচনা করলে আমরা সৈয়দ আমীর আলীর আশঙ্কাকে প্রত্যক্ষ করতে পারব। বর্তমানে হিন্দুদের তল্পীবাহক পুতুল মুসলমানরা যুক্ত নির্বাচনের মাধ্যমে এমপি হয়ে আমাদের সর্বনাশ সাধন করছে। এ দেশের নিষ্ঠাবান মুসলমানরা এখন নিজ দেশে পরবাসী।
৫. আমরা আধুনিক গণতন্ত্রে উজ্জীবিত আমাদের জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গেছি। এ বিষয়ে সৎ ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ, ভাষা সৈনিক অলি আহাদ বলেছেন, “বর্তমানে সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক উপায়ে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার সমস্ত পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়েছে। পেশীশক্তি ও কালো টাকার মালিক ছাড়া নির্বাচনে মনোনয়ন লাভ এবং জিতা যায় না। কোটি টাকা না থাকলে বা সন্ত্রাসী লালন না করলে রাজনীতি করা যায় না।... বর্তমানে রাজনীতিকরা ক্ষমতা লাভের আশায় অপশক্তিকে দেশে প্রতিষ্ঠা করে তার ছত্রছায়ায় কৃত্রিম ক্ষমতা ভোগকে সত্যিকার স্বাধীনতা এবং দেশ, জাতির উন্নতি বলে প্রচার করে। ১৭৫৭ সাল থেকে মীরজাফর-উমিচাঁদ ও তাদের ভাবশিষ্যরা অদ্যাবধি এ ধারা অব্যাহত রেখেছে। এভাবে সৎ রাজনীতিকে অসৎ রাজনীতির বেদীমূলে বিসর্জন দেয়া হয়েছে। দেশপ্রেমিক রাজনীতিকে দেশদ্রোহীতার বেদীমূলে বিসর্জন দেয়া হয়েছে।

বিসর্জন-পরবর্তী জাতীয় পতনের দৃশ্যাবলী
আমাদের সুযোগ্য পূর্ব পুরুষদের দীর্ঘ ১৯০ বছরের অর্জনসমূহ আমরা পর্যায়ক্রমে বিসর্জন দিয়ে বর্তমানে দেউলিয়া অবস্থায় উপনীত হয়েছি। দেউলিয়া ঘোষণাটি শুধু অবশিষ্ট রয়েছে। আমাদের একশ্রেণীর রাজনীতিকরা গণতন্ত্রের মাধ্যমে অর্জিত পাকিস্তান ও বাংলাদেশে গণতন্ত্রকে নির্বাসিত করেছে, সেনাবাহিনীকে রাজনীতিতে টেনে এনে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ ও আঞ্চলিকীকরণ-এর মাধ্যমে সরকারের প্রধান প্রধান অঙ্গসমূহ যথা আইন-বিচার ও শাসন বিভাগকে পঙ্গুবিতকির্ত ও অচলাবস্থায় উপনীত করেছে। বিচার বিভাগের ঘাড়ে বন্দুক রেখে দেশ পরিচালনার গাইডলাইন সংবিধানকে কচুকাটা করা হয়েছে, আমাদের প্রতিরক্ষা সামর্থ ও নীতিকে আমাদের শত্রুদের হাতে সমর্পণ করা হয়েছে, আমাদের ’৪৭ সালে অর্জিত সীমান্তকে আমাদের প্রতিপক্ষের নিয়ন্ত্রণে তুলে দেয়া হয়েছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী ও সেনাবাহিনীকে পঙ্গু করা হয়েছে, আইনশৃংখলা বাহিনীকে জাতীয় বাহিনীর পর্যায় থেকে নামিয়ে এনে দলীয় পেটোয়াবাহিনীতে পরিণত করা হয়েছে। উদ্দেশ্যমূলক কার্যকলাপের দ্বারা এলিট ফোর্স র‌্যাবকে মাত্র আড়াই বছরে চরমভাবে বিতর্কিত করা হয়েছে। এমতাবস্থায় যে সকল অর্জনের মাধ্যমে আমরা ’৪৭ সালে স্বাধীন হয়েছিলাম সে সকল অর্জনকে বিসর্জনের মাধমে আমরা পরাধীনতার গভীর গিরিখাদের কিনারায় উপনীত হয়েছি। উল্লেখ্য, অখণ্ড- ভারত তত্ত্বে বিশ্বাসী ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এদেশীয় দোসররাই আমাদের সকল অর্জনকে বিসর্জন দিয়েছে। এ অবস্থা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে না পারলে আমাদের পতন অবশ্যম্ভাবী।

আমাদের করণীয়
১. শাহ ওয়ালী উল্লাহ ও হাজী শরীয়ত উল্লাহর সংস্কার কর্মসূচি এবং স্যার সাইয়েদ আহমদ খান-এর পুনর্গঠন কর্মসূচিকে সমন্বয় করে জাতীয় পুনরুত্থানের রূপরেখা প্রণয়ন এবং আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে উক্তরূপভাবে ঢেলে সাজানো।
২. সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়ে সত্যিকারের ইতিহাস চর্চাকে সর্বাধিক গুরুত্ব প্রদান করা, যাতে জনগণ ইতিহাস থেকে শিক্ষা নিয়ে সুন্দর আগামী বিনির্মাণে এগিয়ে আসে এবং জাতীয় শত্রুমিত্র চিহ্নিত করতে পারে।
৩. সত্যিকারের ইতিহাসভিত্তিক ও জাতিগঠনমূলক চলচ্চিত্র, নাটক, সাহিত্য রচনা, চর্চা ও প্রদর্শন।
৪. ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবোধকে শক্তিশালী ও সুসংহতকরণ। মনে রাখতে হবে এটাই আমাদের টিকে থাকার প্রধান রক্ষাকবচ। পরিশেষে ভারতীয় মুসলমানদের প্রধানতম অনুসরণীয় নেতা ও সমাজ সংস্কারক শাহ ওয়ালী উল্লাহর উপলব্ধি ও বাণী উদ্ধৃত করে প্রবন্ধ শেষ করছি। তাঁর উপলব্ধি- সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভারসাম্যের অভাবে সমাজ, রাষ্ট্র এবং জাতীয় জীবনে বিশৃঙ্খলা, বিপর্যয়, ব্যবহারিক বিকৃতি ও নৈতিক অবক্ষয়ের সূচনা করে। সমাজ জীবনে অর্থনৈতিক ভারসাম্য বিধান একান্ত জরুরি। কোরআনের ব্যবহারিক মূল্য প্রদর্শন এবং অর্থনৈতিক সমতা বিধান একান্ত জরুরি। এ দুটি ছিল শাহ ওয়ালী উল্লাহর সংস্কার কর্মসূচির বুনিয়াদ। (ওবায়দুল্লাহ সিন্ধি, শাহ ওয়ালীউল্লাহর রাজনৈতিক চিন্তাধারা পৃ. ১৮)।

