Saturday, December 24, 2011

সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্তে সুদান ওপার্বত্য চট্টগ্রামের বিপর্যয়(প্রথম প্রকাশ ফেব্রুয়ারী ২০১১ সংখ্যা)



এই লেখা প্রকাশ হওয়ার আগেই বিশ্ব মানচিত্রে নতুন একটি দেশের অভ্যুত্থান ঘটবে। যার নাম দক্ষিণ সুদান। বিশ্বের প্রধান প্রধান গণমাধ্যমে এখন সুদানের গণভোট এবং দক্ষিণ সুদানের জনগণের দুর্দশার চিত্র ফলাওভাবে প্রচার করা হচ্ছে। কিন্তু বিশ্বের অনেক সচেতন মানুষও জানে না কেন দক্ষিণ সুদানে গণভোট অনুষ্ঠানে বাধ্য করা হয়েছে এবং দক্ষিণ সুদানে কেন উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। উভয় প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর এই যে, ১৮২১ খ্রিস্টাব্দ থেকে বৃটেন এবং পরবর্তীতে অপরাপর পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ সুদানকে উত্তর-দক্ষিণে ভাগ করার বীজ বপণ ও পরিচর্যা করেছে এবং সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি ইন্ধনে দক্ষিণ সুদানে কোনো উন্নয়ন কার্য বাস্তবায়ন করতে দেয়া হয়নি। কোনো দেশের উন্নয়ন সাম্রাজ্যবাদের জন্য প্রয়োজনীয় নয়-সাম্রাজ্যবাদের জন্য প্রয়োজন ভূগুরুত্ব সম্পন্ন ভূখণ্ড- ও এর সম্পদ। গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে কাংখিত ভূখণ্ড- জনশূন্য হলে, অন্নুনত হলে, আন্তঃকোন্দলে লিপ্ত হয়ে দুর্বল হলে সাম্রাজ্যবাদীরা অতি সহজেই নিজেদের উদ্দেশ্য সাধনে সাফল্য লাভ করে। দক্ষিণ সুদানকে মূল ভূখণ্ড- থেকে আলাদা করার জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ ১৮২১ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত যেসব পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে একই পদক্ষেপসমূহ ১৮৬০ খ্রিস্টাব্দ থেকে গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে আমাদের পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে। আমাদের একশ্রেণীর রাজনীতিক ও সুশীল বাবুদের সহায়তায় পার্বত্য চট্টগ্রামের অবস্থাও পূর্ব তিমুর ও দক্ষিণ সুদানের মতো হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা বিদ্যমান।
সুদান : দেশ পরিচিতি
উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার দেশ সুদান। এর আয়তন ২৫০৫৮১৩ বর্গকিলোমিটার, যা বিশ্বে দশম বৃহত্তম আয়তনের দেশ। ২০০৯ সালের গণনা অনুযায়ী এর লোকসংখ্যা ৪,৩৯,৩৯,৫৯৮ জন। মাথাপিছু আয় ২৪৬৪ ডলার। সুদানেরউত্তরে মিসর, উত্তর পূর্বে লোহিত সাগর, পূর্বে ইরিত্রিয়া ও ইথিওপিয়া, দক্ষিণ পূর্বে কেনিয়া ও উগান্ডা, দক্ষিণ-পশ্চিমে কঙ্গো এবং মধ্য আফ্রিকা, পশ্চিমে শাদ, উত্তর-পশ্চিমে লিবিয়া। নীলনদ সুদানকে পূর্ব-পশ্চিমে ভাগ করেছে। প্রশাসনিকভাবে উত্তর সুদানে ২৫টি রাজ্য ও ৮৭টি জেলা এবং দক্ষিণ সুদানে ১০টি রাজ্য ও ৮৪টি কাউন্টি। উত্তরে সংখ্যাগরিষ্ঠ সুন্নি মুসলমান। মুসলমানরা ২ ভাগে বিভক্ত।স্থানীয় (নুবিয়ান) মুসলমান ও আরব বংশোদ্ভুদ মুসলমান। দক্ষিণে খ্রিস্টান ও প্রকৃতিপূজারী।সুদান পেট্রোলিয়াম ও খনিজ তেল সমৃদ্ধ বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগামী অর্থনীতির দেশ।চীন এবং জাপান সুদানী জ্বালানির বৃহত্তম ক্রেতা। সুদানে লোহা, ম্যাঙ্গানিজ, ম্যাগনেসাইড, স্বর্ণ, রৌপ্য, ক্রোমিয়াম, জিপসাম, মাইকা, দস্তা, টাংস্টেন এবং তামার খনি আছে।
খ্রিস্টপূর্ব আমলের সুদান : সুদানের ইতিহাস ও সভ্যতা মিসরীয় সভ্যতার ইতিহাসের চেয়ে অনেক প্রাচীন। খ্রিস্টপূর্ব আমালের বেশিরভাগ সময় মিসর সুদানের অংশ হিসেবে শাসিত হয়েছে। প্রতড়বতাত্ত্বিক নিদর্শন মোতাবেক ৭০ হাজার বছর পূর্বে সুদানে সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। খ্রিস্টপূর্ব ২০০০ সন থেকে সুদানকেন্দ্রীক সুবিয়া সাম্রাজ্যের পত্তন হয়। মিসর, সিরিয়া ও থীবস এ সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।নাবাতীয়দের পর মেরাবীয় বংশ খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ থেকে ৩৫০ পর্যন্ত সুদান শাসন করে। ৩৫০ খ্রিস্টপূর্ব সনে আবিসিনিয়া (বর্তমান ইথিওপিয়া) সুদানি সাম্রাজ্য ধ্বংস করে এবং দখল করে। সুদান সাম্রাজ্যের ধ্বংসস্তূপ থেকে পরবর্তীতে ৫০টি রাজ্যের জন্ম হয়। উক্ত৫০টি রাজ্যের তিনটি ছিল যথাক্রমে নাবাতিয়া (বর্তমান মিসর) মাকুরিয়া ও আলাওয়া(বর্তমান খার্তুমের নিকটে এ রাজ্যের রাজধানীছিল।)
সুদানে খ্রিস্টানিটি ও ইসলাম : বাইজান্টাইন সম্রাজ্ঞী থিওডর স্বয়ং মিশনারীসহ আফ্রিকার উপকূলে উপস্থিত হন। তাদের প্রচারণায় অনেক নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত হয়। তন্মধ্যে নাবাতিয়া, মাকুরিয়া ও আলাওয়াল শাসকত্রয় খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করে।তখন থেকে দ্বাদশ শতাব্দী পর্যন্ত আলাওয়া খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের শাসনাধীন ছিল। হযরত উমর (রা.) খেলাফতের শুরুতে ৬৩৬ খ্রিস্টাব্দে মিসর বিজিত হয় এবং ইসলামী শাসন কায়েম হয়। পর্যায়ক্রমে উত্তর আফ্রিকার জনগণ ইসলাম গ্রহণ করতে শুরু করে ও উত্তর আফ্রিকায় মুসলিম জনগোষ্ঠী সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। দীর্ঘ ৬১৪ বছর পর অর্থাৎ ১২৫০ খ্রিস্টাব্দ থেকে সুদানে মুসলমান শাসন প্রতিষ্ঠা লাভ করে। সেন্নার ও ফ্রুঞ্জ নামক ২টি মুসলিম রাজবংশ ১৮২০ সাল পর্যন্ত সুদান শাসন করে।
সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্তে সুদানের স্বাধীনতার উত্থান-পতন (১৮২১-১৯৫৬)
ওসমানীয় তুর্কী সালতানাতের প্রতিনিধি হিসেবে মিসরে দায়িত্ব পালনরত মুহাম্মদ আলী পাশা ১৮২০ সালে তাঁর ছেলে ইসমাইলকে পাঠিয়ে সুদান দখল করেন এবং সুদান তুর্কী সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়। ইতোমধ্যে মিসর-ফ্রান্স সুয়েজখাল খনন চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। গুরুত্বপূর্ণ সুয়েজখালের নিয়ন্ত্রণের প্রশ্নে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ সুয়েজের দুই পাড়ে অবস্থান নেয় এবং ১৮৮২ সালে মিসরে বৃটেনের শাসন শুরু হয়। ১৮৭৯ সালে ইউরোপীয় শক্তি ইসমাইলকে সুদানের শাসন কর্তৃত্ব থেকে অপসারণ করে তদস্থলে তার পুত্র তাওফীককে ক্ষমতাসীন করে।তাওফীকের দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনায় ওরাবী বিদ্রোহ শুরু হয়।দুর্বলচিত্তের তাওফীক শুধুমাত্র নিজের সিংহাসন রক্ষায় বৃটেনের সাহায্য প্রার্থনা করেন। বৃটেন তাওফীককে নামমাত্র ক্ষমতায় রেখে সুদানে নিজেদের একজন গভর্নর নিয়োগ করে। এভাবে পিতা-পুত্রর মধ্যে দ্বন্দ্ব-সংঘাত সৃষ্টি করে। উত্তম শাসককে সরিয়ে অদক্ষ ও দুর্নীতিবাজ শাসককে ক্ষমতাসীন করে ইউরোপীয় শক্তি সুদানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে এবং উক্ত বিশৃঙ্খলা থেকে সুদানকে রক্ষার অজুহাতে সুদানের শাসক হিসেবে ইংরেজ গভর্নরের শাসন শুরুহয়। দেশপ্রেমিক সুদানীরা আহমদ ইবনে আবদুল্লা (মাহদী)র নেতৃত্বে দখলদার বৃটিশ বিরোধী সশস্ত্র প্রতিরোধ যুদ্ধ শুরু করে।এ যুদ্ধে সুদানে নিযুক্ত বৃটিশ গভর্নর জেনারেল গর্ডন নিহত হয় এবং মাহদী ক্ষমতাসীন হন। টাইফয়েড রোগে পরবর্তী ৬ মাসের মধ্যে মাহদী মৃত্যুবরণ করলে আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ ক্ষমতাসীন হন। তিনি নিজেকে খলীফা ঘোষণা করেন যদিও তিনি ইসলামী শাসন অনুসরণ করেননি।
আবদুল্লাহ ইবনে মুহাম্মদ (মাহদী)র শাসনকাল (১৮৫৫-১৮৯৯)
সুদান পুনরায় স্বাধীন হলে ইতোমধ্যে আফ্রিকায় জেঁকেবসা সকল ইউরোপীয় শক্তি সুদানের স্বাধীনতা হরণে তৎপরতা শুরু করে।তখন মিসর ছিল বৃটেনের দখলে। ইকুইটোরিয়াল ঘানা ছিল বেলজিয়ামের দখলে। ইথিওপিয়ায় ছিল খ্রিস্টান রাজা ইউহানড়বার শাসন। সুদান চতুর্দিক থেকে আক্রান্ত হয় তবুও সুদান শক্তিশালী ইথিওপিয়া দখল করতে সক্ষম হয় কিন্তু ১৮৯৩ সালে ইতালীর আক্রমণে সুদানী সেনারা ইথিওপিয়া ত্যাগ করতে বাধ্য হয়। ১৮৯৯ সালে বৃটেনের তাবেদার রাষ্ট্র মিসরের সহযোগিতায় ওমদুরমান যুদ্ধে সুদান পরাজিত হয়ে বৃটেনের সাথে চুক্তিতে আবদ্ধ হয়। চুক্তি মোতাবেক মিসর কর্তৃক বৃটেনের পছন্দসই ব্যক্তিকে সুদানের গভর্নর নিয়োগ দেয়া হলে সুদান বৃটিশ কলোনীতে পরিণত হয়।
সুদানে অনুসৃত বৃটিশ পলিসি : বৃটিশ শাসকগোষ্ঠীর চিরাচরিত Divide & Role পলিসির শিকার হয়ে সুদানের ঐক্য বিনষ্ট হয়। ১৯২৪ সাল থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত বৃটিশ শাসকগোষ্ঠী সুদানকে উত্তর-দক্ষিণ সুদানে বিভক্ত করে শাসন করে তদুপরি উত্তর সুদানের অংশ দারফুরকে আলাদা প্রশাসনিক ইউনিটে বিভক্তকরে শাসন করে। বৃটিশ শাসনের সময়ে উত্তর-দক্ষিণ বিভেদেরবীজ বপন করা হয়। উক্ত বিভেদের স্বরূপ ছিল
(১) দক্ষিণসুদানের ৮০০ বৃটিশ কর্মচারীর মধ্যে দক্ষিণ সুদানী ছিল ৪ জন বাকিরা ছিল উত্তর সুদানী।
(২) ম্যালেরিয়া রোগের বিস্তার রোধের অজুহাতে উত্তর সুদানীদেরকে দক্ষিণ সুদানে এবং দক্ষিণ সুদানীদেরকে উত্তর সুদানে বসবাসের অনুমতি না দেয়া।
(৩) উত্তর সুদানী দাস ব্যবসায়ীদের দ্বারা দক্ষিণ সুদানী জনগণকে বহির্বিশ্বের দেশসমূহে দাস হিসেবে বিক্রির ব্যবস্থা করা।
(৪)উত্তর সুদানে উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা এবং দক্ষিণকে অন্নুনত রাখা।
(৫) দক্ষিণ সুদানের প্রকৃতিপূজারী কালো লোকদেরকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা।
(৬) উত্তর-দক্ষিণ বিভেদের কাল্পনিক ইতিহাস রচনা করা ইত্যাদি। খনিজ সম্পদে সমৃদ্ধ দক্ষিণ সুদানকে আলাদা করার বৃটিশ পলিসিসমূহ টাইমবোমার ন্যায় কাজ করেছে, যা বর্তমানে বৃটেনের সহযোগী অপরাপর পাশ্চাত্য সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের যোগসাজশে বাস্তবরূপ লাভ করে দক্ষিণ সুদান সম্ভবত চলতি ২০১১ সালে তথাকথিত স্বাধীনতা লাভ করে আফ্রিকার হৃৎপিণ্ডে ইসরাইল ও পাশ্চাত্যের নতুন বাণিজ্যিক ও সামরিক ঘাঁটি স্থাপনের সুযোগ করে দেবে। উত্তর সুদানের দারফুরে ও বৃটিশ রোপিত টাইমবোমা সদৃশ্য বিষবৃক্ষ দ্রুত ডালপালা বিস্তার করছে। দারফুরের জনগণের ধর্মীয় ও ভাষাগত পার্থক্যকে কাজে লাগিয়ে ইতোমধ্যে দারুফুরকে পূর্ব-পশ্চিমে বিভক্ত করার চক্রান্তে বাস্তবায়িত হয়েছে। দক্ষিণ সুদান তথাকথিত স্বাধীন হওয়ার পর দারফুরেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
সর্বশেষ স্বাধীনতা (১৯৫৬ ইং)-এর প্রাক্কালে সুদান : দীর্ঘদিনের ইতিহাসের আলোকে দেখা গেছে মিসর ও সুদান ঐক্যবদ্ধ থাকলে উভয়ের স্বাধীনতা অক্ষুণড়ব থাকে। অপরদিকে বিচ্ছিনড়ব হলে উভয়ের স্বাধীনতা বিপনড়ব হয়। এ জন্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি উভয়কে পৃথক রাখার জন্য কার্যক্রমে পরিচালনা করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বৃটিশ শক্তি হীনবল হওয়ায় বিশ্বের অন্যান্য দেশের ন্যায় মিসর ও সুদানেও স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু হয়। তখন এক পক্ষ অর্থাৎ যারা পূর্বেও সুদানের পৃথক স্বাধীনতার প্রশ্নে বৃটেনের পক্ষে কাজ করেছিল সে মাহদী বংশের নেতৃত্বে সুদানে উম্মাহ পার্টি শক্তিশালী হয়ে উঠে। অপরদিকে সৈয়দ ইসমাইল আজহারীর নেতৃত্বে জাতীয় ঐক্য পার্টিও যথেষ্ট শক্তি সঞ্চয় করে। তখন (১৮৫৪-৫৫) সালে সুদানী রাজনীতির প্রধান ইস্যু ছিল মিসরের সাথে ঐক্যবদ্ধ অথবা পৃথক স্বাধীনতা। ইতোমধ্যে ১৯৫২ সালে বৃটিশবিরোধী বিপ্লব ও সফল অভ্যুত্থানে মিসর স্বাধীনতা লাভ করে কিন্তু সুদানে বৃটিশ শাসন বলবৎ থাকে। স্বাধীনতার পর মিসরে রাজতন্ত্র কায়েম হয় কিন্তু বৃটেনের চক্রান্তে রাজতন্ত্রের অবসান ঘটে এবং একনায়কতন্ত্রের যুগ শুরু হয়। মিসরের তৎকালীন শাসক নাগীব মাহফুজ ঐক্যবদ্ধ মিসর ও সুদানের পক্ষে কাজ করেন কেননা এতেই তিনি স্বাধীনতার রক্ষাকবচ খুঁজে পান। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী বৃটেন সুদানের পূর্ববর্তী মাহদী রাজবংশের সাইয়্যিদ আবদুর রহমানকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়ে মিসরবিরোধী আন্দালনে লিপ্ত করে। সদ্য স্বাধীন মিসর এতে দমে যায় এবং ১৯৫৪ সালে মিসর ও বৃটিশ সরকার ১ জানুয়ারি ১৯৫৬ সালে সুদানকে স্বাধীনতা প্রদানের চুক্তিতে উপনীত হয়।চুক্তি মোতাবেক অনুষ্ঠিত গণভোটে বৃটেনের আকাক্সক্ষা বিরোধী জাতীয় ঐক্য পার্টি বিজয় লাভ করে এবং ইসমাইল আজহারী সুদানের প্রথম প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতাসীন হন।
গণভোটের ফলাফল সাম্রাজ্যবাদী বৃটেনের চাহিদামাফিক না হওয়ায় ১৯৫৫ সাল থেকে শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদী মদদে খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ দক্ষিণ সুদান উত্তরের সাথে গৃহযুদ্ধে লিপ্ত হয়।পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করে প্রধানমন্ত্রী আজহারী জুলাই, ১৯৫৬ সালে পদত্যাগ করেন এবং উম্মাহ পার্টির মহাসচিব আবদুল্লাহ খলিল প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। এতদসত্ত্বেও উক্ত গৃহযুদ্ধ ১৯৭২ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ১৯৭২ সালে World Council of Church-এর মধ্যস্থতায় আদ্দিস আবাবা চুক্তির মাধ্যমে গৃহযুদ্ধ বন্ধ হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক দক্ষিণ সুদান স্বায়ত্তশাসন লাভ করে। দক্ষিণ সুদানের জন্য একটি স্থায়ী উচ্চতর নির্বাহী পরিষদ (উনিপ) গঠন করা হয়। ১৯৮২ সালের জুলাই মাসে উনিপের প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট যোশেফ লাগুকে সুদানের ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ করা হয়।
সুদানের (সামরিক জান্তা) প্রেসিডেন্ট জাফর নিমেরী ক্ষমতায় এসে ‘সুদান সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়ন’ নামে একদলীয় শাসন চালু করার সময় দক্ষিণ নিশ্চুপ ছিল। কিন্তু ১৯৮৩ সালের সেপ্টেম্বর মাসে নিমেরী সুদানে ফেডারেল সরকার ও ইসলামী আইন চালু করতে উদ্যোগী হলে দক্ষিণ আবার বিদ্রোহী হয়ে ওঠে। সেনাবাহিনীর প্রাক্তন কর্নেল এবং যুক্তরাষ্ট্রে প্রশিক্ষিত অর্থনীতিবিদ জন গ্যারাং- এর নেতৃত্বে সুদানী জনগণের মুক্তি আন্দোলন (সজমা) ব্যাপক সশস্ত্র হামলার মাধ্যমে দক্ষিণ সুদানের অর্থনৈতিক,অবকাঠামোগত ও যোগাযোগ ব্যবস্থা অচল করে দেয়। উক্ত গৃহযুদ্ধ ও দুর্ভিক্ষে প্রায় ২০ লাখ লোক নিহত হয়। ১৯৮৫ সাল নাগাদ দক্ষিণের ২টি প্রদেশে সজমার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়।দেশব্যাপী খরা ও দুর্ভিক্ষে নিমেরী সরকারের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন শুরু হলে ৬ এপ্রিল ১৯৮৫ সালে এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে নিমেরী ক্ষমাচ্যুত হন। সেনাবাহিনী প্রধান ও প্রতিরক্ষামন্ত্রী জেনারেল আবদুর রহমান সুয়ারেদ ক্ষমতা দখল করেন। তিনি অন্তর্বর্তীকালীন সামরিক পরিষদ গঠন করেন ও বিভিনড়ব গ্রুপের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে ১৯৮৬ সালের ১-২ এপ্রিল সুদানে গণভোটের আয়োজন করেন। ২৬ এপ্রিল ১৯৮৬ সালে নতুন সংসদ অধিবেশন শুরু হলে জেনারেল রহমান বেসামরিক সরকারের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর করেন। উম্মাহ পার্টির সাদিক আল মাহদী এ সরকারের প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। গণভোট উপলক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জিমি কার্টারের মধ্যস্থতায় দক্ষিণ সুদানে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। গনভোটের ফলাফল সাম্রাজ্যবাদী আমেরিকা ও তাদের এজেন্ট সুদানী গেরিলাদের অনুকূলে না আসায় Sudan Peoples Liveration Army (SPLA)জন গ্যারাংয়ের নেতৃত্বে পুনরায় উত্তরের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ শুরু করে।জন গ্যারাং সাদিক আল মাহদীর সরকারকে স্বীকৃতি দিতে অস্বীকার করে ও বিদ্রোহ করে।