তাঁর দিক নির্দেশনা-
১. ইসলামের নীতি ও বিধানগুলিকে যুক্তি ও বিবেকের সাহায্যে প্রতিষ্ঠিত করার সময় এসেছে। কেবল আল্লাহর আদেশ বলে মানুষ তা পালন করবে সে যুগ আর নাই। (আবু মহামেদ হাবিবুল্লাহ, সমাজ, সংস্কৃতি ও ইতিহাস, পৃ. ১২১)।
২. মুসলমানদের মধ্যে যতদিন জিহাদের মানসিকতা বজায় ছিল ততদিন তাদের বিজয় ও সম্মান অব্যাহত ছিল, কিন্তু যখন থেকে এ মানসিকতা দূর হয়েছে তখন থেকে তারা সর্বত্র অপমানিত ও ঘৃণিত হয়েছে। (জি.এন. জালবানী, লাইফ অফ শাহ ওয়ালীউল্লাহ, পৃ. ৬২)।
বাংলাদেশে যারা ইসলামের কথা বলেন, ইসলামী আন্দোলনের কথা বলেন, তাদের প্রতি আমার আহ্বান- আপনারা অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালনা না করে শাহ ওয়ালী উল্লাহর দিল্লী মাদ্রাসার মতো একটি মাদ্রাসা, ইমাম খোমেনী পরিচালিত কোম মাদ্রাসার ন্যায় একটি মাদ্রাসা অথবা স্যার সৈয়দ আহমেদ খানের মতো আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয়-এর ন্যায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা ও পরিচালনা করুন। ব্যবসার জন্য অসংখ্য মাদ্রাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন না করে দেশ-জাতি গঠন ও ধর্ম রক্ষার জন্য একটি যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলুন। তাহলে দেশ-জাতি-ধর্ম রক্ষা পাবে। 
সম্পাদকঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা।

Wednesday, January 11, 2012

পাকিস্তানের বর্তমান সংকট, কারন ও সম্ভাব্য প্রতিকার


পাকিস্তানের বর্তমান সংকটের উৎপত্তি মেমোগেট কেলেংকারী থেকে। মেমোগেট কেলেংকারী হল, “পাকিস্তানী বংশোদ্ভুদ মার্কিন ব্যবসায়ী মনসুর ইজাজ এই মর্মে তথ্য প্রকাশ করেন যে, যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত তৎকালীন পাকিস্তানী রাষ্ট্রদূত হুসাইন হাক্কানী পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারীর নির্দেশে একটি চিঠির খসড়া প্রস্তুত করে মনসুর ইজাজের মাধ্যমে সাবেক মার্কিন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তা মাইক মুলেনের হাতে প্রদান করেন। (মাইক মুলেনও উক্ত চিঠির সত্যতা স্বীকার করেন তবে চিঠিটি স্বাক্ষরবিহীন ছিল বলে তিনি জানান) মার্কিন বিশেষ বাহিনী কর্তৃক উসামা বিন লাদেনকে হত্যা করার পর সেনাবাহিনী সরকারের উপর ক্ষুব্দ হলে জারদারী পাকিস্তান সেনাবাহিনী ও আই.এস.আই এর ক্ষমতা খর্ব করে জারদারীর সরকারকে রক্ষা করার জন্য মার্কিন হস্তক্ষেপ কামনা করে এই চিঠি দেওয়া হয় বলে মনসুর ইজাজ তথ্য প্রকাশ করেন।” ইহাই বিখ্যাত মেমোগেট কেলেংকারী হিসাবে খ্যাতি পেয়েছে।

জারদারী ও পারভেজ মোশাররফ যে মার্কিন পাপেট তা সর্বজন বিদিত। দেশবাসীর নিকট জনপ্রিয়তা হারানোর কারনে মোশাররফকে সরিয়ে জারদারীকে পাকিস্তানে ক্ষমতাশীল করা হয়েছিল। কিন্তু পাকিস্তানের মার্কিন বিরোধী জনগণ, শক্তিশালী বিচার বিভাগ ও সেনাবাহিনীর কারনে জারদারীর দ্বারা প্রভুদের এজেন্ডা বাস্তবায়ন সম্ভব হয়ে উঠেনি। তদুপরি জারদারী প্রভুর ইচ্ছার বিরুদ্ধে ইরান, পাকিস্তান গ্যাস পাইপ লাইন চুক্তি করে প্রভুদের খরচের খাতায় নিজের নাম লিখান। জারদারীকে বিপদে ফেলতেই মাইক মুলেন মনসুর ইজাজের ফাঁস করা তথ্যের পক্ষে সম্মতি প্রদান করেন। অথচ এসব পাপেটকে ক্ষমতায় বসানো, ক্ষমতায় টিকিয়ে রাখার জন্য কত প্রকার চিঠি চালাচালি, গোপন পরামর্শ  ও চুক্তি হয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নাই। সকল গোপন ষড়যন্ত্র ফাঁস না করে শুধু জারদারীকে ফাঁসানোর জন্য তথ্য ফাঁস করার বিষয়টি অবশ্যই রহস্য জনক।

পাকিস্তানের জন্মলগ্ন থেকে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের রাজনীতিতে নাক গলিয়েছে। বারবার পাকিস্তানের গণতান্ত্রিক শাসন উৎখাত করে সামরিক শাসন ও পুতুল শাসককে পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠা করেছে। এক পুতুলকে দিয়ে মনোবাসনা পুরন না হলে অপর পুতুলকে ক্ষমতায় বসিয়েছে। এতদ সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পাকিস্তান নীতি শক্ত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখী হয়েছে। পাকিস্তানী জনগণের সচেতনতা, শক্তিশালী দেশ প্রেমিক সেনাবাহিনী ও বিচার বিভাগ, চীন-পাকিস্তান-ইরান ঘনিষ্টতা যুক্তরাষ্ট্রকে স্বীয় এজেন্ডা বাস্তবায়নে বারবার বাধা দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান পাকিস্তান নীতিই পাকিস্তানকে অস্তিত্ব সংকটে নিমজ্জিত করেছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্য এশিয়া, দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া নীতি বাস্তবায়নে পাকিস্তান একটি বড় বাধা স্বরূপ। এখানে পাকিস্তানের চাওয়া ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রত্যাশা সাংঘর্ষিক। এতদ সংক্রান্ত কিছু তথ্য নিম্নে প্রদান করা হল-

১। ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপ লাইন স্থাপনঃ
শান্তির পাইপ লাইন নামে খ্যাত ইরান-পাকিস্তান ইন্ডিয়া (IPI) পাইপ লাইনের ব্যাপারে ভারত ২০০৮ সালে সম্মত হলেও মার্কিন চাপে তখনও কার্যকর কোন পদক্ষেপ নেয়নি। অথচ (IPI) বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ পশ্চিম, দক্ষিণ, মধ্য এবং পূর্ব এশিয়ার মধ্যে একটি জ্বালানি সংহতি ও সমৃদ্ধি গড়ে উঠতে পারে যদি এতে চীন ও মধ্য এশিয়া যোগ দেয়।
জ্বালানী স্বল্পতার দেশ পাকিস্তান এতে নিজেও উপকৃত হবে এবং এশিয়ার জ্বালানী করিডোরের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হয়ে দীর্ঘ মেয়াদে পরনির্ভরশীলতা কাটিয়ে উঠতে পারবে। পরবর্তী পর্যায়ে IPI বাস্তবায়িত হলে মার্কিন অর্থ সাহায্য ছাড়াই পাকিস্তান স্বনির্ভর হবে এবং পাক-ভারত বৈরীতা অনেকাংশে কমে যাবে। অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর আফগানিস্তান-পাকিস্তান অভিযানের প্রধান কারন ছিল মধ্য এশিয়া ও আফগানিস্তানের অনুত্তোলিত বিপুল গ্যাস ও খনিজ সম্পদ পাকিস্তানের উপর দিয়ে নিয়ে যাওয়া। এমতাবস্থায় ইরান-পাকিস্তান-ভারত/পাকিস্তান-চীন-মধ্য এশিয়া পাইপ লাইন মার্কিন ও ন্যাটোর স্বার্থের পক্ষে চরম ক্ষতিকর হয়ে পাশ্চাত্যের অর্থনৈতিক পতন ত্বরান্বিত করবে এবং দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া ও মধ্য এশিয়াকে সমৃদ্ধ করবে, এসব দেশে পাশ্চাত্যের খবরদারি বন্ধ হয়ে যাবে। 

২। দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া পলিসিঃ
পাশ্চাত্যের দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার মূল পলিসি হল এশিয়ার উদীয়মান বিশ্বশক্তি চীনকে দমন করা। বিশাল জনগোষ্ঠীর চীনকে দমাতে প্রয়োজন বিশাল জনগোষ্ঠীর দেশ ভারতকে দক্ষিণ ও দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ায় অপ্রতিদ্বন্ধীরূপে প্রতিষ্ঠা করা, ভারতকে মোড়ল বানাতে হলে ভারতের চিরপ্রতিদ্বন্ধী পাকিস্তানের নিকট থেকে পরমানু অস্ত্র কেড়ে নিতে হবে, পাকিস্তানের অর্থনীতি ধ্বংস করতে হবে এবং পাকিস্তানকে জাতিগত ভাবে কমপক্ষে তিন টুকরা করতে হবে। এসব কর্মসূচী বাস্তবায়নের লক্ষ্যে পাশ্চাত্য শক্তি প্রথমে পাকিস্তানের দেশপ্রেমিক গণতান্ত্রিক শক্তি নওয়াজ শরীফকে অপসারন করে তৎস্থলে ভারত-মার্কিন বলয়ের সহযোগী ও পাপেট  পারভেজ মোশাররফকে ক্ষমতাসীন করে, ন্যাটো পারভেজ মোশাররফের সহযোগীতায় আফগানিস্তানের তালেবান সরকারকে উৎখাত করে আফগানিস্তান দখল করে। আফগানিস্তানে অবস্থান করে পাকিস্তানের বৃহত্তর যোদ্ধা জনগোষ্ঠী পশতুনদের ভিতর থেকে দালান সংগ্রহ করে তেহেরিক-ই-তালেবান প্রতিষ্ঠা করে। পরবর্তীতে ইসরাইলী গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ এর ব্রেইন চাইল্ড আল-কায়েদাকে টিটিপির সহযোগী করে পাক-আফগান সীমান্তের উভয় পাশের পশতুনদেরকে দলে ভিড়িয়ে পাকিস্তানের অভ্যন্তরে অনবরত রক্তাক্ত হামলা পরিচালনা করে পাকিস্তানকে ধর্মীয় সামাজিক-জাতিগত ও গোত্রীয়ভাবে অস্থিতিশীল করে ব্যর্থ রাষ্ট্রের পর্যায়ে নিয়ে যায়।