সুদানের গণতান্ত্রিক সরকার উক্ত বিদ্রোহ দমনে ব্যর্থ হয়। দেশব্যাপী অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, নিরাপত্তাহীনতা দেখা দেয়। এরূপ পরিস্থিতিতে জুন ১৯৮৯ সালে কর্নেল উমর আল বশীর এক রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানে সাদিক আল মাহদীর সরকারকে অপসারণ করে ক্ষমতা দখল করেন। তিনি বিপ্লবী কমান্ড কাউন্সিল গঠন করে একনায়কসুলভ সরকার গঠন করেন। উত্তর সুদানে শরীয়া আইন চালুর শর্তে ন্যাশনাল ইসলামী ফ্রন্ট (NIF) নেতা হাসান-আর-তুরাবী ওমর আল বশীরের সরকারে যোগ দেন।দক্ষিণ সুদানের বিদ্রোহী নেতা রিয়েক মাশার ও বশীরের সঙ্গে যোগ দেন। এতে সুদানে শক্তিশালী সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। রিয়েক মাশার এর সহযোগিতায় প্রেসিডেন্ট বশীর সমগ্র দক্ষিণ সুদানে স্বীয় কর্তৃত্ব সংহত করেন। বিদ্রোহী ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের শক্ত হাতে দমন করার পর প্রেসিডেন্ট বশীর অতিরিক্ত আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে চরম ভুল পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি দেশের সর্বময় ক্ষমতা গ্রহণ করেন। সকল দল ও গ্রুপ নিষিদ্ধ করে দেন এবং দেশের একমাত্র দল হিসাবে ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি (NCP) গঠন করেন। প্রেসিডেন্ট বশীরের এরূপ স্বেচ্ছাচারী পদক্ষেপের ফলে (NIF) সরকার থেকে বেরিয়ে যায় এবং (SPLA)-এর সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে ২০০০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন বয়কট করার আহ্বান জানান। এতে আসনড়ব প্রেসিডেন্ট নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারায়। ক্ষিপ্ত বশীর দেশব্যাপী জরুরি অবস্থা জারি করে এবং বিরোধী নেতৃবৃন্দকে আটক করেন। নিজ দেশে জনপ্রিয়তা হারানোর পর পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ প্রেসিডেন্ট বশীরকে ও সুদানকে দুর্বল করার জন্য মিসরের ইসলামী জিহাদ ও ওসামা বিন লাদেনের আল-কায়েদার সাথে সুদানে সম্পর্ক আবিষ্কার করে এবং এ অজুহাতে বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করে।জন গ্যারাং এর নেতৃত্বে গেরিলা যুদ্ধকে আরও বিস্তৃত করা হয়।
চতুর্মুখী চাপে প্রেসিডেন্ট বশির ও সুদান দুর্বল হয়ে পড়লে ২০০৩ সাল নাগাদ পুনরায় শান্তি আলোচনা শুরু হয় এবং ৯/১/২০০৫ সালে ‘নাইরোবী কমপ্রিহেনসিভ শান্তিচুক্তি’ স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তির শর্ত মোতাবেক
১. প্রেসিডেন্ট বশীরের নেতৃত্বে সুদানে কোয়ালিশন সরকার গঠিত হয়। উক্ত সরকারের গঠন হলো ন্যাশনাল কংগ্রেস পার্টি (NCP)র প্রেসিডেন্ট বশীর, SPLM-এর সালভাকির মায়ারভিট ভাইস প্রেসিডেন্ট, ঘঈচ-এর আলী ওসমান তাহা ভাইস প্রেসিডেন্ট, সুদান লিবারেশন আর্মি (SLA)র মিন্নি মিন্নাউবি সাংবিধানিক উপদেষ্টা এবং দুই কক্ষবিশিষ্ট আইনসভা।
২. ২০১১ সালে দক্ষিণ সুদানে গণভোট অনুষ্ঠানেরসময় ধার্য করা হয়, যা এখন অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
৩. জাতিসংঘনিরাপত্তা পরিষদ চুক্তি বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করবে।
 ৪. উত্তরও দক্ষিণ সুদান সমানভাবে তেলসম্পদের উপর অধিকার লাভ করে। চুক্তি স্বাক্ষরের ৭ মাসের মধ্যে অর্থাৎ ০১/০৮/২০০৫ সালে বিমান দুর্ঘটনায় জন গ্যারাং নিহত হলে পুনরায় গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। এ যুদ্ধ দারফুর, লোহিত সাগর উপকূল ও ইক্যুইটোরিয়াল ঘানার সীমানা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। উত্তরের জানজাবিদ মিলিশিয়ার সাথে দক্ষিণের গেরিলা দল SPLA, SLA ও JEM মধ্যে এ যুদ্ধ অনুষ্ঠিত হয়। দক্ষিণ সুদানের গেরিলা দলসমূহ যেহেতু সাম্রাজ্যবাদী শক্তির দাবার ঘুঁটি সেহেতু ২০১১ সালের গণভোটের স্বার্থে উক্ত যুদ্ধ বন্ধ হয়। নির্বাচনের পর দেখা যাবে উক্ত গেরিলা দলসমূহ পারস্পরিক যুদ্ধে লিপ্ত হয়ে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থের বলির পাঠা হবে।
সুদান ও সামরিক বাহিনী : সুদানের জনগণ বাংলাদেশের জনগণের মতোই গণতন্ত্রপ্রিয়। যখনই তারা ভোট দেওয়ার সুযোগ পেয়েছে তখনই তারা দেশপ্রেমিকদেরকে নির্বাচিত করেছে। সাম্রাজ্যবাদীরা দেশপ্রেমিকদের সরকার ও শাসনকে কখনও পছন্দ করে না। কেননা সৎ, জ্ঞানী ও দেশপ্রেমিক ব্যক্তি ও দল ক্ষমতাসীন হলে সাম্রাজ্যবাদী সুযোগ-সুবিধা সীমিত হয়ে পড়ে এবং সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন পরিকল্পনা থেমে যেতে বাধ্য হয়। এ জন্যই দেখা যায় পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের সামরিক অভ্যুত্থানের পিছনে এক বা একাধিক সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কালো হাত সক্রিয় থাকে। গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এ ব্যাপারে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করে। সুদানের প্রতিটি সামরিক অভ্যুত্থানে বৃটেন ও আমেরিকা জড়িত ছিল। তারা গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রায় বারবার সুদানকে বাধা দিয়েছে এবং সামরিক শাসকদেরকে পৃষ্ঠপোষকতা করেছে। একই সাথে তারা সামরিক সরকারকে চাপে রেখে নিজেদের স্বার্থ আদায়ে ও চক্রান্ত বাস্তবায়নে বিরোধী দলকে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়েছে এবং বিভিনড়ব গেরিলা দল সৃষ্টি করে উক্ত গেরিলা দলকে অর্থ, অস্ত্র, প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। তাদের কাজ ফুরানোর পর তারা নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাংকেস্টাইনকে নিশ্চিহ্ন করেছে অথবা দৃশ্যপট থেকে বিদায় দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেনের মদদপুষ্ট পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জিয়াউল হকের শেষ পরিণতি, ইরাকী প্রেসিডেন্ট সাদ্দাম হোসেনের পরিণতি এবং জন গ্যারাংয়ের পরিণতি একই সূত্রে বাঁধা।দক্ষিণ সুদানের জনগণের স্বাধীনতা, স্বচ্ছলতা সাম্রাজ্যবাদী শক্তির কাম্য নয়। তারা চায় খনিজ সম্পদে বিপুলভাবে সমৃদ্ধ এবং আফ্রিকার হৃৎপিণ্ডে অবস্থিত দক্ষিণ সুদানের ভূখণ্ডে নিজেদের অবাধ লুণ্ঠন ও বিচরণ। জন গ্যারাংয়ের ন্যায় অভিজ্ঞ ব্যক্তি দক্ষিণ সুদানের সরকার প্রধান হলে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির অবাধ লুণ্ঠন বাধাগ্রস্ত হবে ভেবেই তাঁকে বিজয়ের পূর্বক্ষণে দৃশ্যপট থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশপ্রেমিক সরকার কোনো দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া শুরু করলে সেখানে দেশের স্বার্থবিরোধী সরকার অথবা সামরিক শাসক চাপিয়ে দেয়া হয়েছে।সামরিক শাসক কোনো দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা নিলে সেখানে একনায়ককে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে, রাজতন্ত্র দেশকে সম্মুখপানে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করলে সেখানে গণতান্ত্রিক বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে সামরিক সরকার চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। এভাবে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি পৃথিবীর প্রতিটি উনড়বয়নশীল দেশে প্রধানত মুসলমান দেশে অশান্তি সৃষ্টি করে মুসলমানদের অগ্রগতিতে বাধা দিয়েছে এবং পুতুল সরকারকে ক্ষমতাসীন করে নিজেদের অন্যায়, অন্যায্য ও অবৈধ লালসা চরিতার্থ করেছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন পতনের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রধান টার্গেটে পরিণত হয়েছে উদীয়মান মুসলিম শক্তি। এ লক্ষ্যেই তারা মুসলিম দেশসমূহকে ভেঙে টুকরা করে শক্তিহীন করে নিজেদের লুণ্ঠনকর্ম সম্পাদনের কার্যμম বাস্তবায়ন করছে। ইতোমধ্যে ইন্দোনেশিয়াকে ভেঙে পূর্ব তিমুরকে আলাদা করা হয়েছে। সুদানকে ভেঙে উত্তর-দক্ষিণ সুদানে পরিণত করার কার্যক্রম সম্পন্ন করেছে। পাকিস্তান ভেঙে তিন টুকরা করার (বালুচিস্তান,পাখতুনিস্তান ও পাকিস্তান) কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ইরাককে ভেঙে শিয়া-সুন্নি-কুর্দিস্থানে পরিণত করার সিংহভাগ অপকর্ম সম্পাদন করেছে। সৌদি আরবকে ভেঙে ৬ টুকরা করার গোপন মানচিত্র প্রকাশিত হয়েছে। বাংলাদেশ ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করার কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। অথচ জাতিসংঘ প্রস্তাব থাকা সত্ত্বেও কাশ্মীরের গণভোট অনুষ্ঠানে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আগ্রহী নয়। ভারত যদি মুসলিম শাসিত দেশ হতো তবে অনেক বছর পূর্বেই ভারত ভেঙে কাশ্মীরকে ও সেভেন সিস্টার আলাদা করা হতো। এই হলো মুসলিম বিদ্বেষী বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির সত্যিকার পরিচয়।
গণভোট-পরবর্তী সুদান : সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ দক্ষিণ সুদানের গণভোটের ফলাফল সম্পর্কে শতভাগ নিশ্চিত হয়ে গণভোটের আয়োজন করেছে। উত্তর সুদান যাতে এতে হস্তক্ষেপ করতে না পারে তার জন্য উত্তর সুদানের উপর বাণিজ্য অবরোধ আরোপ করেছে। সুদানী প্রেসিডেন্ট ওমর আল বশীরকে যুদ্ধাপরাধী আখ্যায়িত করে আইসিসি কর্তৃক গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। সুদানকে জঙ্গীদের আশ্রয়স্থল হিসেবে অপবাদ দিয়ে কালো তালিকাভুক্ত করেছে। ফলে দক্ষিণ সুদানের স্বাধীনতা বর্তমানে একটি বাস্তব সত্য। তবে সাম্রাজ্যবাদী কর্মকা- সম্পর্কে ওয়াকেবহাল মহল নিশ্চিতভাবে জানেন, বাংলাদেশীরা যেভাবে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি শাসকদের হাত থেকে বেরিয়ে এসে ভারতীয়দের হাতে জিম্মী হয়েছে, লুণ্ঠিত হয়েছে, দক্ষিণ সুদানীরাও তদ্রƒপ উত্তর সুদানীদের হাত থেকে মুক্তি পেয়ে ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, বৃটেন ও ফ্রান্সের কঠিন শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়ে লুণ্ঠিত হবে। সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ করে নিঃশেষ হবে। নিজেদের পৈতৃক ভিটেমাটি ত্যাগ করতে বাধ্য হবে অথবা নিজেদের রক্ত-মাংস দিয়ে সুদানের মাটিকে উর্বর করে সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আকাক্সক্ষা পূরণ করবে। অদূরভবিষ্যতে উত্তর সুদান থেকে পুনরায় দারফুরকে আলাদা করার চক্রান্ত বেগবান হবে এবং তেল নিয়ে উত্তর-দক্ষিণ লড়াই শুরু হবে। সমগ্র উত্তর সুদান অস্থিতিশীল হয়ে অস্তিত্বের সঙ্কটে নিমজ্জিত হবে।
সুদানের ভাঙন এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম পলিসি : উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখেছি, ১৯২৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত সুদানে বৃটিশ শাসনের সময় সুদানকে উত্তর-দক্ষিণ ভাগ (প্রশাসনিক) করা হয়। উত্তর-দক্ষিণ বিভেদের কাল্পনিক ইতিহাস, কিংবদন্তী রচনা করা হয়, ম্যালেরিয়া বিস্তারের অজুহাতে উত্তরের লোককে দক্ষিণ এবং দক্ষিণের লোককে উত্তরে বসবাসের সুযোগ বন্ধ করা হয়। গেরিলা হামলা দ্বারা দক্ষিণ থেকে উত্তর সুদানীদের বহিষ্কার করা হয়। দক্ষিণ সুদানকে অনুনড়বত রাখা হয়, দক্ষিণ সুদানের প্রকৃতিপূজারী কালো লোকদেরকে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করে স্থায়ী বিভেদের দেয়াল রচনা করা হয়। ঠিক একইভাবে বৃটিশ শাসক মহল ১৮৬০ সালে অখণ্ড- চট্টগ্রামকে ভেঙে পার্বত্য চট্টগ্রাম নামক আলাদা প্রশাসনিক জেলা সৃষ্টি করা হয়। ১৮৮১ সালে পুলিশ Act প্রণয়নের মাধ্যমে উপজাতীয় পুলিশ বাহিনী করা হয়। উক্ত পুলিশ বাহিনী জোরপূর্বক বাংলা ভাষীদেরকে পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বিতাড়িত করে। ১৯০০ সালে প্রণীত রেজুলেশনের মাধ্যমে বাঙালীদের চট্টগ্রামে বসবাসের অধিকার হরণ করা হয়। ভূমি ক্রয়ের অধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়। মিজোরাম, ত্রিপুরা, অরুনাচল ও আরাকান থেকে উপজাতিদের এনে পার্বত্য চট্টগ্রামে পুনর্বাসন করা হয়। অ-উপজাতীয়দেরকে জোরপূর্বক পার্বত্য চট্টগ্রাম থেকে বহিষ্কার করার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৫ সালে প্রণীত Government of India Act-এর মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামকে কেন্দ্রীয় শাসনের অধীনে করদরাজ্যে পরিণত করা হয়। পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতিদেরকে বিপুল হারে খ্রিস্টধর্মে দীক্ষিত করা হয় এবং বাংলাদেশের তাবেদার সরকার কর্তৃক সাম্রাজ্যবাদের কাক্সিক্ষত শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো হয়।সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ ২০০৫ সালের চুক্তির মাধ্যমে দক্ষিণ সুদানে যে গণভোটের আয়োজন করেছে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র উক্ত কাজটি বাকি রয়েছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠতা আর কিছুটা কমাতে সক্ষম হলে অথবা প্রতিবেশী দেশসমূহ থেকে উপজাতীয় লোকজন এনে লোকসংখ্যা আরকিছুটা বাড়াতে সক্ষম হলে এখানেও গণভোটের আয়োজন করাহবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রামকে আলাদা করে সমগ্র বাংলাদেশের স্বাধীনতা নস্যাতে টাইম বোমা স্থাপনের কাজ সমাধা করা হবে।
আমাদের করণীয়
১. সাম্রাজ্যবাদের পুতুল সরকার ও এজেন্টদের হাত থেকে দেশকে রক্ষা করা।
২. আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা, সাহিত্য, নাটক এবং সিনেমার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী চμান্তের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে শিক্ষা দেয়া এবং দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টির কর্মসূচি গ্রহণ।
৩. জাতীয় ঐক্যের মূলমন্ত্র ধর্ম, ধর্মীয় শিক্ষা ও মূল্যবোধকে জাতীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত প্রতিহত করার যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
৪. বিদেশী সাংস্কৃতিক আগ্রাসন থেকে জাতিকে রক্ষা করা এবংনিজস্ব সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার।মানসম্মত স্বদেশপন্থী পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সংখ্যাবৃদ্ধি।
৫. কাক্সিক্ষত, মানসম্মত দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টিকে দেশের অর্থনীতি ও প্রতিরক্ষার চেয়ে অধিক গুরুত্ব দেয়া।
তথ্যসূত্র :
১. মুসলিম জাহান, সোহরাব উদ্দীন আহমেদ
২. উইকিপিডিয়া
লেখক: এস এম নজরুল ইসলাম, সম্পাদক ও প্রকাশক; 
০১৭১১৭২০৯২৩
মাসিকইতিহাস অন্বেষা

Thursday, December 22, 2011

বাংলাদেশ আবার স্বাধীন হবে এবং বর্তমান নেতৃত্ব ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে (প্রথম প্রকাশ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা জুলাই ২০১১ সংখ্যা)



আমরা কি স্বাধীন? আমাদের দেশ কি স্বাধীন?-এ দুটি প্রশ্নে চিন্তা করার, জিজ্ঞাসা করার, সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়া বর্তমান সময়ের দাবি।ব্যক্তিক ও সামষ্টিক পর্যায়ে আমাদের বর্তমান অবস্থা মূল্যায়ন করলেই আমরা সঠিক সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারব। ব্যক্তি স্বাধীনতার শর্তাবলী হলো- স্বাধীনভাবে চলাফেলার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা, সম্পদ অর্জন ও রক্ষার স্বাধীনতা, মৌলিক অধিকারের নিশ্চয়তা, চাকরি পাওয়ার স্বাধীনতা। ধর্মীয় স্বাধীনতা,রাজনীতি করার স্বাধীনতা ও আত্মরক্ষার স্বাধীনতা। রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার শর্তাবলী হলো রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব অটুট থাকা, গোষ্ঠীগত স্বাধীনতা, নিজ দেশের সীমান্তে নিরাপদে বিচরণের স্বাধীনতা, আমাদের সীমান্ত আমাদের নিয়ন্ত্রণে রাখার স্বাধীনতা, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা, পররাষ্ট্র নীতির স্বাধীনতা, স্বাধীন অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের স্বাধীনতা, স্বাধীন প্রতিরক্ষা নীতি ও আগ্রাসন প্রতিরোধের স্বাধীনতা। উপরোক্ত শর্তাবলীর বর্তমান অবস্থা হলো-আমরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করতে সক্ষম হচ্ছি না। কেননা রাষ্ট্রীয় আস্কারাপ্রাপ্ত ছিনতাইকারী, মলম পার্টি, ঝাপটা পার্টি, খুনি ও দস্যুরা সদা-সর্বদা আমাদের জানমালের নিরাপত্তার প্রতি হুমকি সৃষ্টি করছে। সরকারের পুলিশ বাহিনী যখন-তখন, কারণে-অকারণে গ্রেফতার করে বিনা বিচারে আটক রাখার ক্ষমতাপ্রাপ্ত, রিমান্ডের নামে প্রাণসংহারী অত্যাচার করতে সিদ্ধহস্ত, গ্রেফতার-বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্থ আদায়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত, সরকারের বিশেষ বাহিনীসমূহ যে কোনো নাগরিককে ক্রসফায়ারের নামে হত্যা করার অধিকারপ্রাপ্ত,সিভিল পোশাকের বিশেষ বাহিনী একজন নাগরিককে ধরে নিয়ে গুম বা পঙ্গু করার ক্ষমতাপ্রাপ্ত। আমাদের চিন্তার স্বাধীনতা, বাক-স্বাধীনতা, লেখার স্বাধীনতা ও সরকারি দমন নীতিতে বিপর্যস্ত। সত্য কথা বলা, দেশের স্বার্থের পক্ষে বলা, দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে কথা বলা বা লেখা সরকারের দৃষ্টিতে অমার্জনীয় অপরাধ। এ জন্য লেখককে ও সাংবাদিককে প্রতিনিয়ত জানমালের নিরাপত্তাহীনতায় কালাতিপাত করতে হয়। বৈধভাবে সম্পদ অর্জনেও আমরা স্বাধীন নই। কেননা সম্পদ অর্জনের প্রচেষ্টায় দলীয় ও আমলাতান্ত্রিক বাধা। সরকারি, বেসরকারি চাঁদাবাজ, টেন্ডারবাজের অত্যাচার-নির্যাতন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার। অর্জিত সম্পদ রক্ষায়ও আমরা স্বাধীন নই। চোর, ডাকাত, মাস্তান, লুটেরা ও একশ্রেণীর সরকারি লোক প্রতিনিয়ত অর্জিত সম্পত্তি হাতিয়ে নিতে তৎপর থাকে। দলীয়করণ, আত্মীয়করণ, বিভিন্ন কোটা পদ্ধতি,আঞ্চলিকতা দুষ্ট নীতি ও দুর্বৃত্তের শাসনে জনগণ অন্ন-বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। যোগ্য ব্যক্তির যোগ্য পদে চাকরি পাওয়ার ও প্রমোশন পাওয়ার স্বাধীনতা নেই। বর্তমানে সরকারি চাকরি পেতে হলে প্রথমত সরকারি দলের লোক হতে হয়,দ্বিতীয়ত ঘুষ দিতে হয়, প্রমোশন পেতে হলে শাসকদলের নিঃশর্ত আনুগত্য করতে হয় ওসকল অন্যায্য কাজে সহযোগিতা করতে হয়।সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানদের দেশে ইসলাম ধর্মপালনের স্বাধীনতা নেই। বোরকা পরার অপরাধে শরীফ মহিলাদেরকে লাঞ্ছিত করে জঙ্গি অপবাদ দিয়ে জেলে পাঠানো হয়।নামাজী ছাত্রদেরকে মৌলবাদী অপবাদ দিয়ে হত্যা, নির্যাতন, গ্রেফতার, মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়। পবিত্র কোরআন-হাদীসকে জেহাদী বই আখ্যা দিয়ে রক্ষককে আসামির কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয়। সৎ ধার্মিক ও নামাজী ব্যক্তিকে চাকরি থেকে ওএসডি/বরখাস্ত করা হয়। রাজনীতি করার স্বাধীনতাও বর্তমানে একেবারে সংকুচিত। শাসক দল ব্যতিত আর কেউ মিছিল/ মিটিং/ মানববন্ধন/ প্রতিবাদ সভা/ দলীয় সভা করতে সমর্থ নয়। রাষ্ট্রের পুলিশ বাহিনীকে/বিশেষ বাহিনীকে ভিন্মমতের রাজনীতি দমনে সকল অন্যায় পন্থা অবলম্বনের লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের নামে যে কাউকে জেল-জরিমানা করার অধিকার প্রদান করা হয়েছে। বর্তমানে সরকারি দল ব্যতীত অন্যান্যদের আত্মরক্ষা করার অধিকারও নেই। শাসক দল কাউকে হামলা করলে আত্মরক্ষার্থে কিছু করা যাবে না। কেউ যদি আত্মরক্ষার চেষ্টা করে তবে সে সরকারি বাহিনীর হামলার শিকার হবে, কর্তব্য কাজে বাধাদানের মামলার আসামি হবে, জেল-জুলুম-নির্যাতন-রিমান্ড, ক্রসফায়ারের সম্মুখীন হবে। এর জন্য আদালতে বিচার চাওয়া হবে আরও মারাত্মক। রাজনৈতিক মামলা হিসেবে গণ্য করে আক্রমণকারীকে মুক্তি দেয়া হবে, পুরস্কৃত করা হবে। যাতে সে দ্বিগুণ উৎসাহে পুনরায় হামলা পরিচালনা করে।রাষ্ট্রীয়ভাবেও এখন আমরা স্বাধীন নই। বিচার বিভাগের হস্তক্ষেপে আমাদের পার্লামেন্ট স্বীয় সার্বভৌমত্ব হারিয়েছে, নিম্নমানের দলীয় লোককে বিচারপতি করে বিচার বিভাগকে বিতর্কিত-পঙ্গু ও আজ্ঞাবহ করা হয়েছে। আমাদের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব সাম্রাজ্যবাদী শক্তির নিকট সমর্পিত। সীমান্তে একতরফা কাঁটাতারের বেড়া দিয়ে আমাদের সীমান্তের পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছে প্রতিবেশী ভারত। আমাদের সেনাবাহিনী, বিডিআর ধ্বংস করা হয়েছে।আমাদের প্রতিরক্ষানীতি-পররাষ্ট্রনীতি ভারত-ইসরাইল-মার্কিন জোটের নিকট সমর্পিত। আমাদের অর্থনীতি, শেয়ারবাজার, ক্ষুদ্র-বৃহৎ শিল্প কারখানাকে পঙ্গু করা হয়েছে। আমাদের তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ-বন্দর-সীমান্ত-সমুদ্র-নৌপথ, নৌবন্দর, মহাসড়ক ও নিরাপত্তা আগ্রাসী শক্তির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। আমাদের মস্তক, দেহ, আত্মা সাম্রাজ্যবাদের জালে বন্দী। শুধু তামাটে দুটি চোখ এখনও উন্মুক্ত আছে, যা দিয়ে আমরা নিজেদের শবযাত্রাপ্রত্যক্ষ করতে সক্ষম হচ্ছি।
উপরোক্ত আলোচনায় দেখা গেল আমরা এখন স্বাধীন নই। তবেকি আমরা ১৯৪৭ সালে ও ১৯৭১ সালে স্বাধীন হইনি। আমাদের বাপ-দাদারা বলে গেছেন, তারা দীর্ঘ ১৯০ বছর ইঙ্গ-হিন্দু শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে লড়াই করে কয়েক কোটি শহীদের বিনিময়ে আমাদেরকে বর্তমান ভূখণ্ডের মালিকানা প্রদান করেছেন। আমরা অহরহ বলছি আমরা ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ স্বাধীনতা অর্জন করেছি। আমরা ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার কথা, ১৪ আগস্টের কথা ভুলেও উচ্চারণ করতে রাজী নই। কেউ উচ্চারণ করলে তার টুটি চেপে ধরছি। তবে কি আমাদের বাপ-দাদারা-পরদাদারা মিথ্যুকছিলেন? উক্ত মিথ্যুকদের ঘরে আমরা কি ধর্মপুত্র যুধিষ্ঠির? একথা কি সত্য নয় যে, আমাদের হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী, এ কে ফজলুল হক, শেখ মুজিবুর রহমানসহ অসংখ্য রাজনীতিবিদ ১৯৪৭-এর স্বাধীনতার মাধ্যমে অর্জিত পাকিস্তানের রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন? পরাধীন কেউ কি দেশের প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী,গভর্নর, শিল্পমন্ত্রী হতে পারে? যদি না পারে তবে আমরা ’৪৭কে কেন ভুলে গেলাম? যে জাতি ১৯০ বছরের স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভুলে যায় সে জাতি কি স্বাধীন থাকতে সক্ষম? অথবা সে জাতির কি স্বাধীন থাকা উচিত? এমতাবস্থায় আমরা এ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, ব্যক্তিক ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার শর্তাবলী মোতাবেক আমরা এখন স্বাধীন নই। তবে ১৯৪৭ থেকে ২০১১ সাল সময়কালের মধ্যে যেসময়ে আমাদের ব্যক্তি-স্বাধীনতা ও রাষ্ট্রীয় স্বাধীনতার রক্ষাকবচসমূহ বজায় ছিল সে সময়ে আমরা স্বাধীন ছিলাম। আমাদের সীমান্ত সুরক্ষিত ছিল, স্বাধীন পররাষ্ট্র নীতি ছিল, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ ছিল, আইনের শাসন ছিল।
আমাদের পরাধীনতায় নিমজ্জিত হওয়ার কারণসমূহ
১৭৫৭ সালের পলাশী ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যা আমাদের হাতছাড়া হওয়ার পর খুব দ্রুত ইঙ্গ-হিন্দু ও ক্ষমতালোভী মুসলমানদের ষড়যন্ত্রে ভারতবর্ষের মুসলিম শাসন ভেঙে পড়তে শুরু করে। দিল্লীতে থেকে শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী এ পতনের কারণ চিহ্নিত করেন ও উত্থানের রূপরেখা প্রণয়ন করে তাঁর পিতার প্রতিষ্ঠিত দিল্লী মাদ্রাসার সিলেবাসকে নিজের রূপরেখা অনুযায়ী যুগোপযোগী করেন। তাঁর পরিচালিত মাদ্রাসার ছাত্ররাই পরবর্তী ১০০ বছর যাবত আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম অব্যাহত রাখেন। বাঙালী হিন্দু, শিখ, মারাঠা ও গুর্খাদের অসহযোগিতা ও ব্রিটিশদের পক্ষাবলম্বন করায় ১৮৫৭ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে আমরা হেরে যাই এবং চূড়ান্ত ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হই। পরবর্তীতে ধ্বংসস্তূপ থেকে মুসলমানদের উদ্ধার করার কর্মসূচি গ্রহণ করেন স্যার সাইয়েদ আহমদ খান ও মাওলানা কাসেম নানুতুবী। আমাদের প্রথম শক্তিকেন্দ্র দিল্লী মাদ্রাসার পতনের পর ধ্বংসস্তূপের মাঝে গড়ে উঠে আলীগড় বিশ্ববিদ্যালয় ও দেওবন্দ মাদ্রাসা। ১৮৫৭-১৯৪৭ সময়কালে আমাদের নেতৃত্ব প্রদান করেন উক্ত দুই পাওয়ার হাউজের ছাত্র-শিক্ষকবৃন্দ। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভক্ত হওয়ায় উক্ত দুইটি পাওয়ার হাউসকে সুকৌশলে আত্মিকভাবে নিষ্ক্রিয় করে ভারতের ব্রাহ্মণ্যবাদী শাসকগণ। ১৯৪৭ সালে নতুন রাষ্ট্রের মালিক হয়ে আমাদের শাসকবৃন্দ ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে বেখবর হয়ে পড়েন। ফলে আমাদের পাওয়ার হাউজ আমাদের জাতির জন্য শক্তি উৎপাদন না করে আমাদের জাতিসত্তা ধ্বংসের কাজে ব্যবহৃত হয়। এ চক্রান্তেই আমাদের ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা দ্বিখণ্ডিত ও শক্তিহীন হয়ে পড়ে। ১৯৭১ সালের পর থেকে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও তাদের এদেশীয় দোসরগণ আমাদের জাতীয় পাওয়ার হাউজসমূহে অরাজকতা-বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে বর্তমানে দেশবিরোধী ও জাতিবিরোধী কাজে ব্যবহার করছে আমাদের জাতীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহ। ফলে জাতীয়ভাবে বর্তমানে আমরা নিষ্প্রাণ ও মৃত। আমাদের চোখের সামনে আমাদের স্বাধীনতা,সার্বভৌমত্ব, অস্তিত্ব, মর্যাদা,ভূখণ্ড - কেড়ে নিতে দেখেও আমরা চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখছি।আমাদের সেনাবাহিনী এখন পঙ্গু। বিডিআর ধ্বংসপ্রায়। অন্যান্য বাহিনীসমূহকে আমাদের নিজেদের বাহিনী মনে করতে কষ্ট হয়।আমাদের রাজনীতিকগণ ব্যক্তিস্বার্থ, গোষ্ঠীস্বার্থ ও পারিবারিক স্বার্থে নিমগ্ন। দেশের স্বার্থের প্রতি তারা উদাসীন। ক্ষমতা পেতে ও টিকে থাকতে তারা এখন মীরজাফরের পথ অনুসরণ করছে। আমাদের বিচারকগণ নিজেদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনগণের আস্থা হারিয়ে ফেলেছেন। আমাদের সংসদ অদূরদর্শী, অযোগ্য, দুর্নীতিবাজ ও অভদ্র ব্যক্তিতে পরিপূর্ণ হয়ে মাছের বাজারে পরিণত হয়েছে। আমাদের বুদ্ধিজীবীরা নিজেদের মস্তক সাম্রাজ্যবাদীদের নিকট বিক্রি করে দিয়েছেন। আমাদের ব্যবসায়ীরা রাজনীতিতে প্রবেশ করে রাজনীতিকে ব্যবসা-সফল করতে দেশের স্বার্থ জলাঞ্জলি দিতে কুণ্ঠিত নন। দেশ না থাকলে যে ব্যবসা ও সম্পদ রক্ষা করা যাবে না সেকথা চিন্তা করার সময় বা যোগ্যতা তাদের নেই। আমাদের ধর্মনেতারা জিহাদ ভুলে গেছেন। তারা জালেম শাসককে আল্লাহর চেয়ে অধিক ভয় করে এবং ধর্মকে রুটি-রোজগারের মাধ্যমে পরিণত করেছে। এ জন্যই জাতীয় সংসদ প্রকাশ্যে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর আস্থা ও বিশ্বাস’ মুছে দেওয়ার প্রকাশ্য কুফরী ঘোষণা দেওয়ার পরও আমাদের ধর্ম নেতাদের মধ্যে লক্ষ্যণীয় কোনো প্রতিবাদ নেই। এরূপ অবস্থায় স্বাধীন থাকার সকল যোগ্যতা হারিয়ে আমরা সর্বহারায় পরিণত হয়েছি। ফলে ১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালে আমাদের পূর্বপুরুষগণ যে কারণে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলেন, ১৯৭১ সালে আমরা যে অধিকারের দাবিতে লড়াই-সংগ্রাম করেছিলাম বর্তমান পরিস্থিতি তার চেয়ে অধিক ভয়াবহ হওয়ার পরও আমরা প্রতিবাদ পর্যন্ত করছি না।
জাতীয় মানস বিভ্রান্ত ও নিস্তেজ হওয়ার কারণসমূহ
১. অস্তিত্বের মূল কারণ অস্বীকার করা :
আমাদের বর্তমান ভূখণ্ডটি দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালের স্বাধীনতা সূত্রে পাওয়া সত্ত্বেও আমরা ১৯৪৭কে ভুলে গেছি। ফলে ১৭৫৭-১৯৪৭ সময়কালের বন্ধুদের বন্ধুত্ব, শত্রুদের শত্রুতা, আমরা ভুলে গেছি। শত্রুদের শত্রুতা ভুলে গিয়ে আমাদের জাতশত্রু-স্বাধীনতার শত্রুকে বুকে টেনে নিয়ে আমরা আত্মহত্যা করেছি।
২. মিথ্যা বিকৃত ও খণ্ডিত ইতিহাস রচনা ও শিক্ষাদান :
বিগত ৬৪ বছর যাবত আমরা ইঙ্গ-হিন্দু রচিত মিথ্যা ইতিহাস, বিকৃত ও খণ্ডিত ইতিহাস পড়ছি। সরকারের তরফ থেকে কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে ইঙ্গ-হিন্দু রচিত উদ্দেশ্যমূলক ইতিহাসের মিথ্যা জঞ্জাল অপসারণের উদ্যোগ নেয়া হয়নি। আমাদের পেশাদার ঐতিহাসিকগণ অনুবাদের মাধ্যমে মিথ্যা ইতিহাসের প্রসার ঘটিয়েছেন কিন্তু সঠিক ইতিহাস অনুসন্ধান করে তা পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করেননি। ফলে মিথ্যা ও ভেজালের উপর আমাদের জাতীয় মানস গঠিত হয়েছে। বর্তমানে আরও একটি উপসর্গ এতে যুক্ত হয়েছে, আর তা হলো শাসক দলের ইচ্ছানুযায়ী ইতিহাস পরিবর্তন করা। ফলে জাতি আজ বিভ্রান্ত ওবহুধাবিভক্ত।
৩. যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা চালু না করা :
আমরা বিগত ৬৪ বছরেও জাতির জন্য কোনো বাস্তবধর্মী, যুগোপযোগী ও
প্রাগ্রসর চিন্তার শিক্ষা ব্যবস্থা চালু করতে সক্ষম হইনি।ঔপনিবেশিক আমলের শিক্ষা ব্যবস্থার অনুকরণ ও সাম্রাজ্যবাদী প্রেসক্রিপশন অনুযায়ী শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমে আমরা জাতিকে সাম্রাজ্যবাদী ফাঁদে আটকে ফেলেছি। ঔপনিবেশিক শিক্ষা ব্যবস্থা ও সাম্রাজ্যবাদ নির্দেশিত শিক্ষা ব্যবস্থা যে স্বনির্ভর দেশ ও জাতিগঠনের অন্তরায় এবং স্বাধীন মানস গঠনের প্রতিবন্ধক তা চিন্তা করার সময়, সুযোগ ও যোগ্যতা আমাদের তথাকথিত নেতৃবৃন্দের নেই।
৪. ধর্ম, ইতিহাস/সাহিত্য/রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞান শিক্ষাকে
গুরুত্ব না দেয়া :
আমাদের জাতীয় নেতৃবৃন্দ ও শিক্ষাবিদগণ সঠিক ইতিহাস পাঠের গুরুত্ব, ধর্মজ্ঞানের গুরুত্ব, জাতির মানস গঠনোপযোগী কবিতা, সাহিত্য, নাটক, সিনেমা রচনা ও প্রদর্শনের গুরুত্ব, সঠিক রাজনীতি শিক্ষার গুরুত্ব ও সমাজেরগতিপ্রকৃতি নির্ধারণে সমাজবিজ্ঞান পাঠের গুরুত্ব সম্যক উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছেন, উদাসীন থেকেছেন অথবা অদৃশ্য কারণে অবহেলা করেছেন। ফলে স্বাধীন দেশের উপযোগী নাগরিক সৃষ্টিতে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যর্থ হয়েছে। তদুপরি উপরোক্ত ৫টি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষার্থীরা ব্যবহারিক জীবনে সীমাহীন অবহেলার শিকার হয়। ফলে মেধাবীরা উক্ত বিষয় থেকে দূরে থাকে। অথচ ধর্ম, ইতিহাস, সাহিত্য, রাজনীতি ও সমাজ বিজ্ঞানের সঠিক জ্ঞান ব্যতীত অন্যান্য বিষয়ে শিক্ষিত ব্যক্তিরা স্ব স্ব বিষয়ে কর্মসম্পাদনের রোবট ব্যতীত অন্য কিছু নয়। আমাদের বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসমূহের অবস্থা আরও করুণ। এসব প্রতিষ্ঠান শিক্ষাদান অপেক্ষা শিক্ষা ব্যবসাকে গুরুত্ব দিয়েছে এবং নিজেদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে এসব বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত করেনি।ফলে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে কিছু রোবট তৈরি হচ্ছে, দেশপ্রেমিক সুনাগরিক তৈরি হচ্ছে না। দেশপ্রেমিক নাগরিক সৃষ্টিতে উক্ত ৫টি বিষয় অপরিহার্য। সর্বনাশের এখানেই শেষ নয়। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ও সিলেবাসকে যুগোপযোগী করা হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা আধুনিক ও প্রাগ্রসর যুগের চাহিদা মেটাতে ব্যর্থ। একটি মাত্র উদাহরণ দিলে বিষয়টি সুস্পষ্ট হবে। উদাহরণটি হলো- আমাদের স্নাতক পর্যায়ের রাজনীতি বিজ্ঞানে রয়েছে, “মার্কিন প্রেসিডেন্ট পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী ব্যক্তি।” অথচ বাস্তব জ্ঞানের অধিকারীরা জানেন,“মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ইহুদী লবির পুতুল মাত্র। এই দুই শক্তির অনুমোদন ব্যতীত মার্কিন প্রেসিডেন্ট ক্ষমতা প্রয়োগে অক্ষম।” এমতাবস্থায় আমাদের শিক্ষার্থীরা ভুল ও অনুপযোগী শিক্ষা লাভ করে জাতির বোঝায় পরিণত হচ্ছে। আমাদের রাজনীতি বিজ্ঞানের ছাত্ররা বিশ্বব্যাপী সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তারকারী ইহুদী ষড়যন্ত্র ‘Protocol of the Elders of the Zion.’, মনরো ডকট্রিন, আইসেন হাওয়ার ডকট্রিন, ইন্ডিয়া ডকট্রিন সম্পর্কে জানে না এমনকি অনেকে এ সকল শব্দ সম্পর্কেও অজ্ঞ। এমতাবস্থায় সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত সম্পর্কে তারা নিজেরাও জানে না, জাতিকে সজাগ করবে কিভাবে? আমাদের রাজনীতিকদের অবস্থাও একইরূপ। ফলে সাম্রাজ্যবাদ আমাদের চতুর্দিকে কঠিন বেষ্টনী তৈরি করার পরও জাতি হিসেবে আমরা বেখবর ও নীরব দর্শক।
১৭৫৭ ও বর্তমান অবস্থা একই হলেও পরিণাম ভিন্ন হবে-
১/১১’র পর পর বিভিন্ন বক্তৃতায় ও প্রবন্ধে আমি ১/১১কে পলাশী চক্রান্তের পুনরাবৃত্তি ও মইন-উ-আহমদকে হিডেন মীরজাফর আখ্যা দিয়েছিলাম। কিন্তু তখন অনেকে আমার কথা বিশ্বাস করেননি।মাত্র কয়েক বছর পরেই এ দেশের প্রায় সবাই চলমান ঘটনাবলীকে পলাশী ষড়যন্ত্র বলা শুরু করেছেন। বাস্তবে যে সকল শক্তি মুসলমানদের হাত থেকে ভারতবর্ষের সিংহাসন কেড়ে নেয়ার জন্য ১৭৫৭ সালের পলাশী ষড়যন্ত্রের বাস্তবায়ন করেছিল একই শক্তির উত্তরসূরিরা ২০০৭ সালে ১/১১ ষড়যন্ত্র করেছে মুসলমানদের হাত থেকে বাংলাদেশের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে ইসলামবিদ্বেষী মুসলমান নামধারী ও হিন্দুদেরকে ক্ষমতাসীন করার জন্য। তারা আপাতত সফল হলেও দীর্ঘমেয়াদে বা চূড়ান্ত পর্যায়ে তাদের বর্তমান চক্রান্ত ব্যর্থ হবে। এর কারণ এই যে, ১৭৫৭ সময়কালে বিশ্বব্যাপী মুসলিম শক্তির পতনের সূচনা হয়েছিল, মুসলমানরা বিভিন্ন কুসংস্কারে নিমজ্জিত হয়ে নিজেদের স্বকীয়তা হারিয়েছিল এবং যোগাযোগ ব্যবস্থার অপ্রতুলতায় এক দেশের মুসলমানদের বিপদে অন্য দেশের মুসলমানরা সহযোগিতা করতে সক্ষম ছিল না। তদুপরি ১৭৫৭ সালের ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি ও ইউরোপীয় শক্তি ছিল উদীয়মান শক্তি; পক্ষান্তরে বর্তমান সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমেরিকা, ইসরাইল ও ইইউ ক্ষয়িষ্ণু শক্তি। আফগান, ইরাক ও ফিলিস্তিনের রণাঙ্গনে তারা পরাজিত হয়েছে। অন্য কোনো রণাঙ্গনেও তাদের বিজয়ের আশা ক্ষীণ। বরঞ্চ যুদ্ধের ব্যয় মেটাতে গিয়ে তাদেরকে সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের ভাগ্য বরণ করতে হবে। এমতাবস্থায় পতনোম্মুখ সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বর্তমান দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতকে তার বর্তমান মিত্রদের ভাগ্য বরণ করতে হবে।পক্ষান্তরে বিশ্বব্যাপী মুসলিম শক্তি এখন উদীয়মান।আফগানিস্তানে, ইরাকে, ফিলিস্তিনে, লেবাননে তারা বিশ্বশক্তিকে হারিয়ে নিজেদের সামর্থ ও যোগ্যতার পরিচয় দিয়েছে। তিউনিশিয়া ও মিশরে সাম্রাজ্যবাদের দালাল সরকার উৎখাতে সক্ষম হয়েছে।পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহৎ শক্তি হয়েও ক্ষুদ্র চেচেন মুসলিম জাতির নিকট রাশিয়া অদ্যাবধি নাকানি-চুবানি খাচ্ছে। সর্বক্ষেত্রেই দেখা যাচ্ছে, সঠিক নেতৃত্বের আহ্বানে মুসলিম যুবকরা পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত হতে এসে জড়ো হয়ে সাম্রাজ্যবাদীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। মুসলমানদের বর্তমান বিশ্বভ্রাতৃত্ব বোধের নিকট পৃথিবীর অপরাপর আগ্রাসী জাতিসমূহ পরাজিত হতে বাধ্য। সুতরাং ১৭৫৭ সালে ষড়যন্ত্রকারীরা যা করতে পেরেছিল, বর্তমানে তা করা সম্ভব নয়। বরং বর্তমানে সাম্রাজ্যবাদীরা যা করতে চাইছে তার পরিণাম তাদের জন্য বুমেরাং হবে। পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম মুসলিম দেশে আগ্রাসন পরিচালনা করলে পেন্ডোরার বাক্স খুলে যাবে, কোটি কোটি মুজাহিদ তৈরি হবে, বর্তমান নেতৃত্ব  ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হবে এবং নতুন নেতৃত্ব জাতিকে সংগঠিত করে আগ্রাসী শক্তির শক্তিকেন্দ্রে আঘাত হেনে চুরমার করে দেবে। সমগ্র ভারতে আমরা পুনরায় স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন করব। ভারতবর্ষের নির্যাতিত, নিপীড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত মুসলমান, হরিজন ও দলিত জনগোষ্ঠী আমাদের স্বাগত জানাবে।
চট্টগ্রাম, ২৪ জুন ২০১১
সম্পাদক মাসিক ইতিহাস অন্বেষা
০১৭১১৭২০৯২৩