৩। অস্বাভাবিক সরকার পরিবর্তনের মাধ্যমে বেশী সুবিধা আদায়ঃ
পাশ্চাত্যের সেবাদাশ পারভেজ মোশাররফের গ্রহনযোগ্যতা চরমভাবে বিতর্কিত হলে বেনজীর ভূট্টোকে হত্যার ব্যবস্থা  করে সহানুভূতির ভোটে আরেক দুর্বল পুতুল আসিফ আলী জারদারীকে পাকিস্তানে প্রতিষ্ঠিত করে। যুক্তরাষ্ট্রের টার্গেট ছিল জারদারীকে দিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে দুর্বল করা হবে, আই.এস.আই এর সক্ষমতা সর্বনিম্ন পর্যায়ে নিয়ে যাবে এবং দুর্বল পাকিস্তানের নিকট থেকে পরমানু অস্ত্র সমূহ কেড়ে নেয়া হবে। কিন্তু আই.এস.আই মার্কিন-জারদারী ষড়যন্ত্র আগেভাগে উদঘাটন করায় যুক্তরাষ্ট্র উদ্দেশ্য হাসিলে ব্যর্থ হয়। ইতিমধ্যে অর্থনৈতিক দূরবস্থা থেকে উদ্ধারে জারদারী ইরান-পাকিস্তান গ্যাস পাইপ লাইন চুক্তি স্বাক্ষর করায় যুক্তরাষ্ট্র জারদারীকে সরিয়ে ইমরান খান অথবা পারভেজ মোশাররফকে পাকিস্তানের ক্ষমতায় বসানোর জন্য পদক্ষেপ গ্রহন করেছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক মহল দেখতে পাচ্ছে, উক্ত গ্যাস পাইপ লাইন চুক্তির পর পরই পাকিস্তানের উপজাতি অঞ্চলে ড্রোন হামলা বৃদ্ধি করে উপজাতিদের সাথে পাকিস্তান সরকারের যুদ্ধাবস্থা তৈরী করা হয়, বিনা অনুমতিতে পাকিস্তানের অভ্যন্তর থেকে ওসামা বিন লাদেনকে ধরে নিয়ে হত্যা করে সেনাবাহিনীর সক্ষমতা ও দায়িত্বজ্ঞানহীনতার ব্যাপারে জনগণকে ক্ষুব্ধ করা হয়। সর্বশেষ মেমোগেট কেলেংকারী ফাঁস করে দিয়ে জারদারীর ক্ষমতায় টিকে থাকাকে অসম্ভব করে তোলা হয়। এরপরই শুরু হয় পাকিস্তানে নতুন পাপেট সরকার প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম। উক্ত কার্যক্রম হল- (১) ইমরান খানের নামসর্বস্থ তেহেরিক-ই-ইনসাফ দলের লাইম লাইটে আসা, (২) পিপিপি থেকে মার্কিনপন্থী নেতাদের ইমরান খানের দলে যোগ দেয়া, (৩) ভারতপন্থী মুত্তাহিদা কওমি মুভমেন্টের ইমরান খানের প্রতি সহযোগীতার হাত বাড়ানো।, (৪) পারভেজ মোশাররফের পাকিস্তান প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা এবং পিপিপি থেকে ইমরান খানের দলে যোগ দেয়া মার্কিন পন্থী মাহমুদ শাহ কোরেশীর পারভেজ মোশাররফের সাথে জোট গঠনের আশাবাদ ব্যক্ত করা। যুক্তরাষ্ট্রের পাকিস্তান নীতি ও পুতুল সরকারের কার্যক্রম সম্পর্কে ৩০ জুন ২০১১ সালে নিউজ লাইনকে দেয়া সাবেক আই.এস.আই প্রধান লেঃ জেনারেল (অবঃ) হামিদ গুলের সাক্ষাতকারের মাধ্যমে সংক্ষেপে যা জানা যায় তা হল-

১।পাকিস্তানের কৌশলগত সম্পদরাজির উপর প্রতিটি হামলায় যুক্তরাষ্ট্র জডিত।
২।সাবেক প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফই যুক্তরাষ্ট্রকে পাকিস্তানে ঘাঁটি গেডে বসার সুযোগ করে দিয়েছে। পাকিস্তানকে অনৈসলামি করন, পরমানু অস্রমুক্ত করন ও চীনের সাথে সম্পর্কছেদের পর্যায়ে নিয়া গেছে মোশাররফ।
৩।পাকিস্তানের নৌঘাঁটি মেহরান হামলায় জডিত ছিল মারকিন-ভারতীয় মদদপুষ্ট সন্ত্রাসী গ্রুপ।
৪। পাশ্চাত্য কতৃক পরিচালিত সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের অর্থ হচ্ছে পাকিস্তান কে অস্থিতিশীল করা এবং পাকিস্তানের অর্থনীতি ধ্বংস করে ভারতকে আঞ্চলিক মোডল বানানো।
৫। ৯/১১ হামলা হল বিশ্বব্যাপী নির্দোষ মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ পরিচালনা করার মার্কিন এজেণ্ডা বাস্তবায়নে ষড়যন্ত্র।
৬। যুক্তরাষ্ট্রে নিযুক্ত পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত হোসাইন হাক্কানি এবং ইসলামাবাদের আরও কয়েকজন শীর্ষ ব্যক্তি সরাসরি সি,আই,এর স্বার্থ দেখাশুনা করছে।
৭। পাকিস্তান পিপলস পার্টি (পিপিপি) সবসময় পাকিস্তানী সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা আই,এস,আইকে দুর্বল করে অন্যদের স্বার্থে ব্যবহার করতে চায়।(সূত্রঃ দৈনিক নয়া দিগন্ত ১২/০৭/২০১১,অনুবাদঃ হাসান শরীফ।)




সমূহ ধ্বংস থেকে রক্ষা পেতে পাকিস্তানীদের করণীয়
১। সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী দেশ প্রেমিক জোট গঠন করা। এ জোটে পি.পি.পির সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী অংশ দেশ প্রেমিক ইসলাম পন্থী দল সমূহ থাকা চাই।
২। সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল না করে সুষ্ঠ নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তরে কার্যকর সহায়তা প্রদান।
৩। ইচ্ছাকৃতভাবে জারদারীকে হেনস্তা করার চেষ্টা না করা। কেননা জারদারীর ভুলত্রুটি থাকলেও তিনি ইরানের সাথে গ্যাস পাইপ লাইন চুক্তি করে পাকিস্তানের উপকার করেছেন এবং সাম্রাজ্যবাদীদের চক্ষুশুলে পরিণত হয়েছেন। সুতরাং সাম্রাজ্যবাদীদের চাওয়া ও দেশ প্রেমিকদের চাওয়া যেন এক না হয়। 
৪। চীন, ইরান ও মুসলিম বিশ্বের সাথে সম্পর্ক আরও দৃঢ় করা এবং সম্ভাব্য ন্যাটো ইরান যুদ্ধে ইরানের পাশে থাকা। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, সম্ভাব্য ন্যাটো ইরান যুদ্ধে পাকিস্তান যদি দৃঢ়ভাবে ইরানের পাশে অবস্থান নেয়, জি.সি.সি যদি নিরপেক্ষ থাকে তবে চীন ও রাশিয়া ইরানের পক্ষে অবস্থান নেবে। এমতাবস্থায় ন্যাটোর জন্য এটি হবে সর্বশেষ খেলা।
৫। পাকিস্তান ও আফগান তালিবানদের মধ্য সৃষ্ট সন্দেহ অবিশ্বাস দূর করার ব্যবস্থা নেয়া। এর মাধ্যমে তালেবানরা ন্যাটো ও ভারত থেকে দূরে সরে যাবে।
৬। সাম্রাজ্যবাদ সৃষ্ট তেহেরিক-ই-তালিবানের সাথে আলোচনার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা অন্যথায় শ্রীলংকার মাহিন্দ্রা রাজাপাকসের থেরাপি প্রয়োগ করা।
৭। ‘বালুচ’ দের সাথে সৃষ্ট সমস্যা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা।
৮।সাম্রাজ্যবাদের চি‎হ্নিত দেশীয় এজেন্টদের ব্যাপারে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।
সম্পাদকঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা।

Monday, January 9, 2012

২৩ জুন মুভমেন্ট কি পুনরায় দেশ-জাতি-ধর্ম বিপন্ন করবে ?(প্রথম প্রকাশ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা,মে ২০১১ সংখ্যা)


২৩ জুন ১৭৫৭ সাল, প্রহসনের যুদ্ধে নবাব সিরাজের পতন ও মীরজাফর, জগৎ শেঠ ও ক্লাইভের উত্থানের দিন। আমাদের স্বাধীনতা সাবর্ভৌমত্ব, সমৃদ্ধি, অস্তিত্ব-মর্যাদা-ধর্ম বিপন্নের দিন, মুসলিম বিদ্বেষী ক্লাইভ, জগৎ শেঠ, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ ও ক্ষমতালোভী মীরজাফরের খুশির দিন। সাম্রাজ্যবাদী ও বর্ণবাদীদের উত্থানের সূচনা, দেশপ্রেমিক ও দ্বীন ধর্মের অনুসারীদের পতনের সূচনা। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন মুভমেন্টের উপাদান ছিল লুটেরা ইংরেজ, মুসলিম বিদ্বেষী বর্ণবাদী বর্ণ হিন্দু ও চরিত্রহীন ক্ষমতালোভী মুসলিম নামধারী সেনাপতি মীরজাফর গং। একইভাবে ২০০৭ সালের পলাশী সদৃশ্য ১/১১-এর উপাদানের প্রকৃতিও হুবহু একইরূপ। উভয় ঘটনাতেই ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন মুসলিম শক্তি বিপন্ন হয়েছে, মুসলিম জাতি আমীর থেকে ফকিরে পরিণত হওয়ার করুণ পরিণতির দিকে এগিয়ে গেছে। রক্তাক্ত নৃশংসতায় মুসলিম নেতৃত্বকে ধ্বংস করা হয়েছে এবং মুসলমানেরা নেতৃত্বশূন্য হয়েছে। বর্তমানেও বলিষ্ঠ মুসলিম নেতৃবৃন্দকে অনুরূপ নৃশংসতায় ধ্বংসের প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকারও আরেকটি ২৩ জুন মুভমেন্ট মাত্র। ধর্মীয় মূল্যবোধ সম্পন্ন দেশপ্রেমিক মুসলমানরা যে শোকাবহ দিনটিকে পলাশী বিপর্যয়ের দিন হিসেবে পালন করে সেই ২৩শে জুনেই জন্ম হয়েছে আওয়ামী লীগ নামক দলটি। এ দলটি জন্মলগ্ন থেকেই মুসলমানদের উক্ত বিপর্যয়ের দিনটিতে আনন্দ উৎসবে মেতে উঠে এবং সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে পরম তৃপ্তি লাভ করে।

১/১১ ষড়যন্ত্রের মাধ্যমেই বর্তমান ২৩ জুন মুভমেন্ট ক্ষমতাসীন হয়। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন মুভমেন্ট যেভাবে আমাদের দীর্ঘ ৫৫০ বছরের অর্জনকে ধূলিস্যাৎ করেছিল তদ্রুপ বর্তমান ২৩ জুন মুভমেন্ট আমাদের বিগত ৬০ বছরের অর্জনকে ধূলিস্যাৎ করার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। মাত্র কয়েকটি বছরেই আমাদের সার্বভৌমত্ব অপসৃত, স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ, সেনাবাহিনী পঙ্গু, সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিধ্বস্ত, সীমান্ত অরক্ষিত, সংবিধান আইসিইউতে, প্রশাসন মেধাশূন্য ও অকার্যকর, বিচার বিভাগ বিতর্কিত, অর্থনীতি বিপন্ন, রাজনীতি যাদুঘরে, দেশপ্রেমিক ও ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মর্যাদা ভূলুণ্ঠিত এবং সামাজিক শান্তি ও শৃঙ্খলা বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দেশের সবচেয়ে কার্যকর ও কর্মক্ষম ছাত্র ও যুবশক্তি ফেনসিডিল, ভায়াগ্রা, ইয়াবায় আসক্ত হয়ে মা-বোনদের উপর হামলে পড়ছে, দেশ গঠনের পরিবর্তে দেশ ধ্বংসের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। দেশীয় সংস্কৃতি লালনের পরিবর্তে বিদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনকে সাদরে আমন্ত্রণ জানানো হচ্ছে। আইনের রক্ষকগণ ভক্ষকে পরিণত হয়েছে। এমতাবস্থায় দেশের অস্তিত্ব ও স্থিতিশীলতা চরম বিপর্যয়ের মুখে অবস্থান করছে। বর্তমান সরকারের সাম্রাজ্যবাদ তোষণ নীতি, সরকারি দলের আজীবন ক্ষমতায় থাকার মানসিকতাপ্রসূত অদূরদর্শী কার্যকলাপ, দলীয় লোকদের সীমাহীন লোভ-লালসা, নীতিহীনতা,প্রতিহিংসাপরায়ণতা ও স্বধর্ম বিদ্বেষ দেশের বর্তমান বিপর্যস্ত অবস্থার জন্য বহুলাংশে দায়ী।

সরকারের ইসলাম বিদ্বেষের সম্ভাব্য কারণ
বর্তমান মহাজোট সরকার নিজেদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হিসেবে প্রচার করে কিন্তু পৃথিবীর অন্যান্য ঘোষিত ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের সাথে এ সরকারের কার্যক্রমের কোনো মিল নেই, একটি মাত্র ব্যতিক্রম ছাড়া। পাঠকবৃন্দ নিশ্চয়ই অবগত আছেন, ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে ঘোষিত ইউরোপ, আমেরিকায় নির্বাচিত সরকার শপথ নেয় বাইবেল স্পর্শ করে। উক্ত সরকারসমূহ নিজেদের ধর্ম নেতাদেরকে যথাযথ সম্মান করে, বিশ্বব্যাপী খ্রিস্টান ধর্মের প্রচারে ও প্রসারে নিয়োজিত ধর্ম নেতাদের সার্বিক সহায়তা প্রদান করে, তাদের নিরাপত্তা প্রদানে যুেদ্ধর ঝুঁকি নিতেও কুণ্ঠাবোধ করে না। ধর্মীয় সভা-সমাবেশ-মাহফিল অনুষ্ঠানে উক্ত সরকারসমূহ সার্বিক সহায়তা প্রদান করে। পক্ষান্তরে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার মিথ্যা অজুহাতে ধর্মীয় নেতাদেরকে হয়রানি করে, অপবাদ দেয়, মিথ্যা মামলায় আটক করে, নির্যাতন করে, ইসলামের প্রচার-প্রসারে বাধা প্রদান করে, ওয়াজ মাহফিল ও ধর্মীয় সমাবেশে সরকারি প্রশাসন যন্ত্র ১৪৪ ধারা জারি করে, সরকারি দলের লোকেরা হামলা করে মাহফিল পণ্ড করে দেয়। প্রতিবেশী ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, সেখানে হিন্দু ধর্মের নেতারা সমাজে ও রাষ্ট্রে সমাদৃত, সেখানে ধর্মীয় সভায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয় না, হামলা করে পণ্ড করে দেয়া হয় না। সেসব দেশে সংখ্যাগুরুদের ধর্মীয় মতামত, কৃষ্টি-কালচার জাতীয়ভাবে প্রচার ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে।