কাঠুরিয়ার সুন্দরী কন্যা এবং বাংলার সিংহাসন(প্রথম প্রকাশ অক্টোবর সংখ্যা ২০১১)



দৃশ্যপট-১
মহাজ্ঞানী ঈশপের গল্প দিয়েই শুরু করছি। গল্পটি হলো- বনে বাস করত এক কাঠুরিয়া, তার ছিল এক অপরূপ সুন্দরী কন্যা। পার্শ্ববর্তী জঙ্গলে বাস করত এক বাঘ। এক সময় কাঠুরিয়ার সুন্দরী কন্যাকে বিয়ে করার লোভ জাগলো তার মনে। একদিন সে ভালো সাজার ভান করে কাঠুরিয়ার দুয়ারে এসে কাঠুরিয়ার সুন্দরী কন্যার পাণিপ্রার্থী হলো। কাঠুরিয়া দেখল- হিংস্র বাঘকে না করলে প্রাণহানির শঙ্কা রয়েছে। এমতাবস্থায় সে মনে মনে বুদ্ধি এঁটে বাঘকে বলল- তোমার নিকট আমার মেয়েকে বিয়ে দিতে কোনো আপত্তি নেই তবে আমার মেয়ে তোমার তীক্ষ্ণ  দাঁত ও ধারালো নখকে ভয় করে। তুমি যদি তোমার দাঁত ও নখকে ফেলে দাও তবে আমি আমার মেয়েকে তোমার হাতে তুলে দিব। লোভী ও অপরিণামদর্শী বাঘ কালবিলম্ব না করে নিকটস্থ পাথুরে পাহাড়ে গিয়ে নিজের প্রধান ২টি অস্ত্র দাঁত ও নখকে পাথরের সাথে আঘাত করে করে উপড়ে ফেলে কাঠুরিয়ার মেয়ের পছন্দসই অবয়বে কাঠুরিয়ার বাড়িতে এসে কাঠুরিয়াকে বলল- “আব্বাজান, আপনার কথামতো আমি আমার দাঁত ও নখকে উপড়ে ফেলেছি। সুতরাং এখন আপনার মেয়েকে আমার হাতে তুলে দিন।” কাঠুরিয়া ঘরের ভিতরে ঢুকে মস্ত বড় এক কুঠার নিয়ে বেরিয়ে এসে বাঘের উপর হামলা করল। দন্ত-নখরহীন বোকা বাঘ অল্পক্ষণের মধ্যেই ভবলীলা সাঙ্গ করল।


দৃশ্যপট-২
১৭৫৭ সালে শুধুমাত্র সিংহাসনের লোভে বোকা লোভী ও অদূরদর্শী মীরজাফর দেশপ্রেমিক সিরাজকে অপসারণ ও হত্যা করে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসন দখল করে। সিংহাসন দখলের পর কাঠুরিয়ারূপী ইঙ্গ-হিন্দু চক্রান্তকারীদের পরামর্শে ও সহযোগিতায় সিরাজের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী ভেঙে দেয় এবং অন্যান্য দেশপ্রেমিকদের হত্যা-বন্দী ও বিতাড়ন করে ইঙ্গ-হিন্দুদের পুতুলে পরিণত হয়। নিজ সম্প্রদায়কে নিঃশেষ করে, নিজ জনগণকে নির্যাতন করে জনগণের আস্থা হারায়।এমতাবস্থায় তার সহযোগী ও কন্যা জামাতা মীর কাশিম ইংরেজদেরকে প্রচুর ঘুষ দিয়ে এবং হুগলি ও চট্টগ্রাম বন্দর দেওয়ার গোপন ওয়াদা করে শ্বশুরের স্থলে নিজে সিংহাসনে আরোহণ করেন। কাজ সমাধা হওয়ায় ইংরেজরা বিশ্বাসঘাতক মীরজাফরকে টয়লেট পেপারের মতো ছুড়ে ফেলে দেয়।১৭৬০ সালে তথাকথিত নবাব মীর কাশিম ক্ষমতাসীন হয়ে গোপন ওয়াদা মোতাবেক চট্টগ্রাম ও হুগলি বন্দর ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়। চট্টগ্রামের দখল বুঝে নেওয়ার পর ইংরেজরা দেখল- চট্টগ্রাম শহরের পাঠানটুলির পাঠানগণ ইংরেজদের অধীনতা মেনে নিতে রাজি নয়। এমনকি পাঠানদের এলাকায় কোনো ইংরেজ ঘোড়ার পিঠে আরোহণ করে পথ চলতেও সক্ষম ছিল না। পাঠানদের এলাকা অতিক্রম করার সময় তাদেরকে ঘোড়া থেকে নেমে পায়ে হেঁটে চলতে হতো। ২-৩ বছর পর চট্টগ্রামের ইংরেজ শাসক অত্যন্ত বিনয়ের সাথে পাঠানদেরকে তাদের বড়দিনের উৎসবের ভোজসভায় দাওয়াত করে। সকল পাঠান পুরুষ উক্ত ভোজসভায় অংশ নিতে চট্টগ্রামের চকবাজারস্থ প্যারেড ময়দানে স্থাপিত প্যান্ডেলে যায়। পাঠানরা প্যান্ডেলে ঢুকতেই ইংরেজদের বাবুর্চি, খানসামা, টেবিল বয়রা দিগ¦বিদিক ছুটোছুটি করে পালিয়ে যায়। ইংরেজ কর্তৃপক্ষ তখন পাঠানদেরকে জানায়, আপনাদেরকে সশস্ত্র অবস্থায় দেখে আমার কর্মচারীরা ভয়ে পালিয়েছে। আপনারা যদি আপনাদের সাথে থাকা অস্ত্রশস্ত্র প্যান্ডেলের বাইরে রিসিপশনে জমা রাখেন তবে বাধিত হবো। পাঠানরা সরল মনে নিজেদের অস্ত্রশস্ত্র রিসিপশনে জমা রেখে প্যান্ডেলের ভিতর প্রবেশ করে। পর মুহূর্তেই ইংরেজ সেনারা নিরস্ত্র পাঠানদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রত্যেককে নৃশংসভাবে হত্যা করে। একই সময়ে তাদের বসতবাড়ি পাঠানটুলিতেও অপর একদল ইংরেজ সেনা হামলা করে নারী-শিশু-বৃদ্ধ নির্বিশেষে সবাইকে হত্যা করে। এতদসত্ত্বেও এক গর্ভবতী পাঠান গৃহবধূ পালিয়ে হাটহাজারীগিয়ে আত্মগোপন করে। তাঁর গর্ভে একপুত্রসন্তান জন্ম নেয়। বর্তমান পাঠানটুলিরপাঠানগণ উক্ত সন্তানের ওলি-ওয়ারিশ।


দৃশ্যপট-৩
দীর্ঘ ১৯০ বছর আমাদের পূর্ব পুরুষগণ ইঙ্গ-হিন্দু ষড়যন্ত্রকারীদের শাসন শোষণ  ও আক্রমনে আহত নিহত পঙ্গু ও দীপান্তরিত হয়ে বিশাল ভারতের দুই প্রান্তে দুই ভূখণ্ডের  মালিকানা অর্জনকরে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে ১৯৪৭ সালের ১৪ই আগস্ট। সাম্রাজ্যবাদী ব্রিটেনের দোসর ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারতীয় শাসকগণ কখনো আমাদের উক্ত স্বাধীনতাকে মেনে নেয়নি।মুসলমানদের অবিসংবাদিত নেতা কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহকে ১৫ই আগস্ট ১৯৪৭ সালেই হত্যা করার প্রস্তুতি গ্রহণ করে। মি. জিন্নাহ ও লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন পূর্বাহ্নেই বিষয়টি জানতে পারায় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেন। ফলে কোনো অনাকাংখিত ঘটনা ছাড়াই মি. জিন্নাহ পাকিস্তান রাষ্ট্রের প্রথম গভর্নর জেনারেল হিসেবে অধিষ্ঠিত হন। এরপর শুরু হয় নতুন নিয়মে পুরাতন খেলা। নবপ্রতিষ্ঠিত পাকিস্তানের শুরু থেকে ব্রাহ্মণ্যবাদী ভারত কিছু সংখ্যক অর্থ ও ক্ষমতালোভী পাকিস্তানীদের দিয়ে রাজনৈতিক দল গঠন করে। উক্ত রাজনৈতিক দলটি ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের এদেশীয় সদস্যদেরকে নিজেদের দলে আত্মীয়করণ করে।মুসলিম স্বার্থের রক্ষাকবচ পৃথক নির্বাচন ব্যবস্থা তুলে দেয়া হয়।এরপর শুরু হয় পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল ও দুর্বল করে টুকরো করার খেলা। কাঠুরিয়া যেভাবে সুন্দরী মেয়ের লোভ দেখিয়ে বাঘকে শক্তিহীন করেছিল ঠিক তদ্রুপ ব্রাহ্মণ্যবাদী শক্তি এ দলটিকে বাংলার সিংহাসনের লোভ দেখিয়ে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য ধ্বংস করার কাজে লাগায়। এদের কারণেই সংসদে স্পিকার নিহত হয়, এর অজুহাতে সেনাশাসক আইয়ুব খান ক্ষমতা দখল করে। এ দলটি সূচনালগ্ন থেকেই দ্বিমুখী আচরণে অভ্যস্ত। এরা দিনের বেলায় সামরিক শাসনবিরোধী বক্তৃতা দিত আর রাতের আঁধারে সামরিক শাসক আইয়ুব খান ও ইয়াহিয়া খানকে সাহায্য করত। এ দলটিই এরশাদের ক্ষমতা দখলকে অভিনন্দন জানিয়েছে, জেনারেল নাসিমকে ক্ষমতা দখলে উস্কানি দিয়েছে এবং জেনারেল মইন উ আহমদকে দিয়ে ১/১১-এর মাধ্যমে এ দেশকে সাম্রাজ্যবাদের পদতলে বলি দেয়ার আয়োজন করেছে এবং বাংলার সিংহাসনে আসীন হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। তাদের লক্ষ্য সিংহাসন- দেশ ও জনগণ নয়।
<b>দৃশ্যপট-৪</b> ১৯৭১ সালে বাংলার সিংহাসনের লোভ দেখিয়ে পাকিস্তান ভাঙা হলো। পূর্ব পাকিস্তান হলো বাংলাদেশ। পাকিস্তানের ২৪ বছরে অর্জিত সম্পদ ভারতে পাচার হয়ে গেল। দেশব্যাপী দুর্ভিক্ষ ও অরাজকতায় লক্ষ লক্ষ লোক আহত নিহত ও পঙ্গু হলো। নতুন দেশকে ৭ দফার রশি ও ২৫ দফার রশি দিয়ে শক্ত করে বেঁধে ফেলা হলো। সিংহাসন লোভী শাসনকর্তাকে পরামর্শ দেয়া হলো- কাশ্মীরের ফারুক আব্দুল্লাহর মতো বংশানুক্রমিক ক্ষমতায় থাকতে চাইলে তোমার আমার বিরোধী শক্তিকে উপড়ে ফেলতে হবে। তবেই তোমার আমার বন্ধুত্ব ও মিত্রতা ষোলকলায় পূর্ণ হবে। দেশপ্রেমিক বাঘদের দন্ত-নখর উপড়ে ফেলার জন্য রক্ষীবাহিনী গঠন করে হাজার হাজার দেশপ্রেমিককে হত্যা-নির্যাতন বন্দি করা হলো। দেশ শক্তিহীন ও মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হলো। কোনোমতে প্রাণটি টিকে রইল।
<b>দৃশ্যপট-৫</b>
২৪ বছরে পাকিস্তান ভাঙা সম্ভব হলেও ৩৪ বছরেও বাংলার বাঘদের দমন করা গেল না। তদুপরি ২০০১ সালে পুনরায় বাঘকুল ক্ষমতাসীন হলো। চানক্যবাদীরা মহা ফাঁপরে পড়ল। তারা দেখল এ চীজ একা হজমযোগ্য নয়। সুতরাং ১৭৫৭-এর পলাশী থেরাপী প্রয়োগ করা হলো। ইউরোপ-আমেরিকা-ইসরাইল-অস্ট্রেলিয়াকে দলে ভিড়ান হলো। অর্থ ও সিংহাসনলোভী দলটিকে বিপুল অর্থ দিয়ে বলা হলো-তোমার দেশের দাঁত উপড়ে ফেলতে পারলে তোমাকে সিংহাসন দেয়া হবে। সিংহাসন পাওয়ার পর তোমার দেশের নখসমূহ উপড়ে ফেলতে হবে এবং ১৭৬০ সালে মীর কাশিম যেভাবে সড়ক-বন্দর-বাণিজ্য ইংরেজদের প্রদান করেছিল তেমনি আমাকে উক্ত বস্তুসমূহ প্রদান করতে হবে। তবেই তুমি সিংহাসনে চিরস্থায়ী হতে পারবে এবং তোমার-আমার বন্ধুত্ব ষোলকলায় পূর্ণ হবে।বলাবাহুল্য ২০০৬ সাল পর্যন্ত আমাদের ৩টি শক্তিশালী দাঁত ছিল এবং বেশ কয়েকটি ধারালো নখর ছিল। উক্ত দাঁতসমূহ হলো আমাদের সেনাবাহিনী, সংবিধান ও নিরপেক্ষ বিচার বিভাগ। আর নখরসমূহ হলো- আমাদের জাতির সাহসী, সৎ ও অভিজ্ঞ রাজনীতিকগণ।বর্তমানে আমাদের দাঁতসমূহ উপড়ে ফেলা হয়েছে আর নখরসমূহ বন্দি-আহত এবং নির্বাসনে। এমতাবস্থায় কাঠুরিয়ার হস্তে নিহত হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র।


সিংহাসনের স্বপ্ন এবং রাজনীতির শবযাত্রা
বাংলাদেশের রাজনীতি এখন প্রধানত ৪টি টিমে বিভক্ত। প্রমটি ‘এ’ টিম, ২য়টি ‘বি’ টিম, তৃতীয়টি জে-১ টিম, ৪র্থটি জে-২ টিম। উক্ত ৪টি টিমের কার্যকলাপে দেশ ও দেশের রাজনীতি বর্তমানে শ্মশানে মুখাগ্নির অপেক্ষায় অপেক্ষমান। দেশের জনগণ শোকাহত ও নীরব শবযাত্রী। এ-টিম বংশানুক্রমে সিংহাসন ধরে রাখার স্বপ্নে বিভোর, বি টিম নিকট ভবিষ্যতে সিংহাসন পাওয়ার খোয়াব দেখছে এবং জে-১ টিম সিংহাসনের আশপাশে স্থান পাওয়ার দিবাস্বপ্ন দেখছে আর জে-২ টিমকে অতীতের দুঃস্বপ্ন তাড়া করছে। প্রত্যেকের কার্যকলাপ ব্যক্তি ও দলকেন্দ্রিক দেশ ও জনগণকেন্দ্রিক নয়। প্রত্যেক টিমের বর্তমান কার্যকলাপ নিম্নরূপ :


এ-টিম : এই টিমটি জন্মলগ্ন থেকেই সাম্রাজ্যবাদী শক্তির আশীর্বাদপুষ্ট। এই টিমটি সূচনালগড়ব থেকেই অর্থ ও ক্ষমতালোভী নীতি-নৈতিকতাহীন ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠিত। সাম্রাজ্যবাদীরা বিগত ৬০ বছর যাবত দলটিকে গোপনে ও প্রকাশ্যে সহায়তা দিয়ে দেশে অরাজকতা, বিশৃঙ্খলা, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দুর্নীতি, অন্যায়-অপকর্মের বিস্তার ঘটিয়ে বর্তমানে দেশকে অস্তিত্বের সংকটে নিমজ্জিত করেছে। এ দলটির দ্বারা দেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা, উনড়বয়ন, সমৃদ্ধি, মর্যাদা ও প্রতিরক্ষা সামর্থ ধ্বংস করা হয়েছে। <b>যা কিছু দেশের জন্য উত্তম এরা তার বিরুদ্ধাচরণ করে ও আক্রমন করে ধ্বংস করে। বর্তমানে এদের চতুর্মুখী আক্রমনে দেশের বিচার ব্যবস্থা, সংবিধান, প্রশাসন, সেনাবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশ বাহিনী ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে উপনীত হয়েছে। এ দলের রাজনীতিক, মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, অধ্যাপক, ডাক্তার, কবিরাজ, শিক্ষক, ছাত্র, আমলা, পুলিশ, সেনাকর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের চরিত্রের মধ্যে ও আচরণের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। এরা প্রত্যেকেই স্ব-স্ব পেশার লোকদেরকে ভীতসন্ত্রস্ত ও আতঙ্কিত করে দেশের সর্বনাশ সাধন করছে। এদের অন্যায় কার্যকলাপে দেশের ও সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও সমৃদ্ধি অপসৃত।
দেশের সীমান্ত ও সার্বভৌমত্ব অপসৃত প্রায়।</b> এ দলটি বর্তমানে নিজেদের ক্ষমতাকে চিরস্থায়ী করার স্বপ্নে বিভোর। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি তাদেরকে চিরস্থায়ীভাবে সিংহাসন দখলে রাখার খোয়াব দেখাচ্ছে। ফলে সাম্রাজ্যবাদের গোপন ইশারায় এরা দেশের প্রতিরোধ সামর্থকে, সৎ যোগ্য দেশপ্রেমিক ব্যক্তি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থাকে ধ্বংস করার কাজে লিপ্ত রয়েছে। লোভী ও বোকা বাঘ যেভাবে নিজের প্রতিরক্ষা সামর্থ্য দাঁত ও নখকে উপড়ে ফেলে কাঠুরিয়ার কুঠারের খাদ্যে পরিণত হয়েছিল এরাও তদ্রুপ নিজ দেশের সামর্থ্য ও সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে বোকা বাঘের পরিণতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।


বি-টিম : এই টিমটির জন্ম হয়েছিল ‘এ’ টিমের দেশবিরোধী কার্যকলাপের প্রতিবাদের মাধ্যমে। এ টিমের প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন দেশপ্রেমিক, সৎ ও দূরদর্শী ব্যক্তিত্ব। তাঁর অবর্তমানে যারা এ দলের হাল ধরেছেন তারা প্রতিষ্ঠাতার নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন দেশের মানুষের ভালোবাসা পেয়েছিল। কিন্তু বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, এ দলের নেতাকর্মী বা শীর্ষ ব্যক্তিদের মাঝেও প্রতিষ্ঠাতার চরিত্র, আদর্শ ও দূরদর্শীতা নেই। প্রতিষ্ঠাতার আদর্শের কথা বলে এরা গর্ব করে কিন্তু আদর্শ কি ছিল- আপনাদের সাথে উক্ত আদর্শের বাস্তব সম্পর্ক আছে কি-না প্রশ্ন করলে এদের বলার মতো কিছু থাকে না। এমতাবস্থায় জনগণের দৃষ্টিতে এরা দেউলিয়াপ্রায়। জনগণ দেখছে এরা ব্যক্তি ও পরিবারের স্বার্থকে দেশের স্বার্থের চেয়ে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছে। তাদের চোখের সামনে ‘এ’ টিম দেশের সকল সম্পদ ও সম্ভাবনা সাম্রাজ্যবাদের নিকট তুলে দিচ্ছে দেখেও এরা নিশ্চুপ। সম্ভবত এরা এই খোয়াব দেখছে যে, সাম্রাজ্যবাদ যেভাবে এ টিমকে বাংলার সিংহাসন পাইয়ে দিয়েছে তদ্রুপ তাদেরকেও অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সিংহাসনটি পাইয়ে দেবে। তারা একবারও চিন্তা করছে না যে- সাম্রাজ্যবাদের পুতুল হয়ে সিংহাসন পেলেও ক্ষমতা পাওয়া যায় না, রাজ্য পেলেও রাজত্ব করা যায় না, দেশ ও জনগণের উনড়বতি করা যায় না।‘বি’ টিমের প্রতিষ্ঠাতা দেশের সকল সেক্টর থেকে, দল থেকে দেশপ্রেমিকদের জড়ো করে দল গঠন করেছিলেন, দলের নেতাকর্মীদের আদর্শের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে দলকে ও দেশকে সুদৃঢ় ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু বর্তমান নেতৃত্ব বাছবিচারহীনভাবে  দল বড় করেছেন, টাকার বিনিময়ে নমিনেশন ও দলীয় পদবি বিক্রি করে দলকে অস্ট্রেলিয়ান গাভীর ন্যায় বড় করেছে কিন্তু শক্তিশালী করার পরিবর্তে দুর্বল করেছেন। এ দলের বর্তমান নেতৃত্ব সাম্রাজ্যবাদের আশীর্বাদপুষ্ট ব্যক্তিদেরকে নিজের চারপাশে দেখতে পছন্দ করেন- স্বাধীনচেতা-দূরদর্শী ও যোগ্য নেতৃবৃন্দকে বৃত্তের বাইরে রাখতে পছন্দ করেন। বি টিমের বর্তমান নেতৃত্ব স্বজনপ্রীতিআত্ম ীয়করণ আঞ্চলিকীকরণের মাধ্যমে দলকে ও দেশকে দন্ত-নখরহীন বাঘে পরিণত করেছেন। ফলে এ দলটি বর্তমানে বাঘের মতো হুংকার দিতে পারলেও শিকার করতে পারে না।


জে-১ টিম : ‘এ’ টিম নিজ দেশে জনপ্রিয়তা হারিয়ে বিপর্যস্ত হলে একই সাম্রাজ্যবাদী শক্তি জে-১ টিম গঠন করে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও জে-১ টিম এর সহযোগিতায় ‘এ’ টিম শক্তিশালী হলে জে-১ টিম পরিত্যক্ত হয়। তখন থেকে এই টিমটি নীতি-নৈতিকতা বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার আশপাশে থাকার প্রচেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে। দেশ, দেশের জনগণ ও দেশের স্বার্থ এ দলের বিবেচনার মধ্যে আছে বলে মনে হয় না। এ দলের প্রধানের চরিত্র ও আদর্শ তরল পদার্থের ন্যায়- যখন যে পাত্রে রাখা হয় তখন সে পাত্রের আকার ও রং ধারণ করে। দেশের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখা এ দলের নিকট থেকে আশা করা যায় না।


জে-২ টিম : এটি বাংলাদেশের আদর্শিক টিম হিসেবে পরিচিত। এদের কর্মসূচি কর্মপদ্ধতিতে আদর্শিক ছাপ রয়েছে কিন্তু আদর্শের পরিপূর্ণ বিকাশ নেই। এরা আল্লাহ সর্বশক্তিমান বলে প্রচার করে কিন্তু সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ ও অবিচল আস্থাসমৃদ্ধ কার্যক্রম এরা গ্রহণ করে না। এরা সর্বদাই অপরের উপর নির্ভরশীল হয়ে লতার মতো বাঁচতে চায়। নিজের পায়ে দাঁড়াবার মতো সাহস হিম্মত ঈমানী দৃঢ়তা এদের মধ্যে দেখা যায় না। ঈমানী চেতনা সম্পন্ন জিহাদী বক্তৃতায় এরা পারদর্শী কিন্তু বাস্তব জিহাদ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে সদাসর্বদা তৎপর। সকল ক্ষেত্রে এরা হিকমত অবলম্বনের কথা বলে। হিকমত করতে করতে এরা নিজেদের দলকে ঢোঁড়া সাপের মতো নির্বিষ করে ফেলেছে, পিছাতে পিছাতে নিজেদেরকে ব্ল্যাকহোলের মুখে এনে দাঁড় করিয়েছে। দেশের স্বার্থে এগিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত তারা নেয় কিন্তু নিজেরা সম্মুখ সারিতে থাকতে রাজি নয়। সৎ যোগ্য দূরদর্শী সাহসী লোককে এরা পছন্দ করে কিন্তু নিজ দলের গুরুত্বপূর্ণ পদে এ ধরনের লোককে সম্পৃক্ত করতে এরা দ্বিধাগ্রস্ত। এখানেও নাকি তাদের কায়েমী স্বার্থ রক্ষার হিকমত ক্রিয়াশীল। এ দলের বিভিন্ন ইউনিটের দায়িত্বশীলদের দেখলে করুণা হয় এবং ছোটবেলায় পড়া সুকুমার রায়ের কবিতাটি মনে পড়ে যায়। কবিতাটি হলো-
“বাবুরাম সাপুড়ে
কোথা যাস বাপুরে
আয় বাবা দেখে যা
দুটো সাপ রেখে যা।
যে সাপের সিং নেই- চোখ নেই
ছোটে নাকো হাঁটে না- কাউকে যে কাটে না
করে নাকো ফোঁস ফাঁস- মারে নাকো ঢসুঁ ঢাস।
সেই সাপ জ্যান্ত- গোটা দুই আনতো,
তেরে মেরে ডাণ্ডা- করে দেব ঠাণ্ডা।”
 বিদ্যমান নেতা যৌক্তিক-অযৌক্তিক যা বলেন, তাই অবনত মস্তকে মেনে নেয়ার জন্যই নাকি তাদের এরূপ নির্বীষ সাপ পছন্দ। অথচ ইসলামের ২য় খলিফা হযরত উমর বলতেন- যখনই আমি কোনো অযৌক্তিক কথা বলব অথবা ভুল সিদ্ধান্ত নেব তখনই আপনারা (জনগণ) প্রকাশ্যে আমাকে সতর্ক করবেন এবং ভুল শুধরে দেবেন। এ শিক্ষার ফলেই একদিন হযরত উমর (রা.) মসজিদে খুতবা দিতে দাঁড়ালে এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বলেন-“আমরা সবাই যে পরিমাণ কাপড় বায়তুল মাল থেকে পেয়েছি আপনি তার দ্বিগুণ কাপড় কিভাবে পেলেন? আমার এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগে আপনি খুতবা শুরু করবেন না।” পক্ষান্তরে এ টিমের নেতার বক্তৃতা কোনো কর্মী যদি থামিয়ে দেয়ার দুঃসাহস করে তবে নির্ঘাত উক্ত কর্মীকে সাথে সাথে বহিষ্কার করা হবে। দুর্বল ও ভীরু সেনাপতির নেতৃত্বাধীন বিশাল সেনাবাহিনী যেরূপ দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ও স্বার্থ রক্ষায় অক্ষম- তদ্রুপ এই টিমের বর্তমান অবস্থা। এই টিমটির মানসিক অবস্থা এমন যে, তারা বাংলার সিংহাসনের আকাংখা স্বপ্নেও দেখে না। অতীতের দুঃস্বপ্ন তাদেরকে তাড়িয়ে ফিরছে। তারা বুলন্দ আওয়াজে এ সত্য কথাটি বলতে সক্ষম নয় যে, অতীতে আমরা দেশের অখণ্ডতার পক্ষে ছিলাম এই জন্য যে, দেশ খণ্ডিত হলে আমরা দুর্বল হয়ে পড়ব এবং সাম্রাজ্যবাদী শকুনের খাদ্যে পরিণত হবো। তদুপরি উক্ত অখণ্ড- দেশটি আমাদের মহান পূর্ব পুরুষদের ১৯০ বছরের রক্ত-ঘাম ও শ্রমের ফসল। দীর্ঘ ৪০ বছর পর আমাদের সন্দেহ ও আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হতে চলেছে। সুতরাং আমাদের অতীতের ভূমিকা সঠিক ছিল এবং দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব সমৃদ্ধি মর্যাদা ও অখণ্ডতার পক্ষে ছিল। উপরোক্ত আলোচনায় আমরা দেখতে পেলাম বাংলাদেশের রাজনীতিকদের ‘এ’ টিম বাংলার সিংহাসনে বংশানুক্রমিকভাবে অধিষ্ঠিত থাকার জন্য দেশের সকল সম্পদ ও সম্ভাবনাকে সাম্রাজ্যবাদী প্রভুদের পদতলে বলি দিচ্ছে এবং দেশের প্রতিরোধ শক্তিকে ধ্বংস করছে। ‘বি’ টিম নিকট ভবিষ্যতে সিংহাসন পাওয়ার লোভে ‘এ’ টিমের দেশবিরোধী কার্যকলাপের যথাযথ প্রতিবাদ/প্রতিরোধ করছে না, জে-১ টিম ক্ষমতার আশপাশে থেকে সুবিধা নেয়ার লোভে নিশ্চুপ রয়েছে এবং জে-২ টিমটি অতীতের দুঃস্বপেড়ব আতঙ্কিত হয়ে যথাযথ ভূমিকা পালন থেকে বিরত রয়েছে। এ জন্যই আমাদের সকলের চোখের সামনে মনমোহন সিং আমাদের জান কবজা করতে আসা সত্ত্বেও ঢাকা এবং সমগ্র দেশ ছিল নিরুত্তাপ ও নির্জীব। কোনো মিছিল সমাবেশ, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ এমনকি কোনো কালো পতাকা প্রদর্শিত হয়নি। উক্ত ৪টি টিমের অবহেলা, অদূরদর্শিতা ও অবিমৃশ্যকারীতায় আমাদের ছাত্র যুবসমাজ এখন নিষ্প্রাণ-নির্জীব ও নির্বীষ। অপরাজনীতি-অপসংস্কৃতি ও মাদক আমাদের তরুণ সমাজকে মরণঘুমে নিমজ্জিত করেছে।
প্রিয় পাঠকবৃন্দ, এই হলো আমাদের দেশের বর্তমান রাজনৈতিক ও সার্বিক অবস্থা। এমতাবস্থায় দেশ ও জনগণের স্বার্থ রক্ষায় সকল দলের দেশপ্রেমিকদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে একটি প্লাটফরম গঠন করতে হবে। ১৯৪৭ ও ১৯৭১ সালের স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আমাদেরকে মনে রাখতে হবে ধর্মীয় ঐক্যই আমাদেরকে ১৯৪৭ সালে এই ভূখণ্ডের মালিকানা প্রদান করেছিল। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধসম্পন্ন ও ইতিহাস সচেতন দেশপ্রেমিকদের ঐক্যই দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বকে পুনরুদ্ধার ও পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হবে।
সম্পাদক মাসিক ইতিহাস অন্বেষা
০১৭১১৭২০৯২৩
ঢাকা, ৭ সেপ্টেম্বর ২০১১