ইউরোপ-আমেরিকা ও ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ সরকারের সাথে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের মিল রয়েছে শুধুমাত্র একটি ক্ষেত্রে। আর তা হলো, উক্ত সরকারসমূহ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী হলেও তারা সর্বান্তকরণে ইসলাম ও মুসলিম বিদ্বেষী। মুসলমানদেরকে দমনে এবং ইসলামের অগ্রযাত্রায় বাধা দিতে তারা বিভিন্ন প্রকারের কালাকানুন রচনা ও প্রয়োগ করে প্রতিনিয়ত। মুসলমানদের মসজিদ-মাদ্রাসায় গোয়েন্দাগিরি করে, মিথ্যা অজুহাতে মুসলিম যুবকদেরকে বন্দী ও নির্যাতন করে। সুতরাং দেখা যাচ্ছে, খ্রিস্টান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদী সরকার ধর্মের কারণে খ্রিস্টানদের উপর নির্যাতন করে না, হিন্দু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ধর্মের কারণে হিন্দুদের উপর নির্যাতন করে না কিন্তু মুসলিম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা ধর্মের কারণে স্বধর্মী মুসলমানদের উপর নির্যাতন করে। এই বৈপরীত্যের কারণ হতে পারে নিম্নরূপ:
১. মুসলিম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা শুধুমাত্র ক্ষমতায় যওয়ার জন্য ও ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য আপন ভাইয়ের গোশ্ত ভক্ষণ করতে দ্বিধা করে না।
২. মুসলিম বিদ্বেষী ইহুদী-খ্রিস্টান ও ব্রাহ্মণ্যবাদীদের খুশি করে ক্ষমতায় যাবার জন্য মুসলমান নামধারী ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা স্বধর্মীয়দের উপর অত্যাচার নির্যাতন করে।
৩. মুসলিম ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা আত্মমর্যাদা সম্পর্কে উদাসীন। বৈষয়িক লোভে তারা যে কোনো অপকর্ম করতে কুণ্ঠিত হয় না।
৪. বাংলাদেশের বর্তমান ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের অনেকে চরম মুসলিম বিদ্বেষী ইহুদী-খ্রিস্টান ও হিন্দুদের সাথে আত্মীয়তার বন্ধনে আবদ্ধ। বাস্তবতা হলো- তাদের কারো দাদা-নানা বিধর্মী ছিল, ফলে মুসলমানদের উপর অত্যাচার করে তারা পূর্ব পুরুষের হৃদয়কে শীতল করার কাজ করছে, তাদের কারো ছেলে ইহুদী-খ্রিস্টান-হিন্দুর সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ, কারো স্ত্রী বিধর্মী, কারো কন্যা জামাতা বিধর্মী। ফলে তারা নিজ দেশ ও ধর্মের লোকদের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে বিধর্মী আত্মীয়-স্বজনের স্বার্থ রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। ফলে বর্তমান বাংলাদেশের মসজিদ মাদ্রাসায় পুলিশ-গোয়েন্দাদের সার্বক্ষণিক পাহারার ব্যবস্থা থাকলেও মন্দির-গীর্জা, সিনাগগে পুলিশের টিকিটি দেখা যায় না। স্পর্শকাতর সরকারি পদ থেকে রহিমকে বিদায় দিয়ে রামকে স্থাপন করা হয়েছে।

মহাজোট সরকারের ধর্মবিরোধী কার্যকলাপ
১. বোরকা বা পর্দা প্রাবিরোধী কার্যক্রম:
২০০৭ সালে অর্থাৎ মহাজোট সরকারের আন্দোলনের ফসল মইনুদ্দিন-ফখরুদ্দীনের আমলে প্রধানমন্ত্রী পুত্র জয় যুক্তরাষ্ট্রের একটি ম্যাগাজিনে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছিলেন- “বাংলাদেশে জোট আমলে বোরকা পরিহিতা মহিলার সংখ্যা ৪০০ গুণ বেড়ে গেছে।” ২০০৯ সালে এ সরকার ক্ষমতায় এসেই জয়ের পৈত্রিক জেলা রংপুর থেকে পুলিশের সাহায্যে বোরকাবিরোধী কার্যক্রম শুরু করে।

ক. ১ মার্চ ২০১০ তারিখে রংপুর পুলিশ প্রশাসন বোরকা না পরার অপরাধে ২৯ জন মহিলাকে গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা হয়, ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালত এই মর্মে রায় দেয় যে, “কোনো মহিলাকে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে বোরকা পরতে বাধ্য করা যাবে না।” এইভাবে আওয়ামী পুলিশ ও আওয়ামী আদালতের যোগসাজশে ইসলামের একটি ফরজ-এর বিরুদ্ধে সাজানো রায় দেয়া হলো এবং দেশব্যাপী বহু বোরকা পরিহিতাকে গ্রেফতার করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে দেয়ার কার্যক্রম শুরু হলো। অথচ এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনের সুস্পষ্ট বিধান হলো- “হে নবী তুমি তোমার স্ত্রীদের, কন্যাদের ও বিশ্বাসী নারীদের বলে দাও, তারা যেন চাদরের কিছু অংশ নিজেদের মুখের উপর টেনে দেয়। এতে তদের (ভদ্র ও মার্জিত) হিসাবে চেনা সহজ হবে, কেউ তাদের উত্ত্যক্ত (ইভটিজিং) করবে না।” (সূরা আহজাব, আয়াত ৫৯)। আল্লাহ আরো বলেন, “যারা বিশ্বাসীদের মাঝে অশ্লীলতার প্রসার কামনা করে, তাদের জন্য ইহকালে ও পরকালে রয়েছে কঠিন শাস্তি।” (সূরা নূর, আয়াত ২৪)
এইভাবে আওয়ামী লীগ জোট, তাদের প্রশাসন ও আদালত আল্লাহর কোরআনের বিধানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে ইহকাল ও পরকালের শাস্তিকে নিজেদের জন্য অবধারিত করে নিয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ যেখানে পর্দার বিধান জারি করেছেন, সেখানে এ বিধানকে ঐচ্ছিক করার রায় প্রদান কি আল্লাহ-দ্রোহীতা নয়?