Wednesday, December 21, 2011

জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্রের গডফাদারগণ(প্রথম প্রকাশঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা,মে ২০০৯ সংখ্যা)

মে দিবস ২০০৯ সালে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী জনসভায় দ্ব্যর্থহীনভাবে ঘোষণা করেন যে, “বাংলাদেশে কোনো জঙ্গি নেই অথচ সরকার জঙ্গিবাদের প্রচারণা চালিয়ে বিদেশী হস্তক্ষেপের প্রচেষ্টায় লিপ্ত হয়েছে।” বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীও উক্ত দিবসে প্রায় একই প্রকার বক্তব্য রাখেন। অপরদিকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর বক্তব্যে বাংলাদেশে জঙ্গি রয়েছে প্রচার করেন এবং জঙ্গি নির্মূলে সকল প্রকার বিকল্প অবলম্বনের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন। বর্তমান সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও বেশ কয়েকজন মন্ত্রী বাংলাদেশের জঙ্গি দমনে টাস্কফোর্স গঠন, ভিন্ন রাষ্ট্রের সেনা-সহায়তা গ্রহণের কথা রীতিমতো ঘোষণা করছেন। উভয় শিবিরের পরস্পরবিরোধী বক্তব্যকে আমি বাংলাদেশের রাজনীতির স্বাভাবিক বুলি হিসেবে ধরে নিয়েছিলাম। কিন্তু পরদিন সরকারি বক্তব্যকে সমর্থন করে War for terror & Robbery লিপ্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মরিয়ার্টি যখন বললেন, ‘বাংলাদেশে জঙ্গি আছে’। তখনই আমার টনক নড়ে। আমি বিলক্ষণ উপলব্ধি করলাম যেহেতু সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ও ক্ষমতাসীন সরকার বলছে জঙ্গি আছে, সেহেতু জঙ্গি না থাকার কোনো উপায় নেই। ক্ষমতাধররা নিজেদের বক্তব্যের সত্যতা প্রমাণের জন্য নিশ্চয়ই জঙ্গি আছে প্রমাণের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ করবে। অথবা সরকারি সংস্থা অথবা বন্ধু দেশ নিশ্চয়ই সরকারকে জঙ্গি আছে মর্মে তথ্য সরবরাহ করেছে। উভয় পক্ষের পরস্পর বিরোধী বক্তব্যে উৎসুক হয়ে আমি Terror,Terrorist, Terrorism   সম্পর্কে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত সংগ্রহ করে বিস্ময়াভিভ‚ত হলাম। আমার সংগৃহীত তথ্যের প্রকৃতি এমন যে, সুনির্দিষ্ট তথ্যসমূহ বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছে এবং তথ্যের পরিমাণ এরূপ যে, উক্ত তথ্যসমূহ দিয়ে দশ ফর্মার একটি বই লেখা যাবে। শেষ পর্যন্ত বই লেখার ব্যাপারটা ভবিষ্যতের জন্য রেখে দিয়ে প্রবন্ধের কলেবরে অতি সংক্ষেপে বিষয়টি উপস্থাপনের সিদ্ধান্ত নিলাম।
Terror/Terrorist/ Terrorism-এর সংজ্ঞা SAMSAD English-Bengali Dictionary ৫ম সংস্করণ থেকে প্রমে উক্ত শব্দত্রয়ের অর্থ উদ্ধার করলাম। উক্ত ডিকশনারীতে টেরর শব্দের অর্থ পেলাম সন্ত্রাস/ ভয়ঙ্কর ব্যক্তি, টেররিস্ট-এর অর্থ পেলাম সন্ত্রাসী/ সংঘবদ্ধভাবে ভয় দেখাইয়া বশ মানানোর রীতি/ সন্ত্রাসবাদ, টেররিজম-এর অর্থ করা হয়েছে আতঙ্কিত করা/ ভয় দেখাইয়া শাসন করা, ইত্যাদি। উক্ত শব্দার্থ দেখে মনের আয়নায় ভেসে উঠল কতগুলো নাম, যার মধ্যে কয়েকটি হলো-
হিটলার, মুসোলিনী, চেঙ্গিস খাঁ, হালাকু খাঁ, শ্যারন, বুশ, ইন্দিরা গান্ধী, নেতানিয়াহু, ডোনাল্ডস রামসফেল্ড, ওসামা বিন লাদেন, বাইতুল্লাহ মেহসুদ ও ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের ন্যায় ভয়ঙ্কর ব্যক্তিদের মুখ। উক্ত আতঙ্কবাদী ব্যক্তিগণ আবার দুই প্রকারের। প্রমোক্ত ৯ জন সন্ত্রাসবাদের স্রষ্টা আর শেষোক্ত ৪ জন সন্ত্রাসবাদের সৃষ্টি। বর্তমান বিশ্ব যেন স্রষ্টা ও সৃষ্টির যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করছে। এই স্রষ্টা সৃষ্টি সম্পর্কে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হতে বিশিষ্টজনদের
বক্তব্য যাচাই করলাম।Terror/ Terrorist/Terrorism  সম্পর্কে বিশিষ্টজনদের অভিমত
পাঠকদের জ্ঞাতার্থে উলেøখ করা হলো :


১.আমেরিকার ইরাক-আফগানিস্তান আগ্রাসনকে সমর্থন করে না তারা টেররিস্ট, যারা  প্রতিরোধ করতে  চায়  তারা টেররিস্ট। যারা   ফিলিস্তিনে   ইসরাইলী দখলদারিত্ব প্রতিরোধ করতে  চায়  তারা টেররিস্ট,  যারা ভারতীয় দখলদারিত্ব থেকে  কাশ্মীরকে  মুক্ত করতে চায় তারা  টেররিস্ট।  যে সকল  দেশ সাম্রাজ্যবাদী  আগ্রাসন  প্রতিরোধ  করতে  চায় তারা  সন্ত্রাসী  রাষ্ট্র।  আরব-আফগান-মুসলিম যুবকরা যতদিন যক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা বিশ্বের স্বার্থে রাশিয়ার দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করেছে ততদিন তারা ছিল মুজাহিদ কিন্তু বর্তমানে তারা যেহেত  পশ্চিমা দখলদারিত্বের  বিরুদ্ধে  যুদ্ধ করছে সেহেতু তারা টেররিস্ট।(সূত্র : ওসমান খালিদ, লিসা জার্নাল, অক্টোবর-ডিসেম্বর-০৭, পৃ. ২০ ও ২৮)।


২. রিগ্যান প্রশাসনের এসিসট্যান্ট সেক্রেটারি অব ট্রেজারী ও ওয়াল স্ট্রীট জার্নালের সহযোগী সম্পাদক পল ক্রেইগ রবার্টস নিম্নোক্ত ভাষায় যুক্তরাষ্ট্রের দৃষ্টিতে টেররিস্ট-এর সংজ্ঞা প্রদান করেছেন।
ক. ইরান, হিযবুল্লাহ, হামাস, টেররিস্ট। কারণ ইরান-হামাস ও হিযবুল্লাহর ন্যায় প্রতিরোধ যোদ্ধাদের সাহায্য করে।
খ. হামাস ও হিযবুল্লাহ টেররিস্ট, কারণ তারা অবৈধ ইসরাইল রাষ্ট্রের জুলুম, নির্যাতন ও আগ্রাসনকে প্রতিরোধ করে।
গ. সে সকল দেশ সন্ত্রাসী রাষ্ট্র, যারা যুক্তরাষ্ট্র, বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ থেকে টাকা নিয়ে উক্ত টাকায় অস্ত্র কিনে সিআইএ’র নির্দেশনা মোতাবেক ইহুদী ও মার্কিন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করে না বা করতে রাজী নয়।
ঘ. সে সকল দেশ টেররিস্ট, যারা নিজ দেশের বভিন্নি বাহিনী ব্যবহার করে নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী শক্তিকে ধ্বংস করতে রাজী নয়।
ঙ. আমেরিকা, ইসরাইল ও তার দোসরগণ যখন লক্ষ লক্ষ নিরপরাধ মানুষ হত্যা করে তখন তা টেররিজম হয় না, আগ্রাসন প্রতিরোধ করাই টেররিজম। (সূত্র : লিজা জার্নাল, এপ্রিল-জুন ২০০৮)।


৩. ষাটের দশক থেকে যুক্তরাষ্ট্র ফিলিস্তিনের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারকে অস্বীকার করছে। দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত পার্টনার হওয়ার পর বর্তমানে ভারত কাশ্মীরী প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরকে আখ্যা দিচ্ছে টেররিস্ট নামে। ইরাক ও আফগানিস্তানের প্রতিরোধ যোদ্ধাদেরকে আখ্যা দেয়া হচ্ছে টেররিস্ট হিসেবে।War on terror  একটি প্রচারণা মাত্র। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্বব্যাপী স্থায়ী আধিপত্য কায়েমকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে মনে করে দেশসমূহকে ধ্বংস করা হচ্ছে, জনগণকে নির্মম-নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হচ্ছে। (ওসমান খালিদ, সম্পাদক, লিসা জার্নাল)।


৪. ইসলামিক টেররিজম মূলত ফিলিস্তিনি, আরব ও মুসলিম জনগণকে যন্ত্রণা দেয়া, ক্রোধান্বিত ও অপমানিত করার ফসল। এ যন্ত্রণা,ক্রোধ ও অপমানের তিনটি প্রধান কারণ হলো প্রথমতঃ সাধারণভাবে আমেকিরার শক্তি মদমত্ততা, দ্বিতীয়তঃ, জায়নবাদী ইসরাইলের প্রতি আমেকিরার অন্ধ সমর্থন, তৃতীয়তঃ বর্তমান আরব ও মুসলিম সরকারসমূহের শোচনীয় ব্যর্থতা। (এলান হার্ট, সাংবাদিক ও কলামিস্ট)।


৫. ভারত আমেরিকার চেয়েও অধিক আওয়াজে ইসলামী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে প্রপাগান্ডা চালাচ্ছে। এর কারণ হিন্দু ভোট লাভ করা এবং খ্রিস্টান বিশ্বকে পাকি¯Íানের বিরুদ্ধে উত্তেজিত করা। অথচ সত্যিকারভাবে হিন্দুত্ববাদ মুসলমানদের উপর অবিরাম আক্রমণ চালাচ্ছে, সমাজে মুসলমানদেরকে নিম্নতর শ্রেণীতে কোণঠাসা করে অপমান করছে। মুসলমানরাই ভারতে হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসের করুণ শিকার। মুসলমানরা ভারতে হিন্দু সন্ত্রাসবাদ কর্তৃক পরিকল্পিত ও সংঘটিত হত্যা এবং লুণ্ঠনের শিকার হচ্ছে। | (M.C. Raj, A Leading dalit Intellectual).


৬. ‘ভারতের ইহুদী’খ্যাত ব্রাহ্মণরা ট.ঝ. ডধৎ ড়হ ঞবৎৎবৎ-এর সুযোগ গ্রহণ করে ভারতের মুসলমানদের বিরুদ্ধে রক্তাক্ত যুদ্ধ শুরু করেছে। ভারতে এমন কোনোদিন যায় না যেদিন ভারতের মুসলমানরা সন্ত্রাসের শিকার হয় না। সুতরাং বর্তমানে এটি দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট যে, ‘U.S. War on terror’  ইসলাম ও মুসলিমের বিরুদ্ধে পরিচালিত অমানবিক নৃশংস যুদ্ধ। (V.T. Rajshekar, India) সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্র ইসরাইল, যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, বৃটেন, ফ্রান্স ও জার্মানির দৃষ্টিতে জঙ্গি হওয়ার এবং জঙ্গি রাষ্ট্র হওয়ার বৈশিষ্ট্যসমূহ নিম্নরূপঃ


১. মুসলমান হওয়া ও ইসলামের পক্ষের শক্তি হওয়া।


২. এমন দেশের অধিবাসী হওয়া যে দেশটির অবস্থান ভু- রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং যে দেশে তেল-গ্যাস রয়েছে।


৩. যে দেশের অধিকাংশ জনগণ স্বাধীনচেতা ও যে কোনো বহিঃশক্তির আধিপত্যের বিরোধী ও বৈদেশিক আগ্রাসন প্রতিরোধে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ। উপরোক্ত বৈশিষ্ট্যসমূহ বা দোষসমূহ যেহেতু বাংলাদেশ ও এদেশের অধিকাংশ মানুষের মাঝে বিদ্যমান সেহেতু এদেশ যে জঙ্গিবাদীতে
পরিপূর্ণ তা বলা বাহুল্য।সাম্রাজ্যবাদী  শক্তির চোখে  যারা  জঙ্গি, সাম্রাজ্যবাদের পুতুল মাহমুদ আব্বাস,  হোসনী  মোবারক, নুরী আল মালিকী ও হামিদ কারজাইর চোখে তারা জঙ্গি হতে বাধ্য এবং উক্ত জঙ্গি দমনে প্রভু  দেশকে আমন্ত্রণ জানাতে পুতুল সরকার সমূহ কমিটেড। অপরদিকে ডিকশনারীর শব্দার্থের প্রতি মনোযোগ দিলে দেখা যায়, যারা আতঙ্ক সষ্টি করে, যারা সংঘবদ্ধভাবে ভয়  দেখাইয়া,  চোখ রাঙাইয়া অপরকে শাসন করতে চায়, অপরের  স্বাধীনতা-স্বার্বভৌমত্ব-আমিত্ব- মর্যাদা-অস্তিত্ব বিলীন করতে চায় তারা সন্ত্রাসী, যারা দেশে দেশে রক্তাক্ত সন্ত্রাস রফতানি করে মানব জীবনকে অবর্ণনীয় দঃখ-দর্দশায় নিমজ্জিত করছে তারা  সন্ত্রাসী,  তাদের  এহেন  কার্যাবলীর  নাম টেররিজম।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে পরিচালিত বর্তমান ‘ওয়ার অন টেরর’-এর কারণ ও অজুহাত বিশ্লেষণ করলে আমরা দেখতে পাই, ওয়ার অন টেরর শুরু করার নেপথ্য কারণ হলো বিশ্বব্যাপী জায়নবাদী আধিপত্য বাস্তবায়ন করা। যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-ইইউ জায়নবাদের বাহন বা ঘোড়া মাত্র। ওয়ার অন টেরর-এর প্রকাশ্য অজুহাত হলো মুসলিম নামধারী সন্ত্রাসী কর্তৃক নাইন-ইলেভেনের টুইন টাওয়ার হামলা। অথচ বর্তমানে আমরা জানতে পেরেছি যেহেতু তেলসমৃদ্ধ ও ভু-গুরুত্বপূর্ণ মুসলিম বিশ্ব দখল করা জায়নবাদীদের আপাতঃ টার্গেট সেহেতু সিআইএ-মোসাদ সৃষ্ট মুসলিম নামধারী সন্ত্রাসীদের দ্বারা টুইন টাওয়ার হামলা সংঘটিত করা হয়েছিল।


টইন টাওয়ার হামলার পোস্টমর্টেম:
১. ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল লন্ডন, ডিসেম্বর ২০০৮ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে ইসরাইলের মোসাদের পক্ষে গুপ্তচরবৃত্তির অভিযোগে সিরীয় সীমান্তের বেকা উপত্যকায় লেবাননী সৈন্যরা আলী এবং ইউসুফ জারবাহ নামে দুই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করেছে। তাদের নিকট থেকে অত্যাধুনিক গোয়েন্দা সরঞ্জামাদি ও তথ্যাদি উদ্ধার করা হয়েছে। উক্ত আলী ৯/১১ হামলার কথিত বিমান ছিনতাইকারী জিয়াদ আল জাররাহর চাচা। বৈরুতের আরবী দৈনিক সাফির-এর মতে, উক্ত ব্যক্তিদ্বয় ‘অপারেশন রোম’ এবং হিযবুল্লাহর সিনিয়র সামরিক কমান্ডার ইসমাইল মুগনিয়াকে লেবাননে গাড়ি বোমা দ্বারা হত্যার সাথে জড়িত ছিল। তদন্তকারীরা বলেছেন, সিরীয় সীমান্তে তৎপর ইসরাইলী মদদপুষ্ট ফিলিস্তিনি গ্রুপ ‘ফাতহুল ইনতেফাদা’র সদস্য ছিল উক্ত আলী ভ্রাতৃদ্বয়। (সূত্র : ক্রিসেন্ট ইন্টারন্যাশনাল লন্ডন, ডিসেম্বর ০৮ সংখ্যা)


২. নিউইয়র্ক টাইমস সম্প্রতি লিখেছে, জিয়াদ আল জাররাহর কাজিন আল জাররাহ ১৯৮৩ সাল থেকে ফিলিস্তিনি যোদ্ধা ও হিযবুল্লার বিরুদ্ধে অন্তর্ঘাতি তৎপরতা চালাচ্ছে। ইসরাইল নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে আরব-লেবাননী যুবকদেরকে অর্থের বিনিময়ে রিক্রুট করে সন্ত্রাসী কার্যক্রম পরিচালনা করছে। নিউইয়র্ক টাইমস আরও লিখেছে, টুইন টাওয়ারে হামলার খবরে ফ্লাইট-১১ এবং ফ্লাইট- ১৭৫ এর যাত্রী ৫ ইসরাইলী উল্লাস প্রকাশ করায় তাদেরকে সন্দেহভাজন হিসেবে আটক করা হয়। ৭১ দিন পর ইসরাইলী চাপে তাদেরকে মুক্তি দেয়া হয়। উক্ত ৫ জনের ২ জন মোসাদ-এর সার্ভিলেন্স টিমের সদস্য। হোয়াইট হাউসের নির্দেশে সিআইএ ৯/১১ ঘটনায় ইসরাইলী সম্পৃক্ততা আড়াল করেছে।