২. ফাতওয়া প্রদান নিষিদ্ধ করা : এ সরকার আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে মুফতিদের ফাতওয়া প্রদান নিষিদ্ধ করেছে। অথচ মানব জীবনের কোনো না কোনো ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান তুলে ধরার নাম হলো ফাতওয়া। মহান আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (দ.)ও ফাতওয়া দিয়েছেন। যথা-
ক. লোকেরা আপনার কাছে নারীদের প্রসঙ্গে ফাতওয়া চায়। আপনি বলুন, আল্লাহ তাদের ব্যাপারে তোমাদের ফাতওয়া দিচ্ছেন এবং সে বিষয়েও যা কিতাবে তোমাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে। (সূরা নিসা, আয়াত ১২৭)
খ. “লোকেরা আপনার (রাসুল স.) নিকট ফাতওয়া জানতে চায়, আপনি বলুন, পিতা-মাতাহীন নিঃসন্তান ব্যক্তি সম্পর্কে আল্লাহ তোমাদেরকে ফাতওয়া দিচ্ছেন।” (সূরা নিসা, আয়াত ১৭৬)
ধর্মের বিরুদ্ধে কোনো আইন না করার ওয়াদা দিয়ে ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরাসরি আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (স.) ও ওয়ারাছাতুল আম্বিয়াদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়েছে।
৩. মহাজোট সরকারের ইসলামবিরোধী নারী নীতি যায়নবাদী ইহুদীদের পরিচালিত জাতিসংঘ ১৯৭৯ সালে নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (সিডও) গ্রহণ করে। মুসলিম দেশগুলোর পক্ষ থেকে উক্ত সনদের ২, ৩, ৯, ১৩ ও ১৬ ধারার ব্যাপারে প্রবল আপত্তি উত্থাপন করা হয়। বর্তমান মহাজোট সরকার নিজেদের ইসলামবিরোধী কর্মকাণ্ডের অংশ হিসেবে উক্ত ইসলামবিরোধী নারী নীতি বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত
গ্রহণ করেছে। ‘জাতীয় নারী উন্নয়ন নীতি-২০১১’ এর কয়েকটি ধারা পাঠকদের জ্ঞাতার্থে উল্লেখ করা হলো:
ধারা ১৭.২ : নারীর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্য বিলোপ সনদ (CEDAW)-এর প্রচার ও বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
ধারা ২৫.২ : উপার্জন, উত্তরাধিকার, ঋণ, ভূমি এবং বাজার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে অর্জিত সম্পদের ক্ষেত্রে নারীর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রদান করা।
ধারা ১৮.৪ : কন্যা শিশুর প্রতি সকল প্রকার বৈষম্যমূলক আচরণ দূরীকরণ এবং পরিবারসহ সকল ক্ষেত্রে লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করা।
ধারা ২৩.৫ : সম্পদ, কর্মসংস্থান, বাজার ও ব্যবসায় নারীকে সমান সুযোগ ও অংশীদারিত্ব দেয়া।
ধারা ৩৫.২ : একক নারী, নারী প্রধান পরিবার, শ্রমজীবী ও পেশাজীবী নারী, শিক্ষানবীশ ও প্রশিক্ষণার্থী নারীর জন্য পর্যাপ্ত নিরাপদ গৃহ ও আবাসন সুবিধা প্রদানের উপর বিশেষ গুরুত্ব প্রদান করা।

৪৯টি ধারা ও অসংখ্য উপধারায় বিভক্ত এই নারী নীতি মুসলিম বিশ্ব প্রত্যাখ্যান করেছে, দেশের হাক্কানী আলেম সমাজ ও সচেতন নাগরিকরা এ নীতিকে ইসলামবিরোধী আখ্যা দিয়েছে। এরপরও বর্তমান সরকার তার ইসলামবিরোধী নীতির অংশ হিসেবে নারী নীতিকে জাতির উপর চাপিয়ে দিতে চাচ্ছে। এর মাধ্যমে সরকার ইসলামের পারিবারিক আইন ও উত্তরাধিকার আইনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। এ আইন বাস্তবায়িত হলে প্রত্যেক ঘরে ঘরে সম্পত্তি নিয়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে এবং আমাদের শান্তিময় পরিবার প্রথা ভেঙ্গে যাবে। নারীরা পাশ্চাত্যের উলঙ্গ নারীদের মতো পরিবারবিহীন জীবন যাপনে বাধ্য হবে। মহান আল্লাহ যে আইন দিয়েছেন তাকে পরিবর্তনের অধিকার বর্তমান সরকারকে কে দিয়েছে? মহাজোট সরকার ঘোষিত নারী নীতিমালায় নারী-পুরুষকে সকল ক্ষেত্রে সমতা দেয়ার লক্ষ্য ঘোষিত হয়েছে, যা কোরআন ও সুন্নাহর বিরোধী। যথা-
১. ইরশাদ হচ্ছে, আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের (উত্তরাধিকার প্রাপ্তির) ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন যে, “পুত্র সন্তান পাবে দুই কন্যা সন্তানের সমান, এ হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান আল্লাহ সর্বজ্ঞাতা ও প্রজ্ঞাময়। (সূরা নিসা, আয়াত ১১)
২. রাসূল (সা.) ইরশাদ করেছেন, পুরুষ আপন পরিবার-পরিজেনর উপর দায়িত্বশীল, সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন অধীনস্থদের ব্যাপারে, নারী দায়িত্বশীল তার স্বামীর সংসারের। সে জিজ্ঞাসিত হবে আপন দায়িত্বাধীন বিষয়ে। (বুখারী ২য় খ-, পৃ. ১০৫৭। মুসলিম ২য় খ-, পৃ ১২২) (হাদিসটি সংক্ষেপিত)।