৩. ইতালীর স্থানীয় ‘কোরিয়ার ডে-লা-সেরা’ পত্রিকা লিখেছে, ‘ইতালীর সাবেক প্রধানমন্ত্রী ফার্নেসকো কেসিগো বলেছেন, ৯/১১ এর ঘটনা মোসাদ-সিআইএ-এর যৌথ প্রযোজনার ফসল।


৪. ইসরাইলী টেলিকম ফার্ম ‘অভিগো’র সার্বক্ষণিক বার্তায় টুইন টাওয়ারে হামলার ২ ঘণ্টা পূর্বে বিষয়টি অবহিত হয়। ফলে ৯/১১ হামলার সময় কোনো ইহুদী টুইন টাওয়ারে ছিল না। এই হামলা সম্পর্কে ইসরাইলী সরকার আগে-ভাগে জানত বিধায় ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রীর নিউইয়র্ক সফর আকস্মিকভাবে বাতিল করা হয়। (সূত্র : দৈনিক সংগ্রাম, ১১/০৫/০৯ইং) মার্কিন আগ্রাসী শক্তি ইতিপূর্বে কম্যুনিজম প্রতিরোধের নামে পৃথিবীর দেশে দেশে আগ্রাসন পরিচালনা করেছে। তখন মুসলিম কমরেডগণ ছিল মার্কিনীদের শত্রু আর ইসলামপন্থীরা ছিল মার্কিন বন্ধু। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রক্ত পিপাসু-যুদ্ধবাজ মার্কিনীদের প্রয়োজন হয়ে পড়ে নতুন শত্রুর। কেননা রক্ত ও অস্ত্র ব্যবসাই মার্কিনীদের আজীবন পেশা। এ পেশাকে টিকিয়ে রাখতে কমরেডগণকে বন্ধু বানানো হয়েছে আর মুজাহিদদেরকে জঙ্গি আখ্যা দেয়া হয়েছে।


জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্রের সন্ধানে:
জঙ্গিবাদের প্রজনন কেন্দ্রে মানুষ পয়দা করা হয় না। নিপিড়িত, লাঞ্ছিত, বঞ্চিত, অত্যাচারিত, দরিদ্র ও বেকার যবকদেরকে বিভ্রান্ত করে তাদের মধ্যে প্রতিশোধস্পহা জাগিয়ে  তোলা হয়, তাদের মনে রঙিন  স্বপ্নের আকাংখা জাগ্রত করা হয় এবং তাদেরকে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষন দিয়ে দেশে দেশে সংঘাত সষ্টি করা হয়। উক্ত সংঘাত নির্মলের নামে জঙ্গিবাদের গডফাদারগণ সংশিøষ্ট দেশকে চাপ দিয়ে কাংখিত সুবিধা আদায় করে নেয় অথবা সংশিষ্ট দেশে হামলা করে জনপ্রাণী নিশ্চিহ্ন করে দেশের সকল  সম্পদ  ও  সম্ভাবনা  গ্রাস  করা  হয়  এবং  নিজেদের  আধিপত্য সম্প্রসারণ করা হয়।
স্যামুয়েল হান্টিংটনের সভ্যতার সংঘাত থিওরী রচনার পূর্বে এবং সিনিয়র বুশের Clash of Civilisation  ফেরি করার পূর্বে মুসলিম বিশ্বে কোনো জঙ্গি ছিল না ছিল শুধু ফিলিস্তিনি প্রতিরোধ যোদ্ধা ও কাশ্মীরী মুজাহিদ। উক্ত সভ্যতার সংঘাত তত্ত্ব বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ৯/১১ এর আয়োজন করা হয় এবং তারপর থেকে পৃথিবীর সকল মুসলিম দেশ জঙ্গিময় হয়ে যায়। শুরু হয় সন্ত্রাসী দমনের নামে রক্তাক্ত আগ্রাসন ও হত্যাযজ্ঞের অবিরাম কার্যক্রম। নিজেদের সৃষ্ট জঙ্গি দমনের অজুহাতে জঙ্গির বাপ-দাদার ভিটেমাটি কেড়ে নেওয়ার প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়। বর্তমান ওয়ার অব টেরর-এর গডফাদার হলো জায়নবাদী ইহুদীরা এবং তাদের বরকন্দাজ হলো যথাক্রমে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত এবং ইইউ। জঙ্গিবাদের লালন-পালন ও বিকাশে তাদের ব্যাপক ভু‚মিকার সংক্ষিপ্তসার এখানে উল্লেখ করা হলো।
সাম্রাজ্যবাদী দেশসমহের জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্রের ঠিকানা:


১. ২০০৪  সালের মাঝামাঝি বেলুচিস্তানের মখ্যমন্ত্রী জাম ইউসুফ বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বেলুচিস্তানের বিভিন্ন স্থানে৩০-৪০টি  জঙ্গি  ঘাটি  পরিচালনা  করছে।  ভারত  প্রত্যেক টেররিস্টকে  প্রতিমাসে১০  হাজার  টাকা বেতন  প্রদান  করে।২৯/১২/২০০৫ সালে প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফ বেলুচিস্তানের অস্থিতিশীলতা  সষ্টিতে  প্রতিবেশী দেশের  হাত  রয়েছে  বলে অভিযোগ করেন।
 (সূত্র : Dr. Mahboob Hossain, IndiaBehabior, (The Nation, Jan, 23, 06, See Also Muhammad Tahir, Tribes & Rebells The Players in the Balochistan Insurgencey (The James town Foundation, April-3, 08)


২. পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা বিষয়ক মুখপাত্র মেজর জেনারেল শওকত সুলতান এবং তথ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ আলী দুররানী ৪ সেপ্টেম্বর ২০০৬ সালে মিডিয়াকে বলেন, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ বিপুল পমিরাণ অর্থ ও অস্ত্র (যার মধ্যে ভ‚মি থেকে আকাশে নিক্ষেপ যোগ্য মিসাইল ও ১০৭ মি.মি. রকেটও রয়েছে) সরবরাহ করে বেলুচিস্তানকে অস্থিতিশীল করে তুলছে। জেনারেল সুলতান আরো বলেন, আফগানিস্তানের কান্দাহারস্থ কনস্যুলেট ও ইরানের জাহিদানস্থ ভারতীয় কনস্যুলেট থেকে পাকিস্তানি জঙ্গিদেরকে ভারত অস্ত্র-শস্ত্র সরবরাহ করছে। ভিন্ন প্রেস ব্রিফিংয়ে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র বিষয়ক মুখপাত্র তাসনীম আলম বলেন, ‘ভারত আফগান ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তান বিরোধী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে।’ (সূত্র : PTI- Weapon Supply routes to Balochistan sealed, Pak Govt. (The Hindu Sept. 5, 06) Hindustan Times, Sept. 5, 06/ Hindustan Times Sept. 8, 06 (The Jamestown Foundation, Nov. 16, 06)


৩. বালুচ লিবারেশন আর্মী নেতা আকবর বুগতি, বালাচ মারী এবং তেহেরিক তালিবান পাকিস্তান নেতা আব্দুল্লাহ মেহসুদ, তার কাজিন বাইতুল্লাহ মেহসুদ, আবদুর রশীদ গাজীসহ পাকিস্তানের বর্তমান আলোচিত জঙ্গি নেতৃবৃন্দের অস্ত্র-অর্থ, প্রশিক্ষনের দায়িত্ব পালন করছে যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-ইসরাইল-বৃটেন ও জার্মানী। ইসলামাবাদের লাল মসজিদে সেনাবাহিনীর অভিযানে ক্ষুব্ধ সাধারণ মুসলমানদের ক্ষবকে  কাজে লাগিয়ে উক্ত সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ সাধারণ মুসলমানদেরকে জঙ্গি বানিয়ে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে এবং মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাজে লাগাচ্ছে। উক্ত জঙ্গিদেরকে সরবরাহকৃত যোগাযোগ সরঞ্জাম পাকিস্তানকে সরবরাহকৃত যোগাযোগ সরঞ্জামের চেয়ে বেশি আধুনিক। উক্ত শক্তিসমূহ পাকিস্তানকে ধ্বংস করার জন্য আল কায়েদাসহ অন্যান্য ইসলামী আন্দোলনকে অস্ত্র-অর্থ সরবরাহ করছে। (সূত্র : The India Doctrine, 2nd edition 08, M.B.I. Munshi, page 592-93)


৪. <b>তাবলীগ জামাত ইন্ডিয়া ও ইসরাইল  :</b> নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াশিংটন থিংক ট্যাংকে কর্মরত একজন মার্কিন বিশ্লেষক তাঁর এক পাকিস্তানী বন্ধুকে এই মর্মে একটি ই-মেইল বার্তা পাঠান যে, তাঁর ভাষায় “২০০৭ সালের শুরুতে আমার ইসরাইল সফরের সময় আমি জানতে পারি যে, ইসরাইল হিব্রু বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে হাইফা শহরে একটি ইসলামী স্কুল অব ফিকাহ্ পরিচালনা করে। উক্ত শরীয়াহ (ফিকাহ্) স্কুলে ভারতীয় ও পাকিস্তানী বংশোদ্ভুদ মুসলমানরা প্রশিক্ষন নিয়ে তাবলীগ জামাতে শামিল হয়ে ভারতের বিভিন্ন মুসলিম সংস্থা ও মধ্য এশিয়ার মুসলমান সংস্থায় কাজ করে। আফগানিস্তানে ভারত-ইসরাইল কর্মকাণ্ডের অধীনে এ তৎপরতা পরিচালিত হয়।” (সূত্র : ঐ, পৃ. ৬০০)


৫. যুক্তরাষ্ট্র-ভারত-বৃটেন-জার্মানীসহ সাম্রাজ্যবাদী শক্তিসমূহ তাদের আফগানিস্তানে অবস্থিত ঘাঁটি থেকে পাকিস্তানী উপজাতীয় এলাকায় নাশকতা সৃষ্টির লক্ষ্যে প্রশিক্ষন দিচ্ছে। অনেক পাকিস্তানী ও আফগান তালেবান আত্মসমর্পণ করার পর জিজ্ঞাসাবাদে বলেছে প্রধানত পাকিস্তানে হামলা পরিচালনা করার জন্য ভারতীয় ও আফগান কর্মকর্তারা আফগানিস্তানে প্রশিক্ষন শিবির পরিচালনা করছে।” (সূত্র : Happymoon Jacob, 24.3.07, www.orgonline.org)


৬. ২০০৮ সালের ফেব্রæয়ারি মাসে ভারতের Out Look Magazine -এর সাথে সাক্ষাতকারে ভারতস্থ ইসরাইলী রাষ্ট্রদূত মার্ক সোফার বলেন, “ভারত ১৯৮০’র দশক থেকে সিন্ধু প্রদেশে বিচ্ছিনড়বতাবাদী জঙ্গি চাষাবাদ কার্যক্রম চালু করেছে।”


৭. পাকিস্তানের অভ্যন্তরে ও বাইরে বসবাসরত সিন্ধী হিন্দুদেরকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষন দিয়ে বিচ্ছিন্নতাবাদে মদদ দিচ্ছে। ভারতীয় মদদপুষ্ট দল ‘Sindhu Desh Movement’ অর্থ দিয়ে সমর্থক ও অস্ত্র কিনে এবং  প্রতিষ্ঠাতা কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহের ছবি সরিয়ে এম কে গান্ধীর ছবি স্থাপনের কাজে নিয়োগ করে গরীব কৃষকদের। (সূত্র : The India Doctine, MBI Munshi, 2nd edition, Page 573-574)


৮. ভারত নিজ ভূখণ্ডে তামিল গেরিলাদল এলটিটিইকে প্রশিক্ষন দিয়ে শ্রীলঙ্কায় তামিলদের পৃথক রাষ্ট্রের দাবিকে সমর্থন করে। (সূত্র : সুনীল জয়াশ্রী, The New Nation, June 10, 07)


৯. পাকিস্তানী, তিব্বতী, বাংলাদেশী ভিন্নমতবলম্বিদের ন্যায় ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ তামিলদের অতি গোপনীয় চক্রাথা’ সামরিক প্রশিক্ষন কেন্দ্রে প্রশিক্ষন প্রদান করে। (সূত্র : টি, সাবারত্তম, পিরাপাহারান, ভলিউম-১, চ্যাপ্টার-২৮)


১০. ভারতীয় দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে কাশ্মীরী মুজাহিদদেরকে বিভ্রান্ত করে আন্দোলনকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ কাশ্মীরীদের মধ্য থেকে জনবল সংগ্রহ করে জঙ্গি জিহাদী গ্রুপ গঠন ও পরিচালনা করে। (The India Doctrine Do, Page 571)


১১. জামায়াতুল মুজাহেদীন বাংলাদেশ বা জেএমবি’র কেন্দ্রীয় নেতা আবদুর রহমান ও বাংলাভাই এর গ্রেফতারের পর প্রকাশ হয়ে পড়ে যে, ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা জেএমবিকে অস্ত্র, প্রশিক্ষন ও নিরাপদে সীমান্ত পারাপারের ব্যবস্থা করে। জেএমবি’র বিভিন্ন আস্তানা থেকে উদ্ধারকৃত অস্ত্র ও বিস্ফোরকের গায়ে ভারতীয় সমরাস্ত্র কারখানার সীল ছিল। (সূত্র :Holiday, July 21, 06/ PROBE, June 15-21, 06)


১২. জেএমজি’র সহযোগী সংগঠন হিসেবে পরিচিত হুজি-বি এর আমীর মুফতি হান্নান গ্রেফতার হওয়ার পর স্বীকারোক্তি প্রদান করেছেন যে, ‘সকল গ্রেনেড ভারত থেকে সরবরাহ করা হয়েছে।’ (সূত্র : PROBE, Feb. 16-22)


১৩.ইসরাইলের সহযোগীতায় ও পরামর্শে ভারত  ১৯৯০-এর  দশক থেকে  মসলমানদের  বিভিন্ন দল-উপদলে  ও  ধর্মীয় গোষ্ঠীতে অনপ্রবেশ করে সংঘাতময় পরিস্থিতি সষ্টি করে এবং উক্ত দল- উপদলের থেকে  জনবল  সংগ্রহ  করে  প্রশিক্ষন  দিয়ে ভেতরে  অনপ্রবেশ  করে।  বিংশ  শতকের  প্রথম  অর্ধাংশে ব্রিটিশ গোয়েন্দা  সংস্থা  ও  ইসরাইল  অনরূপ কৌশল   অবলম্বন করা শুরু করে, যা পরবর্তীতে প্রকাশিত হয়।  (সূত্র :
The India Doctrine, Do, Page 600)


১৪.পাকিস্তানের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আসলাম বেগ (২৬.৩.০৮) পত্রিকায় Pakistanis Foil one Conspiracy, To check Another one is Afganistan শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন, যার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ :
আফগানিস্তানে এংলো-আমেরিকান দখলদারিত্বের পর জাবাল- উস-সিরাজে C.I.A./RAW/MOSSAD/MI-6(বৃটেন) এবং BND (German Intelligence)  গোয়েন্দা সংস্থাসমূহ সুবিশাল ও অত্যাধুনিক গোয়েন্দা ঘাঁটি স্থাপন করে। উক্ত কেন্দ্র থেকে পার্শ্ববর্তী দেশসমূহে জঙ্গি তৎপরতা বিস্তারের  লক্ষ্যে ৪টি
আউটপোস্ট স্থাপন করা হয়। উক্ত ৪টি আউটপোস্ট হলো :


ক. : সারোবী এবং কান্দাহারের অগ্রবর্তী ঘাটি : সারোবীতে এর মূল কেন্দ্র অবস্থিত। এর অধীনে রয়েছে কান্দাহার, গজনী, খোস্ত,গারদেজ, জালালাবাদ, আসাদাবাদ, ওয়াখান ও ফয়েজাবাদ ঘাঁটি। সারোবী ঘাঁটির দায়িত্বে রয়েছেন একজন ভারতীয় কর্মকর্তা, যিনি Border Road Organization (BRO)  পরিচালনা করেন। সারোবী কেন্দ্র থেকে পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিম সীমান্ত প্রদেশে জঙ্গি সরবরাহ করা হয়। পাকিস্তানের ভিন্নমতাবলম্বিদের প্রশিক্ষন দিয়ে  NWFP অঞ্চলে পাঠানো হয় নাশকতা সৃষ্টির জন্য। কান্দাহারের ঘাঁটির অধীনে রয়েছে লস্করগাহ ও নাওয়াহতে আরও ২টি ঘাঁটি। বালুচ ভিন্ন মতাবলম্বীদের প্রশিক্ষন দিয়ে বালুছিস্তানে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি ও বালিচিস্তানের উপকুলের গভীর সমুদ্র বন্দর ‘গোয়াদর’ সানডাক ও হাবে চীন কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পে বাধাদানের কাজে ব্যবহার করা হয়।


খ. ফয়েজাবাদ (বাদাখশান) ঘাটি :  এ ঘাঁটি থেকে চীন, তাজিকিস্তান ও উজবেকিস্তানে জঙ্গি সরবরাহ করা হয়।তাজিকিস্তান -উজবেকি¯Íান ও চীনের ঝিনঝিয়াং প্রদেশের ভিন্নমতাবলম্বী মুসলিম যুবকদেরকে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষন দিয়ে জঙ্গিবানানো হয় এবং অপারেশনে পাঠানো হয়। ভারতের ৪০০ মুসলিম সৈন্য, বহু সংখ্যক প্রকৌশলী ও শ্রমিক এ কেন্দ্র পরিচালনা করে। উর্দুভাষী ভারতীয় মুসলিম উলেমারা এসব জঙ্গিদের মানসিক মোটিভেশনের কাজ করে এবং ধারণা দেয়া হয় যে, পাকিস্তানই এ ঘাঁটির সঙ্গে জড়িত। (সম্ভবতঃ ইসরাইল পরিচালিত হাইফার স্কুল অব ফিকাহর প্রশিক্ষিত ব্যক্তিরাই এসব কেন্দ্রে মোটিভেশনের কাজ করে-লেখক)।
(বাংলাদেশের জেএমবি জঙ্গিদের মোটিভেশনেও আমরা ২ জন ভারতীয় উলেমার নাম জানতে পারি। তাদের একজন ২৪ পরগনার মাওলানা মহসিন ভাদরিয়া এবং অন্যজন বশিরহাটের মাওলানা আদল মাকিত ২৪ পরগনায়  ‘র’  পরিচালিত জেএমবির ৯টি প্রশক্ষিণ ঘাঁটরি সাথে জড়তি। -লেখক)।