ধর্মহীন শিক্ষানীতি
ধর্মনিরপেক্ষতার নামে এ সরকার ধর্মহীন শিক্ষা ব্যবস্থা প্রণয়ন করেছে। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা যাতে ধর্মবিবর্জিত শিক্ষায় শিক্ষিত হয় তার ব্যবস্থা পাকাপোক্ত করা হয়েছে। ধর্মকে ঐচ্ছিক বিষয়ে পরিণত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে জানা গেছে, মুসলিম বিদ্বেষী বৃটেন-আমেরিকার প্রেসক্রিপশন মোতাবেক বর্তমান সরকার মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা বিকৃত করার কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। অথচ এই বৃটেনই ১৭৫৭ সালে আমাদের স্বাধীনতা হরণ করে আমাদের গৌরব যুগের শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস করেছিল। পরবর্তীতে এমন এক মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করেছিল যার ফলে উক্ত শিক্ষায় শিক্ষিত মুসলিম যুবকগণ দুনিয়া ও আখেরাত উভয় ক্ষেত্রে পরাজিত হয়। এমতাবস্থায় উক্ত মুসলিম বিদ্বেষী বৃটেনের প্রেসক্রিপশন আমাদের বিদ্যমান মাদ্রাসা শিক্ষা ব্যবস্থাকে কোথায় নিয়ে যাবে তা সহজেই অনুমেয়। মহাজোট সরকারের ইসলামবিরোধী উক্তি ও কর্মকাণ্ড-
১. পৃথিবীতে যত সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ রয়েছে তার সবই ইসলাম ও মুসলমানদের মধ্যে। হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্টানদের মধ্যে কোনো সন্ত্রাস ও জঙ্গীবাদ নেই। (সেমিনারে ইসলামিক ফাউন্ডেশন ডিজি, আমাদের দেশ ২৯.৩.২০০৯)
২. বাংলাদেশের মাদ্রাসাগুলো জঙ্গীবাদের প্রজনন ক্ষেত্র। (সেমিনারে আইনমন্ত্রী, দৈনিক সংগ্রাম ৯.৩.২০১১)
৩. ইসলামী ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে ইসলামী শব্দটি বাদ দেওয়া উচিত। বর্তমানে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের নামে যা হচ্ছে তা ধোঁকাবাজি। (সূত্র : ঐ)
৪. বাংলাদেশে বিশেষ একটি ধর্মকে রাষ্ট্রধর্ম ঘোষণার সিদ্ধান্ত জাতির জন্য অবমাননাকর। (সেমিনারে ডেপুটি স্পিকার, সূত্র : নয়া দিগন্ত, ৮.৯.২০১০)।
৫. বিগত ২০১০ সালের হজযাত্রীদের ব্যাপারে গোয়েন্দাগিরি করার জন্য স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর বক্তৃতায়। (নয়া দিগন্ত, ২৪.১০.২০১০।
৬. এ সরকারের আমলে একজন শিক্ষক পবিত্র কুরআনের বিশুদ্ধতা নিয়ে, কোরবানীর বিধান নিয়ে আপত্তি তুলে হাইকোর্টে রিট করার দুঃসাহস দেখিয়ে পার পেয়ে গেছে।
৭. আওয়ামী শিক্ষক ও চেম্বার জজের যোগসাজশে এ সরকারের আমলে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে ব্যর্থ হয়েছে।
৮. সরকার দলীয় ক্যাডারদের শিক্ষাঙ্গন দখল, ছাত্র ও শিক্ষক পেটানো, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, চুরি, ডাকাতি, রাহাজানি, ইভটিজিং ও ধর্ষণের সেঞ্চুরির কারণে দেশের শিক্ষাঙ্গন, সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা আজ বিপন্ন।
৯. এ সরকার নিজ দলীয় গুন্ডা-পাণ্ডা-চোর-ডাকাত ও খুনীদের মামলা প্রত্যাহার করছে এবং দেশপ্রেমিকদেরকে নিত্য-নতুন মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।
১০.এ সরকার হিন্দু সংস্কৃতির মঙ্গল প্রদীপ, প্রতিকৃতি পূজা, মূর্তি স্থাপন কার্যক্রমকে দলীয় কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করেছে, ভারতীয় শিল্পীদের উলঙ্গ নাচ-গানের ব্যবস্থা করছে এবং ইসলামী সংস্কৃতির লালন ও বিকাশে বাধা দিচ্ছে।

এমতাবস্থায় আমরা দিব্য চোখে দেখতে পাচ্ছি, যদি ২৩ জুন মুভমেন্ট বর্তমানের ন্যায় নির্বিঘ্নে ও অব্যাহত গতিতে দেশ-জাতি ও ধর্মবিরোধী কার্যক্রম চালিয়ে যেতে সক্ষম হয় তবে আমরা অচিরেই ১৭৫৭ পরবর্তী বিপর্যস্ত অবস্থায় উপনীত হবো। ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন আমরা প্রথমে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব হারিয়েছিলাম, তৎপর আমাদের সেনাবাহিনী ভেঙ্গে দেয়া হয়, তৎপর চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নামে আমাদের জমি কেড়ে নিয়ে আমাদেরকে ভূমিহীনে পরিণত করা হয়, আমাদের চাপরাশী হিন্দু কর্মচারীদেরকে জমিদার করা হয়, এরপর আমাদেরকে সরকারি চাকরি থেকে বিতাড়িত করা হয়, তৎপর তৎকালীন রাজভাষা পার্সীর পরিবর্তে ইংরেজি চালু করে আমাদেরকে অজ্ঞ মূর্খে পরিণত করা হয়। পাঠকবৃন্দ একটু খেয়াল করলেই বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতে সক্ষম হবেন। ধরুন আগামীকাল থেকে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পরিবর্তে হিন্দি করা হলো, অফিস আদালতের ভাষাও হয়ে গেল হিন্দি। এমতাবস্থায় আমরা কি আর সরকারি চাকরির উপযুক্ত হবো? আমরা কি শিক্ষিত হিসাবে গণ্য হবো? আমাদের বাংলা ভাষা ও বাংলা বইয়ের অস্তিত্ব কি অতীতের পার্সী ভাষা ও পার্সী বই এর ন্যায় হারিয়ে যাবে না? আমাদের বাংলায় লিখিত জাতীয় ইতিহাস-সাহিত্য কবিতা-উপন্যাস সুখ- দুঃখের কাহিনী কি হারিয়ে যাবে না? বাংলাভাষী জাতি হিসেবে আমরা কি হারিয়ে যাব না? অতএব সময় থাকতে ২৩ জুন মুভমেন্টকে থামাতে হবে। মনে রাখতে হবে, সময়ের এক ফোঁড়- অসময়ের সহস্র ফোঁড়। মন্ত্রের সাধন কিংবা শরীর পতন।

সম্পাদকঃমাসিক ইতিহাস অন্বেষা।