গ.মাজার-ই শরীফ ঘাঁটি: তুর্কমেনিস্তান ও চেচনিয়ার ভিন্নমতাবলম্বীদের এ ঘাঁটিতে প্রশিক্ষন দিয়ে সংশ্লিষ্ট অঞ্চল ও রাশিয়ায় নাশকতার জন্য পাঠানো হয়। সাবেক সোভিয়েত রাশিয়ার আফগান সহযোগী ওয়ারলর্ড রশীদ দোস্তাম ও আহমদ জিয়া মাসুদ এ কেন্দ্র থেকে উজবেকিস্তান ও তাজিকিস্তান কার্যক্রম পরিচালনা করে। এ গোয়েন্দা ঘাঁটিটি C.I.A./RAW/ MOSSAD/ এবং BND (German)  যৌথভাবে পরিচালনা করে।


ঘ. হিরাত ঘাটি :  C.I.A./RAW/MOSSAD  যৌথভাবে এই ঘাঁটি
পরিচালনা করে। এ ঘাঁটির অধীনে ফারাহ ঘাঁটি এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরে কালামাত, জিওয়ানী ও মান্দ ঘাঁটি কার্যক্রম পরিচালনা করে। ইরানের অভ্যন্তরে নাশকতা সৃষ্টির জন্যই মূলত এসব ঘাঁটিসমূহ ব্যবহৃত হয়। ইরানের অভ্যন্তরে তৎপরতায় লিপ্ত জঙ্গি গোষ্ঠী ‘জান্দাল্লাহ’ হিরাত ঘাঁটির অধীনে কাজ করে। (তথ্য সূত্র:http://www.ahmedquraishi.com/ article_detail. php?id=252)


এংলো-আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদী শক্তির পুতুল হামিদ কারজাই উপরোক্ত গোয়েন্দা ঘাটি (জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র)সমুহকে কনস্যুলেটের মর্যাদা দিয়ে একটি কটনৈতিক রক্ষাকবজ পরিয়েছেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির তাবেদার সরকারসমহ এইভাবে জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র পাহারায় ও জঙ্গিগোষ্ঠী বিস্তারে প্রভুর সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করে। যে সকল সরকার নিজ দেশে বিদেশী সেনাঘাটি স্থাপন করতে চায় তারা মলত শুধমাত্র ক্ষমতার লোভে নিজ দেশে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কর্তক জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র স্থাপন করে।


১৫. পাকিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। পাকিস্তানের আকাশসীমা নিয়ন্ত্রণ করে যুক্তরাষ্ট্র। উক্ত ঘাঁটির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানের বিভিন্ন গোষ্ঠীকে অস্ত্র-অর্থ ও ট্রেনিং দিয়ে পাকিস্তানে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ব্যবহার করে। (সূত্র : উইলিয়াম আরকিন, ওয়াশিংটন পোস্ট, ডিসেম্বর ০৭)
১৬. পাকিস্তানকে অস্থিতিশীল করতে যুক্তরাষ্ট্র পারভেজ মোশাররফ অথবা বেনজির ভুট্টোর মধ্যে একজনকে হত্যার সিদ্ধান্ত নেয় এবং বেনজির নিহত হন। (সূত্র ঃ Larry Chin, Global Research, 29.12.07)


১৭. ১১ মার্চ ২০০৯ তারিখে যুক্তরাষ্ট্রের মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সেমিনারে আমেরিকার অনুসন্ধানী রিপোর্টার পুলিৎজার পুরস্কার বিজয়ী সিমুর হার্শ বলেছেন, প্রেসিডেন্ট বুশের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনী পরিচালিত ‘নির্বাহী আততায়ী চক্র’ বেনজির ভুট্টো, রফিক হারিরী ও লেবাননের সেনাপ্রধানকে হত্যা করে। আল কায়েদা কর্মী ওমর শেখ সাঈদ কর্তৃক ওসামা বিন লাদেনের নিহত হওয়ার খবর ফাঁস করায় বেনজিরকে এবং লেবাননে মার্কিন ঘাঁটি স্থাপনে অনুমতি না দেয়ায় প্রেসিডেন্ট হারিরী ও সেনাপ্রধানকে হত্যা করা হয়। শোষোক্ত ঘটনায় ইসরাইলী প্রধানমন্ত্রী এরিয়েল শ্যারন জাড়িত ছিল। (সূত্র : দৈনিক আমার দেশ, ২০.০৫.০৯)
১৮. সিআইএ পাকিস্তানী গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইকে পরিচালনা করে। আইএসআই আল কায়েদাকে সহায়তা করে প্রভুর নির্দেশে। সত্যিকার অর্থে আল কায়েদা সিআইএ’র Brain Child. (সূত্র : Michel Chossudovsky, Author, Global Research) (বেনজির, রফিক হারিরী ও লেবাননের সেনাপ্রধানের মৃত্যুর ঘটনা থেকে আমরা এই শিক্ষা পাই যে, যারা একবার সাম্রাজ্যবাদের দালালের খাতায় নাম লেখায় তাদেরকে প্রভুর নির্দেশে প্রভুর পালিত সন্ত্রাসী বা আততায়ী কর্তৃক নিহত হওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকতে হয়। উপরোক্ত তিনজনই সাম্রাজ্যবাদী আকাঙ্খা মেটাতে নিজ দেশ ও জনগণের ব্যাপক ক্ষতি সাধনে লিপ্ত ছিলেন। বাংলাদেশের কেউ যদি শুধুমাত্র ক্ষমতার লোভে সাম্রাজ্যবাদের দালালের খাতায় নাম লিখিয়ে থাকেন তবে তাঁর বা তাদের পরিণতিও অনুরূপ হতে বাধ্য। কেননা, সাম্রাজ্যবাদের দৃষ্টিতে দালালগণ টয়লেট পেপার মাত্র। -লেখক)


সাম্রাজ্যবাদী শক্তির জঙ্গি সংগ্রহের ক্ষেত্র সমুহঃ
সীমাহীন জুলুম, নির্যাতন, অপমান, লাঞ্ছনার শিকার ব্যক্তিরা যখন ন্যায়বিচারের জন্য কোনো আদালত পায় না, মাথা গোঁজার ঠাঁই পায় না, ক্ষব প্রকাশের পথ পায় না, আশা-ভরসা-সান্ত¡নার বাণী পায় না, তখনই উক্ত ব্যক্তিগণ প্রতিশোধপরায়ণ হয়ে উঠেন। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির এজেন্টগণ এহেন ক্ষব্ধ ব্যক্তিদের আশ্রয় প্রদান, লালন-পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করে এবং তার ক্ষভকে বহুগুণ বর্ধিত করে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষন দিয়ে প্রতিশোধমূলক কাজে লিপ্ত করায় এবং উক্ত ব্যক্তির নাম দেয় জঙ্গি। এ জন্যই দেখা যায়, অপরাধী যে ধর্মের, সম্প্রদায়ের বা দলের হোক না কেন সাম্রাজ্যবাদী দেশসমূহ তাদেরকে আশ্রয় প্রদান করে এবং নিজের স্বার্থসিদ্ধির কাজে ব্যবহার করে। জাতিগত বিরোধ, সম্প্রদায়গত বিরোধ, সাম্প্রদায়িক বিরোধ, ভাষা-কৃষ্টি-সংস্কৃতিগত বিরোধ, ধর্মীয় ও দলীয় বিরোধকে উস্কে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি নেপথ্যে উভয়পক্ষ কে সহযোগিতা করে। ফলে উভয় পক্ষ রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয়। কয়েকটি উদাহরণ দিলে বিষয়টি বোধগম্য হবে। ইরাক: ইরাকের নিহত প্রেসিডেন্ট ছিলেন ব্রিটিশ গোয়েন্দা সংস্থার Brain Child। বিশ্বশক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের উত্থানের পর সাদ্দাম সিআইএ’র পক্ষপুটে আশ্রয় নেয়। সিআইএ ও মোসাদ-এর দিকনিদেশনায় সুন্নি সাদ্দাম নিজ দেশের শিয়া ও কুর্দীদের উপর অবর্ণনীয় জুলুম অত্যাচার করে। ক্ষব্ধ শিয়া ও কুর্দীরা সাদ্দামের অত্যাচার থেকে বাঁচতে বন্ধু যুক্তরাষ্ট্রকে নিজ দেশে ডেকে আনে এবং ফুটন্ত কড়াই থেকে জ্বলন্ত উনুনে পতিত হয়। এ প্রসঙ্গে ০৬/০৫/২০০৯ইং তারিখে প্রচারিত Inside Story  অনুষ্ঠানে সাবেক জাতিসংঘ দূত লাখদার ব্রাহিমী বলেন, ইরাকের প্রতিটি মিলিশিয়া গ্রুপকে মদদ দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। শিয়া-সুন্নি-কুর্দী দ্বন্দ্ব-সংঘাত উস্কে দিয়ে ইরাককে খণ্ডিত করা হচ্ছে। এক সময় শিয়াদেরকে শক্তিশালী করে সুন্নিদের উপর হামলা করাচ্ছে অন্য সময় সুন্নিবাদিদের শক্তিশালী করে শিয়াদের উপর প্রতিশোধ গ্রহণের ব্যবস্থা করছে। উক্ত অনুষ্ঠানে বিখ্যাত রিপোর্টার সিমুর হার্শ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র নূরী আল মালিকীকে ভবিষ্যতের সাদ্দাম হিসেবে গড়ে তুলছে। আফগানিস্তানের বিগত দিনের ইতিহাস দেখুন। সেখানে সুন্নি  পশতুনরা সংখ্যাগরিষ্ঠ এবং সে দেশের সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতো পশতুনরা। সোভিয়েত ইউনিয়ন আফগানিস্তান দখল করার লক্ষে সেখানকার জাতিগত সংখ্যালঘু তাজিক উজবেক ও শিয়াদের নিকট থেকে দালাল কমরেড সংগ্রহ করে এবং আফগানিস্তান দখল করে সংখ্যাগরিষ্ঠ পশতুনদের দেশ ছাড়া করে। সোভিয়েত শত্রু পশ্চিমা বিশ্ব ক্ষব্ধ-অপমানিত পশতুনদের অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষন দিয়ে এক সময় ক্ষমতায় বসায় এবং নিজ প্রয়োজনে পুনরায় সাবেক শত্রু জাতিগত সংখ্যালঘুদের ক্ষমতায় বসায় এবং আফগানিস্তান দখল করে বর্তমানে অসংখ্য জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করে বিশ্বব্যাপী জঙ্গি সরবরাহ কার্যক্রম পরিচালনা করছে। আর দোষ চাপাচ্ছে ঢালাওভাবে ইসলামের উপর, শান্তিপ্রিয় মুসলমানদের ঘাড়ে। পাকিস্তান, সুদান, সোমালিয়া, ইয়েমেন ও লেবাননের বেলায়ও একই ব্যবস্থা কার্যকর রেখেছে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি।


বাংলাদশে সাম্রাজ্জবাদরে জন্য কঠিন পরীক্ষাঃ
অন্যান্য দেশে যে প্রক্রিয়ায় জঙ্গি সংগ্রহ করা হচ্ছে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা সম্ভব হচ্ছে না। কেননা বাংলাদেশে কোনো জাতিগত, সম্প্রদায়গত, ধর্মীয়, ভাষাগত বিভেদ নেই। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবাই সমান অধিকার ভোগ করছে। এতদসত্ত্বেও সাম্রাজ্যবাদী শক্তি এই একক জাতিসত্তাকে বিভাজন করার জন্য মতবাদগত অনৈক্য সৃষ্টি করেছে, যথাঃ ইসলামপন্থী- ধর্মনিরপেÿতাবাদী, বাঙালি-বাংলাদেশী। এই কৃত্রিম বিভাজন বর্তমানে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের রক্ত-ক্ষরণ ঘটাচ্ছে কিন্তু এরপরও পারস্পরিক বৈরিতাকে কাংখিত মাত্রায় উন্নিত করা যাচ্ছে না। এর মূল কারণ হলো একক জাতিসত্তা। এ জন্য দেখা যায়, ছোট ভাই মৌলবাদী হলেও বড় ভাই ধরমনিরেপক্ষতাবাদি, পিতা বাঙালী হলেও ছেলে বাংলাদেশী। ফলে এই কৃত্রিম বিভাজন দ্বারা ব্যাপক সংঘর্ষের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা যাচ্ছে না। এমতাবস্থায় জঙ্গি সংগ্রহের প্রচেষ্টায়
সাম্রাজ্যবাদী শক্তি যে সকল ষড়যন্ত্র করতে পারে তা নিম্নে :
১. দেশের প্রধান দুই জোটকে মদদ দিয়ে সংঘর্ষে লিপ্ত করানো। (বি.দ্র. পাকিস্তান সরকারকে বালুচ লিবারেশন আর্মীকে দমানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্র এফ-১৬ সরবরাহ করেছে, আর যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগী মিত্র ভারত, বৃটেন, জার্মানী বিমান বিধ্বংসী ক্ষেপণন্নাস্র সরবরাহ করেছে বালুচ লিবারেশন আর্মীকে)।
২. বাঙালী ও ধরমনিরেপক্ষ গোষ্ঠীকে অস্ত্র-অর্থ-প্রশিক্ষন দিয়ে বাংলাদেশীদের উপর তীব্র হামলা পরিচালনা করতে পারলে ক্ষুব্ধ বাংলাদেশীরা হয়তো সাম্রাজ্যবাদী জোটের কারো সহায়তায় রুখে দাঁড়াতে পারে।
৩. দেশের অর্থনীতিকে ধ্বংস করার মাধ্যমে দুরবিক্ষ-হাহাকার সৃষ্টি করতে পারলে ক্ষুধারথ মানুষের ক্ষভকে কাজে লাগিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি ক্ষুধার্তদের অন্ন, অস্ত্র, প্রশিক্ষন দিয়ে দেশবিরোধী কাজে নিয়োজিত করতে পারে।
৪. দেশের প্রধান প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিকে বেনজির-রফিক হারিরী কৌশলে মাইনাস করে দেশকে অস্থিতিশীল করে জঙ্গি সংগ্রহ করতে পারে।
৫. পলাতক বিডিআর/ ক্ষুব্ধ সেনা পরিবার ও বিডিআর পরিবারের সদস্যদের ক্ষভকে উস্কে দিয়ে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি কাজে লাগাতে পারে।
৬. নিরীহ মোল্লা-মওলবী, কওমী মাদ্রাসার তালেবানদের উপর মিথ্যাদোষ আরোপ করে তাদের উপর জুলুম-নির্যাতন করিয়ে জঙ্গি সংগ্রহের চেষ্টা করতে পারে সাম্রাজ্যবাদী শক্তি।


বাংলাদশে জঙ্গি উৎপাদন কারখানা-কারাগার
মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েদী ও হাজতীদের মুখে শুনেছি, জেএমবি’র যে সকল সদস্য বর্তমানে কারাগারে বন্দী আছে তারা সেখানে অবাধে সদস্য সংগ্রহ করছে। নিরপরাধ যেসব ব্যক্তি বাংলাদেশ পুলিশের কল্যাণে হাজতী ও কয়েদী জীবন যাপন করছে তাদের ক্ষভকে পুঁজি করে তাদেরকে মোটিভেট করে জেএমবির সদস্য করা হচ্ছে এবং দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের কেউ কেউ জেল থেকে মুক্ত হওয়ার অর্থ সংগ্রহ করতে জেএমবির সদস্য হচ্ছে। কেননা, জেএমবি’র সদস্য হলে নাকি পরিবারের জন্য টাকা পাঠানোর ব্যবস্থাও করা হয়। সরকারের উচিত বিষয়টি খতিয়ে দেখে যথাযথ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া।উপরোক্ত তথ্য-উপাত্তের মাধ্যমে জঙ্গি কাকে বলে, জঙ্গি প্রজনন কেন্দ্রের ঠিকানা, জঙ্গিদের গডফাদার, War on Terror-এর স্বরূপ,War on Terror -এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে আমরা সম্যক অবগত হলাম।এমতাবস্থায় আমাদের সুন্দর-শান্তিপ্রিয় দেশটি যাতে জঙ্গিময় না হয়, আমরা যেন ইরাক-আফগানিস্তান-পাকিস্তানের ন্যায় অবস্থার শিকার না হই তার জন্য সময় থাকতে দল-মত নির্বিশেষে সকল পক্ষকে দায়িত্বশীল ভুমিকা পালন করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশীর ঘরে আগুন লাগলে সে আগুন এক সময় আমার ঘরেও লাগবে। আগুনের অসীম ধ্বংসলীলা থেকে কেউ রক্ষা পাবে না।


জঙ্গবিাদ নির্মূলে করণীয়
১. জায়নবাদী ইসরাইল ও জায়নবাদকে প্রতিরোধ করা।
২. যেসব দেশ জঙ্গি উৎপাদন এবং সরবরাহে লিপ্ত রয়েছে তাদের কার্যক্রম ও দূতাবাসসমূহ কঠোর নজরদারিতে রাখা।
৩. দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি হয়, এমন কার্যক্রম থেকে বিরত থাকা এবং সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে জাতীয় স্বার্থে সমঝোতা ও সমন্বয় সাধন।
৪. সকল দেশরক্ষা বাহিনীকে অধিকতর শক্তিশালী ও সজাগ করা।
৫. জাতীয় শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করে জাতিকে জানানো।
এমতাবস্থায় জঙ্গিবাদের গডফাদার দেশের পক্ষ থেকে যখন বলা হবে অমুক দেশে জঙ্গি আছে এবং সরকারও যখন সাম্রাজ্যবাদীদের সুরে সুর মিলিয়ে বলবে, দেশে জঙ্গি আছে তখন ধরে নিতে হবে উক্ত দেশে জঙ্গি আছে অথবা উক্ত দেশে পাঠানোর জন্য ইতিমধ্যে একদল জঙ্গিকে প্রজনন কেন্দ্রসমূহে ট্রেনিং দিয়ে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সময়-সুযোগ মতো অথবা সরকারের সহায়তায় দেশে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করে উক্ত জঙ্গিদেরকে কাঁটাতারের বেড়ার ফাঁক দিয়ে পুশব্যাক করা হবে। সাম্রাজ্যবাদের সৃষ্ট ও পাঠানো উক্ত জঙ্গিরা যখন নিরীহ মানুষের উপর রক্তাক্ত হামলা পরিচালনা করবে সংশ্লিষ্ট তাবেদার সরকার তখন জঙ্গি হামলার অজুহাতে নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ব্যক্তি ও দলকে নিশ্চিহ্ন করার কাজ শুরু করে দেশে গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতি সৃষ্টি করবে। রক্তাক্ত গৃহযুদ্ধ থেকে উক্ত দেশকে বাঁচানোর নামে এবং নিজেদের সৃষ্ট জঙ্গি দমনের অজুহাতে গডফাদার দেশসমূহ সংশ্লিষ্ট দেশে সসৈন্যেহাজির হয়ে দেশ দখল, তাবেদার সরকার রক্ষা, গণহত্যা ও লুণ্ঠন শুরুকরবে। এই হলো War on Terror-এর নামে War for Terror &
Roberry’র অনুসৃত নীতি।
এস.এম. নজরুল ইসলাম।
সম্পাদকঃ মাসিক ইতিহাস অন্বেষা ।
০১৭১১৭২০৯২৩